বালাপুর জমিদারবাড়ি : মোশারফ হোসেন

20 May 2026, 03:12 PM অন্যান্য শেয়ার:
বালাপুর জমিদারবাড়ি : মোশারফ হোসেন


নরসিংদী জেলার সদর উপজেলা থেকে ১৭ কি. মি. দক্ষিণে পাইকারচর ইউনিয়নের বালাপুর গ্রামে জমিদারবাড়িটি অবস্থিত। ধনাঢ্য ব্যবসয়ী শ্রী নবীনচন্দ্র সাহা নরসিংদীর বালাপুরে জমিদারির গোড়াপত্তন করেছিলেন। সে-সময়ে তিনি কাপড় ও লবণ ব্যবসা করে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হন। অতঃপর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে এই এলাকার জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভের পর মেঘনা নদীর অদূরে তিনশত বিশ [৩২০] বিঘা জমির উপর বিশাল জমিদারবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেন। অঞ্চলটি একসময়ে জাহাজঘাট বা স্টিমারঘাট নামে পরিচিত ছিল। এখনো অনেকেই এই নামে এলাকাটি চেনেন। সে-সময় কলকাতা থেকে বড়ো বড়ো জাহাজ এসে মেঘনা নদীর এই ঘাটে নোঙর করে মাল খালাস করতো।

প্রায় পৌনে দুই শত বছর প্রাচীন বিশাল এই জমিদারবাড়িটির অনেক স্থাপনা এখনো টিকে আছে। জমিদারবাড়ির মূল ভবনটি তিনতলাবিশিষ্ট। জমিদারবাড়িটি সম্মুখভাগ পূর্ব দিকে মুখ করা। সম্মুখভাগের মূল ভবনটি তিনতলাবিশিষ্ট। এই ভবনের দোতলা ও তিনতলায় একাধিক শয়নকক্ষ, অতিথিকক্ষ, দাসদাসীর কক্ষ। নিচতলায় বৈঠকখানা, মালখানা, রন্ধনশালা, বিচার শালিসিকক্ষসহ ১০৩টি কক্ষ রয়েছে। ভবনটির দোতলা-তিনতলার সম্মুখভাগে কোনায় অর্ধগোলাকৃত ঝুলবারান্দার স্থাপত্যনকশা ও কারুকাজগুলো খুবই মনোমুগ্ধকর।

ভবনটির অন্দরমহলের ভেতরে উত্তর পাশে একতলা পূজামণ্ডপ, দক্ষিণে দোতলা ভবন, পূর্ব দিকে তিনতলা ভবন ও পশ্চিম পাশে আরো একটি দোতলা ভবন রয়েছে। ভবনগুলোর মাঝখানে বড়ো একটি উঠান রয়েছে। পূজা উদ্যাপন ও অনুষ্ঠানের সময় অতিথি, পূজারি ও দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা করা হতো এই উঠানে। মূল ভবনটির পশ্চিম পাশের দেয়ালঘেঁষে ইংরেজি এল আকৃতির আরো একটি দোতলা ভবন রয়েছে। এই ভবনের বারান্দার লোহার খাম ও দেয়ালে রাধাকৃষ্ণের লীলাচিত্র এখনো শোভা পাচ্ছে। জমিদার নবীনচন্দ্র সাহা ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে এই ভবনটির পশ্চিম পাশে মদন মোহন জিউ ঠাকুরমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে একতলাবিশিষ্ট এই মন্দিরটিতে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করে মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এই ভবন থেকে কিছু দক্ষিণে কাচারি ভবন ও দুর্গামন্দির। ইংরেজি ইউ আকৃতির একতলা কাচারি ভবনে বড়ো বড়ো বেশ কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। কাচারিভবনের ছাদে ওঠার জন্য দুই পাশে দু’টি সিঁড়ি রয়েছে। কাচারিভবনের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে খোলা প্রান্তর রয়েছে। অতিথিদের থাকার জন্য বাড়ির অন্দরমহলের পশ্চিম দিকে একটি ৩১ কক্ষবিশিষ্ট দোতলা ভবন রয়েছে।

বিশাল জমিদারবাড়িটির চারপাশে সীমানা দেয়াল এবং পূর্ব পাশে প্রবেশদ্বার ছিল। বাড়িটির অদূরে একটি খাল মেঘনা নদীর সাথে সংযুক্ত ছিল। এই খাল দিয়েই জলপথে জমিদার-পরিবার যাতায়াত করতো এবং খাজনা প্রদানকারী প্রজারা নৌকা যোগে জমিদারের কাচারিতে আসতো।

বালাপুর জমিদারবাড়ির পশ্চিম পাশে ৯২ শতক জমিজুড়ে একটি বড়ো দিঘি রয়েছে। নারী ও পুরুষদের স্নানের সুবিধার জন্য দিঘিটির চারদিকে আলাদা আলাদা শানবাঁধানো ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। দিঘিটির চারপাশে সীমানা দেয়াল ও পূর্ব পাশে লাল ইট দিয়ে নির্মিত একটি প্রবেশদ্বার ছিল। কয়েক বছর আগে সেটি ভেঙে গেলে নতুন করে প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হয়। জমিদারবাড়ির নারীরা এই প্রবেশদ্বার দিয়ে দিঘিতে আসা-যাওয়া করতো।

জমিদার নবীনচন্দ্র সাহার তিনপুত্র ছিল। বড়ো ছেলে কালিচন্দ্র সাহা, মেজ ছেলে আশুতোষচন্দ্র সাহা ও ছোটো ছেলে মনোরঞ্জনচন্দ্র সাহা। জমিদার নবীনচন্দ্র সাহার মৃত্যুর পর তার বড়ো ছেলে কালিচন্দ্র সাহা বিশ শতকের প্রথম দিকে জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভের পর কালিচন্দ্র সাহা ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারবাড়ির অদূরে একটি উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন করে নাম দেন ‘বালাপুর নবীনচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়’। কালিচন্দ্র সাহা বাবা নবীনচন্দ্র সাহার মতো দক্ষ জমিদার ছিলেন না। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অবসান হলে কয়েক বছরের মধ্যেই পাকিস্তান ও ভারতে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। যার ফলে জমিদার কালিচন্দ্র সাহা কিছুদিনের মধ্যে নিজ এলাকায় ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন। তখন তিনি মদন মোহন বিগ্রহের নামে বাড়িটি দান করে দিয়ে পরিবার পরিজনসহ পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় চলে যান।

বর্তমানে বালাপুর জমিদারবাড়ির ভবনগুলোতে এবং আঙ্গিনায় কয়েকটি হিন্দুপরিবার যে যার মতো করে ঘর তুলে বসবাস করছে। আবার অনেকেই জমিদারবাড়ির জায়গাতে অনুমতি ছাড়া ভবন তুলে বসবাস করছেন।

নরসিংদীর বালাপুর জমিদারবাড়ির ভবনগুলোর নির্মাণরীতিতে ইন্দ-ইউরোপীয় স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। বাড়িটির প্রতিটি ভবনের দরজা-জানালার চৌকাঠ ও খিলানগুলো কারুকার্যখচিত কাঠের তৈরি। বারান্দার লোহার খামগুলোতে রাধাকৃষ্ণের লীলামূর্তি এখনো শোভা পাচ্ছে। বাড়ির ছাদের ভারবহন করা কাঠ ও লোহার টানা ও গোলাকৃত খামগুলো টিকে আছে। বসবাস করা কক্ষগুলোর কাঠের দরজা জানালাগুলো এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে। বাড়িটির দেয়ালে দেয়ালে আঁকা দেশীয় ফুল, লতাপাতার ছবি মনোমুগ্ধকর।

সংস্কারের অভাবে বাড়িটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। জমিদারবাড়ির বিভিন্ন ভবনের নানা অংশ অশ্বথ ও বটবৃক্ষে ছেয়ে গেছে। নরসিংদী জেলার ডিসি অফিস বালাপুর জমিদারবাড়ির কয়েকটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও কয়েকটি পরিবার এখনো বসবাস করছে।

মেঘনা নদীর তীরে প্রায় পৌনে দুই শত বছর প্রাচীন বালাপুর জমিদারবাড়িটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। 

লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা