রাইদাহ গালিবা ছিল ক্ষণজন্মা এক শিশু। বহু গুণে সে গুণান্বিত ছিল। বারো বছর বয়স হতে-না-হতেই তার ছয় খানা গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২২ সালে ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হলে তাঁকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে প্রতিভাধর এই শিশুটির জীবনপ্রদীপ নিভে গিয়েছিল বড়ো অসময়ে। রাইদাহর মৃত্যুতে দেশ হারালো এক অনন্য প্রতিভাকে। একজন নারীর প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি এবং অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে অবহেলার শিকার হয়ে সন্তান হারানোর বেদনা কেমন, তা কিছুটা অনুভব করা যায় রাইদাহর মা কথাশিল্পী ও কবি কানিজ পারিজাতের এই লেখা থেকে। [সম্পাদক]
সে এসেছিল অমিত সম্ভাবনা নিয়ে...
মুহুর্মুহু বেজে উঠেছে তার অবিনাশী প্রতিভার পদধ্বনি ! সেই বিস্ময়কর প্রতিভার বর্ণালি আলোকচ্ছটা মহাজাগতিক বিচ্ছুরণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই নীতিহীন চিকিৎসকের মুনাফাবৃদ্ধির গোপন নীলনকশার শিকার হয়ে অবহেলা ও গাফিলতির করুণ পরিণতিতে অকালে হারিয়ে যেতে হয় তাকে...! মুগ্ধজনেদের চোখে সে অ্যাঞ্জেল কখনো-বা সাহসী টিপু সুলতান, বিশ্বাসী বৈরাম খান, ক্ষণজন্মা সুকান্ত, ঝাঁকড়া চুলের নজরুল, নয়তো মাকে রক্ষা করে ছুটে চলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই দুঃসাহসী বীরপুরুষ ! সততা, সহমর্মিতা, মানবিকতা, বন্ধুত্বের অনন্য নিদর্শন ও ‘শুভচিন্তার অধিকারী’, মহৎ হৃদয়ের, মেধাবী ও অবিস্মরণীয় সৃজনশীল প্রতিভাধর বিস্ময়শিশু রাইদাহ গালিবা কুইনের জন্মমুহূর্ত এবং তাকে নিয়ে মায়ের স্মৃতিচারণ...
তার চোখে ভাষা ছিল
দিনটা ছিল শুক্রবার, মাঘের পড়ন্ত দুপুর- আমি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ওটি রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই আমার পেছনে আমার বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, বন্ধু স্বজনেরাও এগিয়ে যেতে থাকে- হঠাৎ আমার বাবা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ওটি রুমের দরজা টেনে ধরে ডাক্তার আংকেল [পিজির গাইনি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন]-কে বলেন, ‘আমার ছোটো মেয়ে, দেখবেন ওর যেন কিছু না হয়-’
সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ডাক্তার আংকেল বারবার তার টিমের সদস্যদের সতর্ক করছিলেন আমার বিষয়ে- ‘ওকে একটু সাবধানে দেখতে হবে, ওর বাবাকে কথা দিয়েছি, তার মেয়েকে সহিসালামতে তার হাতে বুঝিয়ে দেব’।
ওটি রুমের মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা আর এনেস্থিসিয়ার ঘোর- সব মিলিয়ে এমন এক আবেশ তৈরি হলো যে, সি সেকশনের সময় আমার ভেতরে চাপা দিয়ে রাখা দুঃখ যেন উথলে উঠলো- আমি ডাক্তার আংকেলকে প্রথার কারণে ভিন্ন এক সংস্কৃতি ও প্রতিকূল পরিবেশে গিয়ে আমার যাপিত জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে থাকি, অপারেশনের সময় তিনি খুব স্নেহের সাথে শুনছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন- ‘এই যে মা, এই দেখো, কত সুন্দর ফুটফুটে একটা বেবি, তোমার সব কষ্ট শেষ...!’ সদ্যোজাত একটি শিশুর কান্না শুনে একঝলক তাকাতেই একটি ট্রের ওপরে পরিপুষ্ট শিশুটিকে আবছা দেখতে পাই ! কিছু সময় পর সেবিকা যখন তাকে টাওয়েল দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে আসে, দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সরাসরি, মনে হলো সে যেন আমাকে চেনে, বহুকাল ধরেই চেনে। সেবিকা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, ডাক্তার আংকেল বললেন, ‘ওর মায়ের গালে ওর গালটা একটু ছুঁইয়ে দাও’- সেই প্রথম আমি তার কচি কোমল পেলব স্পর্শ পেলাম, তখনো সে তাকিয়ে ছিল আমার চোখে- আবারও মনে হলো সে আমার পরিচিত, আমাকে চেনে সে, জনম জনম ধরেই আমাকে চেনে সে- তার চোখে ভাষা ছিল!

