নতুন সমৃদ্ধ সমাজের জন্যে খুব পরিশ্রম করতে হবে : তারিক আনাম খান

18 Mar 2025, 02:04 PM অন্যান্য শেয়ার:
নতুন সমৃদ্ধ সমাজের জন্যে খুব পরিশ্রম করতে হবে : তারিক আনাম খান

তারিক আনাম খান- মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রের তুখোড় অভিনেতা। সৃষ্টিশীল নির্দেশক। বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা ও মডেল। সম্প্রতি আনন্দভুবন ঈদসংখার জন্য তিনি আন্তরিকভাবে দিয়েছেন দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার। যেখানে উঠে এসেছে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা প্রসঙ্গ। তাঁর এই সাক্ষাৎকার থেকে পাঠক জানতে পারবেন এদেশের মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটক বিকাশের স্বচ্ছ একটি চিত্র। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আবৃত্তিশিল্পী নাট্য ও গণমাধ্যমকর্মী মাসুদুজ্জামান...


মাসুদুজ্জামান : আপনার কাছে জানতে চাই সংস্কৃতির পথে পথচলার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল ?

তারিক আনাম খান- আমার বাবা চাচা সবাই সাংস্কৃতিক পরিম-লে ছিলেন। আমার দাদার ভাই আকরম খাঁ ছিলেন আজাদ পত্রিকার সম্পাদক। কলকাতার সঙ্গে আমার পরিবারের একটা সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেখানে অনেকেই আবার ওখানকার মঞ্চনাটকের সাথে যুক্ত ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি যেমন খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতাম তেমনি কবিতা আবৃত্তি, গান শোনা বই পড়া এগুলো করতাম ছেলেবেলা থেকেই। সাতক্ষীরার রসুলপুর গ্রামে আমার জন্ম। ওইখানে বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। আমি কবিতা আবৃত্তি করতাম, বাবা শিখিয়ে দিতেন। স্কুলের বইতে যে ছড়া-কবিতাগুলো থাকত সেগুলো দিয়েই অভিনয়ের চর্চাটা শুরু হয়। ছড়া পড়তে গেলে, কবিতা পড়তে গেলে এক্সপ্রেস করতে হয়। আবৃত্তিতে তখন একটা এক্সপ্রেশান তৈরি হয়, কোনোটা থেমে বলা, কোনোটা টানা বিভিন্ন ধরনের তো, এটার সঙ্গে অভিনয়ে একটা সাংঘাতিক মিল আছে। সাহিত্যের সঙ্গে তো অবশ্যই আছে। তো সে-সময় আমরা ছোটোদের বই পড়তে শুরু করেছি আবার ছোটোদের ডিটেকটিভ উপন্যাস থেকে শুরু করে সবই পড়তাম, বাসায় পত্রিকা আসত পত্রিকা পড়তাম, সেগুলো নিয়ে আবার আলোচনা হতো।

আমার চাচা ছিলেন নুরুল আনাম খান তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যখন শুরু হয়, তখন থেকেই জড়িত ছিলেন। উনি চাইতেন যে, শুধুমাত্র পড়াশোনা নয়, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সাথেও যেন আমরা যুক্ত থাকি। কেননা সেটা আসলে সাহায্য করে মানুষ হিসেবে তৈরি হতে। কেননা সাংস্কৃতিক কর্মকা-র মাধ্যমে মানুষের একটা এক্সপোজার তৈরি হয়, একটা একটা উন্মুক্ততা তৈরি হয়।

আবার নিয়মনীতি মেনে চলতে হতো খুব, সন্ধ্যার পরে আবার বাইরে থাকার অনুমতি নেই, সন্ধ্যা হলেই ঘরে ফিরতে হবে, পড়তে বসতে হবে। তাছাড়া আমার উৎসাহ ছিল নানান কর্মকা-ে, মানে ঘরের কাজটা আমি মনে করি সংস্কৃতিরই একটা অঙ্গ। একটা কাপড় ভালো করে ঠিকঠাক মতো গুছিয়ে রাখাটাও একটা সংস্কৃতিরই একটা অঙ্গ। আমরা তখন যে জায়গায় থাকতাম তখন সেটা মাটির ঘর ছিল। তাই আবার মায়ের কাজে সাহায্য করা লেপা মোছা গোবর টোবর দিয়ে, এগুলো আমি এনজয় করতাম।

