টিভি সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট উচ্চারণ, মিষ্টি কণ্ঠ, সাবলীল বাচনভঙ্গি, আকর্ষণীয় চেহারা আর দর্শকপ্রিয়তার মাপকাঠিতে যে-ক’জন সংবাদ উপস্থাপক এগিয়ে আছেন, যমুনা টেলিভিশনের রাবেয়া স্মৃতি তাদের মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘ ১৭ বছরের পথচলায় সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি নিউজ রুমের নানা দায়িত্বও সামলাচ্ছেন তিনি। এবারের আনন্দভুবনের সংবাদ উপস্থাপক বিভাগে রাবেয়া স্মৃতিকে নিয়ে লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...
শৈশব থেকেই সংবাদ পাঠের স্বপ্ন
শৈশব থেকেই মিডিয়া অঙ্গনের প্রতি রাবেয়া স্মৃতির আগ্রহ ছিল। টুকটাক মিডিয়ায় কাজ করার পাশাপাশি কয়েকটি বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন। তবে, মডেলিংয়ের সেই জগতের সঙ্গে নিজেকে সেভাবে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। এমন সময় নিজের ভেতর একটি নতুন স্বপ্ন উঁকি দেয় সংবাদ পাঠিকা হিসেবে নিজেকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখার। সেই স্বপ্ন থেকেই শুরু হয় নিজেকে প্রস্তুত করার পথচলা।
স্বপ্নের যাত্রা শুরু
২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে একুশে টেলিভিশনের মাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপনায় যাত্রা শুরু। এরপর কাজ করেছেন এটিএন নিউজ, একাত্তর ও বৈশাখী টেলিভিশনে। অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে যোগ দেন যমুনা টেলিভিশনে। এখনো এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত আছেন।
পরিবারের সমর্থন
রাবেয়া স্মৃতির পরিবার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার। পরিবারের প্রায় সবাই সরকারি চাকরিজীবী। ভাই-বোনদের মধ্যে ছোটো হওয়ায় তাঁর ইচ্ছেকে পরিবার গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবারের সবাই হয়তো মন থেকে তাঁর পেশা বেছে নেওয়াকে পুরোপুরি সমর্থন করেননি, কিন্তু কেউ তাঁকে বাধাও দেননি। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। মায়ের সেই অকুণ্ঠ সমর্থনই তাঁর পথচলায় বড়ো শক্তি যুগিয়েছিল।

ভালো সংবাদ উপস্থাপকের গুণাবলি
একজন ভালো সংবাদ উপস্থাপক হতে হলে কী কী গুণ থাকা প্রয়োজনÑএ প্রসঙ্গে রাবেয়া স্মৃতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন আত্মবিশ্বাসকে। তাঁর মতে, আত্মবিশ্বাসের সামান্য ঘাটতি থাকলে অন্য সব প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ক্যামেরার সামনে সঠিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি শুদ্ধ উচ্চারণ, দেশ-বিদেশের সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত আপডেট থাকা এবং ক্যামেরার সামনে নিজেকে গুছিয়ে উপস্থাপন করার দক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর অভিজ্ঞতায়, বর্তমান সময়ে সংবাদ উপস্থাপনায় আসার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। একটু শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারা এবং দেখতে সুশ্রী হলেই অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ উপস্থাপনায় আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু তাঁর সময়টা ছিল অন্যরকম। তখন একজন সংবাদ পাঠক বা পাঠিকা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জিং ধাপ পার হতে হতো। সেই কঠিন পথ পেরিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন রাবেয়া স্মৃতি।
প্রথম সংবাদ পাঠের অভিজ্ঞতা
প্রথম সংবাদ পাঠের অভিজ্ঞতার কথা মনে করলে এখনো তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একুশে টেলিভিশনে অডিশন দিতে গিয়ে সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। অডিশন দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন রাত ১০টায়। শেষ পর্যন্ত সাতজনকে নির্বাচন করা হয়। এরপর টানা একমাস চলে প্রস্তুতি।
প্রথম অন-এয়ার ছিল সকাল ৯টার সংবাদ। সেই দিনটির কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। ভোর ৬টায় বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে গিয়েছিলেন। মা-বারবার দোয়া পড়ে তাঁকে ফুঁ দিচ্ছিলেন, আর বাবা সাহস জোগাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পরই যেন সব আত্মবিশ্বাস উধাও! একুশে টেলিভিশনের নিউজের সেই পরিচিত সিগন্যাল শেষ হওয়ার পর হেডলাইনের জন্য কিউ আসতেই তাঁর গলা শুকিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, কখন সংবাদ শেষ হবে, কখন ক্লোজিং দিতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত সফল হন তিনি। তবে, সত্যিকার অর্থেই বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেদিন থেকেই তার মনে হয়েছিল আরেকটু আত্মবিশ্বাস থাকলে তিনি হয়তো আরো ভালো করতে পারতেন সেদিন...
