আনন্দভুবন : কেমন আছেন? বর্তমান সময়ে ব্যবসার সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
হাফিজ উদ্দিন— ভালো আছি, ধন্যবাদ। বর্তমান সময়ে ব্যবসার সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারব্যবস্থা, ব্যবসার নতুন প্রবণতা এবং গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। বিশেষ করে, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ক্লায়েন্টের প্রত্যাশা ও চাহিদা সঠিকভাবে অনুধাবন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত সেবা প্রদান এবং তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করাও একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ।
আমি মনে করি, পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া, উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা এবং ক্লায়েন্টের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাই বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশে সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
আনন্দভুবন : বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে আপনার শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল? এই অবস্থানে আসার ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে বড়ো টার্নিং পয়েন্ট বা চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত কোনটি ছিল?
হাফিজ উদ্দিন— আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও সহজ ছিল না। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে নানা চড়াই-উতরাই, প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে, আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, ক্যারিয়ারের শুরুটা যদি তৃণমূল পর্যায় থেকে হয়, তাহলে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি পেশাগত ভিত্তিও অনেক বেশি মজবুত হয়।
আমার কর্মজীবনের শুরু থেকেই আমি দায়িত্বশীলতা, আন্তরিকতা এবং মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। আমার বিশ্বাস, পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক একজন মানুষকে এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড়ো টার্নিং পয়েন্ট ছিল সেই সময়, যখন আমি নিজ উদ্যোগে আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণ করতে শুরু করি। দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস এবং কাজের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে ধীরে ধীরে আমার কর্মপরিধি ও নেতৃত্বের সুযোগ প্রসারিত হতে থাকে। সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে আজকের অবস্থানে আসতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে।
আনন্দভুবন : একজন সাধারণ এক্সিকিউটিভ বা এন্ট্রি-লেভেল থেকে করপোরেট জগতের জেনারেল ম্যানেজার বা ঊর্ধ্বতন পদে উন্নীত হওয়ার নেপথ্যে আপনার কোন বিশেষ দক্ষতা, মানসিকতা বা অভ্যাসগুলো সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন?
হাফিজ উদ্দিন— ধন্যবাদ। কর্মজীবন মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জীবনের একটি বড়ো সময় আমরা কর্মক্ষেত্রে ব্যয় করি। তাই আমি মনে করি, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য শুধু পরিশ্রম করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পেশাদারিত্ব, সততা, দায়িত্ববোধ, ধৈর্য এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলার মানসিকতা।
আমার অভিজ্ঞতায়, কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা একজন পেশাজীবীকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
পাশাপাশি সততা, নৈতিকতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা আমার কর্মজীবনে সবসময় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি, শুধু নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই নয়, বরং সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে একটি ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে।

আমি বিশ্বাস করি, একজন সফল নেতা শুধু নিজের সাফল্য অর্জন করেন না, তিনি অন্যদের সফল হওয়ার সুযোগও তৈরি করেন। এসব নীতি ও অভ্যাসই আমাকে একজন সাধারণ কর্মকর্তা থেকে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের দায়িত্বে আসতে সহায় কভূমিকা রেখেছে।
আনন্দভুবন : আপনার কর্মজীবনে এমন কোনো ব্যর্থতা বা চ্যালেঞ্জ এসেছিল, যা পরবর্তীসময়ে আপনার সাফল্যের পথকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছে? তরুণদের জন্য এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
হাফিজ উদ্দিন— দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন সময়ে আমাকে নানা ধরনের প্রতিতকূল পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে, আমি কখনো সমস্যাকে শুধু বাধা হিসেবে দেখিনি; বরং প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে নতুন কিছু শেখার এবং নিজের দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি।
কঠিন পরিস্থিতিতে আবেগের বশবর্তী না হয়ে ধৈর্য ধরে, ঠান্ডা মাথায় সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ করে বাস্তসম্মত সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। আবার কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সতর্ক, বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তীসময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
তরুণ প্রজšে§র প্রতি আমার পরামর্শ হলো, যে-কাজই করো-না-কেন, তা আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করো। কর্মজীবনে সমস্যা বা ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু তাতে হতাশ হওয়া যাবে না। ধৈর্য, ইতিবাচক মনোভাব এবং সমাধানমুখী চিন্তা-ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ব্যর্থতা কখনোই পথ চলার শেষ নয়; বরং সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে সেটিই ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আনন্দভুবন : করপোরেট সেক্টরে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে এবং একজন সফল নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ পেশাজীবীদের প্রতিদিনের কাজের সংস্কৃতিতে কোন নীতিগুলো মেনে চলা উচিত?
হাফিজ উদ্দিন— করপোরেট জগতে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলেই হবে না, পাশাপাশি একজন দায়িত্বশীল ও মানবিক নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। আমার মতে, নেতৃত্ব কোনো পদবি নয়; এটিএ কটি দায়িত্ব, যা আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং কাজের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়।
প্রথমত, সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তাদের কাজের প্রতি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কখনো একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দলগত কাজের মাধ্যমেই বড়ো অর্জন সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য বজায় রেখে যুক্তিসংগত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সহকর্মীদের মানসিক অবস্থা, সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বুঝে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি কাজে সততা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখা অত্যান্ত জরুরি। পাশাপাশি নিজের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা সহকর্মীদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে সবাই একটি অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে পারে।
সবশেষে আমি বলব, শেখার আগ্রহ সবসময় ধরে রাখতে হবে। সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে, নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে হবে এবং নিজের দক্ষতা প্রতিনিয়ত উন্নত করতে হবে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সফল নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো সততা, দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা এবং অন্যদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।
আনন্দভুবন : শত ব্যাস্ততার মধ্যেও আনন্দভুবনকে মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
হাফিজ উদ্দিন— আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ। আনন্দভুবনের মাধ্যমে আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও ভাবনাগুলো পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। আশা করি, আমার অভিজ্ঞতা তরুণ পেশাজীবীদের সামনে এগিয়ে যেতে কিছুটা হলে ও অনুপ্রেরণা জোগাবে। সবার জন্য রইল আন্তরিক শুভ কামনা।