জীবন নদীর বাঁকে : দিল আফরোজ রিমা

11 Mar 2026, 02:28 PM গল্প শেয়ার:
জীবন নদীর বাঁকে : দিল আফরোজ রিমা


আরব আমিরাতের নামি-দামি শহরে রোকসানা বেগমের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেই দিন কাটে বললে ভুল হবে না। একটি ভালো কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার তিনি।

অফিস শেষে নিজ বাড়িতে কাজকর্ম শেষ করে ফোনে মেয়ের খোঁজখবর নিতে দশ মিনিট কথা হয়। তারপর চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে টিভির সামনে বসেন রোকসানা বেগম। ফেলে আসা দিনগুলো ইদানীং মন ভারি করে দেয় তার। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে-কেমন আছে মানুষটা?

নিজের জীবনের পাতা খুলে বসেন তিনি।

বাবা-মায়ের অনেক আদরের মেয়ে রোকসানা বেগম একদিন বউ সেজে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর ঘরে যান নতুন ঘর বাঁধার প্রত্যাশায়।

নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষদের সাথে কষ্ট-সুখে কেটে যায় কয়েকটি বছর। এক সময় কোল জুড়ে আসে ছোট্ট মেয়ে নয়না। কন্যা সন্তান এই পরিবারের এত অপছন্দ, তা জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানায়। মাসুদ সাহেব একজন শিক্ষিত মানুষ। বড়োসড়ো চাকরি করেন। কিন্তু তিনি অশিক্ষিত। আসলে কোরআন-হাদিসের শিক্ষার আলো যার ভিতরে নেই, সে অশিক্ষিতই বটে।

মেয়েকে নিয়ে চলে যেতে হলো বাবা-মা-ভাইদের সংসারে। ছোট্ট বাচ্চাটিকে নিয়ে সে একজন বাড়তি মানুষ, আর সবার ঝামেলায় পরিণত হলো। কী যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলো তাকে! আর কোনোদিন খবর নেয়নি স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ।

মেয়ের বয়স এক বছর হলো। তখন রোকসানার বান্ধবী রেহেনা পারভীনের সহযোগিতায় আরব আমিরাতে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়।

রোকসানা বিয়ের আগেই অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে আরও কিছু দরকারি কোর্স করে নেন তিনি। তারপর একদিন হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে আরব আমিরাতে চলে যান।

সেখানে তিনি খুব ধনী একজন বাংলাদেশি মুসলমানের বাড়িতে কাজ পান। সেখানে তিনি দুটো বাচ্চার দেখাশোনা এবং বাসার অন্যান্য কাজের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আমরা যেমন পার্মানেন্ট বুয়া রাখি, সেরকম। সেখানে বুয়ার কাজকে তিনি অবহেলা করেননি। বরং খুশি হয়েছিলেন যে একটি বাংলাদেশি মানুষের বাড়িতে কাজ পেয়েছেন বলে। কোনো অফিসের বা বাইরের কোনো কাজ নয়। ছোট্ট মেয়েটাকে তিনি নিজের চোখের সামনে রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। এই কাজটিকেই তিনি একটি ভালো চাকরি ভেবে নিষ্ঠার সাথে, নিজের ব্যক্তিত্ব অক্ষুণ্ন রেখে দায়িত্বগুলো পালন করে যান।

এই বাসার মানুষ খুব ভালো। তারা সবটা জানে। রোকসানাকে তারা সম্মান দিয়ে কথা বলে। প্রতিমাসে বেতন হিসেবে তিনি এক লক্ষ টাকা পান।

কাজ এবং নিজের মেয়ের লালন-পালনের পাশাপাশি তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করেন।

এভাবে কেটে গেল কয়েকটি বছর। ছোট্ট নয়নাকে স্কুলে ভর্তি করা হলো। এত দিনে তার বেতন দ্বিগুণ হলো।

