ভোরে ঘড়ির কাঁটা যখন পাঁচটার ঘরে পৌঁছায় তখন তার ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে চলে যান আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়ির বারান্দায়। তিনটি বারান্দা রয়েছে তার ফ্ল্যাটে। সেখানে একে অপরের মায়ায় জড়াজড়ি করে ছায়া দেয় বেলি, টগর, করবী, কামিনী, বাগান বিলাস, নানা ধরনের অর্কিড, ডালিয়া, মরিচ, অ্যারোমেটিক জুঁইসহ আরও বর্ণিল ফুল ফোটানো নানান গাছগাছালি। একে একে তিনটি বারান্দাতেই যান তিনি। গাছেদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটান, তাদের খোঁজখবর নেন, পরিচর্যা করেন। ফুলের সৌরভ গায়ে মেখে বেরিয়ে পড়েন প্রাতঃভ্রমণে। ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট হাঁটেন ভোরের সতেজ বাতাসে। ততক্ষণে শরীর মন চাঙ্গা হয়ে প্রস্তুতি নেয় কর্মময় একটি দিনের জন্য। বাড়ির সকলের জন্য প্রাতরাশ নিজ হাতে তৈরি করতে পছন্দ করেন তিনি। প্রভাতী ভ্রমণশেষে চটপট লেগে পড়েন বাড়ির সকলের সারাদিনের আহারের আয়োজনে। ঘণ্টাদুয়েক সময় ব্যয় করেন হেঁসেলে। নিজ পুত্র আর শ^শুর-পুত্রকে খাইয়ে এরপর নিজে খেয়ে পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে পড়েন কর্মস্থলের উদ্দেশে। গত ত্রিশ বছর ধরে চলছে এই নিয়ম। বেসরকারি একটি ব্যাঙ্কের ঊর্ধ্বতন একজন নির্বাহী তিনি। না, তিনি কেবলই একজন ব্যাঙ্ককর্তাই নন, তার রয়েছে ভিন্ন সত্তা, ভিন্ন পরিচয়- বলছি আবৃত্তি ও অভিনয়শিল্পী নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলির কথা। সম্প্রতি স্বেচ্ছায় চাকরিজীবনকে বিদায় জানিয়েছেন কাকলি।
ভোর পাঁচটায় যে ঘুম থেকে ওঠেন, এই অভ্যাস কাকলির সেই শিশু পাঠ মুখস্থ করার বয়স থেকেই। জন্মেছেন ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। পাঁচ বছর বয়সে যুক্ত হন ‘গেন্ডারিয়া সীমান্ত খেলাঘর আসরে’। সেখানে নিত্যদিন অনুশীলন করেন গান-আবৃত্তি-অভিনয়, ড্রামবেল, ঝুমুর ও কাঠিনৃত্য। মা সৈয়দা ইশরাত জাহান অনুপ্রেরণা জোগান শিল্পচর্চায়। মা খুব চাইতেন, মেয়ে যেন শিল্পকলার কোনো একটা বিষয় নিয়ে এগিয়ে যায়, জীবনে সফল হয়; তাই তার প্রচেষ্টার কোনো খামতি ছিল না। বাবা নুরুল ইসলাম চৌধুরীও সমর্থন করতেন সবকিছুতে। আবৃত্তি, গান, নাচ শিখতে শিখতে শিশু কাকলি ভর্তি হলেন মনিজা রহমান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। এখান থেকে পার হলেন স্কুলের গণ্ডি। উচ্চমাধ্যমিক পড়েছেন কে এল জুবেলী কলেজে। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ফজলুল হক মহিলা কলেজ থেকে। আর, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি থেকে। স্নাতক পাস করেই যুক্ত হয়ে যান ব্যাঙ্কিং পেশায়। ‘সীমান্ত খেলাঘর আসরে’ আবৃত্তি শেখাতেন বকুল ভাই। বকুল ভাইয়ের কাছে আবৃত্তি শিখতে শিখতেই কবিতার প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয় তার। মাঝে মা ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে, নাচ শেখার জন্য। কিছুদিন চেষ্টাও করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নাচ তাকে টানেনি। একপর্যায়ে বন্ধ করে দেন সেখানে যাওয়া।
