দেশের অনেক প্রথিতযশা শিল্পী আছেন, যারা একসময় ছিলেন বেশ জনপ্রিয়। যাদের অভিনীত নাটক, সিনেমা নিয়ে হতো আলোচনা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তাদের অনেকেই এখন আর পর্দায় নেই। দীর্ঘসময় পার হলেও এখনো তারা কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দন। রুপালি পর্দার সেই সোনালি দিনগুলো এখন না থাকলেও, তাদের প্রতি দর্শকের আগ্রহ আজও কমেনি, ৯০ দশকের দর্শকপ্রিয় অভিনেত্রীরা কে কোথায় আছেন এবং কেমন কাটছে তাদের দিন। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...
গত শতকের নয়ের দশকে ছোটোপর্দা ও বড়োপর্দায় আলো ছড়িয়েছেন এমন অভিনয়শিল্পীর তালিকা অনেক বড়ো। তাদের কাউকে কাউকে এখন আর সেই অর্থে অভিনয়ে দেখা যায় না। দু-একজন আবার বিনোদন অঙ্গনে কাজের ধরন বদলে ফেলেছেন। তারা অভিনয় না-করলেও উপস্থাপনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিচার কাজে অংশ নেন।
লিমা, অভিনেত্রী
গত শতকের নয়ের দশকে হাজারো যুবকের ক্রাশ হয়ে ওঠে অভিনেত্রী লিমা। পারিবারিক নাম শামীমা আলী লিমা। শৈশব থেকেই অভিয়ের সঙ্গে যুক্ত লিমা। বাবা মোহর আলী একজন মুক্তিযোদ্ধা।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধের পর ঢাকায় ব্যবসা শুরু করেন মোহর আলী। বাবা ছিলেন শিল্পমনস্ক। মোহাম্মদপুরে থাকতেই ‘কুট্টি ভাই’ নামে একজনের সঙ্গে মোহর আলীর পরিচয় হয়। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রকৌশলী ছিলেন। তিনিই লিমাকে দেখে বিটিভির ‘অঙ্কুর’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বলেন। অঙ্কুরের মাধ্যমেই লিমার অভিনয়ের শুরু। তখন লিমার বয়স ৯ বছর। লিমা ক্রমে অভিনয়, নাচ ও গানে ভালো করতে থাকেন। এরপর যুক্ত হন সিনেমায়।
লিমা প্রথম নায়িকা হয়ে সিনেমায় অভিনয় করেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে। কমল সরকার পরিচালিত ‘সুখের আগুন’ ছবিতে। সিনেমাটি ব্যবসায়িকভাবে তেমন সফল না-হলেও প্রথম ছবিতেই লিমার অভিনয় নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর নজরে আসে। সেই থেকে অর্থাৎ ১৯৯৩ খ্র্ষ্টিাব্দ থেকে লিমা সবচেয়ে বেশি দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ছবিতে অভিনয় করেন।
টানা আট বছরে ২৫টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন লিমা। বেশিরভাগ ছবি ছিল ব্যবসাসফল। লিমার অভিনয়জীবন পুরোপুরি বদলে দেয় নয়ের দশকের জনপ্রিয় ‘প্রেমগীত’। ছবিটি ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পায়। দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘প্রেমগীত’ দিয়ে শীর্ষ অভিনেত্রীদের তালিকায় চলে আসেন লিমা। এ ছবি দিয়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান অভিনেতা ওমর সানীও। বিশেষ করে ছবির ‘আমার সুরের সাথি আয় রে’ গানটি এখনো অনেকেরই মনে গেঁথে রয়েছে। লিমা সমানতালে অভিনয় করেছেন সে সময়ের সুপারহিট তারকা সালমান শাহ, ওমর সানী, জসীম, বাপ্পারাজ, অমিত হাসান ও রুবেলের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে। মাসের বেশিরভাগ সময় শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকা এই অভিনেত্রী হঠাৎ সবার অগোচরে অভিনয় থেকে সরে পড়েন। একসঙ্গে অনেক ছবির কাজ তড়িঘড়ি করে শেষ করেন।
অভিনয় থেকে সরে যাওয়া প্রসঙ্গে লিমা বলেছিলেন, ‘আমার পরিবার একদমই সাদামাটা। বাবা প্রথম দিকে চাইতেন অভিনয় করি, তাই শখের বশে অভিনয়ে আসি। অভিনয় করতে করতে একসময় মোটা হয়ে যাচ্ছিলাম। স্থূলতা দিন দিন বাড়ছিল। অন্যদিকে বাবাও পারিপার্শ্বিক চাপে চাইছিলেন না আর অভিনয় করি। তখন নিজের সিদ্ধান্তেই অভিনয় থেকে সরে আসি।’ অভিনয় ছাড়ার পর লিমা মোহাম্মদপুরে বিউটি পার্লারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর টানা ২৫ বছর ধরে সিনেমার কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি তিনি।
সোনিয়া, অভিনেত্রী
১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ‘মাস্তান রাজা’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সোনিয়ার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের শুরু। পরের বছর বাপ্পারাজের বিপরীতে ‘প্রেমশক্তি’ সিনেমায় প্রধান নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছবিটি বক্স অফিসে হিট হয়। সুপারস্টার জসিমের বুকের ধন, কালিয়া, রাজাবাবু, বাংলার নায়ক, ভাই কেন আসামিসহ আরো অনেক সিনেমায় বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলো সর্বমহলে প্রশংসিত ও ব্যবসায়সফল হয়। তিনি অকাল প্রয়াত সুপারস্টার সালমান শাহের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ সিনেমায় অভিনয় করেন। সোনিয়া পঞ্চাশটিরও অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। সোনিয়া সবশেষ অভিনয় করেন দেবাশীষ বিশ্বাস পরিচালিত ‘শুভ বিবাহ’ ছবিতে। এরপর আর নতুন কোনো ছবিতে তাকে অভিনয় করতে দেখা যায়নি। ৫০টির বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন এ অভিনেত্রী। যার মধ্যে বেশ কিছু সিনেমা ব্যবসাসফলও হয়েছে। সালমান শাহ, বাপ্পারাজ, রিয়াজসহ সে-সময়ের প্রথম সারির নায়কদের বিপরীতে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি নাটকেও অভিনয় করতেন ; কিন্তু প্রায় ২০ বছর ধরে সবধরনের অভিনয়ের বাইরে তিনি। বেশ কয়েক বছর আগে বিয়ে করে প্রবাসী স্বামীর হাত ধরে লন্ডনে পাড়ি জমান। তিনি সেখানকার নাগরিকত্বও পেয়েছেন। বৈবাহিক জীবনে সোনিয়া তিন সন্তানের জননী।
![]()
সোনিয়া ছেলেবেলায় বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখেছেন। চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রাখার পূর্বে তিনি বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনা করেন। সোনিয়া ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মে নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন ‘মাস্তান রাজা’ ছবিতে অভিনয় করেন। সোনিয়ার বাবা উকিল সুবহান মালেক মির্জা এবং মা নারীনেত্রী কানিজ আফরোজ আরা। ৩ ভাইবোনের মধ্যে সোনিয়া সবার বড়ো। তার ছোটো দুই ভাই শুভ্র ও শায়ান।
তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রয়েছে- মাস্তান রাজা, প্রেম শক্তি, বুকের ধন, কালিয়া, রাজাবাবু, ভাই কেন আসামি, স্বপ্নের ঠিকানা, বাংলার নায়ক, অজান্তে, স্বপ্নের নায়ক, মেয়েরাও মাস্তান, প্রেম প্রতিশোধ, শত জনমের প্রেম, বউ শাশুড়ির যুদ্ধ।
আঞ্জুমান আরা শিল্পী, অভিনেত্রী
নয়ের দশকের দর্শকনন্দিত নায়িকা শিল্পী। পুরো নাম আঞ্জুমান আরা শিল্পী হলেও তিনি শিল্পী নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তার। মাত্র একটি ছবিতেই সালমান শাহের বিপরীতে কাজ করার সুযোগ পান শিল্পী। সেটিকে ক্যারিয়ারের সেরা ছবি বলে মনে করেন তিনি। সিনেমার নাম ‘প্রিয়জন’। ক্যারিয়ারে প্রায় ৩৬টি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। দর্শক জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন শিল্পী। তার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত সবশেষ চলচ্চিত্র দু’টি হচ্ছে নায়করাজ রাজ্জাকের ‘প্রেমের নাম বেদনা’ এবং দেওয়ান নজরুলের ‘সুজন বন্ধু’।

২০০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকে বিদায় নিলেও ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিভিনাটকে অনিয়মিতভাবে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার শকুন্তলা নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে বিভিন্ন মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। শিল্পীর জন্ম তারিখ ১৫ মে। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর শিল্পী টেলিভিশনে কয়েক বছর ধরে উপস্থাপনা করেছেন।
শিল্পী প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে তাদের ছেলে সনত ইকবালের জন্মের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। দুই বছর পর তাদের মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনা ইকবালের জন্ম হয়। ৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আঞ্জুমানসহ ইকবাল এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশ দেয়। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি হচ্ছে বাংলার কমান্ডো, প্রিয়জন, লম্পট, বাবা কেন চাকর, কে আমার বাবা, বীর সন্তান, প্রেমপত্র, প্রেমের নাম বেদনা, মুক্তি চাই, রাজপথের রাজা, শেষ প্রতীক্ষা, শক্তের ভক্ত প্রভৃতি।