খুব শান্ত ছিল সে
রাতের দিকে সি সেকশনের এনেস্থিসিয়ার আবেশ কেটে গেছে, পেটের কাটা অংশে একটা অসহ্য তীব্র ধরনের ব্যথাও শুরু হয়েছে, আমি আছি দোতলায়, গুলশান লেক ভিউ ক্লিনিকের দোতলায়, পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে। নিচতলায় ভিআইপি কেবিনে আমার স্বজনেরা। শিশুদের একজন চিকিৎসক এলেন, পৃথিবীতে নতুন আসা শিশুটির বর্ণনা দিলেন, ব্যথার যন্ত্রণা আর আধোচেতনের ঘোরে শিশু বিশেষজ্ঞের যে কথাটা কানে ঢুকলো- ‘মা, আপনার এই শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা হবে, তার মেরুদণ্ডের গঠন তেমনই...!’ তিনি যাবার সময় শিশুটিকে এত ঠান্ডায় একটি ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে জড়াতে বললেন, আধোচেতনের ঘোরে ‘ব্ল্যাঙ্কেট’ শব্দটা কেমন অপরিচিত লাগল।
পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে আমি ও আরেকজন মা, নবজাতক শিশুগুলো পাশের আরেকটি রুমে সেবিকা ও আয়াদের তত্ত্বাবধানে। কিছু সময় পরপর যন্ত্রণাক্লিষ্ট আমার কাছে আয়া শিশুটিকে নিয়ে আসেন, আমার বুকে তার মুখ লাগিয়ে দেন, প্রতিবার শিশুটিকে আমার কাছে আনা হলে দেখি সে চেনা চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, যেন বহুকাল ধরেই আমরা একে অন্যকে চিনি, বহুকাল ধরেই আমরা একে অন্যের আপন।
আয়া বলল, ‘বাচ্চাটা খুব শান্ত, একটুও কান্দে না’ নিজেরা বলাবলি করছিল- ‘এর শীতের কাপড় এখনো দেয় নাই।’ আধো চেতনের ঘোরে অবাক ও বিরক্ত আমি আমার বোনকে খবর দিতে বলি, ‘বাচ্চাটার শীতের কাপড় এখনো দেয়নি কেন’ ? তার নানাবাড়ি ও দাদাবাড়ি দুই পক্ষেই ইতোপূর্বে কোনো শিশুর আগমন ঘটেনি, দুই পক্ষেরই প্রথম নাতনি সে, তার নানি ও দাদি তার জন্য কাঁথা সেলাই করিয়ে রেখেছে আগে থেকেই, তার খালা ও নানা তার জন্য শীতের কাপড়, নানারকম পোশাক ও সরঞ্জামাদি কিনে রেখেছে, আর তার দাদা কিনেছে শীতের কম্বল।
পরে জানা যায়, তার জন্য পাঠানো শীতের কাপড়, শীতের কম্বল ও অন্যান্য পোশাক এক সেবিকা ভুল করে অন্য জায়গায় রেখে দিয়েছিল, আর এত ঘন জমাট শীতেও এতক্ষণ কম্বল ছাড়া থেকেও শিশুটি শান্ত ছিল, একটুও কাঁদেনি..। রাতে যতবার তাকে আমার কাছে আনা হলো, আমার বুকে মুখ লাগিয়ে তার স্ফটিকস্বচ্ছ কালো চোখের মণি দিয়ে সে খুব শান্ত ও পরিচিত দৃষ্টিতে শুধু আমাকেই দেখছিল ! ভোর পর্যন্ত আয়ারা বলাবলি করল, ‘কী শান্ত বাচ্চা, কী ভালো একটা বাচ্চা... এমন বাচ্চা আগে দেখা যায়নি..’! ১২ বছর ১০ মাস বয়সে চিকিৎসকের ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও চরম গাফিলতিতে নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার শেষমুহূর্ত পর্যন্ত সে ছিল ধীর.. স্থির.. শান্ত !

