ঘর-বাড়ি বালা না আমার : মোশাররফ হোসেন

24 Dec 2025, 01:17 PM অন্যান্য শেয়ার:
ঘর-বাড়ি বালা না আমার : মোশাররফ হোসেন


‘লোকে বলে বলে-রে ঘর-বাড়ি বালা না আমার।

ও লোকে বলে রে ঘর-বাড়ি বালা না আমার,

কি ঘর বানাইমু আমি [২] শূন্যেরও মাজার।’


মরমি কবি হাসন রাজার এই গানটি কিশোর বয়স থেকেই শুনে আসছি। তিনি একজন প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। জমিদারবাড়ি ভালো না-হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ২১ ডিসেম্বর [৭ পৌষ] তার ১৭১তম জন্মদিন। ইচ্ছে হলো জন্মদিনের আগেই সুরমা নদীর পাড়ে তার বাড়ি দেখবার। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনদিনের সফরে সুনামগঞ্জ অঞ্চলের হাওর ও কবি হাসন রাজার বাড়ি পরিদর্শন করলাম। এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করলাম মরমি কবি হাসন রাজার বাড়ি ও তার পারিবারিক তথ্য।

দেওয়ান হাসন রাজা ৭ পৌষ ১২৬১ বঙ্গাব্দ, ২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা নদীর পারে তেঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন হুরমতজান বিবি এবং বাবা দেওয়ান আলীরাজ চৌধুরী। শৈশবে তার নাম ছিল দেওয়ান অহিদুর রাজা। দলিলপত্রেও তার নাম দেওয়ান অহিদুর রাজা বলেই উল্লেখ রয়েছে। জানা যায়, তার পিতা দেওয়ান আলী রাজার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৎকালীন ফারসি ভাষাবিদ নাজির আব্দুল্লাহ কিশোর অহিদুর রাজাকে দেখে নাম রাখেন হাসন রাজা। পরিণত বয়সে তিনি দেওয়ান হাসন রাজা নামেই পরিচিতি লাভ করেন।

হাসন রাজার পূর্বপুরুষ ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলি থেকে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় আসেন এবং সেখান থেকে ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ববঙ্গের যশোর জেলার কাগদি গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। হাসন রাজার পূর্বপুরুষ বিজয়সিংহ দেব কিছু কালের মধ্যেই যশোর অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য গঠন করতে সক্ষম হন। রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ছোটোভাই দুর্জয় সিংহের ষড়যন্ত্রে রাজ্য পরিত্যাগ করে তিনি সিলেট অঞ্চলে চলে আসেন।

অনেকেই ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, হাসন রাজার পূর্বপুরুষগণ অযোধ্যার অধিবাসী ছিলেন। জাতিতে ছিলেন আর্য গোষ্ঠীর ক্ষত্রিয় শাখার অন্তর্ভুক্ত। হাসন রাজার পূর্ববর্তী বংশধরেরা সনাতন ধর্মাবলম্বি ছিলেন। পূর্বপুরুষ বানারসি রাম সিংহের একমাত্র পুত্র বীরেন্দ্র চন্দ্র বাবু রায় সনাতন ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নিজের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন বাবু খান। বাবু খানের পরবর্তী বংশধর আলী রাজা চৌধুরী ইংরেজদের কাছ থেকে সুনামগঞ্জ হাওড় এলাকার দেওয়ানি লাভ করেন। তখন থেকেই আলী রাজা চৌধুরী দেওয়ান উপাধি ব্যবহার করতে থাকেন। তিনি সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী গ্রামে সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন।

দুরন্ত স্বভাবের হাসান রাজার কৈশোর ও যৌবন কেটেছে ভোগবিলাসের মধ্যে। স্বশিক্ষিত হাসন রাজা আরবি ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তার বাবা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ও বড়ো ভাই দেওয়ান ওবায়দুর রাজা মৃত্যুবরণ করেন। বাবা ও বড়ো ভাইয়ের মৃত্যুর পর মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেওয়ান হাসন রাজা সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের রামপাশা এস্টেট, লক্ষ্মণশ্রী, চামতলা, মহারাম, পাগলা, লাউড় ও বেতালসহ কয়েকটি পরগনার প্রতাপশালী জমিদার হয়ে ওঠেন। কিন্তু জমিদারির বাঁধাধরা নিয়মে তার মন আরো চঞ্চল হয়ে ওঠে। ক্রমশ তার মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার উদ্ভব হয়। তিনি জমিদারির সৌখিন ও ভোগবিলাসের জীবন পরিত্যাগ করে মানবতাবাদী মরমি সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। সংগীত সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি আধ্যাত্মবাদের মরমি বাণী প্রচার করতে থাকেন।

কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসন রাজার চেতনার পরিবর্তন ঘটে। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষের এই অঞ্চলে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা ও অসহায় পরিস্থিতি তাকে পাল্টে দেয়। প্রতিপত্তিশালী রাজা থেকে রূপান্তরিত হন হাওরের বাউলে। তিনি গেয়ে ওঠেন-

‘বাউলা কে বানাইল রে হাসন রাজারে বাউলা কে বানাইলো রে।’

অন্য একটি গানে তার মনের কথা বেজে ওঠে-

‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে,

কান্দে হাসন রাজার মন মনিয়া রে’

ভাবরস আর জীবন বোধে সমৃদ্ধ এমন কালজয়ী বহু গান তিনি রচনা করেন। ধারণা করা হয়, তিনি একহাজারের বেশি গান রচনা করেছিলেন। তার অনেক গানই সংরক্ষণ করা যায়নি। হিন্দি ভাষায় রচিত কয়েকটি গানসহ এখন পর্যন্ত তার ৫৫৩টি গানের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তার গানের বাণীতে আধ্যাত্মবাদের মর্মবাণীর পাশাপাশি হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের নানা বিষয় স্থান করে নিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ব দরবারে হাসন রাজাকে তুলে ধরেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সেমিনারে ‘রিলিজিয়ান ম্যান’ শিরোনামে এক বক্তৃতায় হাসন রাজার গানের ভাব দর্শন তুলে ধরেন।

পশুপাখির প্রতিও হাসন রাজার খুব ভালোবাসা ছিল। তিনি পশুপাখি লালন পালন করতেন। তার সংগ্রহে অসংখ্য পাখি ও ৭৭টি ঘোড়া ছিল। তার প্রিয় পাখির নাম ছিল কুঁড়া পাখি আর প্রিয় ঘোড়ার নাম ছিল জংবাহাদুর। জংবাহাদুরে চড়েই তিনি বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। মরমি কবি দেওয়ান হাসন রাজা ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে তার মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাধিত করা হয়েছে। 

লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা