সুরের মায়াজালে ফাহমিদা নবী

11 Mar 2026, 02:42 PM সারেগারে শেয়ার:
সুরের মায়াজালে ফাহমিদা নবী

নস্টালজিয়া আর আধুনিকতার সেতুবন্ধন


বাংলা গানের ভুবনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ফাহমিদা নবী। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তার স্বকীয় গায়কি এবং রুচিশীল গানের মাধ্যমে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। গত শতকের নয়ের দশকের সেই ক্যাসেট প্লেয়ারের সোনালি দিন থেকে আজকের ডিজিটাল যুগ- সবখানেই তার কণ্ঠের জাদু অমলিন। সম্প্রতি এই গুণী শিল্পী নতুন কিছু গান নিয়ে হাজির হয়েছেন, যা আবারও শ্রোতাদের নিয়ে যাচ্ছে এক মায়াময় নস্টালজিক ভ্রমণে। ফাহমিদা নবীকে নিয়ে থাকছে বিশেষ প্রতিবেদন। লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


নতুন গান নিয়ে ব্যস্ততা

প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গান উপহার দিয়ে চলেছেন ফাহমিদা নবী। ভালোবাসাদিবস ও বসন্ত-উৎসবে নতুন গান প্রকাশিত হয়েছে তার। ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে ‘চায়ের কাপে কবিতা’ শিরোনামের নতুন একটি গান। গানটির বিশেষত্ব হলো, শ্রোতারা এটি দু’টি ভিন্ন আমেজে উপভোগ করতে পারছেন। একটিতে ফাহমিদা নবীর সাথে কণ্ঠ দিয়েছেন জয় শাহরিয়ার। অন্যটি তার একক কণ্ঠে গীত।

সোমেশ্বর অলির চমৎকার কথায় গানটির একটি দৃষ্টিনন্দন মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করা হয়েছে। গানটি প্রসঙ্গে ফাহমিদা নবী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘সত্যি বলতে এই কাজটি নিয়ে মনে আলাদা একটি ভালো লাগা কাজ করছে। একই গান দুই ঢঙে শুনে শ্রোতারা ভিন্ন আনন্দ পাবেন। দারুণ কিছু শব্দ আর সুরের মায়ায় গানটি সবার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।’

এছাড়া বসন্ত-উৎসবের রং আরও বাড়িয়ে দিতে মুক্তি পেয়েছে তার অন্য একটি গান- ‘আজ বসন্ত’। গানটি সাজানো হয়েছে বসন্তের চিরায়ত আবেশ দিয়ে। গানটির কথা লিখেছেন রঞ্জু রেজা। সুর ও সংগীত করেছেন সজীব দাস।

নতুন এই কাজগুলোর মাধ্যমে ফাহমিদা নবী আবারও প্রমাণ করলেন, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে রুচিশীল গানের মাধ্যমে তিনি সবসময়ই শ্রোতাদের মনের খুব কাছে থাকতে ভালোবাসেন।


ফিরে দেখা সেই মায়াবী বিকেল

একসময় বিকেলের নিস্তব্ধতা মানেই ছিল ক্যাসেট প্লেয়ারের পাশে বসে গান শোনা। জানালার ফাঁক গলে আসা ম্লান আলো আর বাইরে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দে মিশে যেত ফাহমিদা নবীর কণ্ঠ। সেই দিনগুলো কেবল একটি সময় নয়, ছিল এক বিশেষ অনুভূতির নাম। সমসাময়িক সংগীতাঙ্গনে যখন মৌলিক গানের জোয়ার কিছুটা স্তিমিত, ঠিক তখনই ফাহমিদা নবী তার ৬০তম জন্মদিনে ‘দুঃখের দলিল’ ‘আসলো না বৃষ্টি’ ও ‘ইচ্ছে করে’ শিরোনামের তিনটি নতুন গানের ঘোষণা দেন। গানগুলোর কথা লিখেছেন গীতিকার গোলাম মোর্শেদ এবং সুর করেছেন শামস সুমন। প্রতিটি গানেই রয়েছে বেদনার এক মৃদু আবহ। তবে, তা ভারাক্রান্ত নয়। বরং সংযত, পরিমিত এবং আধুনিক সুরায়োজনে নির্মিত। গানগুলো প্রসঙ্গে শিল্পী বলেন, ‘আমি চেয়েছি নব্বইয়ের দশকের সেই সুর-সংবেদন ফিরিয়ে আনতে। আমাদের এখনকার গানে অনেক সময় আবেগের চেয়ে প্রযুক্তি বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই গানগুলোতে আমি চেয়েছি মানুষের মনের ভেতরের লুকানো কষ্টগুলোকে আধুনিক ছোঁয়ায় প্রকাশ করতে।’