হার এক্সেলেন্সি কুইন
সি সেকশনের পর ওটি রুমের সামনে তাকে যখন একঝলক অপেক্ষমাণ স্বজনদের দেখানো হয় তখন নাকি সে হেসে দিয়েছিল, সকলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, আর তখনই আমার বাবা অর্থাৎ তার নানা হেসে উঠে বলেন, ‘এই তো এসে গেছে হার এক্সেলেন্সি কুইন’। প্রথম দুই মাস তার নামকরণ তখনো হয়নি- ডাক্তারের কাছে ‘বেবি অব মিসেস কানিজ’, আর বাসায় একেকজন একেক নামে ডাকতে থাকে- তবে, সবচেয়ে বেশি তাকে যে-নামে ডাকা হয় তা ছিল ‘কুইন’- প্রথম দর্শনে তাকে দেখে আমার বাবার দেওয়া উপাধি।
কিছুদিন পরেই আমি শিশুদের নামের বই দেখে তার নাম রাখি রাইদাহ গালিবা- যার অর্থ ‘নেত্রী’, ‘বিজয়িনী’- নামকরণের সার্থকতা সে রেখে গেছে, যেখানেই গিয়েছে সবখানেই সে তার সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণাবলিতে অনন্য ছিল ! তার অধ্যয়ন করা তিনটি স্কুলেই সে শ্রেণিনেতার [ক্লাস ক্যাপ্টেন] দায়িত্ব পালন করে গেছে। সে ছিল দুর্দান্ত মেধাবী, অনবদ্য সৃজনশীল, সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তার আত্মবিশ্বাস কখনো কমেনি, সবকিছুকে জয় করার দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় ছিল তার উদার হৃদয়ের, শুভচিন্তার, অসাধারণ প্রতিভাধর এই দুর্লভ শিশু বেঁচে থাকলে অনন্য এক দৃষ্টান্ত হতো।

সংবেদনশীল-মায়াময় শিশু...
খুব ছোটো থেকেই কুইনের ভেতরে সংবেদনশীলতার আভাস পাওয়া যায়। ওই বয়সে যা ব্যতিক্রম। তার যে গভীর অনুভূতি ছিল এবং খুব ছোটো থেকেই তা যে সক্রিয় হয়ে যায়, তা টের পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি ঘটনায়-
তার দুই মাস বয়সের ঘটনা- তাকে কোলে নিয়ে আমি সোফায় বসে কাজ করছিলাম, সামনে টিভি চলছিল, একটি হিন্দি সিনেমা টিভিতে চলছিল, আমার কোলে বসে সে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎ দেখি সে কাঁদতে শুরু করেছে, যেন ভয় পাওয়া কান্না। কারণ খুঁজতে গিয়ে কিছু খুঁজে না-পেয়ে সামনে তাকিয়ে দেখি আসলে টিভিতে যে হিন্দি সিনেমা দেখাচ্ছিল সেখানে মারামারি হচ্ছে, নায়ক একের পর এক শত্রুর মাথা কেটে ফেলে দিচ্ছে, দৃশ্যটি খুবই ভয়াবহ ছিল। কিন্তু দুই মাসের শিশু দূরের টিভিতে কী করে চলমান দৃশ্যটির ভয়াবহতা অনুভব করতে পারল, সেটা ভেবে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম!