একা, অভিনেত্রী

একসময়ের বড়োপর্দার আলোচিত অভিনেত্রী একা। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাতা কাজী হায়াতের ‘তেজী’ এবং পরের বছরে ‘ধর’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে নায়ক মান্নার বিপরীতে অভিনয় করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি। অভিনয় করেন অভিনেতা রুবেলের বিপরীতে ‘বাবা কেন আসামি’ ছবিতেও। এখানেও নজর কাড়তে সক্ষম হন তিনি। নায়ক মান্না মারা যাওয়ার পরও একাধিক নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন। শাকিব খানের বিপরীতে ‘আজকের দাপট’ আলেকজান্ডার বোর সঙ্গে সর্বাধিক ছবিতে অভিনয় ছাড়াও ৩০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু সেভাবে আর নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। একটা সময় মাদক ব্যবসার অভিযোগ উঠলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর ২০১২-’১৩ খ্রিষ্টাব্দে দেশে ফেরেন। এরপর থেকে চলচ্চিত্রে আর দেখা যায়নি এই অভিনেত্রীকে। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০১৭-’১৮ মেয়াদের নির্বাচনে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছিলেন একা। কিন্তু নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে তিনি আটক হয়ে আলোচনায় আসেন। তবে, চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই বলেছেন, অনেক দিন ধরেই একার কোনো খোঁজ নেই। তিনি নিজ থেকে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করেন না।
বিপাশা হায়াত-তৌকির আহমেদ
নয়ের দশকের অন্যতম শীর্ষ তারকা বিপাশা হায়াত। একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা আবুল হায়াতের মেয়ে ও অভিনেতা-নির্মাতা তৌকীর আহমেদের স্ত্রী বিপাশা হায়াত ক্যারিয়ারে অসংখ্য সফল নাটকে অভিনয় করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের তুমুল জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘অয়োময়’-এ ‘লবঙ্গ’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি এতটাই জনপ্রিয়তা পান যে, অনেকেই তাকে সেই নামে ডাকতেন। মঞ্চেও সরব ছিলেন। যুক্ত ছিলেন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে। একসময় অভিনয় করেছেন ‘আগুণের পরশমণি’র মতো চলচ্চিত্রেও। বর্তমানে অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও লেখালেখি ও ছবি আঁকা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি এখন থিতু হয়েছেন আমেরিকায়।

দেশের শিল্পাঙ্গনের জনপ্রিয় তারকা দম্পতি তৌকীর আহমেদ ও বিপাশা হায়াত। তাদের হাত ধরে সম্পন্ন হয়েছে খ্যাতিমান সব কাজ। কিন্তু দেশ ছেড়ে তারা পাড়ি জমিয়েছেন দূরদেশ যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু কী কারণে ? ছিল অভিমানও।
যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর শোনা গিয়েছিল, অভিমান থেকে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৌকীর ও বিপাশা। তবে, এ নিয়ে কখনোই কথা বলেননি দু’জনের কেউ।
সম্প্রতি এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তৌকীর আহমেদ কথা বলেন সেই প্রসঙ্গে। জানান, মূলত সন্তানদের পড়াশোনার কথা চিন্তা করেই যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। তবে, অভিমানের কথাটাও অস্বীকার করেননি অভিনেতা।
তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘শিল্পীরা তো অভিমানী। সব শিল্পীই মনে করেন, তার সঠিক মূল্যায়ন হলো না। তবে, আমাদের দেশের বাইরে যাওয়ার মূল কারণ হলো সন্তানদের বেটার এডুকেশনের চেষ্টা করা।’
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া প্রথমে চ্যালেঞ্জিং হলেও বিষয়টি জীবনের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন তৌকীর আহমেদ। অভিনেতা বলেন, ‘নির্বাসনও কিন্তু একটা অভিজ্ঞতা। হোক সেটা স্বেচ্ছা নির্বাসন। তিনি বলেন, আমার ধারণা, এটা আমার জীবনের বড়ো একটা অভিজ্ঞতা। বিদেশে না থাকলে আমি হয়তো বুঝতাম না যে, নির্বাসনে পাবলো দো কী ফিল করেছেন। আন্দ্রেই তারকোভস্কি কেন তার গ্রামের জন্য কেঁদেছিলেন। এমনকি ইঙ্গমার বার্গম্যানকে কেন সুইডেন ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে আসতে হয়েছিল। নির্বাসন বা স্থানান্তর একটি ইন্টারেস্টিং বিষয়। কেননা, স্থানান্তরিত হওয়ার পর আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। শূন্য থেকে শুরুর একটা চ্যালেঞ্জ থাকে, একটা ভয় থাকে। আবার এক্সপ্লোরেশনের অসম্ভব সুন্দর একটা আনন্দ থাকে।
বিদেশে বেশিরভাগ সময় পড়াশোনা ও লেখালেখি করেই কাটে বলে জানান তৌকীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর্লি রিটায়ারমেন্টের দিকে আছি। আর্লি রিটায়ারমেন্ট বলতে আমি অ্যাকটিভ প্রফেশন থেকে দূরে আছি, কিন্তু ক্রিয়েটিভ প্রফেশনকে ধরে রেখেছি। সেখানে আমি প্রচুর পড়ার সময় পাই, লেখার সময় পাই, সিনেমা দেখার সুযোগ পাই, বেড়ানোর সময় পাই। যেগুলো আমি আর বিপাশা খুব উপভোগ করি।’
বিদেশে স্থায়ী হলেও সময়-সুযোগ পেলেই দেশে আসেন তৌকীর আহমেদ। চেষ্টা করেন পছন্দমতো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে। সম্প্রতি বিটিভিতে প্রচার হলো তার নির্মিত ও অভিনীত ধারাবাহিক নাটক ‘ধূসর প্রজাপতি’। নাটকটি দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
এর আগে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে তৌকীর আহমেদ পরিচালনা করেছিলেন ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামের সিনেমা। মাঝে মঞ্চে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন মঞ্চনাটক ‘তীর্থযাত্রী’।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিপাশা আন্তর্জাতিক শিল্পকর্মের দল ‘দ্য আর্ট ডোম’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
আফসানা মিমি
নয়ের দশকের টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় মুখ ছিলেন অভিনেত্রী আফসানা মিমি। সংযত অভিনয়, সহজ উপস্থিতি আর চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের নির্ভরতার নাম। হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর ‘বকুল’ চরিত্রটি দিয়ে দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন আফসানা মিমি। আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘জিরো পয়েন্ট’ দিয়ে টিভিতে অভিষেক হলেও ‘বউ কথা কও’ নাটকটি ছিল তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। ‘পৌনঃপুনিক’ ও ‘হাউজওয়াইফ’ তার অভিনীত দু’টি আলোচিত নাটক। মঞ্চ থেকে অভিনয়ে আসা এই গুনী শিল্পী পরে নাটক ও সিনেমায় কাজের পাশাপাশি পরিচালনাও করেছেন।

বর্তমানে তিনি ৫৭ বছরে পা রেখেছেন। তার নাম মিমি হওয়ার পেছনে রয়েছে সুন্দর এক গল্প, সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে আড্ডায় উঠে আসে তার ‘মিমি’ হয়ে ওঠার সেই মজার কাহিনি। আফসানা মিমি জানান, শৈশবে ‘মিমি’ চকোলেট তার খুব প্রিয় ছিল। বড়োবোন ‘অ্যানি’র নামের সাথে মিল রেখে তার পারিবারিক নাম রাখা হয়েছিল ‘জুনি’, আর ভালো নাম ছিল ‘আফসানা করিম’। অন্যদিকে বাবা তাকে আদর করে ডাকতেন ‘মিম’। কিন্তু চকোলেটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি নিজের আগ্রহে ‘মিমি’ নামটি বেছে নেন।
মজা করে মিমি বলেন, আমি বোধ হয় পৃথিবীর একমাত্র শিশু, যে কিনা নিজের নাম নিজেই চূড়ান্ত করেছে।
নয়ের দশকে প্রচারিত তার অভিনীত নাটকগুলোর মধ্যে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল ‘একদিন হঠাৎ’, ‘অপেক্ষা’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ এবং ‘নির্জন দ্বীপ’- এ ধরনের সম্পর্কনির্ভর ও চরিত্র প্রধান কাজগুলো। নাটকের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। পাপপুণ্য [২০২২] ছবিতে তার অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্বঅভিনেত্রী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। মিমি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা প্রয়াত সৈয়দ ফজলুল করিম। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে কাজ করতেন। তার মা শিরিন আফরোজ। মিমি তার অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু করেন নাট্যদল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের মাধ্যমে। তার শেষ নাটকটি ছিল ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে প্রচীনত এর রাজা এবং অন্যান্য। মিমি ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ‘কাছের মানুষ’ নামক সিনেমা দিয়ে পরিচালনা শুরু করেন।