এবার যুক্ত হলেন গেন্ডারিয়া ‘উদীচী’তে, আবৃত্তি শাখায়। এখানে আবৃত্তি বিভাগে পেলেন শাহাদাৎ হোসেন নিপু, অলোক বসু আর ঝর্ণা সরকারকে। এরা সবাই এখন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আবৃত্তিতে বোনের এত আগ্রহ দেখে বড়ো ভাই মানজহার ইসলাম চৌধুরী সুইট ভাবলেন একটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন, কী করা যায়- শাহাদাত হোসেন নিপুর পরামর্শে কাকলিকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় আবৃত্তি শেখার প্রতিষ্ঠান ‘কণ্ঠশীলন’-এ। গেন্ডারিয়া, ওয়াইজঘাটের গণ্ডি পেরিয়ে এবার চলে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে, ভর্তি হলেন ‘কণ্ঠশীলন’র প্রশিক্ষণ আবর্তনে, সেটা ১৯৯০-এর কথা।
এখানে ওয়াহিদুল হক, নরেন বিশ্বাস, বিপ্লব বালার মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিবিড় সান্নিধ্য কিশোরী কাকলিকে ছন্দ, ভাব-রস, উচ্চারণ, পাঠ, আবৃত্তির কলাকৌশল রপ্ত করার অনন্য এক জগতের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। চার মাসের কোর্সশেষে একটা পরীক্ষা হয়, বাড়িতে সাফ জানিয়ে দিলেন পরীক্ষা তিনি দেবেন না। মা বললেন, কেন ? জানালেন, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কোর্স সম্পন্ন করে পরীক্ষার দিচ্ছেন, সেখানে তিনি কী পরীক্ষা দেবেন ? কী-ই-বা অর্জন করবেন ? মা বললেন, তাতে কী ? ফার্স্ট-সেকেন্ড হতে হবে এমন কোনো কথা নেই- যা পারবে তা-ই পরীক্ষা দেবে। দিলেন পরীক্ষা, ভালোভাবে উত্তীর্ণও হলেন। এবার পাকাপাকিভাবে যুক্ত হলেন ‘কণ্ঠশীলনে’। প্রতি শুক্রবার সকালে চলে আসেন টিএসসিতে, নিয়মিত চলে উচ্চতর প্রশিক্ষণ, মহড়া। ১৯৯০ থেকে ২০০৭ টানা ১৭ বছর ‘কণ্ঠশীলনে’ সময় দিয়েছেন একাগ্রচিত্তে। ‘কণ্ঠশীলন’ প্রযোজিত ‘অনা¤িœ অঙ্গনা’, ‘রোমিও জুলিয়েট’, ‘রবিঠাকুর কবিঠাকুর’ প্রভৃতি প্রযোজনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হলেন কাকলি। এবং, এর পাশাপাশি চলতে থাকে মঞ্চ ও টেলিভিশনে একক আবৃত্তি।

‘কণ্ঠশীলনে’ পথ চলতে চলতে পরিচয় হয় অভিনয়শিল্পী খালিদ খান যুবরাজের সঙ্গে। যুবরাজ তখন ঢাকার মঞ্চকাঁপানো দারুণ এক অভিনেতা। খালেদ খান তখন সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি হেনরি ইবসেনের সাড়াজাগানো নাটক ‘ডলস হাউজ’ মঞ্চে আনবেন। পা-ুলিপি নির্বাচন করেছেন শম্ভু মিত্রের রূপান্তর- ‘পুতুল খেলা’। ‘ডলস হাউজ’র ‘নোয়া’ চরিত্রের নাম হলো এখানে ‘বুলু’। ‘বুল’ চরিত্রের জন্য খালেদ খানের পছন্দ কাকলিকেই।
সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ কাকলি প্রস্তুত হতে থাকেন দুই সন্তানের জননী ‘বুলু’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য। সে-সময়ে নির্দেশক খালেদ খানের পরামর্শে তিনি সহপাঠী সহযাত্রীদের সঙ্গ ত্যাগ করে কিছুদিন বড়োদের সঙ্গে মিশেছিলেন। মঞ্চস্থ হলো ‘পুতুল খেলা’। মঞ্চে নবীন হিসেবে প্রশংসিতও হলেন।
২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে যুক্ত হলেন দেশের অন্যতম নাট্যদল ‘নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে’। নাগরিকে যোগ দিয়ে প্রথমে অভিনয় করেন আন্তন চেকভ-এর নাটক ‘চেরি অর্চার্ড’ অবলম্বনে আলী যাকেরের রূপান্তর ও নির্দেশনায় ‘কাঁঠালবাগান’ নাটকে। ‘নাগরিকে’ তার উল্লেখযোগ্য কাজ মঞ্চসারথী আতাউর রহমানের নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’ নাটকের ‘নন্দিনী’ চরিত্রে অভিনয়, এ নাকটির ৪৬টি প্রদর্শনীতে তিনি অভিনয় করেছেন। ‘নন্দিনী’ চরিত্রটি তার কাছে সৌন্দর্যের প্রতীক যেমন তেমনি পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদও। কাকলি মনে করেন, যে পুঁজিবাদী শাসন ও শোষণ এখনো পৃথিবীতে বর্তমান, শুধু তার ধরন পল্টেছে এই যা। ‘নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে’ আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘এখন দুঃসময়’ ও ‘অপেক্ষমান’ নাটকে আতাউর রহমান ও পান্থ শাহরিয়ারের বিপরীতে অভিনয় করে প্রশংসিত হন কাকলি। ‘অপেক্ষমান’ বাংলাদেশের বাইরে মিশর ও নেপালে সফলভাবে মঞ্চায়িত হয়েছে।
তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম শ্রেণির তালিকাভুক্ত আবৃত্তি ও অভিনয়শিল্পী। টেলিভিশনে বেশকিছু নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি। করেছেন বিশেষ দিবসের অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও।
প্রতিদিন কোনো-না-কোনো কবিতা পড়েন কাকলি। কবিতার মধ্যে তিনি উন্নত জীবনের বোধ খুঁজে পান। মানব অবয়বের ভেতরের সত্তাটিকে প্রাণোচ্ছল এক মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মন্ত্র প্রোথিত আছে কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে, এমনই ভাবনা কাজ করে কাকলির মনোলোকে।
কণ্ঠশীলনেই পরিচয় হয়েছিল আরেক আবৃত্তিকার আহসানুল করিম দিপুর সঙ্গে। আবৃত্তির সাথি থেকে তিনি হয়ে ওঠেন কাকলির জীবনসাথি। গুছিয়ে সংসার করেন কাকলি। নিজ হাতে রান্না করেন। নানাপদের রান্না আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়াতে ভালোবাসেন। কাকলি-দিপু একমাত্র পুত্রসন্তান ধ্রুব জ্যোতি আহসান-এর গর্বিত বাবা-মা। ধ্রুব এখন অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন।
আবৃত্তি-অভিনয়, ব্যাঙ্কে ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর চাকরি, গোছানো পরিপাটি সংসার- সব মিলিয়ে সফল এক শিল্পীসত্তার অবয়ব নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলি।
আবৃত্তি নিয়ে বেশিকিছু কাজ করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। আবৃত্তির পেশাগত ভিত রচনার উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি। তার সাফল্য প্রত্যাশা করি।
লেখা : শ্যামল কায়া