কুইনের বয়স যখন পাঁচ মাস, আমার তখন জন্ডিস ধরা পড়ে, আমি বাসায় গিয়ে মেডিকেল রিপোর্টটা নিয়ে সাহায্যকারী মেয়ে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘এবার বোধহয় বাঁচবো না রে সাদিয়া’..., আমার এমন কথা শোনার সাথে সাথেই সাদিয়ার কোলে থাকা কুইন আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলো, অনেক দুঃখের এক কান্না ! পাঁচ মাসের কুইন কীভাবে তার মায়ের বলা কথাটার মর্মার্থ টের পেল, তা জানি না। বিষয়টা আমাদের সবাইকে চমকিত করেছিল পাঁচ মাসের শিশু কী করে বুঝলো তার মা কী বলছে বা তার মায়ের যে এই বিপদ !
কুইনের সাড়ে তিন মাস বয়সে আমাকে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগদান করতে হয়, আমি প্রতিদিন যে-সময়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরতাম ঠিক সেই সময়ে সে জেগে থাকতো, কিংবা ঘুমিয়ে থাকলেও ঠিক ওই সময়টাতেই জেগে উঠত। আসলে সে আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকতো। আমার নিত্য ফেরার সময়ের একটু দেরি হলেই সে কাঁদতে শুরু করতো।
কয়েক মাসের বাচ্চা ঘড়ি তো দেখতে জানে না, এই সময়টা সে কী করে নির্ণয় করতে পারত, কে জানে ! আমার ফেরার নির্ধারিত সময়ের থেকে একটু দেরি হলেই সে কাঁদতে শুরু করতো, দেরি হওয়া দিনগুলোতে প্রায়দিনই আমি বাসার নিচে পৌঁছে শুনতে পেতাম ওপরে বাসার ভেতর থেকে তার কান্নার আওয়াজ আসছে। আমি দরজায় গিয়ে পৌঁছালেই, আমাকে দেখামাত্রই তার কান্না থেমে যেত আর সঙ্গে সঙ্গে ক্রন্দনরত মুখে অদ্ভুত সুন্দর এক ভুবনভোলানো হাসি ফুটে উঠতো- স্বর্গীয় হাসি ! তার মায়াবী মুখের সেই ভুবনভোলানো হাসিই আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্য !
তাকে নির্মমভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে চিকিৎসা-বাণিজ্য করা, নিরীহ রোগীদের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা মুনাফালোভী নীতিহীন চিকিৎসক ও তার সহযোগীরা, তারা শুধু তরতাজা কুইনকে নয়, আমার জীবনকেও এমনভাবেই থামিয়ে দিয়েছে যে, একজীবন অপার হয়ে বসে থাকলেও অমৃত মুখের সেই স্বর্গীয় হাসি আমি আর কোনোদিনও দেখতে পাবো না....!
তার বয়স যখন তিন বছরের কাছে, তখন আমি তাকে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘পান্তাবুড়ির গল্প’ বইটি পড়ে শুনিয়েছিলাম, দুই-তিন বার পড়ার পরই দেখি, আমি যে টোনে অর্থাৎ কণ্ঠাভিনয় দিয়ে পাঠ করেছি, হুবহু সেই টোনেই সে গল্পটা সকলকে শোনাচ্ছে, সেই একই ভঙ্গিমায় দাড়ি কমাসহ ! এই সময়টাতেই তাকে একদিন ‘জাদুর তুলি’ গল্পটা পড়ে শোনাতে শুরু করি।
