মানসিক রোগ নিয়ে ভুল ধারণা ও করণীয় : ডা. ওয়ালিউল হাসনাত সজীব

20 Apr 2026, 03:11 PM স্বাস্থ্যভুবন শেয়ার:
মানসিক রোগ নিয়ে ভুল ধারণা ও করণীয় : ডা. ওয়ালিউল হাসনাত সজীব

স্বল্পোন্নত দেশ হতে এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশ। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৭২ লাখের বেশি। এখনো দেশে দারিদ্র্যসীমার হার ২৫ শতাংশের উপরে। স্বাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭.৯ শতাংশে। সাক্ষরতার হার বাড়লেও জনসাধারণের মধ্যে খুব কমই উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষার মানের দিক থেকে এখনো আমরা অনেকটাই পিছিয়ে। তাছাড়া ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামি এবং নানা ধরনের কুসংস্কার আমাদের সামন্তবাদী মানসিকতার পরিচয় এখনো ধরে রেখেছে। এছাড়া অপশিক্ষা ও দারিদ্র্য একসাথে সমাজকে এমন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে ধরে রেখেছে, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও বিকাশ অনেকটাই যেন মন্থরগতিতে চলছে।

সাধারণ শিক্ষায় বর্তমানে শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বসহকারে প্রচার করা হলেও এখনো আমরা শারীরিক স্বাস্থ্যশিক্ষায় পুরোপুরি সচেতন হতে পারিনি। তাই বাংলাদেশে মানসিক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি এখনো অত্যন্ত অবহেলিত এবং একান্ত অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। সরকারের কর্মকা-ের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা যতদিন পিছিয়ে থাকবে মানসিক স্বাস্থ্যে উন্নতি ততটাই পিছিয়ে থাকবে।

মানসিক রোগ নিয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে নানারকমের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। মানসিক রোগকে তারা জিন-ভূত এবং নানারকমের অশরীরী আত্মার দ্বারা ব্যাখ্যা করে থাকে। এসব রোগীদের চিকিৎসা হয় পানি পড়া, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ আর না-হয় কবিরাজি চিকিৎসার মাধ্যমে। অধিকাংশ রোগীর লোকজন সামাজিক নেতিবাচক ধারণার কারণে লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে রোগীদের ঘরবন্দি রেখেই চিকিৎসা চালায়, যা একসময় রোগীকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অক্ষমতার দিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলস্বরূপ তাদের শেষ ঠিকানা হয় শিকলবদ্ধ বন্দিঘর কিংবা ঠিকানাহীন অর্ধনগ্ন শরীরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো জীবন।

মানসিক রোগ নানারকমের হতে পারে। কিন্তু আমাদের এ নিয়ে ধারণা অনেক কম। কিছু কিছু রোগে রোগীর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা থাকলেও বেশিরভাগ মানসিক রোগে এমনটা থাকে না। অথচ, বেশিরভাগ মানুষ ভাবে মানসিক রোগ মানেই রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ থাকবে যাকে আমরা বলি পাগলামি। তাই অনেক রোগী দুশ্চিন্তা কিংবা মনের অশান্তির মতো কমন কিছু সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসা নিতে মানসিক চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। কারণ, এতে তার নামের সাথে যেন পাগল শব্দটা আবার যুক্ত হয়ে না-যায় এই ভয়ে। অনেকেই মনে করেন, মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানেই পাগলের ডাক্তারের কাছে যাওয়া। আর এতে সমাজে তাকে নিয়ে শুরু হবে নানাবিধ কথা, যার প্রভাব পড়বে তার পরিবারেও।

তাই অনেকেই শুরুতে সমস্যাকে আড়াল করে রাখে। ফলে রোগের জটিলতা বাড়ে। আবার অনেকেই নিজের সমস্যাটাকে বুঝতে পারেন না, কেউ-বা বুঝলেও কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, সেটা জানেন না। এর পেছনে একটি বড়ো কারণ আমাদের মানসিক রোগ নিয়ে ধারণার ঘাটতি। প্রকৃত শিক্ষার অভাব আর দারিদ্র্য এর পেছনে একটি বড়ো কারণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শারীরিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মানসিক শিক্ষা এখনো অবহেলিত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য দেখভাল করার জন্য যেখানে ন্যূন একজন কাউন্সিলর থাকার কথা ছিল ; সেখানে শহরাঞ্চলের গুটিকয়েক স্কুল ছাড়া অধিকাংশ স্কুলেই তা নেই। ফলে স্কুল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝে মাঝে আত্মহত্যার খবর পত্রিকায় ছাপা হয়, যা একাধারে উদ্বেগ ও দুঃখজনক। এমনকি মানসিক রোগের কারণে স্কুল হতে বিতাড়িত হতেও হয়েছে।

খুব অদ্ভুত শোনালেও এটাই বাস্তবতা যে, অনেক মেডিকেলশিক্ষার্থী প্রতিবছর আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কিন্তু এমন হওয়ার কথা ছিল না। যারা চিকিৎসক হয়ে অন্যের সমস্যা কমাবে আজ তারাই কেন এত বিপদে ? এর পেছনে একটি বড়ো কারণ আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে মানসিক রোগ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা, চিকিৎসার ধরন নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, মানসিক রোগ চিকিৎসকের স্বল্পতা এমনকি মানসিক রোগ নিয়ে অনেক চিকিৎসকদের মধ্যেই নেতিবাচক ধ্যান-ধারণার উপস্থিতি।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, সব বয়সী এবং নানা পেশার মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য অতি জরুরি একটি বিষয়। অথচ দেশের শ্রমজীবী মানুষের জন্য কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য চরমভাবে অবহেলিত। কর্মীর মধ্যে মানসিক সমস্যা-উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কোনো কর্মসূচি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই হয় না। মানসিক রোগ মস্তিষ্কের রোগ। কিছু কিছু রোগের লক্ষণগুলো অস্বাভাবিক থাকে বলে অনেকেই একে অশরীরী আত্মার কারণ বলেই ভাবেন। তাই এখনো সামাজিক প্রচলিত ধারণা ও গোঁড়ামির সাথে এর চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে আছে। এ কারণেই খুব সহজে এর মূলোৎপাটন করাও কঠিন। তাছাড়া হাসপাতালের অভাব, চিকিৎসার অভাব, বাজেট স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব এর অগ্রযাত্রাকে যেন বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। সুস্থ থাকা মানে শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা নয়। শারীরিক স্বাস্থ্যকে নিশ্চিত করতে হলেও চাই মানসিক সুস্থতার নিশ্চয়তা।

মানসিক বিভিন্ন রোগ, আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদক গ্রহণসহ নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা নিরসনের জন্য শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসক বাড়ালেই চলবে না, সেইসাথে দূর করতে হবে নেতিবাচক ধ্যান-ধারণা, কুসংস্কার এবং বাড়াতে হবে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা।

মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ও প্রচারই পারে সমাজ থেকে নোংরা ও কুসংস্কারগুলোকে দূর করতে এবং পাশাপাশি মানসিক রোগীদের মানসিক মুক্তি ঘটাতে এবং এর জন্য প্রয়োজন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিটা সেক্টরে মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। 


লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,

শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ

মনের খবর-এর সৌজন্যে