এই সময়ের দুর্গোৎসব পুরানের মিথ জীবন্ত হয় যেসব পূজামণ্ডপে : প্রশান্ত অধিকারী

18 Oct 2026, 01:30 PM খবর শেয়ার:
এই সময়ের দুর্গোৎসব পুরানের মিথ জীবন্ত হয় যেসব পূজামণ্ডপে : প্রশান্ত অধিকারী

‘বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ’-এর মধ্যে শারদীয় দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব একটু বেশিই রঙিন। দিনে দিনে শারদীয় দুর্গাপূজা এখন শারদীয় দুর্গোৎসবে রূপ নিয়েছে। তাই তো দু’চারটি স্থান বা দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দুর্গোৎসব এখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সর্বজনীন উৎসবের স্বীকৃতি পেয়েছে।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা সহযোগিতার বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন কিছু দুর্গাপূজা হয়ে থাকে যেটি শুধু ওই এলাকারই নয়, সারাদেশের লোকসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি রং-তুলিতে পুরানের মিথ যেন জীবন্ত হয় সে সব পূজামণ্ডপে। আমরা এবার তেমন কয়েকটি পূজামণ্ডপ নিয়ে আলোচনা করব।

কিন্তু তার আগে একটু জেনে নেওয়া যাক, কবে কোথায় কীভাবে দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়েছিল। যদিও তা নিয়ে ঐতিহাসিক নানা মত ও তথ্য রয়েছে। তবে, প্রায় ২২ হাজার বছর আগে ভারতে প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠী থেকে দেবী পূজার প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। হরপ্পা ও মহেঞ্জাদারো সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরও গ্রহণযোগ্য এবং পরবর্তীসময়ে কালের পরিক্রমায় আজকের আধুনিক ও নান্দনিক রূপ লাভ করে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, দুর্গাপূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দুর্গাপূজার আয়োজন করেন মহাদেব। আবার দেবী ভাগবত পুরান থেকে জানা যায়, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু ক্ষীরোধসাগরের তীরে দুর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হন। যদিও মূল বাল্মীকির রামায়ণে দুর্গাপূজার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব আছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কবি কৃত্তিবাস ওঝা সংস্কৃত রামায়ণ বাংলা করার সময় মূল রামায়ণের বাইরের তৎকালীন সমাজে প্রচলিত বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও লৌকিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ, অনেক মিথ, গল্প বাংলা রামায়ণে তুলে ধরেন। তার এই অনুবাদকৃত রামায়ণ পরিচিতি পায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামে, যা বাংলাভাষী হিন্দু সমাজে বেশ জনপ্রিয়। সেখানে তিনি কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দুর্গাপূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের সব জেলায় দুর্গাপূজা হলেও বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বাগেরহাট, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া ও মানিকগঞ্জ জেলায় ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করা হয়। এছাড়া ভারতের আসাম, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গেও দুর্গাপূজা করা হয়। ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সবচেয়ে বড়ো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পালিত হয়। বর্তমানে পূর্ব ভারতের কলকাতা, হুগলি, শিলিগুড়ি, কুচবিহার, লতাগুড়ি, বাহারাপুর, জলপাইগুড়ি এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল যেমন- আসাম, বিহার, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরালায় ঘটা করে এই উৎসব পালন করা হয়। নেপাল ও ভুটানে স্থানীয় রীতি-নীতি অনুসারে প্রধান উৎসব হিসেবে পালন করা হয়।

বিশ্বজুড়ে যেমন : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, ফিজি, টোবাকো, কুয়েত, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হিন্দুরা বা বাঙালি হিন্দুদের নানা সংগঠন এই উৎসব পালন করে থাকে। বাংলা ভূখণ্ডে এই পূজাকে শারদীয় পূজা, শারদোৎসব এবং বসন্তকালে বাসন্তীপূজা বলা হয়। তবে বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, কেরালা, হিমাচল প্রদেশ, মহীশুর, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশে এ পূজাকে নবরাত্রি পূজা বলা হয়।

১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দুর্গাপূজা করেন। আবার কারো মতে, ষোড়শ শতকে রাজশাহীর তাহেরপুর এলাকার রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজা করেন। ১৫১০ খ্রিষ্টাব্দে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, ১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন। আবার কেউ বলেন, ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী-পরিবার দুর্গার ছেলেমেয়েসহ সপরিবারে পূজা চালু করেন।