নয়ন নামের এক ছোট্ট ছেলে যার বাবা-মা ছিল না, গ্রামের কোণে একা থাকতো, এই তিন লাইন পড়ার পরই দেখি সে কাঁদতে শুরু করেছে, গরিব ছেলেটির দুঃখে তার হৃদয় দুঃখে ভিজে উঠেছে, সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে, তার কান্না দেখে আমি গল্পটা না-পড়ে থেমে যাই। বিষয়টি পরদিন আমার অফিস কলিগ খালেদা পারভিনকে বলি, সে আমাকে বলে- ‘বিষয়টা খুবই চমকপ্রদ, তোমার মেয়ে আসলে ভেতরে খুবই সংবেদনশীল’।
সত্যিই দারুণ সংবেদনশীল ছিল সে, মানুষের দুঃখে খুব তাড়াতাড়ি তার হৃদয় আপ্লুত হতো। আর তার হৃদয় উপচে পড়া সেই ভালোবাসায় স্নাত হয়েছে অবলা প্রাণী থেকে শুরু করে কখনো পথশিশু, কখনো ভিখিরি, বাসার সাহায্যকারী, বাসার গাড়ি চালকসহ, বাসায় আসা অতিথি, তার বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনেরা। যেকোনো খাবার নিজে খাওয়ার আগে বাসার সাহায্যকারী বা পথে চলার সময় গাড়ি চালককে আগে দিয়ে তবেই সে মুখে তুলতো। নিজের খাবার পথশিশু বা ভিখিরিকে দিয়েছে বেশ কয়েকবার ! একবার নীলক্ষেতে গাড়িতে থাকা সে তার ভাই ও গাড়ি চালকের জন্য বিরিয়ানির প্যাকেট কেনা হয়, গাড়ির কাছে একটি পথশিশু এসে খিদে লেগেছে, কিছু খেতে দিতে বলে, কুইন তখন নিজের খাওয়ার জন্য কেনা বিরিয়ানির প্যাকেটটি ছেলেটিকে দিয়ে দেয় ! ছেলেটি একটা আনন্দের হাসি দিয়ে চলে গেলে গাড়িচালক শামীমের দিকে তাকিয়ে কুইন বলে, ‘শামীম মামা, ওই বাচ্চাটার অনেক ক্ষুধা ছিল, তাই না?’ বাসার বারান্দায় উড়ে আসা কবুতর এসির মেশিনের উপরে বসবাস করতে শুরু করে, মাঝে মাঝেই বারান্দায় গিয়ে সে বসবাসকারী সেইসব কবুতরকে খাবার দিত, একবার ডিম ফুটে বের হওয়া সেই কবুতরের বাচ্চা এসির মেশিনের উপরে বানানো বাসা থেকে নিচে পড়ে আহত হয়, কুইন কবুতরের বাচ্চাটিকে উঠিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
বাসার সাহায্যকারীকে সে বন্ধু বানিয়েছিল আর গাড়িচালককে বানিয়েছিল আপন মামা। সুন্দর ব্যবহার আর মিষ্টি কথার জন্য সবাই খুব তাড়াতাড়ি আপন হয়ে যেত তার।
শেষদিকে তাকে একটি ছেলে বাসায় পড়াতো, নাম পিয়াস। তার সেই গৃহশিক্ষক পিয়াস মেসে থাকতো আর তার আরবি শেখানোর হুজুর মেসে একা থাকতেন। এটা জানার পর কুইন তার শিক্ষকেরা মেসে থাকে বলে তাদের খাবারের দিকে খুব খেয়াল করতো। তারা দু’জন বাসায় পড়াতে এলে প্রতিদিনই তাদের দু’জনের খাবার নিজে হাতে পরম যত্নে গুছিয়ে নিত, ডিসেম্বর, ২০২২ সালে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে তার খালামণি, কুইনের শিক্ষক পিয়াসসহ সবাইকে বুফে খাওয়াতে নিয়ে যাবে, তাই সে তার পিয়াস স্যারকে বলেছিল, ‘স্যার, আপনি কিন্তু ওই সময় অবশ্যই আমাদের সাথে যাবেন’ ! উত্তরে তার স্যার যখন বলেছিল, ‘আম্মু, আমি তো কোনোদিন বুফেতে যাই নাই।’ তখন সে তার স্যারকে বলে- ‘স্যার, কোনো চিন্তা করবেন না, আপনি আমার সাথে সাথে থাকবেন, আমার প্লেটে আমি যে-খাবারগুলো তুলব, আপনিও সেগুলোই তুলবেন, আমরা একসাথে খাব...’!