২০২০-২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে শিল্পকলা একাডেমিতে থিয়েটার ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব¡ পালন করেন। তিনি শিশুদের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ‘ইচ্ছাতলা’র পরিচালক। তিনি ‘গ্রিন স্ক্রিন’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিক, যা ‘ডলস হাউজ’, ‘কাছের মানুষ’ এবং ‘পৌষ ফাল্গুনের পালা’-এর মতো টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করে।
শমী কায়সার
শমী কায়সার রাজনীতির কারণে বিতর্কিত হলেও নয়ের দশক ধরে টানা অভিনয় করেছেন এবং পেয়েছেন বিপুল মানুষের ভালোবাসা। তার অভিনীত প্রথম নাটক ‘কেবা আপন কেবা পর’। এরপর অভিনয় করেন ‘যত দূরে যাই’ নাটকে। দু’টি নাটক তাকে পরিচিতি এনে দেয়। টিভি নাটক ছাড়াও মঞ্চনাটকে তিনি নিয়মিত ছিলেন একসময়। তার নাটকের দল ‘ঢাকা থিয়েটার’। বর্তমানে রাজনীতি ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অভিনয়ে অনিয়মিত।

তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য টেলিভিশন নাটক হলো- নক্ষত্রের রাত, নীতু তোমাকে ভালোবাসি, প্যাকেজ সংবাদ প্রভৃতি। নাটকের পাশাপাশি বড়োপর্দায় কাজ করেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে হাছন রাজা [২০০৩] ও লালন [২০০৪]।
শমী কায়সার ১৫ জানুয়ারি ১৯৭০-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার এবং মা পান্না কায়সার। পান্না কায়সার একজন লেখিকা এবং সাবেক সংসদ সদস্য। শমীর একজন ছোটো ভাই আছেন, অমিতাভ কায়সার। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক আতিকুল হক চৌধুরী এমন একজন মেয়ে খুঁজছিলেন, যে কি না নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারে, তার নাটক ‘কেবা আপন কেবা পর’-এ অভিনয়ের জন্যে। এর ফলে শমী কায়সার প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান। পরে ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস অবলম্বনে এবং আব্দুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় তিন পর্বের ধারাবাহিক নাটক ‘যত দূরে যাই’-এ অভিনয় করে পরিচিতি লাভ করেন। তার উল্লেখযোগ্য নাটককের মধ্যে রয়েছে নক্ষত্রের রাত, ছোটো ছোটো ঢেউ, স্পর্শ, একজন, অরণ্য, আকাশে অনেক রাত, মুক্তি, অন্তরে নিরন্তরে, স্বপ্ন, ঠিকানা প্রভৃতি।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও নাম লেখান তিনি। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধানসিঁড়ি প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনায় মুক্তি এবং অন্তরে নিরন্তরে নাটক নির্মিত হয়। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে নভেম্বরে তার প্রতিষ্ঠান, ধানসিঁড়ি কমিউনিকেশন লিমিটেড, রেডিও অ্যাক্টিভ নামে একটি বেতার কেন্দ্রের জন্য লাইসেন্স পায়।
শমী ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় ব্যবসায়ী অর্নব ব্যানার্জি রিঙ্গোকে বিয়ে করেন। তবে, দুই বছর পর তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীসময়ে তিনি ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুলাই ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোহাম্মদ আরাফাতকে বিয়ে করেন। নানা কারণে এই সংসারেও বিচ্ছেদ ঘটে। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ অক্টোবর তিনি বিয়ে করেন ব্যবসায়ী রেজা আমিন সুমনকে। সুমন র্যাংগস গ্রুপের প্রাক্তন কর্মকর্তা ছিলেন এবং বর্তমানে গ্রুপ ফোর দুবাইয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।