নাটকে সিনিয়র শিল্পীর উপস্থিতি এখন আর আড়াল করে রাখার মতো নয়। টেলিভিশন ও ইউটিউবভিত্তিক নাটকের সংখ্যা বাড়লেও সিনিয়র শিল্পীদের উপস্থিতি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে গল্পের গভীরতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি বাংলা নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এক বিশেষ ধরনের দর্শক। এটা অনেক নির্মাতা স্বীকারও করছেন। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...
বাংলা নাটকের সমৃদ্ধি ঐতিহ্য ও গৌরবের। সেই ঐতিহ্য এখন হারানোর পথে। আগে একটি নাটক নির্মাণের পূর্বে গল্প নিয়ে ভাবা হতো, পারিবারিক ও জীবনঘনিষ্ট গল্প নিয়ে কাজ করা হতো বলে আমাদের দর্শকের পাশাপাশি ওপার বাংলার দর্শকও বাংলাদেশের নাটক দেখতেন। প্রশংসা করতেন নাটক ও শিল্পীর। সেই সুনাম দিনদিন যেন হ্রাস পাচ্ছে। এখন আর নাটকে পরিবার দেখা যায় না। পরিবার কেন্দ্রিক নাটকে অনেকের আবার অনীহাও, নাটকে নায়ক নায়িকাদের সন্তান দেখালে না কি তাদের কদর কমে যাবে, তাই রোমান্টিক ঘরানার নাটকে কাজ করতেই বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তথাকথিত গ্ল্যামারসরা। অথচ একটা সময় এই বিষয় নিয়ে ভাবতেন না কেউ, সবাই ভাবতেন অভিনয়টাই মুখ্য বিষয়। তাই কী চরিত্র পেলেন সেটা না ভেবে, চরিত্রটিকে কীভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতেন তারা। শুধু তাই নয়, একটি খণ্ডনাটকে থাকত একঝাঁক তরতাজা শিল্পী। যেখানে, দাদা-দাদি, বাবা-মা, ভাইবোন, শিশুশিল্পীসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন স্থান পেতেন নাটকে।
বিশেষ করে গত শতকের নয়ের দশক থেকে টিভিনাটক মানেই ছিল শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যম। দিলারা জামান, মামুনুর রশীদ, ফেরদৌসী মজুমদার, আবুল হায়াত, খালেকুজ্জামান, আলী যাকের, শর্মিলী আহমেদ, ডলি জহুর, খালেদ খান, আফজাল হোসেনসহ অনেক সিনিয়র ও অভিজ্ঞ শিল্পীরা রূপায়ণ করতেন নানান চরিত্র। তারা শুধু অভিনয়শিল্পীই ছিলেন না, নাটকের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হিসেবেও তাদের নাম উল্লেখ করা হতো। তাদের উপস্থিতিতেই একটি সাধারণ গল্পও হয়ে উঠত গভীর ও স্মরণীয়। এখন সময় বদলেছে। বর্তমানে অধিকাংশ নাটকে সিনিয়র শিল্পীদের দেখা যায় না বললেই চলে। এ সময় নিয়মিত ও অনিয়মিত যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন তারিক আনাম খান, সাবেরী আলম, আফরোজা বানু, আমিরুল হক চৌধুরী, খায়রুল আলম সবুজ, ডলি জহুর, আজিজুল হাকিম, মনিরা মিঠু প্রমুখ। এছাড়া নয়ের দশকের প্রধান চরিত্রের দর্শকপ্রিয় শিল্পীরাও এখন আর পর্দায় নেই। তবে, মাঝে মধ্যে বিশেষ কোনো চরিত্রে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। এ তালিকায় রয়েছেন তৌকির আহমেদ, বিপাশা হায়াত, সুর্বণা মুস্তাফা, আফসানা মিমি, অপি করিম, জাহিদ হাসান, মাহফুজ আহমেদ, সাদিয়া ইসলাম মৌ, শমী কায়সার, বিপাশা হায়াতসহ আরো অনেকে। এ ছাড়া বেশিরভাগ শিল্পীই নাটককে গুডবাই জানিয়েছেন।
এর প্রধান কারণ হিসাবে উঠে এসেছে পারিশ্রমিক ও চহিদার সংকট। ইউটিউব নাটকের বাজেট তুলনামূলক কম। সেখানে সিনিয়র শিল্পীদের সম্মানজনক পারিশ্রমিক দেওয়া অনেক প্রযোজকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এর আর একটা বড়ো কারণ, এমন একজন শিল্পীকে প্রধান চরিত্রের জন্য নেওয়া হয় তার সম্মানীর অর্ধেক টাকা দিয়ে অন্যান্য শিল্পী, ইউনিট খরচসহ পুরো নাটকের খরচ বহন করা হয়। সিনিয়র শিল্পীর বাজেট কমানোর জন্য অনেক নির্মাতাই বাধ্য হন কম পারিশ্রমিকের নতুন মুখ নিয়ে কাজ করতে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের জনপ্রিয়তা থাকলেও অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ও গভীরতায় তারা মূল শিল্পীদের জায়গা পূরণ করতে পারছেন না, এ কথা অনেক দর্শকও বলছেন।
এছাড়া আরো অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে গল্প ও চরিত্রের সংকট। এখনকার অধিকাংশ নাটক ঘুরপাক খাচ্ছে প্রেম, ব্রেকআপ, স্বামী-স্ত্রীর টানাপোড়েন কিংবা কমেডির মধ্যে। এসব গল্পে বয়েসী চরিত্রের প্রয়োজন কম। ফলে সিনিয়র শিল্পীদের জন্য উপযুক্ত চরিত্রই লেখা হচ্ছে না। অথচ একসময় পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক গল্পে সিনিয়র চরিত্র ছিল গল্পের প্রাণভোমরা। বাবা-মা, শিক্ষক, সমাজপতি কিংবা অভিজ্ঞ জীবনের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের উপস্থিতি নাটককে দিত আলাদা বৈশিষ্ট্য। তবে, সবাই যে স্রোতের জোয়ারে গা ভাসাচ্ছেন এমনও নয়, কেউ কেউ এখন আবার পারিবারিক গল্প নিয়ে কাজ করছেন, এবং প্রমাণও করে দিয়েছেন পারিবারিক জীবনঘনিষ্ঠ গল্প হলে দর্শক নাটক দেখেন এবং নাটকটি প্রশংসিত হয়, এক্ষেত্রে মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজকে ধন্যবাদ দিতে হয়, তিনি এমন একটা সময়ে পারিবারিক মূল্যবোধের সংকটকে বুঝতে পেরে এই ধরনের কাজ করতে সাহস দেখিয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন, অনেকে তার পথ ধরে এখন আবার পারিবারিক গল্প নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

সিনিয়র শিল্পী ছাড়াও আরো একটি নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে বর্তমান নাটক ইন্ডাস্ট্রিতে। এটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় চরিত্রের সংকট। কিছুদিন আগেই যারা নাটক ইন্ডাস্ট্রি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, নাটকে যাদের দর্শকপ্রিয়তা ছিল, তারা অনেকেই এখন পেইড ভার্সন ওটিটি কিংবা সিনেমায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের অবর্তমানে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে এটিও চিন্তায় ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের। যেমন, আফরান নিশো, মেহজাবীন চৌধুরী, সাবিলা নূর, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, তানজিন তিশা, তাসনিয়া ফারিণ, শ্যামল মাওলা, আব্দুন নূর সজল, অর্চিতা স্পর্শিয়াসহ আরো অনেক তারকা শিল্পীই এখন সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত। বলতে গেলে তারা নাটককে একরকম বিদায় জানিয়েছেন। দর্শক এখনো নাটকে এ মুখগুলো খুঁজে ফেরেন। এটাকে বর্তমানে সংকট হিসেবেই মনে করছেন নির্মাতারা।
এদিকে সিনিয়র শিল্পীদের অভাবে সাম্প্রতিক ইউটিউব নাটকগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ নাটকে বাবা-মায়ের চরিত্রে কাজ করছেন অপরিচিত মুখ বা মাঝ বয়েসি শিল্পীরা। যারা প্রকৃত অর্থে চরিত্রের বয়েস বা অভিজ্ঞতার মর্যাদা বহন করতে পারেন না। এতে করে গল্প বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। দর্শক বুঝে ফেলেন, এটা নাটক, বাস্তব নয়। অথচ আগে দিলারা জামান, ফেরদৌসি মজুমদার, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আলী যাকের, আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, খালেদ খানের মতো কেউ বাবা-মায়ের চরিত্রে এলেই গল্প নিজে থেকেই বাস্তবে পরিণত হয়ে যেত।
অনেকে মনে করছেন, বর্তমানে সিনিয়র শিল্পীদের কাজ কমে যাওয়ার বড়ো প্রতিবন্ধকতা শুটিংয়ের ধরন ও সময় ব্যবস্থাপনা। সিনিয়র শিল্পীরা সাধারণত পরিকল্পিত শিডিউল, নির্দিষ্ট সময় ও পেশাদার পরিবেশে কাজ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এখনকার নাটক ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায়ই দেখা যায়, হুট করে শুটিং, দীর্ঘসময় অপেক্ষা, অনির্দিষ্ট কল টাইম। এসব অনিয়ম সিনিয়র শিল্পীদের অনেকে মেনে নিতে চান না। ফলে তারা নিজেরাই অনেকে নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন নিয়মিত কাজ করছেন। আবার অনেকে সিনেমা বা ওটিটিতেই ব্যস্ত হয়েছেন।
এদিকে সিনিয়র শিল্পীদের শূন্যতার প্রভাব পড়ছে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের ওপরও। সিনিয়রদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ কমে যাওয়ায় তরুণ শিল্পীরা অভিনয়ের সূক্ষ্মতা শেখার সুযোগ হারাচ্ছেন। আগে সেটে সিনিয়র শিল্পীদের কাছ থেকে শেখা যেত সংলাপ বলার ভঙ্গি, ক্যামেরার সামনে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, চরিত্র বিশ্লেষণের কৌশল। এখন সেই শিক্ষার জায়গাটাও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
এই বিষয়ে সিনিয়র শিল্পীরা মনে করেন ‘এ সংকট যে সমাধান করা যাবে না বা সমাধানের পথ একেবারেই বন্ধ হয়েছে তা নয়। নির্মাতারা যদি সচেতনভাবে গল্পে সমৃদ্ধ চরিত্রের জায়গা তৈরি করেন, বাজেট পরিকল্পনায় সিনিয়র শিল্পীদের গুরুত্ব দেন এবং শুটিং পরিবেশে পেশাদায়িত্ব বজায় রাখেন, তাহলে এ সংকট কাটানো সম্ভব। আমাদের বাংলা নাটকের যে ঐতিহ্য তা ফিরে আসুক এটাই প্রত্যাশা অভিনয়শিল্পী, নাটক্যকার, নাট্যনিমার্তা, প্রযোজকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে।