নাট্যাঙ্গনের তরুণ দুই মুখ। সুজন হাবিব ও প্রীতি আলভী। দু’জনেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সাবলীল অভিনয় দিয়ে নিজেদের আসন পোক্ত করেছেন। ছোটোপর্দার পাশাপাশি কাজ করেছেন বড়োপর্দায়। ইতোমধ্যে প্রীতির দু’টি ছবি মুক্তি পেয়েছে, সুজনের ছবি রয়েছে মুক্তির মিছিলে। দু’জনের বর্তমান ব্যস্ততা ও নানা বিষয় নিয়ে লিখছেন শেখ সেলিম...
তরুণ অভিনেতা সুজন হাবিব। বিজ্ঞাপনচিত্র ও নাটক সবজায়গায় নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সাবলীল অভিনয় দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। স্কুলে পড়াকালীন অভিনয় নামের পোকাটা মাথায় প্রবেশ করে। শুরুটা নিজ স্কুলের একটি নাটকের মঞ্চে। স্কুল শিক্ষকের অনুরোধে একদিন স্কুলের মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। উপস্থিত সবার প্রশংসা সুজনকে এই অঙ্গনে কাজ করার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। স্কুলে পড়াকালীন থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন সুজন। অঞ্চলভিত্তিক অভিনয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিকবার পুরস্কারও পান। একবার কবিতা আবৃত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হন। এরপর থেকেই অভিনয়ের প্রতি একটা ভালোবাসার শুরু হয়। ছেলেবেলা থেকেই নাটকে কাজ করার স্বপ্ন ছিল। এরপর ঢাকায় এসে টোকাই নাট্যদলে ভর্তি হন। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম টিভিনাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান। শাহাদাত রাসেলের রচনা ও সাইফুল আজমের পরিচালনায় ‘বৃত্তবন্দী’ নাটকে সুজন সহশিল্পী হিসেবে পান সাদিয়া ইসলাম মৌ ও শতাব্দী ওয়াদুদকে। নাটকটি মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচার হয়। এই নাটকটি করার পর দীর্ঘদিন একটা গ্যাপ হয়। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে দীপ্ত টিভিতে প্রচারিত ‘অপরাজিতা’ ধারাবাহিক নাটক দিয়ে আবার অভিনয়ে ফেরেন। প্রান্তিক চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান সুজন। এই নাটকটি সুজনের টার্নিং পয়েন্ট।
বর্তামানে সুজন হাবিব অভিনীত একাধিক ধারাবাহিক নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। এরমধ্যে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে প্রচার হচ্ছে ‘সাদি মোবারক’ ও এনটিভিতে প্রচার হচ্ছে ‘জোনাকির আলো’। এছাড়াও কাজ করছেন একাধিক খ-নাটকে। সম্প্রতি প্রচার হয়েছে ‘ঝালমুড়ি’ ও ‘তুমি আমার কে’ নাটক দু’টি।
অন্যদিকে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে শখের বশে পোশাকের ফটোসেশন শুরু করেন প্রীতি আলভী। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে হঠাৎ করেই নির্মাতা তপু খানের ‘লিডার আমি বাংলাদেশ’ ছবিতে কাজের সুযোগ পান প্রীতি। অনেকটা শখের বসেই ছবিতে কাজ করেন তিনি। ছবিতে শাকিব খানের বোনের চরিত্রে অভিনয় করেন প্রীতি। ছবিটি মুক্তির আগেই অফার আসে মুঠোফোন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপনচিত্রে। কাজটি করেন তিনি, পরিচিতি বাড়তে থাকে তার। এরপরই সুযোগ আসে নাটকের। সৈয়দ শাকিলের পরিচালনায় ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। সহশিল্পী ছিলেন অপূর্ব ও ফারিণ। এই নাটকটি করার পর মিডিয়ায় নিয়মিত হয়ে যান প্রীতি, কাজ করেন বেশকিছু নাটকে, পাশাপাশি বিজ্ঞাপনচিত্রেও মডেল হন।
তার উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপনচিত্রের মধ্যে রয়েছে, দারাজ, সিলন টি, চাষি পোলাও চাল, সিটি ব্যাংক প্রভৃতি। কাজ করতে করতে আবারও অফার আসে চলচ্চিত্রের। এবার অভিনয় করেন ‘দাগী’ ছবিতে। ছবিতে উপস্থিতি কম থাকলেও দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
ছোটোপর্দার পাশাপাশি তিনটি সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন সুজন। তিনটি ছবিই মুক্তির অপেক্ষায় আছে।

বড়ো ও ছোটোপর্দা কোন মাধ্যমে কাজ করতে বেশি ভালো লাগে, সুজন বলেন দুই মাধ্যমেই কাজ করতে ভালো লাগে। কারণ দুই জায়গাতেই অভিনয় করতে হয়। বর্তমানে ওটিটি প্লাটফর্ম একটি বড়ো মাধ্যম সেখানেও একাধিক কনটেন্টে কাজ করেছেন সুজন। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়া যায় কি নাÑ এ প্রসঙ্গে সুজন বলেন, এটা আসলে নির্ভর করে জনপ্রিয়তার ওপর, ভাগ্যও সহায়ক হতে হবে। আমি তো শুধু অভিনয় নিয়েই আছি। এখন পর্যন্ত টিকে আছি। আগামীদিনে কী হবে জানি না।
একজন অভিনেতা হিসেবে যতটুকু কাজ করছেন, সেটা কি যথেষ্ট বলে মনে করেন ? সুজন বলেন, মনে হয় আমার কাজ করার অনেক জায়গা পড়ে রয়েছে, কিন্তু পারছি না, কারণ ভিউ। যার যত ভিউ তার তত কাজ। আমি যে গল্পকেন্দ্রিক কাজ করি, আমাদের দেশে এই ধরনের গল্প দর্শক কম দেখেন। সেগুলোর ভিউ কম হয়, সেজন্য হয়ত আশাতীত কাজ করতে পারছি না। মূলত ভিউর কারণেই আমি পিছিয়ে আছি। তবে এখন আবার গল্পকেন্দ্রিক নাটকের দর্শক বাড়ছে।
এপর্যন্ত প্রায় ৩০টি বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হয়েছেন সুজন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপনচিত্র হলোÑ প্রাণ আরএফএল ওয়াটার পাম্প পিউর ইট পানি, ইসলামী ব্যাংক সেলফিন, সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড প্রভৃতি।
কাজ করতে এসে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে সুজন বলেন, আমি গ্রামের একজন ছেলে, সেখান থেকে উঠে এসেছি, আজ ইন্টারভিউ দিচ্ছি এটাই আমার বড়ো প্রাপ্তি।
ধারাবাহিক নাটকের পাশাপাশি ৫০টির অধিক খ-নাটকে অভিনয় করেন তিনি। আমার একবছরের একটি সন্তান আছে, তাকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা-এটাই একমাত্র স্বপ্ন। আর অভিনয় করতে চাই যতদিন দর্শক চাইবেন।
পরিবার প্রীতির মিডিয়ায় কাজ করা প্রথম দিকে মেনে না নিলেও এখন তার কাজের সবচেয়ে বড়ো সমালোচক তার পরিবার। প্রীতিদের বাসার প্রায় সবাই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার তাই প্রথমে কেউ মেনে নিতে পারেনি। প্রীতির কাজ দেখে এখন সবাই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন। প্রীতির পুরো পরিবার সিনেমা হলে গিয়ে ‘দাগী’ সিনেমাটি দেখছেন।

তবে প্রীতির ছেলেবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল, নায়িকা হবেন। আর এই স্বপ্নের বীজ বপণ হয় প্রয়াত নায়ক সালমান শাহকে দেখে। ছেলেবেলায় প্রীতি জানতেন না সালমান শাহ মারা গেছেন, টেলিভিশনে দেখতেন, আর ভাবতেন বড়ো হয়ে তার নায়িকা হবেন।
ওটিটি প্লাটফর্ম প্রসঙ্গে প্রীতি বলেন, ওটিটিতে এখনো কাজ করা হয়ে ওঠেনি, তবে এখানে ভালো কাজের সুযোগ পেলে অবশ্যই করব। তবে, আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে সিনেমায়। অভিনয়কে কি পেশা হিসেবে নেওয়া যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে প্রীতি বলেন, হ্যাঁ নেওয়া যাচ্ছে, আমি তো পেশা হিসেবেই নিয়েছি। আগে চাকরি করতাম, মিডিয়ায় কাজের জন্য ছেড়ে দিয়েছি। রোমান্টিক ও থ্রিলার গল্পে কাজ করতে বেশি ভালো লাগে।
অনেকটা শখের বসেই মিডিয়ায় আসেন প্রীতি। এখন এটিই জীবনের প্যাশন হয়ে উঠেছে। নাটক, বিজ্ঞাপনচিত্র, সিনেমা তিন মাধ্যমেই নিজেকে মেলে ধরছেন তরুণ এই অভিনেত্রী।
কুমিল্লা শহরে বেড়ে ওঠা প্রীতি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এবার তিনি নিজেকে চলচ্চিত্রেই প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখছেন। হতে চান প্রধান চরিত্রের অভিনেত্রী। অভিনয় দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করে সামনে এগোতে চান প্রীতি। জায়গা করে নিতে চান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি দর্শকের মনে।