সাগরকন্যা কুয়াকাটা তার ভৌগলিক অবস্থানের কারণে যতটা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত আমাদের অবহেলা আর পর্যটনশিল্প সম্পর্কে অজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যটন স্পটকে ততটাই বিষণ্ন এক জনপদে পরিণত করেছে। বিষণ্ন বলছি এ কারণে যে, এখানে গেলে মন ভালো হওয়ার বদলে খারাপ হয়ে যায়। অথচ প্রকৃতি এখানে অকৃপণ। না, তবে শুরুটা কিন্তু এ রকম ছিল না, যখন অল্প কিছু মানুষের কাছে এর পরিচিতি ছিল তখন সে স্বাভাকি সৌন্দর্যে অসাধারণ ছিল। বর্তমানে এটি এতটাই নির্যাতিত যে পর্যটকদের জন্য নূন্য সুযোগ-সুবিধাও খুঁজে পাওয়া যায় না, উল্টো তাকে নিংড়ে নিয়ে কোনো রকমে অর্থ উপার্জনই এখানকার স্থানীয়দের একাংশের কাছে মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা খুব স্বাভাবিক, সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর উন্নয়নের স্থায়িত্ব ছাড়া কোনো কিছুই খুব লম্বা সময় ধরে টিকে তাকতে পারে না, যে-কারণে দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার এক বিরল অভিজ্ঞতা সঞ্চেয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এটি দিনে দিনে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। এর মূল কারণ রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, অবকাঠামো কোনোটাই পর্যটনবান্ধব নয়।
কুয়াকাটার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে। হুট করেই পরিকল্পনা, এক সন্ধ্যায় লঞ্চে করে পটুয়াখালির পথে রওনা হলাম। পর্যটক হিসেবে কোথাও এটা আমার দ্বিতীয় ভ্রমণ। যদিও এখানে আমি দুধ-ভাত। আমার বোনের বন্ধুবাহিনীর সাথে আমি অতিথি। যা হোক ভোর ভোর আমরা পটুয়াখালি পৌঁছাই। সেখানে একটি মাঝারি মানের হোটেলে ঘণ্টাখানেকের জন্য বিশ্রাম নিয়ে নাশতা করে একটি মাইক্রোবাসে করে আমরা কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। পথ-ঘাট তেমন সুবিধার না হলেও পথের দু-ধারের দৃশ্যপট সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সে সময় পটুয়াখালি থেকে কুয়াকাটা যেতে তিনটি ফেরি পার হতে হতো, মানে তিনটি নদী পার হতে হতো— পায়রা, আন্ধারমানিক আর খাপড়াভাঙা নদী। তাই ফেরির সময়ের সাথে এবং ফেরির প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করত পথ পরিক্রমার সময়ের ব্যাপ্তি। এখন ঠিক ঘণ্টা-মিনিটের হিসাব মনে নেই তবে যতদূর মনে হয় পৌঁছুতে পৌঁছুতে দুপুর গড়িয়েছিল। সেবার প্রথম আমরা কোনো হোটেল বুকিং না করেই চলে গিয়েছিলাম, অবশ্য তখন সচারচর এমনটাই হতো। কারণ, সে সময় অনলাইল সিস্টেম প্রচলিত ছিল না আর সব হোটেলের ফোন নাম্বার ফোন ডিরেক্টরিতে পাওয়াও যেত না। আমরা বেশ কয়েকটি হোটেল ঘুরে একটি নব নির্মত হোটেলে আস্তানা গেঁড়ে ছিলাম। তারপর সেখানে বাক্শোপ্যাটরা রেখে খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁ খুঁজতে বের হলাম। সারারাত আর