সংবাদ পাঠে বিব্রতকর মুহূর্ত এবং প্রশিক্ষণ
দীর্ঘ ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে সংবাদ পাঠ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়নি বলেও জানান রাবেয়া স্মৃতি। সংবাদ উপস্থাপনার জন্য আলাদা কোনো প্রশিক্ষণও নেননি তিনি। তবে, টিএসসিতে ‘কণ্ঠশীলন’ নামে একটি সংগঠন উচ্চারণ ও আবৃত্তির কোর্স করাতো। সেখানে এক-দুই মাস ক্লাস করেছিলেন। উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি উন্নত করতে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর কাজে এসেছে।
সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি অন্য কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত নন রাবেয়া স্মৃতি। যমুনা টেলিভিশনেই তিনি ফুলটাইম কাজ করছেন। শুধু প্রেজেন্টেশন নয়, নিউজরুম এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ক্যামেরার সামনে সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি সংবাদ তৈরির পেছনের কাজের সঙ্গেও তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

নতুনদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ
নতুন যারা সংবাদ উপস্থাপনায় আসতে চান, তাদের জন্য রাবেয়া স্মৃতির পরামর্শ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, হুজুগে বা শুধু শখের বশে ক্যামেরার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য এই পেশায় আসা উচিত নয়। কারণ নিজের চেহারা দেখানোর জন্য এখন অনেক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। কিন্তু সংবাদ উপস্থাপনা শুধু চেহারা দেখানোর পেশা নয়। এই পেশায় আসতে হলে অন্তত দেশ ও বহির্বিশ্বের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং শিখতে হবে।
তিনি মনে করেন, জ্ঞান থাকলে আত্মবিশ্বাস এমনিতেই তৈরি হয়। ক্যামেরার সামনে কোনো বিষয় সম্পর্কে জেনে কথা বলতে বসলে একসময় দেখা যাবে, সামনে স্ক্রিপ্ট কিংবা অটোকিউ না থাকলেও সাবলীলভাবে কথা বলা যাচ্ছে। তাই জ্ঞানের কোনো শেষ নেই এবং শেখারও কোনো শেষ নেই। প্রতিনিয়ত জানতে হবে, শিখতে হবে। একইসঙ্গে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।
অবসর সময়ে
ব্যস্ত কর্মজীবনের বাইরে ব্যক্তিজীবনেও নানা দায়িত্ব পালন করেন রাবেয়া স্মৃতি। তিনি একজন সিঙ্গেল মাদার। অফিসের দায়িত্ব শেষ করার পর সন্তানদের জন্যও অনেকটা সময় দিতে হয়। তাই নিজের জন্য অবসর সময় খুব কমই পান। তবে, কালে-ভদ্রে অবসর মিললে তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ দুই মেয়েকে নিয়ে সময় কাটানো। সন্তানদের সঙ্গে কাটানো সময়ই তাঁর কাছে সবচেয়ে আনন্দের।
ঘুরতেও ভালোবাসেন রাবেয়া স্মৃতি। তবে, ভ্রমণের জায়গা হিসেবে তার সবচেয়ে পছন্দ সমুদ্র। সমুদ্রের কাছে গেলেই তিনি নিজেকে অনেকটা হালকা অনুভব করেন। নিজের মতো করে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন। ঋতুর মধ্যে শীতকাল তার সবচেয়ে পছন্দের।
খাবারের ব্যাপারে অবশ্য তিনি বেশ সিলেক্টিভ। তবে খাওয়াদাওয়ার প্রতি তার তেমন কোনো বিশেষ আকর্ষণ বা পছন্দ নেই। কিছু একটা হলেই চলে। তার প্রিয় রং সাদা।
দীর্ঘ দুই দশকের পেশাগত পথচলায় রাবেয়া স্মৃতি এখন একজন অভিজ্ঞ সংবাদ উপস্থাপক। টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর মিষ্টি কণ্ঠ, স্পষ্ট উচ্চারণ ও সাবলীল উপস্থাপনা যেমন দর্শকের ভালো লাগা তৈরি করেছে, তেমনি পেশার প্রতি নিষ্ঠা, শেখার আগ্রহ এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত তৈরি করার মানসিকতা তাঁকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। সংবাদ উপস্থাপনাকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, দায়িত্ব হিসেবেও দেখেন তিনি। আর সেই দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করেই সামনে এগিয়ে যেতে চান রাবেয়া স্মৃতি।