রোকসানা তখন চাকরির জন্য চেষ্টা শুরু করলেন। জনাব শহীদুল ইসলামের বাসায় রোকসানা কাজ করতেন। তাঁরই সহযোগিতায়, তাঁরই একটি ভালো কোম্পানিতে চাকরি হলো রোকসানা বেগমের।

বেশ ভালো সেলারি। কিন্তু তিনি ঐ বাসাতেই থাকেন। অফিসের ডিউটি করে এসে বাসার কাজ করেন। যেহেতু একটি ভালো বেতনের চাকরি হয়েছে, তাই রোকসানা শহীদুল ইসলামের কাছ থেকে কোনো বেতন নিতে চান না। যেটুকু সময় পান, রাসিদা খাতুনের কাজে হেল্প করে দেন। কিন্তু তারা তাঁকে বেশ বড়ো অঙ্কের টাকা বেতন দেন।

বিরাট বড়ো ইন্ডাস্ট্রির মালিক শহীদুল ইসলাম। অনেক মানুষকে তিনি সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন।

পার হয় অনেকটা সময়। রোকসানার নিজের বাড়ি হয় ওখানে। মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে তাঁর জন্যও একটি ভালো চাকরির ব্যবস্থা হয়। শহীদুল ইসলামের ছোট ছেলের সাথে নয়নার বিয়ে হয়।

রোকসানা একদিন মেয়েকে ডেকে বলেন-

“মা, তোমাকে এবার তোমার বাবার খোঁজ নেওয়া উচিত। তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেননি, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন কর। সেজন্য আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করবেন।”

মায়ের কথায় নয়নার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে বলে-

“আমিতো বাবাকে কোনোদিন দেখিনি। আমি যাব বাংলাদেশে, বাবার খোঁজ করতে। তাকে দেখতে।”

এক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা হয়ে যায়। বাংলাদেশে পৌঁছে মাকে ফোন করেছে নয়না।

দুই মাসের ছুটির পনেরো দিন অলরেডি শেষ। এর মধ্যে নয়না বাবার সাথে দেখা করেছে।

মাসুদ সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর ছোট ছেলের বাসায় থাকেন। সেখানে মাসুদ সাহেবের জায়গা হয়নি। বড় ছেলে থাকে ইউরোপের কোনো দেশে। মাসুদ সাহেব গ্রামের বাড়িতে থাকেন। তাঁর ছোট বোন মাজেদা বেগম তাঁর দেখাশোনা করেন। দু’জনেরই বয়স হয়েছে। মাজেদা বেগমের কেউ নেই। আর মাসুদ সাহেবের থাকতেও নেই। দুজনই অসুস্থ।

সকালে শুধু এক গ্লাস ফলের জুস খেয়ে রোকসানা বেগম গাড়িতে ওঠেন। আজ আবার অফিসে জরুরি মিটিং আছে।

এমন সময় নয়না ফোন করে মাকে বলে-

“মা, বাবাকে আর ছোট ফুফিকে আমি নিয়ে যেতে চাই আমাদের কাছে। এখানে তাঁদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। খুব অসুস্থ। দুজনেরই চিকিৎসা এবং যত্ন দরকার।”

রোকসানার চোখে সাগরের ঢেউ। তিনি কথা বলতে পারছেন না। শুধু বললেন-

“আমি তোমাকে পরে জানাচ্ছি।”

সারা রাস্তা কাঁদলেন আর ভাবলেন-

“আমার মেয়েকে একা মানুষ করলেও, মানুষ করতে পেরেছি।”

মেয়েকে জানিয়ে দিলেন-

“তোমার বাবা যদি নিজে থেকে আসতে চান, আর তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে নিয়ে আসতে পার।”

রোকসানা ভাবেন-

“দুনিয়াতো দু’দিনের, তাই মনে রাগ পুষে রেখে কী লাভ!

সে তো এখনো আমার স্বামী।

অসুস্থ হয়ে একা পড়ে আছে।

মেয়ে নিয়ে আসতে চায়-আসুক।” হ

অলংকরণ : আশরাফ হোসেন