পূজার গান : আনন্দ-প্রেম-নস্টালজিয়া ও নগরজীবনের গল্প

18 Oct 2026, 01:03 PM সারেগারে শেয়ার:
পূজার গান : আনন্দ-প্রেম-নস্টালজিয়া ও নগরজীবনের গল্প

দুর্গাপূজা এলেই বাঙালির মনে তৈরি হয় এক বিশেষ আবহ। আর এই আবহকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে গান। একসময় রেডিও, গ্রামোফোন ও ক্যাসেটের মাধ্যমে যে ‘পূজার গান’ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাত, সময়ের সঙ্গে তার মাধ্যম বদলেছে। এখন ইউটিউব, ফেসবুক ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই নতুন গান প্রকাশ ও শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর প্রধান জায়গা। তবে, বদলায়নি গানের প্রতি মানুষের আবেগ। গত চার-পাঁচ বছরে পূজা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত গানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা একদিকে যেমন দেবী বন্দনার গান করছেন, অন্যদিকে পূজার আনন্দ, প্রেম, নস্টালজিয়া ও নাগরিক জীবনের গল্পও উঠে এসেছে গানে। ফলে ‘পূজার গান’ এখন আর কেবল আগমনী বা ভক্তিমূলক গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা হয়ে উঠেছে উৎসবের সামগ্রিক অনুভূতির সংগীতচিত্র...


২০২১ খ্রিষ্টাব্দের দুর্গাপূজায় কণ্ঠশিল্পী উত্তমের দুটি গান প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ‘জাগো মা’ গানটি ছিল বিশেষভাবে প্রার্থনামূলক। গানটির কথা, সুর ও সংগীতায়োজন করেন উত্তম নিজেই। করোনাভাইরাসের কঠিন সময়কে সামনে রেখে তৈরি গানটিতে ছিল দেশ ও বিশ্বকে সংক্রমণমুক্ত করার প্রার্থনা। শঙ্খ, বাদ্যি ও কাঁসর-ঘণ্টার ব্যবহার গানে তৈরি করেছিল পূজার আবহ।

একই বছরে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী শুভমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও প্রকাশ পায় ‘তুমি দুঃখ দিয়ো এ মনে’। আলাউদ্দিন মাহমুদ সমীরের সুরে এবং সুমন কল্যাণের সংগীত আয়োজনে তৈরি গানটি পূজার মৌসুমে ভক্তিমূলক গানের পাশাপাশি আধুনিক ও রোমান্টিক গানও শ্রোতাদের কাছে জায়গা করে নিতে পারে।

২০২২ খ্রিষ্টাব্দ ছিল পূজার গানের দিক থেকে বেশ বৈচিত্র্যময়। এ বছর প্রকাশিত গানগুলোর তালিকায় যেমন ছিল ‘দেবী’, ‘বলো দুর্গা মা’, ‘দুর্গা মায়ের জয়’ ও ‘দেখা দাও মা’, তেমনি ছিল ‘প্রেমে পড়ি’, ‘রাইকিশোরী’ ও ‘প্রেম বিরহ’-এর মতো গান। অর্থাৎ পূজাকে কেন্দ্র করে গানের বিষয়বৈচিত্র্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রফিকুল আলম ও আবিদা সুলতানার ‘দেবী’ গানটি ছিল পূজার আবহের একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন। শেখ নজরুলের কথায় গানটির সুর করেন সোয়েব শিবলী এবং সংগীতায়োজন করেন বিনোদ রায়। অন্যদিকে সিঁথি সাহার ‘বলো দুর্গা মা’ গানে তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ দেন ঊষা উত্থুপ ও ঈশান। রাজীব দত্তের কথায় তুবাই রায়ের সুরে তৈরি গানটির ভিডিওচিত্র ছিল বড়ো আয়োজনের। একই বছরের আরেক আলোচিত আয়োজন ছিল পাঁচ শিল্পীর কণ্ঠে ‘মহাদেব’। বাঁধন সরকার পূজা, মৌমিতা বড়ুয়া, জি এম জন, শোভন রায় ও অজয় রায়ের কণ্ঠে গানটি প্রকাশিত হয়। প্রসেনজিৎ ওঝার কথায় গানটির সুর ও সংগীতায়োজন করেন শোভন রায়। গানটিতে শিবতাণ্ডবের সংযোজনও ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