বৃষ্টির সাথে এক অদ্ভুত মিতালি

ফাহমিদা নবীর কণ্ঠ আর বৃষ্টি যেন একে অপরের পরিপূরক। সম্প্রতি তার কণ্ঠে মুক্তি পাওয়া ‘বৃষ্টি তুমি ঝরছিলে সেদিন’ গানটি ইউটিউবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে। সোহেল আলমের কথা এবং শেখ মোহাম্মদ রাজোয়ানের সুরে এই গানটি যেন এক বর্ষণমুখর বিকেলের প্রতিচ্ছবি। শ্রোতারা তার কণ্ঠে যে-ধরনের ধীর লয়ের এবং গভীর আবেগের গান প্রত্যাশা করেন, এটি ঠিক তেমনই। তার গান কখনো উচ্চস্বরে চিৎকার করে না, বরং বাতাসের মতো নিঃশব্দে হৃদয়ে প্রবেশ করে।


জীবনের সুর ও শৈশব : যেখানে শুরু

১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি দিনাজপুরে এক সংগীততীর্থে জন্ম নেন ফাহমিদা নবী। তার রক্তে মিশে আছে সংগীত। বাবা প্রখ্যাত শিল্পী মাহমুদুন্নবী ছিলেন তার প্রথম শিক্ষক এবং অনুপ্রেরণা। বাবার কড়া শাসনে নয়, বরং সুরের আদরে বড়ো হয়েছেন তিনি। তার বোন সামিনা চৌধুরী এবং ভাই পঞ্চম- দু’জনেই দেশের সংগীত জগতে প্রতিষ্ঠিত।


‘আহা!’ থেকে জাতীয় স্বীকৃতি

২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ ছিল ফাহমিদা নবীর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বছর। এনামুল করিম নির্ঝরের ‘আহা!’ চলচ্চিত্রের ‘লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প’ গানটি তাকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়াও তিনি চ্যানেল আই পারফর্মেন্স অ্যাওয়ার্ড ও মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

ফাহমিদা নবীর জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘একটু যদি তাকাও তুমি’, ‘যায় কি ছেঁড়া বুকের পাঁজর’, ‘তুমি কি বল আসবে’, ‘আমি আকাশ হবো’, ‘ভালোবাসার কোনো মানে নেই’, ‘স্বপ্নছোঁয়া’, ‘আকাশ সমুদ্র ওপার’, ‘ভুল করে ভালোবেসেছি’, ‘লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প’সহ অসংখ্য গান।


রিয়েলিটি শো এবং গানের শুদ্ধতা রক্ষা

২০০৫ থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ১’-এর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তিনি কেবল বিচারক ছিলেন না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে গানের শুদ্ধতা এবং ক্ল্যাসিক্যাল তালিমের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বরাবরই মনে করেন, গান হচ্ছে সাধনার বিষয়, রাতারাতি তারকা হওয়ার মাধ্যম নয়।

সুরের বাইরের ফাহমিদা নবী

ফাহমিদা নবী কেবল একজন গায়িকাই নন, তিনি একজন সৃজনশীল সত্তা। তিনি গান লিখতে এবং সুর করতে দারুণ ভালোবাসেন। তবে, তার আরেকটি গোপন নেশা হলো আলোকচিত্র [চযড়ঃড়মৎধঢ়যু]। লেন্সের আড়ালে দাঁড়িয়ে জীবনকে ফ্রেমবন্দি করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার এই শৌখিনতা তার সংগীতেও প্রভাব ফেলে। প্রতিটি গানে তিনি যেন এক একটি দৃশ্যপট তৈরি করেন।


বর্তমান দর্শন : ভিউ বনাম তৃপ্তি

আজকের ‘ভিউ-কালচার’ নিয়ে ফাহমিদা নবীর চিন্তা বেশ স্বচ্ছ। তিনি মনে করেন- “গান কোনো ‘মজার’ বিষয় নয়। গান হলো আনন্দের এবং আরামের বিষয়।”

ফাহমিদা নবী পেশাদার সংগীতজীবন শুরু করেন ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি মূলত ক্ল্যাসিকাল এবং আধুনিক গান গেয়ে থাকেন। তবে, রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীতেও তার দক্ষতা প্রশংসনীয়। যার কারণেই তিনি আজ চার দশক পরেও সমান জনপ্রিয়। যেখানে অনেক শিল্পী সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছেন, সেখানে ফাহমিদা নবী আজও টিকে আছেন তার স্বকীয়তা আর গুণগত মানের জোরে।


শেষ কথা

নয়ের দশকে সেই ক্যাসেট প্লেয়ারের দিনগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু ফাহমিদা নবীর গানগুলো শুনলে মনে হয় সময় থমকে আছে। তিনি আমাদের শেখান কীভাবে স্মৃতিকে বর্তমানে জিইয়ে রাখতে হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এক অনন্য উদাহরণ যে, কীভাবে জনপ্রিয়তার মোহ ত্যাগ করে কেবল শিল্পের সেবা করে যাওয়া যায়। ফাহমিদা নবীর এই সুরের যাত্রা আরও দীর্ঘ হোক, এটাই ভক্তদের প্রত্যাশা।