সেইদিনও ধুলো উঠছিল।
সৌদির আকাশে রোদটা এমন জ্বলছিল, যেন সূর্যও কারও কাছে পাওনা আদায় করতে নামছে। মফিজ বসে ছিল ‘টেনশনের গলি’-তে। জায়গাটার কোনো সরকারি নাম নেই, কিন্তু প্রবাসীদের মুখে মুখে এর নাম হয়ে গেছে ‘টেনশনের গলি’ এখানে মানুষ কাজ খুঁজতে আসে না, আসে আশার শেষ টুকরাটা বিক্রি করতে।
মফিজের জীবনের স্বপ্নগুলো যেন ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে। তার চোখ শুকনা। কান্না আসে, কিন্তু পানি নাই। বুকের ভেতরটা শুধু ধুঁকধুঁক করে।
আজ তিন মাস গত হয়েছে, মফিজ এই টেনশনের গলিতে সূর্য ওঠার আগে এসে বসে থাকে। দেখতে দেখতে ছ’মাস পার হয়েছে। মফিজের মনে পড়ে সেই দিনের কথা, সাড়ে চার লাখ টাকা ধার, ভিটেমাটি বন্ধক, সুদের আগুন মাথায় নিয়ে যখন শাহজালাল বিমানবন্দর ছাড়ছিল। বিদায়বেলায় চার বছরের ছেলে টুপুরা তার জামা টেনে ধরে বলেছিল, ‘বাজান, আমার লাইগা একটা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি নিয়া আইসো কিন্তু !’
বউ অজিফা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, ‘নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাইখো। টাকা-পয়সা কামাই কইরা আগে ধারটা শোধ দিলেই অইবো। আমার শখ আহ্লাদ পরে।’
মফিজ তখন বুকভরা আশা নিয়ে বলেছিল, ‘চিন্তা করিস না অজি, সব আনব, টুপ্পার গাড়ি আর তোর সোনার চুড়ি নিয়া তবেই ফিরমু।
‘কিন্তু ভাগ্য হাসে না, বিদ্রƒপ করে।’
অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস ! রিয়াদ বিমানবন্দরে নামার পর দুইদিন দুইরাত মফিজ একা বসে কেঁদেছে। দালাল তাকে কোনো কোম্পানিতে পাঠায়নি, পাঠিয়েছিল ‘ফ্রি ভিসার’ নামে এক গোলকধাঁধাঁয়। ভাষা জানে না, চেনে না কাউকে। অবশেষে এক সহৃদয় বাংলাদেশি ভাইয়ের সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও কপালে জোটেনি কোনো কাজ।
নিজ গ্রামের আটু দালাল অনেক লোক পাঠিয়েছে। সে কারণে মফিজও অভাবদৈত্য থেকে মুক্তির আশায় বিদেশে যাবার জন্য ধার দেনা করে, ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে, সাড়ে চার লাখ টাকা দালাল দৈত্যের হাতে তুলে দেয়।
রিকশা চালিয়ে দিনশেষে যা রোজগার হয়. তা সেদিনই শেষ। একদিন শরীর যদি খারাপ থাকে সেদিন না খেয়ে থাকতে হয়। ছেলেটার কোনো বায়না মেটাতে পারে না। সম্পদ বলতে নিজের ভিটেটুকু, তাও এখন বন্ধি।
টেনশনের গলিটা এক অদ্ভুত জায়গা। বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা এখানে এসে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দেয়ালে একটা বড়ো বোর্ড, সেখানে নাম লেখা হয়। কোনো সৌদি শেখ এসে নাম দেখে কাউকে দিনে ১০০ বা ১৫০ রিয়ালে কামলা হিসেবে নিয়ে যায়। যার কপাল ভালো, তার নাম বোর্ড থেকে মুছে যায়। আর যার কপাল মন্দ, সে মফিজের মতো সারাদিন তপ্ত রোদে পুড়ে সন্ধ্যায় শূন্য হাতে ডেরায় ফিরে আসে।
আটুদালাল ফোন ধরে না। অজিফা তার বাড়ি গিয়া কান্নাকাটি করে। দালাল বলে, আরো পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিবে। আবারও অজিফা এনজিও থেকে টাকা তুলে দালালের হাতে তুলে দেয়। এরপর আটু দালালের আর খবর নেই। মফিজের ফোন আর ধরে না। এসব দালালরা টাকাপয়সা দিয়ে পুলিশ, প্রশাসন হাতে করে নেয়। আর গরিব মফিজরা এদের একটা লুম্বাও ছিড়তে পারে না।
মফিজের আশ্রয়দাতা দিনুভাই একদিন বললেন, ‘মফিজ রে, এই গলিটা অভিশপ্ত। এখানে মানুষ কাজ খুঁজতে আসে না, আসলে নিজের আয়ু বিক্রি করতে আসে। একেকটা দিন পার হয় আর আমাদের হাড়মাংস শুকায়া যায়।’
মফিজ উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে। তার কানে বাজে টুপুরের সেই আধো-আধো বুলি, ‘বাজান, গাড়ি আনবা তো ?’
মাস ছয়েক পার হয়ে গেল। মফিজের পকেটে এক রিয়াল নেই। দিনুভাইয়ের মোবাইলটা ধার নিয়ে যখন সে দেশে ফোন দেয়, তখন ওপাশ থেকে শুধু কান্নার আওয়াজ-
‘ওগো, পাওনাদাররা বাড়ির দুয়ারে আইসা গালিগালাজ করে, দুয়ারে খাড়ায়া আমার ইজ্জত নিয়া টানা হেঁচড়া করে, টুপ্পার মুখে দুবেলা ভাত তুলে দিতে পারি না। মানুষে কয় তুমি নাকি টাকা পাঠাও কিন্তু আমি লুকায়া রাখি। আমি আর পারতাছি না ! পচু মাতবর বাড়ি থনে বাইর কইরা দিছে, লাথি গুতা খাইয়া মানুষের রান্ধন ঘরে গ্যাদারে নইয়া থাকি। আর কত বুঝ দিমু নিজেরে। টুপুর যখন মাঝ রাইতে ঘুমের ঘুরে তোমারে খুঁজে, তখন আমার বুকটা ফাইট্যা যায়। আমারে মাফ কইরো, আমি আর পারলাম না। তোমার দেনা শোধ করতে পারলাম না, কিন্তু নিজেরে শ্যাষ কইরা কলঙ্ক তো মুছতে পারি।
অজিফার এই কথাগুলো মফিজের বুকে তীরের মতো বিঁধত।
মফিজ ধরা গলায় বলত, ‘অজি, আর কয়েকটা দিন সবুর কর। আমি কাজ পামু, নিশ্চয়ই পামু। খোদা এত নিষ্ঠুর না রে, একটা ব্যবস্থা অইব।’
কিন্তু নিষ্ঠুরতা তো মানুষের সৃষ্টি। মাস সাতেক পর মফিজ একটা ক্লিনিংয়ের কাজ জোগাড় করল, মফিজ খুশিতে দিনুভাইয়ের মোবাইলে খবরটা জানাতে অজিফাকে কল করতেই খবর এল অজিফা আর দুনিয়ায় নেই। পাওনাদারদের অপমান সইতে না পেরে আর ছেলের ক্ষুধার জ্বালা মিটাইতে না-পেরে সে গলায় ফাঁসি দিয়ে মরছে। টুপুর এখন তার নানির কাছে। সে এখনো বোঝে না মৃত্যু কী, সে শুধু জানে তার মা অনেকক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছে আর বাবা আসবে খেলনা গাড়ি নিয়ে।
খবরটা শোনার পর মফিজ আর কথা বলেনি। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ হয়ে গেছে। আজ টুপুরের জন্মদিন। মফিজের পকেটে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা পাঠানোর মতো মানুষ নেই। দিনুভাইয়ের ঘরের কোণে বসে একটা ছেঁড়া কাগজে কাঁপাকাঁপা হাতে কলম ধরল মফিজ।
“বাজানরে”, লিখতে গিয়েই তার চোখের পানিতে কাগজের বুক ভিজে গেল। “বাজানরে, তোর মা মরে নাই, আমি তারে মারছি। এই টেনশনের গলিতে বইসা বইসা আমি তোর মায়ের হাড়গোড় চিবাইয়া খাইছি। আমি পাপিষ্ঠ, আমি অপরাধী। যে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি তুই চাইছিলি, সেইটা আমার হাতে রে বাজান। কিন্তু তোরে পাঠামু কেমনে ? এই গাড়ির চাকা তো আমার কলিজার ওপর দিয়া চইলা গেছে।
তোর মা নাই, এখন তোর বাপও একটা জ্যান্ত লাশ। নানিকে বলিস তোর মা মরে নাই, সে আসলে শান্তিতে ঘুমানোর একটা জায়গা পাইছে। আর তোর বাপে... তোর বাপে মইরাও শান্তি পাইবো না রে বাজান। তুই বড়ো হইয়া আমারে ঘৃণা করিস, কিন্তু তোর মায়রে ভুলিস না।
আমার কলিজার টুকরা ধন। আজ তোর জন্মদিন, কিন্তু তোর এই অভাগা বাপ আজ তোরে দোয়া করার মুখও হারায়া ফেলছে। লিখতে গিয়া হাত কাঁপতাছে রে বাজান, চোখের পানিতে কাগজের অক্ষরগুলা সব ঝাপসা হইয়া যাইতাছে। ঠিক যেমন সৌদির এই ধুলাবালিতে আমার স্বপ্নগুলা ঝাপসা হইয়া গেছিল। তোর মায়রে আমি কইছিলাম, ‘অজি, সোনার চুড়ি আনুম।’
অজি আমারে কইছিল, ‘চুড়ি দিয়া কী করুম ? তুমি সুস্থ শরীরে ফিরা আইলেই আমার সব।’

আমি কথা শুনি নাই রে বাজান। টাকার লোভে তোর মায়রে আমি আগুনের মুখে ফালায়া আসছিলাম। আজ খবর পাইলাম অজি নাকি পরশুদিন শেষ রাতে তোরে বুকে জড়ায়ে ধইরা অনেকক্ষণ কাঁদছিল। তোর নানি কইলো, সে নাকি বিড়বিড় কইরা কি কথা য্যান কইয়া গেছে-
আইজ তোর জন্মদিন। আমি জানি নানি তোরে পায়েস কইরা খাওয়াইতে পারে নাই। এই পাপী বাপটারে তুই ক্ষমা করিস বাজান। আমারে মাফ করিস... এই চিঠির ভাজে আমার বুকের রক্ত মিশা থাকলো...”
চিঠিটা শেষ হতে পারল না। মফিজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার। কলমধরা হাতটা কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ নিথর হয়ে গেল। ‘টেনশনের গলি’র সেই হাজারো মানুষের ভীড়ে আর একজনের দীর্ঘশ্বাস চিরতরে থেমে গেল।
পরদিন সকালে দিনুভাই এসে দেখলেন, মফিজের নিথর দেহটা মেঝের ওপর পড়ে আছে। তার একহাত আঁকড়ে ধরে আছে সেই অসম্পূর্ণ চিঠিটা, আর অন্য হাতে ধরা একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ি, যেটা সে আজই কিনেছিল টুপুরার জন্য।
টেনশনের গলিতে সেদিনও রোদ উঠেছিল, সেদিনও বোর্ডে নাম লেখা হয়েছিল। শুধু মফিজের নামটা সেই বোর্ড থেকে নয়, জীবনের খাতা থেকেই চিরতরে মুছে গেল।
অলংকরণ : আশরাফ হোসেন