এছাড়াও ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে অভিনেত্রী ও গায়িকা মিমি চক্রবর্তীর ‘আমাদের পুজোর গান’ও আলোচনায় আসে। গানটির কথা ও সুরে লিংকনের অবদান ছিল। পূজার চার দিনের আনন্দ, সাজসজ্জা ও উৎসবের অনুভূতিকে কেন্দ্র করে গান ও ভিডিওটি নির্মিত হয়। মিমি নিজেও জানিয়েছিলেন, গানের মধ্যে তিনি পূজার অনুভূতিটা তুলে ধরতে চেয়েছেন। পূজার গান মানেই শুধু দেবী বন্দনা—এই ধারণাকে বদলে দিয়ে ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে ‘প্রেমে পড়ি’ শিরোনামের আরও একটি গান মুক্তি পায়। বাংলাদেশের আসিফ আলতাফ ও কলকাতার লগ্নজিতা গানটিতে দ্বৈতকণ্ঠ দিয়েছেন। গানটির কথা, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন আসিফ নিজেই; সংগীতায়োজনে ছিলেন পাভেল আরিন। পূজার আবহের সঙ্গে প্রেমের গল্পকে মিলিয়ে তৈরি গানটি দুই বাংলার শ্রোতাদের জন্য ভিন্ন স্বাদের আয়োজন ছিল। এ ধরনের গান প্রমাণ করে, সময়ের সঙ্গে পূজার গানের সংজ্ঞার্থও বদলাচ্ছে। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি উৎসবের আনন্দ, মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত অনুভূতিও এখন পূজার গানের বিষয় হয়ে উঠছে।

২০২৩ খ্রিষ্টাব্দেও পূজা উপলক্ষ্যে বাংলাদেশি শিল্পীদের বেশকিছু গান প্রকাশিত হয়। শিলা দেবী প্রকাশ করেন ‘হে ভবানী’ ও ‘আশ্বিনে এল দুর্গা’—দুটি গানই ছিল পূজাকেন্দ্রিক।

এ বছর পিজিত মহাজনের ‘দেবী এলো’ গানটিও ছিল উল্লেখযোগ্য। শেখ নজরুলের কথায় গানটির সুর করেন পিজিত নিজেই এবং সংগীত পরিচালনায় ছিলেন এ এন ফরহাদ। তাঁর সঙ্গে গানটিতে কণ্ঠ দেন চম্পা। গানটির মিউজিক ভিডিওতেও ছিল নাচ ও অভিনয়ের আয়োজন।

এ বছর শুভমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রঞ্জন চৌধুরীর দ্বৈতকণ্ঠে প্রকাশিত ‘মন জড়ায় কথায় কথায়’ গানটিও পূজার মৌসুমে আলোচনায় আসে। লিটন অধিকারী রিন্টুর কথায় তৈরি এই রোমান্টিক গান দেখিয়ে দেয়, পূজার সময় শ্রোতারা শুধু ভক্তিমূলক গানই শুনতে চান না ; উৎসবের সঙ্গে প্রেমের আবেগও সমানভাবে উপভোগ করেন।

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের পূজায়ও নতুন গানের আয়োজন ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার প্রকাশ করেন ‘শহরের চোখ’। আতিউর রহমানের কথায় গানটির সুর ও সংগীতায়োজন করেন বাপ্পা নিজেই। তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত গানটির জন্য অ্যানিমেশন ভিডিওও তৈরি করা হয়। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, গানটি সরাসরি প্রচলিত অর্থে আগমনী বা দেবী বন্দনার গান নয়। বরং শহর, মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে ঘিরে তৈরি একটি আধুনিক গানকে পূজার মৌসুমে শ্রোতাদের সামনে আনা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, পূজার গান এখন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর উৎসবের সংগীতে পরিণত হচ্ছে।

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে সারেগামাপা-খ্যাত শিল্পী শুভ দাশও পূজা উপলক্ষে ‘ও মাঝিরে’ শীর্ষক গান রিলিজ করেন। পশ্চিমবঙ্গের সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী গৌতম ঘোষাল গানটির কথা ও সুর করেন। দুই বাংলার শিল্পীদের অংশগ্রহণে তৈরি এই গানটিও পূজার সময়ের সংগীত আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেছে।

২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে এসে পূজার গানের চেহারায় আরও একটি পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভরতা। ইউটিউব, ফেসবুক ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে গান প্রকাশের কারণে নতুন শিল্পীরা আগের তুলনায় সহজেই শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারছেন। পূজার গান নিয়ে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের আলোচনাতেও পুরোনো রেডিও-ক্যাসেটের যুগের সঙ্গে বর্তমান ডিজিটাল সময়ের পার্থক্য উঠে এসেছে। এই সময়ের আলোচিত আয়োজনগুলোর মধ্যে ছিল ‘পূজার গান’।

২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের পূজায় আরো বেশ কিছু নতুন গান প্রকাশিত হয়, যেগুলোর মধ্যে ছিল ভক্তিমূলক গান থেকে শুরু করে আধুনিক ও পরীক্ষামূলক সংগীত।

গত পাঁচ বছরের পূজার গানগুলো বিশ্লেষণ করলে আরও একটি বিষয় চোখে পড়ে— দুই বাংলার সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে কলকাতার শিল্পীদের যৌথ পরিবেশনা, দ্বৈতকণ্ঠ এবং যৌথ প্রযোজনার আয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। ফলে পূজার গান হয়ে উঠছে বাংলাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক মিলনেরও একটি মাধ্যম। 

লেখা : জাইন ইসলাম