দিনের অর্ধেকটা জার্নি করে তখন সেটাই একমাত্র জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, খিদেয় মনে হচ্ছিল পেটের ভেতর ইদুরদৌড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমরা যে হোটেলটিতে ছিলাম সেটি ছিল বাঁধের ভেতরে, সেই বাঁধটিই এখন কুয়াকাটার অন্যতম সড়ক যা সৈকতের সমান্তরালে চলে গেছে। আমরা বাঁধ পেরিয়ে সৈকতের কাছাকাছি একটি বাঁশের তৈরি টিনের ছাওনি দেওয়া রেস্তোরা খুঁজে পেলাম। পরবর্তীতিনদিন এটাই ছিল আমাদের ডাইনিং।
রেস্তোরাঁ থেকেই সমুদ্র দেখা যায় সমুদ্র যেন গর্জন করে আমাদের ডাকছিল আর আমরা সে ডাক উপেক্ষা করতে না পেরে দুপুরের খাওয়া শেষে সরাসরি চলে গেলাম সৈকতে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। এরপর গোসল করে রাতের খাবারের আগ পর্যন্ত হোটেলেই কাটিয়ে দিলাম। রাতের খাবারের জন্য বের হয়ে হোটেলে ফেরার আগে আবার কিছুক্ষণ সৈকতে হাঁটাহাটি তারপর চায়ের দোকানে বসে আড্ডা, সেখানে বসেই পরের দিনের কর্মপরিকল্পনা মানে ভ্রমণ পরিকল্পনা ঠিক করে নিলাম। এরপর রুমে ফিরেই ঘুমুতে গেলাম। কারণ, পরদিন সূর্যোদয় দেখতে যাবো, তাই স্বাভাবিকভাবেই খুব ভোরে উঠতে হবে।

আগের রাতেই রিকশাভ্যান ঠিক করা ছিল যে কি না ভোর ভোর এসে গিয়েছিল আমরাও তৈরি ছিলাম। সূর্যোদয় দেখার ভিউ পয়েন্ট আমাদের হোটেলের ঠিক উল্টো পথে। পথ কম না, প্রায় মিনিট ৪০ এর মতো লেগে গেল পৌঁছুতে, তবু শেষ রক্ষা হলো না, আমরা সময়ের থেকে কিছুটা পিছিয়ে ছিলাম। আরও আগে রওনা দেওয়া দরকার ছিল। কী আর করা, ভোরের হাওয়ায় কিছুটা সময় সৈকতে কাটিয়ে আমরা ফিরে এলাম এরপর নাশতা করে আবার রওনা হলাম, এবার গন্তব্য মিশ্রিপাড়া। মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধমন্দিরের জন্য বিখ্যাত, যা সীমা বৌদ্ধমন্দির নামে খ্যাত। যারাই কুয়াকাটা যান একবার হলেও ঢুঁ মারেন। ৩৬ ফুট উচ্চতার অষ্টধাতুর ৩৭ মন ওজনের এই সোনালি বুদ্ধমূর্তি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মূর্তি। মিশ্রিপাড়া যাওয়ার পথে আমরা রাখাইন পল্লিতে যাত্রা বিরতি দিলাম, আসলে পথের ধারেও তাদের পরিপাটি নিকানো উঠোন আর সেখানে তাঁতে, কাপড় বুনতে থাকা রাখাইন তরুণীদের ছন্দময় যাপিত-জীবন যেন এক অসাধারণ জীবন্ত ছবি। যাত্রা-বিরতি দিতেই হলো। এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখা দরকার, প্রতিটি রাখাইন পরিবারে রয়েছে একধিক তাঁত তারা তাদের তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে তো বিক্রি করেই তাঁতিদের কাছ থেকেও সরাসরি কেনার সুযোগ রয়েছে। এরপর আবার ভ্যান চলতে শুরু করল, মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধমন্দিরটি পাড়ার একদম ভেতরে আশপাশ দেখলে হঠাৎ বুঝার উপায় নাই যে এখানে এত বড়ো একটা মন্দির আছে। তখন দুপুর, দর্শনার্থী বা পূণ্যার্থী উভয়ের সংখ্যাই কম। আমাদের সাথে একজন সনাতনি ছিলেন তিনি পুজো দিলেন, আমরা অপেক্ষা করলাম, যখন হোটেলে ফিরলাম তখন প্রায় বিকেল, দুপুরের খাওয়া তখনো বাকি। ফ্রেশ হয়েই খেতে নামলাম।
বিকেলের কিছুটা সময় হোটেলে গড়িয়ে নিলাম। সন্ধে হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়লাম, সাগরের তীর ধরে বেশ খানিকক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম, ছবি তুললাম, সূর্য ডোবার মুহূর্তটিকে উপভোগ করলাম। আমার মনে হয় সূর্যের সাথে জলের এক গভীর মায়াবী সম্পর্ক আছে। জলের উপর সূর্যোদয় অথবা জলের মাঝে সূর্যাস্ত দুটোই এক অপার্থিব দৃশ্যপট তৈরি করে, যা চরম বেরসিককেও থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে, অতিমাত্রার বাচালকেও করে তোলে মৌনি। আমরা সূর্য ডোবার ক্ষণটিকে নিঃশব্দে বিদায় দিয়ে কুয়াকাটার কুয়োর খোঁজে এগিয়ে গেলাম। কুয়াকাটা নামের উৎপত্তি যে কুয়োকে ঘিরে সেটা না দেখলে তো চলে না। আমি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি সময়টা ছিল ২০০৩ তাই সে সময়ের অনেক কিছুই কিন্তু এখন মিলবে না। স্থানীয় খ্রিষ্টাব্দে বৌদ্ধবিহারের পাশে ১৭৮৪ সালে রাখাইন সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের সুপেয় পানির সংকট মেটাতে সে সময় এই কুয়ো খনন করা হয়, পরবর্তীসময়ে এই কুয়োর নামেই এলাকাটি কুয়াকাটা নামে পরিচিতি পায়; যা এখন বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। সমতল থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে এই কুয়ার অবস্থান। অনেক সিঁড়ির ধাপ পার হয়ে কুয়োর কাছে পৌঁছুতে হয়। কুয়ো চত্বরের খানিকটা জুড়ে বেশ কিছু দোকান রয়েছে যেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন পণ্য বিক্রি হয়। আমরা কুয়ো দেখে স্থানীয় পণ্যের পসরা দেখতে দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলাম। টুকটাক কেনাকাটাও হলো এরপর আবার সৈকতে। কেননা, আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে হোটেলে ফিরবো।
পরদিন সকাল সকাল উঠেই সৈকতে চলে গেলাম, অবশ্য আমার বোন আমার আগেই উঠে বেরিয়েছিল। আমি যতক্ষণে সৈকতে পৌঁছালাম ততক্ষণে তার সমুদ্রবিলাস সমাপ্ত। সৈকতে যাওয়ার পথে কিছু ছোটো ছোটো দোকান আছে, যেখানে নানা ধরনের পোশাক বিক্রি হয়, স্থানীয় পণ্যের পাশাপাশি অন্যান্য স্থানের পণ্যও বিক্রি হয়। দাম বেশ কম, আমার বোনকে দেখলাম সে দোকানিকে দিয়ে একটি বস্তার মুখ বাঁধাচ্ছে, জিজ্ঞেস করে জানলাম সে এখান থেকে কাপড়-চাদর কিনে এই বস্তায় বন্দি করছে মানে একটা বস্তা ভরে সে কেনাকাটা করেছে। অবশ্য তার এই পাগলামির সাথে আমরা পরিচিত তাই খুব একটা অবাক না হয়ে আমি সৈকতের পথে এগিয়ে গেলাম। আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ সৈকত থেকে আমি সরাসরি রেস্তোরাঁয় চলে গেলাম, জানতাম এর মধ্যেই সবাই নাশতা করতে আসবে। নাশতা করতে করতে আমরা আমাদের পরবর্তীগন্তব্যে যাওয়ার সময় ঠিক করে নিলাম। [চলবে]