মানুষ মাত্রই প্রতিভা নিয়ে জন্ম নেয়। তবে, বেশিরভাগ মানুষই বোধ হতেই জীবনকে যাপনের উদ্দেশ্যে নানা কাজে নিয়োজিত করে, বিশেষ করে বৈষয়িক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িয়ে প্রতিভাকে ডুবিয়ে মারে। প্রতিভা কোনো প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠে না, সহজাতভাবে একজন মানুষের মধ্যে যে প্রতিভা থাকে, চর্চার মধ্যমে তার উন্মেষ ঘটে।
শিল্পী ফিদা হোসেন এমনই একজন প্রতিভাধর শিল্পী, যিনি প্রথম জীবনে সিনেমার বড়ো বড়ো ব্যানারে নায়ক নায়িকাসহ অন্যান্যের নানা অবয়ব এঁকেছেন এবং সাইনবোর্ড লিখেছেন, এ-সব কিছুই করেছেন তার শিল্পচর্চার সরঞ্জাম জোগাতে। শত বাধাতেও তিনি থেমে যাননি। বন্ধ করে দেননি ছবি আঁকা। সকলের সুনাম পেয়েছেন। ক্রমশই শিল্পচর্চার নতুন নতুন দুয়ার উন্মোচন হয়েছে তার সামনে, আর সেপথ ধরে এগিয়ে গেছেন সাহস ও অদম্য সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে। একাগ্রতা ও অধ্যাবসায় হোসেনকে তার নিজস্ব স্টাইলে এমনকি ব্রান্ডে পরিণত করেছেন। ব্র্যান্ড শব্দটা বললাম এই জন্য যে, তিনি শিল্পকর্ম কীভাবে বাজারজাত করতে হয় সে ব্যাপারে ভীষণ অনভিজ্ঞই ছিলেন। তিনি পৃথিবীর বহু দেশে নামিদামি অকশন হাউজগুলোতে ছবি বিক্রি করেছেন প্রচুর দামে। এতে তিনি আরেকটি বিষয় প্রমাণ করেছেন যে, শিল্পের শুধু অনন্যতাই নয় বরং ব্যক্তি পরচয়ও একটা মুখ্য বিষয়, শিল্পকর্মকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে।

ফিদা হোসেন ১৯১৫ সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখে জন্ম নেন ভারতের গান্ধারপুরে। বাবা কাপড়ের কারখানায় কাজ করতেন। ছেলে ফিদার বয়স যখন প্রায় ২২, তখন বাবা মুম্বাইতে এসে ঘি-এর ব্যবসা শুরু করেন, তবে বাবার ঘি-এর ব্যবসার সাথে ফিদা নিজেকে জড়াননি। শিশুকাল থেকে ফিদা হোসেন তার প্রতিভা প্রকাশ করতে পেরেছেন সহজভাবেই, তিনি ওই বয়সেই যেখানে যা দেখতেন এঁকে ফেলতেন হুবহু। বাবাও বুঝতে পারলেন, এ ছেলে ছবিই আঁকবে। ফিদা হোসেন বাবার ব্যবসা না-দেখে তিনি ভর্তি হলেন জে জে আর্ট স্কুলে। এখানেই ঘুরে গেল তার জীবনের মোড়।
শিল্পীজীবন শুরু হলো নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে, কিন্তু কোনো সমস্যাই তাকে নিচে নামাতে পারলো না অদম্য সাহস, একাগ্রতা, ধৈর্য, স্থিরতা মকবুল ফিদা হোসেনকে দিল জগৎখ্যাতি।
সে-সময়ে অন্য শিল্পীদের চেয়ে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী, তিনি শুধু ছবি এঁকেই থামেননি। তার প্রতিভার আলো শিল্পকর্মের প্রায় প্রতিটা জায়গায় বিচ্ছুরিত হয়েছে সুনিপুণভাবে তিনি একাধারে লেখক, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, বাড়ির নকশাকার এবং চিত্রনির্মাতা।