আম্মু.... রাইদাহর আম্মু
একটু পেছনে যাই- রাইদাহর তিন মাসের কাছাকাছি বয়সে কী খাবার খাওয়াবো তা জানতে এক শিশুবিশেষজ্ঞের চেম্বারে যাই। চেম্বারের সামনে অসংখ্য শিশু ও তাদের মায়েরা- সিরিয়ালি একে একে ডাকা হচ্ছে। ডাক্তারের চেম্বারের সামনে দাঁড়ানো ডাক্তারের সহকারী কমবয়সী একটি ছেলে- দাড়িওয়ালা হুজুরের পোশাক পরা, সে হঠাৎ জোরে ডেকে উঠলো, এরপর ‘রাইদাহর আম্মু যাবেন’...।
‘আম্মু’......‘রাইদার আম্মু’... শব্দটা শ্রবণেন্দ্রিয় ভেদ করে মননে-চেতনে অদ্ভুত এক অনুরণন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ! এতদিন টিকা দেওয়া বা ডাক্তার দেখানোর সময়, শুধু ‘বেবি অব মিসেস কানিজ’ শুনতাম। তখনো যেন আমি পরিপূর্ণ একজন ‘আম্মু’ হয়ে উঠিনি। অথচ এই প্রথম কে যেন সমস্ত পৃথিবীতে- আকাশে-বাতাসে-ইথারে ঘোষণা করে দিলো- ‘আমি আম্মু’ , ‘আমি রাইদাহর আম্মু।’ পৃথিবীর সামনে সেদিন থেকে আমি ‘আম্মু’ হয়ে গেলাম... ‘রাইদাহর আম্মু’..! এক অপার মমতায় মনটা ভরে উঠলো..
তার দুই মাস বয়সের পর দুইবার তাকে বাসায় রেখে অল্প সময়ের জন্য জরুরি বাইরে গিয়ে ঝট করে ফিরে এসেছিলাম। এই স্বল্প সময়েই আমি বের হওয়ার সাথে সাথেই শান্ত কুইন কাঁদতে শুরু করে, অবিরাম।
সে কী করে টের পেল আমি ঘরে নেই, কে জানে ! ফিরে এলে আবার কান্না থামে, শান্ত হয়ে যায়। অনেকেই বলতো শিশুরা মায়ের গায়ের ঘ্রাণ টের পায়- অন্য রুমে থাকলেও সে বোঝে, তার মা আশেপাশেই আছে, তাই ঘর থেকে বের হলেই ঘ্রাণটা না থাকায় সে কাঁদতে শুরু করতো। এমনটাই মনে হয়েছিল !
প্রথমদিকে ম্যা, তারপর আ...ম্মা, আ...ম্মো .. , তারপর ‘আম্মু’ .. আধো আধো বুলিতে খুব সুন্দর করে আম্মু ডাকতো কুইন, ম এর নিচে ম জোড়া দেওয়া অংশে খুব সুন্দর একটা টান দিয়ে ডেকে উঠতো- ‘আ...ম্মু...’ তার সেই ডাকের সাথে অপূর্ব এক মধুর আবেশ ছড়িয়ে পড়তো।
সুন্দর করে কথা বলতো সে, তার সেই অপূর্ব মধুর ‘আম্মু’ ডাকে যে দারুণ এক আবেশ ছড়িয়ে দিত তাতে প্রাণটা যেন আবেশেই জুড়িয়ে যেত।
আবরার ‘আম্মু’ ডাকে, আবরার ডাকে তাই ‘আহনাফও [বোনের ছেলে] আবরারকে দেখাদেখি কিছুদিন ‘আম্মু’ ডেকেছিল, তবু কেন যেন কারো ডাকেই কুইনের সেই মিষ্টি ডাকের আবেশটা আর ফুটে ওঠে না।
চিকিৎসকের ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও চরমতম গাফিলতির নির্মম শিকার হয়ে চলে যাবার আগ মুহূর্তেও আইসিউর ভেতরে সে সেভাবেই আমাকে ডেকেছে, আমাকে খুঁজেছে। নার্সের উদ্দেশ্যে বলেছে, ‘তোমরা কি আমার আম্মুরে দেখছো..? ’
তার কণ্ঠের সেই মিষ্টি ‘আম্মু’ ডাক, সেই আবেশী ... ভুবনভোলানো, প্রাণজুড়ানো ‘আম্মু’ ডাক আমাকে এতটাই আবিষ্ট করে রেখে গেছে যে, সেই মধু-কণ্ঠের অমৃত সেই ‘আম্মু’ ডাক শোনার অপার আকাক্সক্ষা আমাকে চিরদিনের জন্য ‘তৃষ্ণার্ত এক ভিখিরি’ করে রেখেছে ...!
মা আমার যেখানেই থাকো ভালো থেকো...
লেখক : কথাশিল্পী, কবি