একশো বছর কথা কয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় -ফকির আলমগীর

09 Feb 2021, 02:09 PM ক্যাম্পাস শেয়ার:
একশো বছর কথা কয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় -ফকির আলমগীর

১৯২১ সালের ১ জুলাই আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তবে ১৯২০ সালের ১২ ফেব্রæয়ারি ভারতীয় আইন সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠালে সিদ্ধান্ত হয় এবং ১৮ মার্চ সর্বসম্মতিক্রমে অ্যাক্ট-এ পরিণত হয়। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল কর্তৃক ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ অনুমোদন লাভ করে। এর আওতায় ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। ফলে জ্ঞানের বিস্তার, পরীক্ষা গ্রহণ, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিশেষ সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান, ফেলোশিপ, স্কলারশিপ প্রদান, হল সৃষ্টি ও তত্ত¡াবধানসহ বিভিন্ন দায়িত্ব অর্পিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। এক্ষেত্রে ১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠিত হয়। এ কমিশনের দুটি সুপারিশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তিকরণ ক্ষমতা থাকবে না। এটি হবে একমাত্র বিশিষ্ট শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষায়তন।

২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান।

কমিশনের সুপারিশমতে বিশ্ববিদ্যালয় হবে আবাসিক হল কেন্দ্রিক। এর ফলে ছাত্রদের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটবে। প্রত্যেক শিক্ষক এক একটি হলের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে ছাত্রদের খুব কাছাকাছি থেকে শিক্ষা দান করবেন। প্রত্যেক হলে একজন প্রভোস্টের তত্ত¡াবধানে ৪০০ ছাত্র থাকবে। প্রতিটি হল ৪ বা তার বেশি হাউজে বিভক্ত করা হবে। যার প্রত্যেকটির দায়িত্বে থাকবেন এক একজন হাউজ টিউটর। প্রতিটি হলে টিউটোরিয়াল ক্লাস, কমনরুম, লাইব্রেরি, লেকচার থিয়েটার থাকবে। ১৯২১ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্ট এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল, একাডেমিক কাউন্সিল এবং অনুষদসমূহ সর্বময় কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুভসূচনা পর্ব

২০২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। এ শতবর্ষের ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শতবর্ষ যেমন গৌরবের তেমনি সংগ্রামের। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শিক্ষা-দীক্ষাহীন, সংস্কৃতিহীন, মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন, নিয়তিবাদী ধ্যানধারণায় আচ্ছন্ন থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাস তেমনি এক মানব সমাজের জাগরণের কাহিনি। তাই তো সেই গণসংগীতের গানের চরণে বলতে হয় - ‘পেছন ফিরে চাইলে পরে একশো বছর কথা কয়’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে তদানীন্তন পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশ যার অধিকাংশ মানুষই ছিল শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় পশ্চাদমুখী এবং অসচেতন। ওই পটভূমিকায় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং এর অবদান এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। কালের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও বিবর্তন অবলোকন করলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে প্রথম বঙ্গভঙ্গ ও তাদের প্রসঙ্গ নিয়েই আলোচনার সূত্রপাত করতে হয়। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ এবং ঢাকাকে রাজধানী রূপে নতুন ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের সৃষ্টি’ এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সমর্থন পেয়েছিল। এই সমর্থন শুধু সা¤প্রদায়িক বা রাজনৈতিক কারণেই ছিল না, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কারণেই প্রথম বঙ্গভঙ্গ এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে সমর্থিত ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ এবং পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠনের ফলে সবচেয়ে উন্নতি ঘটে শিক্ষার ক্ষেত্রে অনগ্রসর পূর্ব-বাংলার। ১৯০৬ সালে পূর্ব বাংলায় কলেজ ছাত্রের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,৬৯৮ জন এবং খরচ ১,৫৪,৩৫৮ টাকা যা বেড়ে ১৯১২ সালে দাঁড়ায় ২,৫৬০ জন এবং খরচ ৩,৮৩,৬১৯ টাকা। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে নবগঠিত প্রদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ছাত্র সংখ্যা ৬,৯৯,০৬১ থেকে বেড়ে ৯,৩৬,৬৫৩ জনে দাঁড়ায়। ১৯০৯ সালের মধ্যে প্রদেশে ৮১৯টি নতুন বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয় এবং ছাত্রী বাড়ে ২৫,৪৯৩ জন। ১৯১১ সালে নবগঠিত প্রদেশে ৪,৫৫০টি মেয়েদের স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১,৩১,১৩৯ জনে। পাশাপাশি নতুন প্রদেশ গঠিত হওয়ার পর এ অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষারও ভিত্তি স্থাপিত হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, পূব-বাংলা ও আসাম সরকার অনগ্রসর, পশ্চাদপদ মুসলমান ছাত্রদের জন্য বিশেষ বৃত্তি প্রদান এবং বৃত্তির সংখ্যা বৃদ্ধি করে। প্রায় প্রতিটি কলেজ ও স্কুলে হোস্টেল বা ছাত্রাবাস স্থাপিত হয়। এভাবেই প্রথম বঙ্গভঙ্গ, পূর্ব-বাংলা আসাম প্রদেশ গঠন এবং ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের ফলে এ অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মুসলমান ও তফসিলি স¤প্রদায় আধুনিক শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অভিযাত্রার প্রাক্কালে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে ঢাকা শহরে দুটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। সরকারি ঢাকা কলেজ [১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত] আর বেসরকারি জগন্নাথ কলেজ [১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত]। সরকারি ঢাকা কলেজে সাধারণত উচ্চবিত্ত পরিবারের আর বেসরকারি জগন্নাথ কলেজে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা পড়াশোনা করত, দুটি কলেজেই আইএ, বিএ ও এমএ পড়ানো হতো, কিন্তু বিশের দশকের শুরুতে যখন ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় সোয়া লাখ তখন ওই দুটি কলেজের ছাত্রসংখ্যা হাজার দুয়ের বেশি ছিল না। এমতাবস্থায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত না হলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনগ্রসর পূর্ব-বাংলার নিম্নবিত্ত শ্রেণির মুসলমান ও তফসিলি স¤প্রদায়ের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যেত। তদুপরি ১৯২৬ সাল থেকে ঢাকা শহর ছিল সা¤প্রদায়িক দাঙ্গায় বিপর্যস্ত, ওই পটভূমিকায় রমনায়, নতুন ঢাকায় যদি অসা¤প্রদায়িক পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত না হতো তাহলে যে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ বিলম্বিত হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই, যে শ্রেণির রাজনৈতিক সচেতন অংশ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রপথিক।

এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত মুসলমান ছাত্রগণই বর্তমান মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এদের পরবর্তীপ্রজন্মই শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনবাংলা স্থাপন করেন। মুসলমান সমাজে পূর্বে কোনো মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল না। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃজন করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।  [চলবে]

তথ্যসূত্র : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর : রফিকুল ইসলাম

শতকের পথে গৌরবোজ্জ্বল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : সৈয়দ রেজাউর রহমান

লেখক : গণসংগীতশিল্পী