অনেকেই ফিদা হেসেনকে ভারতীয় শিল্পকলায় পিকাসোর সাথে মিলিয়ে বলে থাকেন যে, তিনি ভরতের পিকাসো, বিষয়টা আসলে সেরকম নয়। প্রত্যেক শিল্পী বা কবি সবারই কারো না কারোর পূর্বের বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীর ছাপ বা প্রভাব থাকে কাজের মধ্য এর মানে এভাবে তুলনা করা যায় না। কারণ, কারো সাথেই কাউকে তুলনা করা ঠিকব নয়, তা যায়ও না, সকলেই স্ব স্ব জায়গায় মহিয়ান। ফিদার প্রায় অনেক কাজেই পিকাসোর প্রভাব পাওয়া যায়, কিন্তু তবুও ফিদার রচনাশৈলী, তার রং ও রেখা এবং ভারতীয় গল্পকে নতুন রূপ দিয়েছে পশ্চিমা ঢঙে ওই সময়ে ভারত, ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোতে নানাধরনের শিল্প আন্দোলন চলছিল তাতে করে, সচেতন সকল শিল্পীর ওপরই এর একটা প্রভাব পড়ে, যা আমরা ওই সময়ের শিল্পীদের কাজে পেয়ে থাকি। আর ফিদার কাজে পিকাসোর কিউবিজমের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তবে, ফিদা আবহমান ভারতীয় নিজস্ব সংস্কৃতির, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে রেখেই কিউবিজম ধারার মিলন ঘটিয়েছেন স্বেচ্ছায় স্বতন্ত্র স্টাইলে।
শিল্পী ফিদা হোসেন ছিলেন মাতৃহারা। তার ছবি আঁকার পথচলায় একসময়ে যোগ হয় মাতৃশূন্যতা। এ শূন্যতা রূপ নেয় ফিদার রং ও লম্বা তুলিতে তিনি মাতৃরূপ সন্ধান করেন তার কাজে, মাতৃহীন এক শিশুর আজন্ম সাধনা যেন ভারত মৃত্তিকাকে ঘিরে। সন্ধান করেন জন্মভূমি মাকে দেবিতুল্য করে, রূপ, রেখা, রং ও নিজস্ব ঢঙে নির্মিতি করেন একেকটি স্ট্রকের মধ্য দিয়ে নারীমূর্তিকে মায়ের আসনে রেখে একের পর এক নিত্য-নতুন সৃষ্টি।
১৯৪৭ মানে ভারত বর্ষের ঊষালগ্ন, সে-সময় থেকে ফিদার দীর্ঘ পথচলা হচ্ছে একটি মহাকাব্য। তিনি দ্য বোম্বে প্রগ্রেসিভ আর্টস্ট গ্রুপে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তার প্রতিভা বিকাশের লগ্নক্ষণ। এ গ্রুপে আরো যেসব শিল্পীরা ছিলেন, তারা হচ্ছেন শিল্পী সুজা ও রাজা, তাদের ভালো নাম মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। তারা সকলেই ফিদার বন্ধু ও সহকর্মী। তারা দেশকে ভালোবেসে বসেছিলেন না ভারত মাটি আঁকড়িয়ে বরং খ্যাতির অন্বেষণে পা রেখেছিলেন দেশের বাইরে। কিন্তু ফিদা কখনোই বাইরে প্রতিষ্ঠিত হতে চাননি । তার দৃঢ় সংকল্প ছিল তিনি, যেদেশে জন্মেছেন, যেদেশের আলো, বাতাস জল ও মাটিতে বেড়ে উঠেছেন, তাকে ফেলে অন্য কোথাও যত সুখ বা আনন্দ, যাই থাক না কেন, প্রাণের তৃপ্তি পাওয়া যাবে না। তিনি মা, মাটির এই নিঃশর্ত ভালোবাসা, সম্পর্কের সুর ব্যবচ্ছেদ করতে পারেন না। তাই তিনি এ মাটিতেই রয়ে যান।
একজন শিল্পীর ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা বা দেশ বলে কিছু নেই। শিল্পী তো এসব কিছুর উর্ধ্বে। এসব সংকীর্ণতাকে ছিন্ন করে চারের দশকেই অন্যান্য শিল্পীকে ছাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চার পথপ্রদর্শক।
ফিদা এম, এফ হোসেন নামে সবচাইতে বেশি পরিচিতি লাভ করেন চারের দশকে। তার প্রথম প্রদর্শনী হয় সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে। এর কয়েক বছরের মধ্যেই তার পেইন্টিংস ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে। তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত হন ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৭৩-এ পান ‘পদ্মভূষণ’ এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ পান ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে। রাজা রবিবর্মা পুরস্কার পান ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে কেরেলা সরকার কর্তৃক। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় শিল্প পুরস্কার পান ললিতকলা একাডেমি নয়াদিল্লি থেকে। এছাড়াও তার ঝুলিতে রয়েছে আরো অনেক পুরস্কার ১৯৬৭-’৬৮ খ্রিষ্টাব্দে পান তার নির্মিত চলচ্চিত্রের ওপর। ১৯৫৯/৫৫/৪৭-এ পান দেশে এবং বিদেশের নানা বড়ো বড়ো সম্মাননা ও পুরস্কার। তার নির্মিত মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়ে গজ গামিনী, থ্রু দ্য আইজ অব আ পেইন্টার ও মিনাক্ষি। তার শিল্পকর্ম কখনো ব্যঙ্গাত্মক ও হাস্য রসাত্মক আবার কখনো গভীর ভাবাবেগের এবং গম্ভীর, তিনি বহু বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, মহাত্মা গান্ধী থেকে মাদার তেরেসা। আবার ছুটে গেছেন রামায়ণ থেকে মহাভরত, তার পথচলা ছিল অবিরাম, তিনি ভারতের গ্রামীণ ও শহুরে জীবন নিয়ে এঁকেছেন বহু ছবি, এর মধ্যে ব্রিটিশ রাজত্বের কাহিনি ও বাদ দেননি। তার অসংখ্য শিল্পকর্মের মধ্যে মাধুরীকে নিয়েও কম কাজ করেননি। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের সংসদে রাজ্যসভায় মনোনীত হন আর ’৯২ খ্রিষ্টাব্দে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। সেখানে তিনি সংসদের কার্যক্রমের ওপর স্কেচ করেন এই স্কেচগুলো দিয়ে পরে ‘ঝধহংধফ টঢ়ধহরংযধফ’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে। শিল্পী এম, এফ হোসেনের শিল্পকর্মকে আলাদা ব্যাখ্যায় না নিয়ে সামগ্রিকতায় যা দেখা যায় তা হচ্ছে, প্রথমত তিনি শিল্পী মাতিসের মতো এক লম্বা ও মোটা ব্রাশ ব্যবহার করেছেন তার ক্যানভাসে। মোটা দাগে রেখা কেটেছেন তার বলিষ্ঠ ঘোড়া ও মানুষের অবয়বে। উজ্জ্বল রঙে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন, ঘোড়াগুলোর গলা লম্বা করে, মুখ এঁকেছেন হা করে, দেখে মনে হয় চিৎকার করেছে, কোন শব্দের রূপ, রূপক হয়ে বলে ওঠে ইতিহাস সমাজ রাষ্ট্র ও ধর্মের সত্য কাহিনি। মাতৃহারা ফিদা হোসেন মাকে খুঁজতেন নানাভাবে, সেখান থেকেই নারী চরিত্রের নানা ছবির উদ্ভব। তার ছবিতে নিজস্ব সংস্কৃতি, জীবন ও ইতিহাসকে দেখা যায় নানা ভঙ্গিতে কখনো রসে, কখনো তীর্যক অথচ গম্ভীর রং ও রেখার মিলানো ফর্মে। ঠিক তার ছবির মতোই বিস্ময় তার ব্যক্তিজীবনও। এম, এফ হোসেনের খ্যাতিটাই হয়তো মৌলবাদি এক গোষ্ঠীর কারণে সঙ্কটময় হয়ে উঠেছিল। যা তার শেষ জীবনে ঘটে গেল, তিনি চাননি কখনো তার মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে কিন্তু তাকে যেতে হলো যেন স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিতে হলো ইউরোপ, আমেরিকা, লন্ডন, কাতার ও দুবাইতে। তিনি দোহায় এবং লন্ডনে থাকতেন এবং ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে দোহায় [কাতারের] নাগরিকত্ব নেন। লন্ডনে বসবাসের সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন রয়্যাল ব্রম্পটন হাসপাতালে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে ৯ জুন। তাকে লন্ডনের ব্রুকউড কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
লেখক : ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী