আমরা এখন আর ডেয়ারিং না
পরপর কয়েকবার মনে হলো অটো উল্টে যাবে। চালক বেপরোয়া। ব্যাটারিচালিত অটোরও এমন তীব্র গতি হতে পারে! তার ওপর আপাতমসৃণ পিচঢালা সরু রাস্তাটি আসলে এবড়োখেবড়ো ও ঢেউখেলানো। রাস্তার মধ্যভাগ কবরের মতো- দুপাশে ঢালু, মাঝে ঢিবি। ফলে তিন চাকার অটোটি যেন ডান্স করছে- ‘কমোলায় নৃত্য করে থমকিয়া থমকিয়া’!
আমি বসেছি চালকের বাঁ পাশে। ডানে আমার শ্বশুরকুলের এক আত্মীয়। পেছনে মুখোমুখি দুই সারির সিটেও আত্মীয়স্বজন- দু’জন শিশুসহ।
চালককে অনুরোধের ঢঙে বললাম,
- একটু আস্তে চালান, পেছনে বাচ্চাকাচ্চা আছে।
চালক বললেন,
- অবশ্যই, ওরাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। আমরা মরলে মরি, ওদের বাঁচতে হবে!
এই কথা বলেই বাঁ দিকের একটা গর্ত কাটিয়ে যেভাবে ডানে উঠলেন, মনে হলো সত্যি সত্যিই আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। বুঝলাম, অনুরোধে কাজ হবে না। কিন্তু মুশকিল হলো- সিরাজগঞ্জের সাধারণ মানুষ সাধারণ ধমকধামকে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কী করা যায় ! এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে!
- আপনার বাড়ি কি এ এলাকায় ? জিজ্ঞেস করলাম।
বললেন,
- না, আমার বাড়ি জানপুর ব্যাঙপাড়া।
বললাম- ওরেব্বাবা ! জানপুরের লোক তো ডেয়ারিং হয়!
কাজ হলো এই কথাতেই। উনি গতি কমিয়ে দিলেন এবং জানপুরের মানুষ যে এখন খুবই ভালো, সে আলোচনায় মেতে উঠলেন।
জানলাম, জানপুর শিংপাড়া এখন অনেক বদলে গেছে। আগের মতো মারামারি-কাটাকাটি আর হয় না। বেশিরভাগ পরিবারেই এখন বিএ, এমএ পাস, এমনকি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারও আছে। আর ব্যাংকে চাকরি করা অনেক মানুষ এখানে দোতলা-তিনতলা বাড়ি বানিয়ে ব্যাঙ্কারদেরই ভাড়া দেয়। সে জন্য জানপুরের নামও বদলে গেছে। আগে ছিল জানপুর শিংপাড়া, এখন জানপুর ব্যাঙপাড়া।
তিনি বললেন,
আমরা এখন আর ডেয়ারিং না, আগে ডেয়ারিং আছিলাম।
ডেয়ারিং- শব্দটি একসময় বাংলা বিশেষণ হিসেবেই বিবেচিত হতো। মফস্বলের প্রতিটি পাড়ায় এক-দুইটা ডেয়ারিং পোলা থাকত। তারা নিজ এলাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে প্রভাব রাখত। মাঝে মাঝে ডেয়ারিং-এ ডেয়ারিং-এ মারপিট হতো। সেই মারপিটে নিজ পাড়ার ডেয়ারিংয়ের পক্ষ নিয়ে অন্য পাড়ার ডেয়ারিং ও তার দলের সঙ্গে লড়তে হতো। রাজশাহীতে আমাদের পাড়ার ডেয়ারিংদের সঙ্গে ভাটাপাড়ার ডেয়ারিংদের এক মারপিটের ঘটনা মনে পড়ে গেল।
এমন স্মৃতিচারণ আর অটোচালকের নানাবিধ উন্নয়নের গল্প শুনতে শুনতে মাঝারি গতিতেই ডুমুর-কবির গ্রামে পৌঁছে গেলাম- বৌভাতের অনুষ্ঠানে। এত প্রাঞ্জল গ্রামীণ আতিথ্যে বহুদিন পর একটা দিন কাটানো গেল। সম্পর্কে আমি বরের নানা এবং বউয়ের নানা-শ্বশুর। ফলে একটা এক্সট্রা খাতিরও পাওয়া গেল!
সিরাজগঞ্জ সদরের বহুলী ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের সঙ্গে ‘ডুমুর’ যুক্ত আছে- ইসা ডুমুর, মুসা ডুমুর, নদা ডুমুর, গোলামি ডুমুর ও পাল ডুমুর।
যে-গ্রামে বিয়ে খেতে এসেছি, তার এখনকার নাম- ডুমুর কবির [বেশ একটা ছন্দ আছে]। আগে এর নাম ছিল ‘পাল ডুমুর’। পাল সম্প্রদায়ের আধিক্য ছিল বলেই পাল ডুমুর নাম। নামটি ছন্দ মিলানোর জন্য পাল্টেছে, না অন্য কোনো কারণে- জানা হয়নি।
শেষবিকেলে ইচ্ছাকৃতভাবেই দলছুট হলাম। একটা রিকশা-ভ্যানে চড়ে বসলাম। বললাম- ভদ্রঘাট চলেন। ভাবলাম, একটু ঘুরোপথ ধরি।
চারদিক ছাইরঙা কুয়াশার চাদরে আগলানো। ফাঁকা রাস্তা। ভ্যানে আমার সঙ্গে আর মাত্র একজন যাত্রী- নাকমুখ ঢাকা। আমিও নাক ঢাকার চেষ্টা করি। কনকনে ঠান্ডা মগজ পর্যন্ত ঢুকে যাচ্ছে। চায়ের তেষ্টা পাচ্ছে। অথচ ছাইরঙা কুয়াশা ভেদ করে দিগন্ত প্রসারিত হলুদ সর্ষেক্ষেত আর মাফলার ভেদ করে ঢুকে পড়া তীব্র মিষ্টি গন্ধ অন্য লেভেলের নেশার ঘোরে নিয়ে গেল।
ভদ্রঘাট থেকে সিএনজি-তে সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশন, সেখান থেকে নবোদের বাসদ অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। সাইফুল ভাই এই শীতেও আমার অপেক্ষায় বসে ছিলেন। এ আমার পরম পাওয়া। অফিসে না-বসে প্রথমেই আমরা চলে গেলাম কড়া লিকারের দুধ-চা খেতে। খুব আনন্দ হলো!
নীলগিরির জাম্বুরা পেঁপে ও আধখানা চাঁদ...
পাহাড়টার নাম তেংপ্লংচুট। তার চূড়াতেই নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র, ঢুকতে লাগে মাথাপিছু একশ’ টাকা।
ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, প্রকৃতির বুকে কৃত্রিমতার বিষ ঢেলে দিয়েছে কেউ ! প্রায় পুরো পাহাড়চূড়া প্লাস্টিকের তৈরি [গাছের ডালের মতো দেখতে], নকল সাজসজ্জা। বাঙালির ‘টাইলস’ প্রেমও এখান থেকে বাদ যায়নি। যেখানে সেখানে টাইলস লাগানো আমাদের ‘খাইসলত’! যার জাররা পরিমাণ রুচিবোধ আছে, তার-ও এসব দেখে বিবমিষা হবে।

তারচেয়ে একশ’ টাকা বঁাঁচিয়ে গেটের বাইরে থাকা ম্রো বা বমদের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারাই ভালো। সেখানে পাহাড়ি দেশি আর থাই পেঁপের স্বাদ পাওয়া যায়, পাওয়া যায় জাম্বুরা, হলুদের ফুল!
ভাষা বুঝি না বলে ম্রো ও বমদের আলাদা করা যায়নি। বাঙালি একজন ড্রাইভার জানালো এখানে ম্রোদের সংখ্যা বেশি, তবে বম জনগোষ্ঠীরও অনেকে আছেন।
আদিবাসী নারী দোকানিরা নিজের হাতে ফল কেটে সাজিয়ে দেবে। আন্তরিকভাবে। ওদের দু’কানে দুই রঙেরফুল গেঁাঁজা। বাংলা কম বুঝেন। তবে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।
অসাধারণ স্বাদের এসব ফল, দামও আশ্চর্যরকম কম। পাহাড়ি সরলতায় মেশানো সেই স্বাদে যেন কলিজা ঠান্ডা হয়ে যায়!
আমি আড়াইশ’ টাকায় দুটি পেঁপে [একটা থাই ভ্যারাইটির বিশাল, আরেকটা মাঝারি দেশি] আর দুটি প্রমাণ সাইজের বাতাবিলেবু কিনলাম।
দেশি পেঁপেটা ইতোমধ্যে খাওয়া শেষ। কঁাঁচা-হলুদ রং, মোমের মতো নরম, আর প্রকৃতির মতোই মিষ্টি। আশা করি থাই পেঁপেটিও তেমনই হবে, যেমনটা ওখানে খেয়ে মনে হয়েছিল, গন্ধটা এমন যেন গালাপের রসে চুবানো!
ফেরার পথে নীলগিরির সব কুৎসিততা ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম বিরক্তি। কারণ সেই পথ- বান্দরবান থেকে নীলগিরি, আবার নীলগিরি থেকে বান্দরবান- পুরোটাই যেন এক আকাশগঙ্গা!
দলের তরুণেরা প্রাণ খুলে গান গাইতে লাগল- হাসন রাজা থেকে লালন, রবীন্দ্রনাথ থেকে কোক স্টুডিও - গান চলতে থাকল অবিরত।
চান্দের গাড়ি পাহাড় বেয়ে নামছে, মাথার ওপর আধখানা চঁাঁদ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলছে। যেন ‘চঁাঁদের গায়ে চঁাঁদ লেগেছে!’ আমরা তাই ভাবনা বাদ দিলাম- নীলগিরির আলো-ছায়া, গান আর চাঁদের সঙ্গেই দিনান্ত হলো!
লুঙ্গি ও শ্যাটা-য়ার
তখন লুঙ্গি সেলাই না করে পরার একটা ট্রেন্ড ছিল। বিরাশি-তিরাশি সালের দিকে। এবং, লুঙ্গিটা হতে হবে প্রিন্টের। সাধারণ বাংলাদেশি চেক লুঙ্গি না। তো, যেহেতু ট্রেন্ড এবং আমরা বয়সে তরুণ, সকলেরই ঝোঁক ছিল প্রিন্টের একটা ফাটা লুঙ্গি পরা।
সে লুঙ্গি আসতো ভারত থেকে। চোরাই পথে। দেশি লুঙ্গির চেয়ে দাম বেশি ছিল বলে সকলে কিনতে পারতো না। আর কড়া শাসনে থাকা পরিবারের তরুণেরা তো মুখ ফুটে বলতেই পারতো না যে, তার একটা ছাপা লুঙ্গি চাই। বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না- এ আপ্তবাক্য কেবল নারীর জন্য প্রযোজ্য না। পুরুষেরও এ অবস্থা হতে পারে।

আমাদের পাড়ার এক বন্ধু একদিন সেই লুঙ্গি কিনে ফেললো। সাদা পাঞ্জাবির সাথে বেগুনি-ছাপা লুঙ্গি পরে জোর কদমে সে পাড়ার রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে লাগল। কদমটা জোরে দিতে হতো। কারণ, তা না-হলে লুঙ্গির ফাটা অংশ প্রকাশ পায় না। অন্তত উরুর মাঝের অংশ পর্যন্ত তো দেখাতে হবেই। সে বন্ধুটি ছিল আবার একটু দুষ্টু প্রকৃতির। আমাদের এলাকার বেশিরভাগ ছেলেই তখন একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছিল। তার অনেকগুলো কারণ আছে। তার থেকে দুটো কারণ বলি :
কারণ এক : ভৌগোলিক অবস্থান। রাজনৈতিক অবস্থানও। এখন যেটাকে জিও-পলিটিক্যাল বলা হয় আরকি! আমাদের পাড়ার নাম ‘ভেড়িপাড়া।’ এনামে রাজশাহীতে একটা ফেমাস মোড় আছে। যেখানে আড্ডা জমে এইট-ডেইজ-এ-উইক।
ভেড়িপাড়া নামকরণ হয়েছে ভেড়া থেকে। এ অঞ্চলে এক সময় ভেড়ার লোম থেকে কম্বল বানানো হতো। যারা এ পেশার সাথে ছিলেন তাদের ভেড়ি বলা হতো। সেই থেকে ‘ভেড়িপাড়া’। আমাদের সময় একটি মাত্র পরিবারকে দেখতাম ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল বানাতে। এখনকার খবর জানি না।
যাই হোক, সেই ভেড়িপাড়ার ভৌগোলিক অবস্থানটা এরকম- পূর্বে পুলিশ লাইন্স [এসএফ], পশ্চিমে পুলিশ লাইন্স [আরআরএফ], উত্তরের পশ্চিম অংশঘেঁষে রাজশাহী কোর্ট। তার মানে হলো- তিন দিক থেকে ঘিরে আছে পুলিশ, পুলিশ এবং উকিলমোক্তারগণ। এবার বলেন, এহেন জিও-পলিটিক্যাল অবস্থানে বসবাসকারী পোলাপান একটু দুষ্টু না হয়ে পারে ? যদিও দক্ষিণের পদ্মা আমাদে সাহসী হতেও শিখিয়ে থাকতে পারে। অথবা উদার।
কারণ দুই : আমাদের এলাকার সীমানার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে ছিল চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য। বন্ধুস্থানীয় অনেকেই এ-কারবারের সাথে যুক্ত ছিল। চিনি, এলাচ, শাড়ি, লুঙ্গি, পাওয়ার স্নিকার [কেডস্] মাদক, এমনকি অস্ত্রশস্ত্রও [নাকি] চোরাচালান হতো এ তল্লাটে। ফলে বিডিআর-এর উৎপাত [নাটকও হতে পারে] থাকতো নদীর পারজুড়ে। এবার আরেকবার বলেন, এহেন জিও-পলিটিক্যাল অবস্থানে বসবাসকারী পোলাপান একটু দুষ্টু না-হয়ে পারে?
ফিরে আসি আমার সেই দুষ্টু বন্ধুর কথায়। তার আগে বলে নিই শ্যাটা-য়ার দারোগার [ছদ্ম নাম] কথা। তিনি বোয়ালিয়া থানার কোন লেভেলের অফিসার ছিলেন জানি না। তাকে শ্যাটা-য়ার দারোগা নামেই সবাই চিনতো। হাড়গিলে শরীর, ছোটোখাটো গড়নের এ দারোগা তখন এলাকার ত্রাস। দূর থেকে তাকে মটোরবাইক চালিয়ে আসতে দেখলেই জোয়ান-বুড়া সবাই সটকে পড়তো। কেউ কেউ বলতো থানায় কাউকে ধরে নিয়ে গেলে ঘুষ তো দিতেই হবে, বেধড়ক মাইরও খেতে হবে। প্রচলিত ছিল যে, কারো কারো ক্ষেত্রে [যাদের ঘুষ দেওয়ার টাকা থাকতো না], তিনি ঘুষের টাকাটা বাড়তি মাইর দিয়ে উসুল করতেন।
শ্যাটা-য়ার দারোগা বত্রিশ নম্বর ভাঙার ওই লোকটার মতো। তার যেমন বত্রিশ নম্বরের একেকটা ইট ভাঙার সময় একেকজন স্ত্রী-সঙ্গমের আনন্দ হচ্ছিল, শ্যাটা-য়ার দারোগাও হয়তো মানুষকে পিটাইতে পারলে অর্গাজমের সুখ পাইতো। হাসিনার আমলে মহান ‘র্যাব’ বাহিনীতেও নাকি এমন কিছু অফিসার ছিলেন। ‘নাকি’ বললাম কারণ কারো নাম জানি না।
তো আমার সেই দুষ্টু বন্ধুকে কি এক কারণে শ্যাটা-য়ার দারোগা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু ধরতে পারছেন না। বন্ধুটি যেন দারোগার গন্ধ পাইতো। দারোগা আসিবার পূর্বেই আসামি পলায়ন করিতো!
তবে, একদিন বন্ধুটি ধরা পড়ে গেল। সাদা পাঞ্জাবির সাথে বেগুণি-ছাপা লুঙ্গি পরে সে বেশ হেলেদুলে ভেড়িপাড়ার মোড় ক্রস করছিল। শ্যাটা-য়ার দারোগা দূরে কোথাও মটোরবাইক রেখে ঘাপটি মেরে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শ্যাটা-য়ার দারোগা সফল হলেন না। তিনি প্রথমে তাকে জাপটে ধরলেন এবং একটু পরে তার কোমরের দিকে লুঙ্গিতে হাত ঢুকিয়ে টানতে থাকলেন। বন্ধুটি জাস্ট সামনে থেকে লুঙ্গির গিট আলগা করে দৌড় দিল পদ্মা নদীর দিকে। আর শ্যাটা-য়ারের হাতে ফাটা লুঙ্গি দোল খেতে থাকল।
তরুণ প্রজন্ম সবসময়েই নিজ নিজ সময়ের মতো মেধাবী ও সৃষ্টিশীল। এদের ঠিকঠাক ডিল করতে না পারলে অনেক কিছুই শ্যাটা-য়ার হয়ে যেতে পারে।