১৭১১ খ্রিষ্টাব্দে অহম রাজ্যের রাজধানী রংপুরে শারদীয় দুর্গাপূজার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দূত রামেশ্বর নয়ালঙ্কার। পলাশীর যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃঞ্চদেব লর্ড ক্লাইভের সম্মানে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। পাটনাতে ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের দুর্গাপূজার ওয়াটার কালার ছবির ডকুমেন্ট পাওয়া যায়। ঊড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। কাসিমবাজারের রাজা হরিনাথ ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে বারোয়ারি এই পূজা কলকাতায় পরিচিত করান। পরে তাদের দেখাদেখি আস্তে আস্তে তা উচ্চবর্ণের হিন্দু বাঙালি জমিদারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সম্ভবত সেই থেকে বারোয়ারী পূজার শুরু।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে অতীন্দ্রনাথ বোস জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে পূজা উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও দুর্গাপূজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল [যেমন- কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা, বঙ্কিচন্দ্রের ‘বন্দে মা তরম’ কবিতা, পরবর্তীসময়ে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে ভারতের জাতীয় সংগীত]। ব্রিটিশ বাংলায় এই পূজা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দুর্গা স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে জাগ্রত হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারি বা কমিউনিটি পূজা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস বলতে গিয়ে অনেকে বাংলাদেশের রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন বলে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ তাদের বইতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। কংসনারায়ণ দুর্গোৎসব করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষ লগ্নে, সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনায়। তারও পূর্বেকার সাহিত্যে ও অন্যান্য গ্রন্থে বাংলায় দুর্গাপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করে কংসনারায়ণ দুর্গোৎসব করেন বলে মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। বদলে গিয়েছিল দুর্গাপূজার সংজ্ঞার্থ। আর সেই থেকেই কংসনারায়ণী মিথের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

কংসনারায়ণী সেই মিথকে যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় বর্তমান রাজধানীর গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন আয়োজিত দুর্গাপূজা কিংবা বাগেরহাটের শিকদারবাড়ি ও ফরিদপুরের যশোদা জীবন দেবনাথের বাড়ির দুর্গোৎসব। গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে শুধু দেশেই নয় ; বিষয়-বৈচিত্র্য, থিম ও নান্দনিকতায় এবং আর্থিক ব্যয়ের হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এই পূজামণ্ডপগুলো সবার দৃষ্টি কেড়েছে।

গুলশান-বনানী সর্বজনীন দুর্গাপূজা

রাজধানীর বনানীর দুর্গাপূজা বর্তমানে ঢাকার অন্যতম প্রধান, জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব হিসেবে পরিচিত। গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন [এইঝচঋ]-এর উদ্যোগে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে এই পূজার যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর ধরে এই উৎসব রাজধানীর অন্যতম আকর্ষণীয় সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক বা পুরোনো মণ্ডপের মতো শতবর্ষী ইতিহাস বনানীর না থাকলেও, এটি আধুনিক ঢাকার অন্যতম সেরা কমিউনিটি বা সর্বজনীন পূজার রূপকার। প্রতিবছর ভিন্ন ও পরিবেশবান্ধব থিমে বনানীর মণ্ডপ সাজানো হয়। দেশের বিভিন্ন জেলার লোকজ উপাদান, মাটি ও প্রাকৃতিক সজ্জা এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়।

কেবল ধর্মীয় আচার নয়, গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন শীতবস্ত্র বিতরণ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং দুস্থদের মধ্যে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কূটনীতিকরা অংশ নেন, যা একে সর্বজনীন রূপ দেয়। পূজা উপলক্ষ্যে মন্দির প্রাঙ্গণ রং-বেরঙের বৈদ্যুতিক বাতি ও চমৎকার আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। মহালয়া থেকে শুরু করে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়াদশমীর দিনগুলোতে এখানে হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর ভিড় জমে।


বাগেরহাট শিকদার বাড়ির দুর্গাপূজা

বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের শিকদার বাড়ির দুর্গাপূজা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি মূর্তি নিয়ে পালিত দুর্গাপূজার স্থান দখল করে আছে। শিকদার বাড়িতে কয়েক বছর আগে ৮৫১টি প্রতিমা তৈরি করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল এই দুর্গামন্দির। এমনকি করোনাসহ বিভিন্ন কারণে তিন বছর স্বল্প পরিসরে হওয়ার পর এ কয়েক বছর ধরে ৫০১টি প্রতিমা নিয়ে আগের রূপে ফিরছে শিকদার বাড়ির দুর্গাপূজা।

বাগেরহাটের হাকিমপুর গ্রামের শিল্পপতি লিটন শিকদারের বাবা প্রয়াত দুলাল কৃষ্ণ শিকদার ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম ১৫০টি প্রতিমা নির্মাণ করে দুর্গাপূজা শুরু করেন। পরে প্রত্যেক বছর ধাপে ধাপে সেই প্রতিমার সংখ্যা বৃদ্ধি করে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে ৭০১টি প্রতিমা তৈরি করা হয়। যা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ পূজার খ্যাতি অর্জন করে। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে দুলাল কৃষ্ণ শিকদার পরলোকগমন করার পর তার ছেলে শিল্পপতি লিটন শিকদার ও পুত্রবধূ পূজা শিকদার তার পিতার সম্মানে ১৫০টি থেকে একটি বাড়িয়ে মোট ৮৫১টি প্রতিমা নির্মাণ করে দেশে সাড়া ফেলে দেন। তবে, পূজায় প্রতিমার সংখ্যা কমবেশি হলেও প্রত্যেক বছর একটি থিম নিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়।

রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনির চার যুগের দেব-দেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলা হয় এই মণ্ডপে। এখানে ৬৫ ফুট লম্বা কুম্ভকর্ণের প্রতিমাসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় ও বিশাল আকৃতির প্রতিমা তৈরি করা হয়। এই পূজামণ্ডপ দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী ভিড় জমান।

শিকদার বাড়ির এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। মন্দিরের আশপাশে সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন শতাধিক দোকানি। ভক্ত-দর্শনার্থীরাও নিজের পছন্দ অনুযায়ী খাবার, খেলনা ও প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারেন।

অন্যদিকে পূজামণ্ডপ ও ভক্ত-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ, আনসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করেন। এর পাশাপাশি সাদা পোশাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। এছাড়া আয়োজকদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দলও কাজ করে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায়।


ফরিদপুরের যশোদা জীবন দেবনাথের বাড়ির দুর্গোৎসব

শুধু ফরিদপুর জেলাতেই নয়, দেশজুড়ে গত প্রায় একযুগ ধরে আলোচনায় ছিল ফরিদপুর জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী যশোদা জীবন দেবনাথের বাড়ির দুর্গোৎসব। ব্যতিক্রমী আয়োজনে ফরিদপুরের সদর উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা-চাঁদপুর গ্রামের এই পূজামণ্ডপ তিন শতাধিক প্রতিমা নিয়ে তৈরি হতো। এ পূজামণ্ডপ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করতেন হাজারো মানুষ। যদিও গত দুই বছর ধরে এই আয়োজনে ভাটা পড়েছে।

ফরিদপুর জেলায় প্রতিবছর প্রায় আট শতাধিক মন্দির-মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। তার মধ্যে ফরিদপুর জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি যশোদা জীবন দেবনাথের বাড়ির এই বৃহৎ পরিসরে তিন শতাধিক প্রতিমা নিয়ে দুর্গোৎসব ছিল জেলার প্রধান অকর্ষণ।

এসব প্রতিমার মাধ্যমে পৌরাণিক নানা কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হতো। আড়াই মাস ধরে কাজ করে রামায়ণ ও মহাভারতের মূল কাহিনি তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো এই মণ্ডপে। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ছিল রাজা হরিশ্চন্দ্র, রাম-লক্ষ্মণ, মুচি রুহিদাশের কাহিনি। সামনে নির্মাণ করা হতো বিশাল আকারের সুসজ্জিত তোরণ। বিশাল এই আয়োজনে ব্যয় হতো ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্গাপূজা

প্রথম তিনটি পূজামণ্ডপের মতো বৈচিত্র্য না থাকলেও রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো ও প্রধান শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনের কেন্দ্রস্থল। তাছাড়া এর একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। কারণ, এটি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ও জাতীয় মন্দির হিসেবে স্বীকৃত। প্রতিবছর এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে মন্দির প্রাঙ্গণ রং-বেরঙের বৈদ্যুতিক বাতি ও চমৎকার আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে। মহালয়া থেকে শুরু করে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়াদশমীর দিনগুলোতে এখানে হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর ভিড় জমে। ভক্তদের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকেই ঢাকার ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা বিসর্জনের মূল শোভাযাত্রা বের হয়। পরবর্তীসময়ে সংলগ্ন মাঠে বিজয়া সম্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

ঢাকেশ্বরী [দুর্গা] মন্দিরটি ১২ শতকে সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন নির্মাণ করেছিলেন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, দেবীর নামানুসারে ঢাকা শহরের নামকরণ করা হয়েছিল। যদিও মন্দিরের বর্তমান স্থাপত্য শৈলীটি সেই সময়ের মতো আর নেই। কারণ, কালের বিবর্তনে বারবার সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করায় তার রূপে বদল ঘটেছে। মন্দিরটি ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শক্তি পীঠ বা সতীপীঠগুলোর মধ্যে একটি। বলা হয়ে থাকে এখানে দেবী সতীর মুকুট থেকে রত্ন পড়েছিল। তাই মিথ ও ইতিহাস দুই দিক বিবেচনায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দুর্গোৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।