ছোলেবেলায় গ্রামে যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, মাটির বাড়ি অনেক উঁচু দাওয়া, গোলপাতার ছাউনি বড়ো বড়ো ঘর, কিন্তু খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, বিশাল বড়ো উঠান, উঠানের একপাশে হাস্নাহেনার গাছ, একপাশে করবী গাছ, তারপরে শীতকালে গাঁদা ফুল লাগানো হতো। এগুলো সংস্কৃতির অঙ্গ বলে আমি মনে করি, ফুল তো খাওয়া যায় না, এটা আসলে মানুষের অন্তরে একধরনের তৃপ্তি দেয়- একটা সুন্দর ফুল দেখলে, একটা প্রজাপতির ঘুরে বেড়ানো দেখলে। বাড়িতে জানালা যেটা ছিল, যখন বৃষ্টি হতো তখন দেখতাম পেছনের দিকে প্রচুর পানি জমে যেত। পেয়ারা গাছ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে বৃষ্টির পরে, এরই মাঝে ব্যাঙ যাচ্ছে, হেলে সাপ মানে হলুদ রঙের সাপ, যেগুলো নির্বিষ, এগুলো দেখতে খুব ভালো লাগত। পাখির ডাক, এই যে প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধন এটা মানুষকে সংস্কৃতি বলি বা যেকোনো কর্মকা-েই উৎসাহিত করে। এইভাবেই প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা।

মাসুদুজ্জামান : স্কুলে পড়ার সময়েই কি অভিনয়ের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন ?

তারিক আনাম খান- যদি নাটক বলি তাহলে সেটা হচ্ছে একেবারেই হাইস্কুলে উঠে। যখন আমরা গ্রাম থেকে শহরে আসলাম, হাইস্কুলে পড়লাম বাৎসরিক সংস্কৃতি প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, খেলার অনুষ্ঠান হচ্ছে, এগুলোতে যাচ্ছি, অংশগ্রহণ করছি, বাৎসরিক নাটকও হতো। ক্লাস সেভেন এইটে বোধহয় খুব সম্ভবত, আমার প্রথম নাটক হচ্ছে মহেন্দ্রগুপ্তের ‘টিপু সুলতান’। একটা ইতিহাসভিত্তিক নাটক। এই নাটকে একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম নাম হচ্ছে মশিয়ে লালি। মশিয়ে লালি একটা ফ্রেঞ্চ ক্যারেক্টার ছিল, সে ভাঙা ভাঙা বাংলা বলে। আমার বাবা দেখিয়ে দিতেন- অভিনয় কেমন হবে, বিশেষ করে ওই ভাঙা ভাঙা বাংলা কেমন হবে। এইটাতে প্রচুর তালি পেয়েছিলাম।

মাসুদুজ্জামান : সাতক্ষীরায় তখন সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ কেমন ছিল ? ওখানে কি নিয়মিত নাটক করতেন ?

তারিক আনাম খান- বরাবরই সাতক্ষীরায় সাংস্কৃতিক কর্মকা- চলমান ছিল। এই সময়ই সাতক্ষীরাতে বাচ্চাদের নিয়ে একটা দল হলো, সংগঠনটির নাম ছিল ‘কোড়ক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’। ওখানে আজমল সাহেব বলে একজন ছিলেন, তিনি আমাদের নাটক করাতেন। এর পাশাপাশি আমরা নিয়মিত রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী করছি, সুকান্তের বার্ষিকী করছি। আমরা পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করছি আমরা একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরী করছি। নিয়মিত নাটক হতো, মানে তখন একাঙ্কিকা হতো, যেহেতু আমরা শিশু তাই তখন আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী বর্জিত নাটক করতাম। তো ওই দলের সঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে ছোটো নাটিকা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতাম। স্কুলেও নাটক করতাম। তখন কিন্তু সাতক্ষীরার এই ধরনের কর্মকা-ে নেতৃত্ব দিত প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা, যারা একটু বামপন্থী রাজনীতি অর্থাৎ মানুষের মুক্তি-আন্দোলন করত। ওইসময়ই স্কুলে আমাদের এক সিনিয়র প্রস্তাব করল, ক্ষুদিরামের যেদিন ফাঁসি হয়েছিল সেদিনটাকে আমরা মনে রাখতে চাই আমরা কথা বলতে চাই এটা নিয়ে। এটা নিয়ে স্কুলের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু গোঁড়া লোকজন আবার প্রতিবাদ করলো, না না ক্ষুদিরামকে নিয়ে কেন অনুষ্ঠান হবে ? আমরাও প্রতিবাদ করে বললাম নানা ক্ষুদিরামেরটা শুনতে হবে আমাদের। সেই সময়েই শহিদমিনার তৈরি করা হলো, সেই ৬৮-৬৯-এর দিকে, যখন চারিদিকে আন্দোলন দানা বাঁধছে। এর পাশাপাশি পড়াশোনা তো আছেই, সাতক্ষীরায় তখন একটা লাইব্রেরি ছিল। লাইব্রেরিতে গিয়ে নিয়মিত বই নিয়ে আসতাম পড়তাম। বাড়িতে খবরের কাগজ আসত, খবরের কাগজ পড়তাম।

ওইসময়ই বড়োদেরও একটা সংগঠন হলো নাম ‘কল্লোল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’। তারা নিয়মিত নাটক করত। তখন আমরা ওইখানে গেলাম, এটা কিন্তু স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় মানে আটষট্টি-উনসত্তর হবে। উনসত্তরে যখন আমার পরীক্ষা, কিন্তু আমি আমার ওই দলের সঙ্গে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় যেমন আছি, তেমনি আমি তখন গ্রামে গ্রামে নাটক করতে গিয়েছি- ‘শেকল ভাঙার গান’। সেখানে আমি রাজার একটা চরিত্র করতাম। নাটকে দেখানো রাজাকে উৎখাত করছে প্রতিবাদী জনগণ।

মাসুদুজ্জামান : তার মানে তখন কি গ্রামে গ্রামে ঘুরে পথনাটক করতেন ?

তারিক আনাম খান- পথনাটক না, মানে এটা মঞ্চনাটকই হতো। পথনাটকের কনসেপ্ট তখনো বাংলাদেশে আসেনি। এটা হতো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি মানে মাওলানা ভাসানীর গ্রুপ, তাদের মিটিংয়ের পরে নাটক হতো। এটা তৎকালীন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিশেষ করে যারা বামপন্থী কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন তাদের কর্মসূচি ছিল সমাবেশের পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। তখন সংস্কৃতির প্রতি একটা ঝোঁক ছিল। মানুষের মুক্তি শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে এই ভাবনাতেই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।

মাসুদুজ্জামান : বাড়িতে আপনার অভিভাবকরা এটা মানতেন ? পড়াশোনায় ব্যাঘাত হতো না ? আর তখন তো বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন তুঙ্গে-

তারিক আনাম খান- বাড়ি থেকে পালিয়ে করেছি। বাবা তো যাই হোক না কেন, যতই সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহ দিন, পড়াশোনার দিকে মনোযোগী না হলে খুব রাগারাগি করতেন। আমি আবার পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম। মানে ক্লাসে মোটামুটি তিনজনের মধ্যেই আমার অবস্থান থাকত। আমাদের ক্লাশে একশ’ পঁচিশ-ত্রিশজন ছাত্র ছিল, বয়েজ স্কুল। তখন তো ওই তিনজনের মধ্যে রেজাল্ট থাকত, নাহলে নিজের কাছেই খুব খারাপ লাগত। পরে নাটক করতে গিয়ে একটু পড়াশোনায় ঢিলেমি হয়েছিল, কিন্তু সেটা আবার একটু খেটে পূরণ করে নিই। এই করতে করতেই স্বাধীনতা আন্দোলনে আমার সম্পৃক্ততা হয়। পঁচিশে মার্চ রাতে আমরা বেরিয়ে গেছি যখন শুনেছি যে, রাজারবাগ, পিলখানা আক্রান্ত হয়েছে। তখন কেবল কিছুদিন আগে একটা ওয়ারলেস এসেছে সাতক্ষীরা থানাতে। খবর পেলাম ভোর চারটার সময় এনাউন্স করে দিয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালিদের উপর আক্রমণ করেছে। সাথে সাথে আমরা বেরিয়ে গেছি। মার্চের শেষ দিকে তো, একটা চাদর গায়ে দিয়ে আমাদের মেইন মোড় ছিল পাকা পুলের মোড়, ওখানে গিয়ে সমবেত হই। সবাই আলোচনা করছে কী করে প্রতিরোধ করব-না-করব। পরের দিন বারবার থানাতে গিয়ে খোঁজ নিই কোথায় আক্রান্ত হয়েছে, কী হচ্ছে কোনো মুভমেন্ট হচ্ছে কি না।

মাসুদুজ্জামান : এরপর তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলেন ?

তারিক আনাম খান- আমি মোটামুটি এপ্রিলের দিকে ভারতে চলে যাই। অসুস্থ হয়ে ছিলাম বেশ দীর্ঘদিন। কিছুই ছিল না, কোথায় থাকব ? একটা রুমের মধ্যে ছিলাম, যেটার মধ্যে বাথরুম নাই, কিচ্ছু নাই, খাওয়া দাওয়ার ঠিক নাই, একটা কম্বল বিছানো আর একটা কম্বল বা চাদর গায়ে দিয়ে এককাপড়ে প্রায় ত্রিশ দিন থাকতে হয়েছে আমাদের। এরপর আমরা সংগঠিত হই, আমাদের একজন এমপি ছিলেন, উনি বললেন যে, যুদ্ধ তো অবশ্যই দরকার কিন্তু পাশাপাশি যুদ্ধের অনুপ্রেরণা জোগানোটাও অনেক বেশি প্রয়োজন। কারণ, আমরা যে যুদ্ধটা করছি সেটা সংস্কৃতির জন্য অনেক বেশি- আমাদের নিজস্ব ভাষা, আমাদের নিজস্ব বাংলা নামক একটি রাষ্ট্রের জন্য। সংস্কৃতির থেকেই কিন্তু আমাদের এই রাষ্ট্রের জন্ম বা উদ্ভব। তাই আমাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে মুক্তিযোদ্ধাদের। আমরা নিজেরা যতটুকু গান জানি, আরও পাঁচ-সাতজন মিলে। আমি গণসংগীতও করতাম সে-সময়।

আমরা নয় নম্বর সেক্টরে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে, রিফিউজি ক্যাম্পে নাটক করেছি, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য। নিজেরাই লিখে, আমাদের একজন ছিলেন খায়রুল বাশার, মুসা সাহেব বলে একজন ছিলেন আর আমরা যারা নাটক করতাম। মুক্তিযোদ্ধারা যে কী অনুপ্রাণিত হতো, শেষের দিকে যখন নাটকে দেখানো হতো মুক্তিযোদ্ধারা জয়লাভ করছে। আমি পাকিস্তানি মেজরের একটা ক্যারেক্টার করতাম। দেখানো হতো মুক্তিবাহিনী অ্যাম্বুস করে তাকে ধরছে। তখন সেই পুরো এলাকা জয়বাংলা স্লোগানে প্রকম্পিত হতো। আস্তে আস্তে শেষের দিকে যখন যুদ্ধটা সরাসরি হচ্ছে তখন আমরা যুদ্ধের মধ্যে ফিরে গেলাম বসির হাটে। ব দিয়ে নাম বদর তলায় একটা ক্যাম্প হলো। ক্যাম্প মানে তাঁবু খড়ের উপরে একটা কম্বল তার মধ্যে থাকা একটা প্লেট একটা মগ ওইটা দিয়ে লাইন ধরে খাওয়ার নেওয়া ওখান থেকে অস্ত্র চালনা শেখা, কী করে কী করতে হবে, কোন দিকে যেতে হবে, রেকি কী ? রিকভারি ইউনিট কী ? এই বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং আমরা করতাম।

মাসুদুজ্জামান : মুক্তিযুদ্ধের পর কি ঢাকায় চলে এলেন ? ঢাকায় আসার পর কি নিয়মিত নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত হলেন ? ওই সময়ে নাট্যচর্চায় কি আপনাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ?

তারিক আনাম খান : মুক্তিযুদ্ধের পরে আমি বাংলাদেশে চলে আসি, দেশ স্বাধীন হলো আমার মেজবোনের হাজব্যান্ড মারা গিয়েছিল। উনি ছিলেন রেডিওর প্রোগ্রাম অর্গানাইজার। রংপুরে পোস্টিং ছিল। পাকিস্তান আর্মি মেরে ফেলে ওখানে। আমার বোনের দুইজন সন্তান। ওদের কে দেখবে। আমি যেহেতু বাড়ির বড়ো ছেলে আমাকে বলল ওদের দেখাশোনা করতে পাশাপাশি পড়াশোনাও করতে হবে। ইচ্ছে ছিল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবো কিন্তু সেটা তো আর সেই সময়ের পরিবেশের কারণে পারলাম না। চলে এলাম ঢাকায় এবং বোনের সঙ্গে থাকলাম। ৭৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রেগুলার ঢাকায় থাকি। জীবিকার প্রয়োজনে ওইসময় রেডিওতে চাকরি করেছি। কিন্তু মাথার মধ্যে রয়েছে নাটক- ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে তখন শুরু হয়ে গেছে নাট্যান্দোলন। এর আগে যখন বললাম যে সাতক্ষীরায় ‘কল্লোল’ এবং ‘কোড়ক’-এ কাজ করতাম তখন কিন্তু আমরা প্রচ- ডিসিপ্লিনভাবে চর্চা করতাম। প্রতিদিন সকালে উঠে ব্যায়াম করতাম। কে যেন বুঝিয়েছিল, নাটক করতে গেলে শক্তি দরকার, দম দরকার। নাট্যচর্চায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আরো একটি এক্সপোজার ছিল সেটা হচ্ছে খুব বেতার-নাটক শুনতাম। শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, অজিতেষ বন্দ্যোপাধ্যায় বা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র- রেডিওতে এঁদের কণ্ঠাভিনয় শোনার মাধ্যমে কানকে তৈরি করতে সাহায্য করেছে। সেই সময় নেফা সুন্দরী, রাজা ইডিপাস শুনেছি রেডিওতে হচ্ছে, আরও অনুবাদ নাটক মানে রূপান্তরিত নাটক হচ্ছে। একটা নাটক শুনে পরের দিন আমার নিজেদের মধ্যে বিশ্লেষণ করতাম ওমুক অভিনয়টা দেখেছিস কি করেছে ওই জায়াগাটা কান্নাটা এরকম ভাঙা এরকম ভয়েজ ব্যবহার করেছে এই করেছে, এই শিক্ষাটা খুব প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের আগে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের নাটক শুনতাম। তখন আমাদের কাছে গোলাম মুস্তাফা, আজমেরি জামান, সৈয়দ হাসান ইমাম তারপর সিরাজুল ইসলাম, কাফী খান, শওকত আকবর এদের নামগুলো কিন্তু আমাদের কাছে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে গোলাম মুস্তাফার অভিনয়, তাঁর উচ্চারণের খুব ভক্ত ছিলাম। তারপর স্বাধীনতার পরবর্তীসময়ে এসে নিজেরা একটা কাজ করার চেষ্টা করলাম। প্রথমে ‘রূপান্তর’ বলে একটা দল করেছিলাম, এর উদ্যোক্তা ছিলেন রায়হান গফুর। উনি ঢাকায় এসেছিলেন ওনার সঙ্গে কাজ করলাম। তখন ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে নাটক হচ্ছে, মামুন ভাইরা করছেন, মামুন ভাইয়ের সঙ্গে কিন্তু আমার যোগাযোগ হয়েছিল ‘আরণ্যকে’- আমি কিন্তু একসময় কাজ করেছিলাম সেখানে। যেহেতু ‘আরণ্যক’ একটু বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে মানে আন্দোলন বৈষম্য মুক্তি সাম্য এগুলো নিয়ে কাজ করত, তাদের সঙ্গে আমাদের একটা রাজনৈতিক দর্শনগত মিল ছিল। আমি এখনো মনে করি যে, বিশেষ করে থিয়েটারের ক্ষেত্রে রাজনীতিটা খুব খুব সংশ্লিষ্ট, মানে সেখানে সমাজ পরিবর্তন সেটা বিপ্লব বিদ্রোহ সমালোচনা যাই বলা হোক-না-কেন, থাকা উচিত।

৭৩ থেকে ৭৬ পর্যন্ত এসে কিন্তু আামি বিচ্ছিন্নভাবে নাটক করেছি। ‘নাটক’ বলে একটা গ্রুপ ছিল কমলাপুরের দিকে, ওদের সাথে কাজ করলাম কিছুদিন। তারপরে ‘কথক’ বলে একটা দল ছিল সেখানে আমিরুল হক চৌধুরী, আলিমুজ্জামান দুলু [মারা গেছেন], ওদের সঙ্গে মিলে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটকে কাজ করলাম। তখন নিয়মিত নাট্যচর্চার একটা জায়গা তৈরি হচ্ছিল। শিল্পকলা একাডেমি তখন তো হয়নি, ‘বাংলাদেশ আর্ট কাউন্সিল’ ছিল। পরে অবশ্য শিল্পকলা একাডেমি বিল এলো। ‘কথক’ দলের সাথে যখন কাজ শুরু করলাম, তখন আর্ট কাউন্সিলে নাটকের রিহার্সাল করতাম। ‘নাটক’ নামে যে সংগঠনটা ছিল, ওখানে যে নাটকটা করেছিলাম তার নাম হলো ‘নিহত সংলাপ’। এটা করলাম শিল্পকলা একাডেমির নাট্য-উৎসবে। ততদিনে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

মাসুদুজ্জামান : এই সময়ই তো আপনি দিল্লিতে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়তে গেলেন ? কী ভাবনা কাজ করেছিল এর পেছনে ?

তারিক আনাম খান- আসলে আমার ইচ্ছে ছিল অভিনয় নিয়ে পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পড়তে যাব। আমার বড়ো ভাই সাইদুল আনাম টুটুল পড়তে গিয়েছিল সেখানে। মনে হলো ফিল্ম অ্যাকটিংটা শিখব- কী যেন মনে হলো জাস্ট কী হবে জীবনে, বাড়িতে সবাই বলত চাকরি করো। পুরো জীবন সামনে কী করবা থিয়েটার নাটক অভিনয় করে, এগুলো খুব রিস্কি। কী করবো! সৈয়দ হাসান ইমাম সাহেব তখন সংশ্লিষ্ট ছিলেন পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটের বৃত্তি প্রদান প্রক্রিয়ার সাথে। তখনই ভাবছিলাম যে আমি যাব পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটে- তাই এই ব্যাপারে আমি ওনার সঙ্গে দেখা করি আমার এক পরিচিত জনের মাধ্যমে। উনি আমার চাচাকে চিনতেন, তাই উনি শুনেটুনে বললেন, কিন্তু পুনাতে তো এখন অ্যাকটিংয়ের কোর্স তুলে দিয়েছে। তুমি এক কাজ করো না দিল্লি যাও ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা আছে। আর ওখানে একজন লোক আছে ইব্রাহিম আল কাজী একদম মানুষ করে দেবে। সেটা আমার কানে এখনো বাজে। আমি ভাবি, থিয়েটার নিয়ে পড়তে যাব! কী হবে না হবে ? আবার ভাবি যে এখানেই-বা কী করব- ছোটো একটা চাকরি করব, কী হবে।

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ইন্টারভিউ হলো শিল্পকলা একাডেমিতে। ইন্টারভিউতে সৈয়দ হাসান ইমাম ছিলেন, ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন সিরাজুল ইসলাম তখন বোধহয় শিল্পকলা একাডেমির ডিজি, তো উনি ওনার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিল বোর্ডে। আমরা ইন্টারভিউ দিলাম। ইন্টারভিউতে কিছু করে দেখাতে বলে বলল, কবিতা পড়তে পারো ? তো আমার মনে আছে রবীন্দ্রনাথের ঝুলন কবিতাটি পড়েছিলাম আমি। ইন্টারভিউ শেষে চলে এলাম জানি না কী হয়েছে ? ওখানে আমাদের সঙ্গে খ. ম. হারুন ভাই। ওনার সঙ্গে একদিন নিউমার্কেটে দেখা, বললেন আপনি ওমুক না ? আপনার তো হয়ে গেছে। তখন গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম আমার হয়েছে। মিনিস্ট্রি থেকে একটা চিঠি লিখে নিলো তিন বছর পরে আপনাদের ফিরে আসতে হবে এবং সরকারি চাকরি করতে হবে। তখন মনে হলো ফিরে আসার পর সরকারি চাকরি একটা হবেটবে। তাই চলে গেলাম। তো আমার মনে হয় যে, সেটা আমার জীবনের জন্য একটা খুব ভাইটাল ডিসিশন ছিল। এর ফলে আমার জীবনের মুখ্য আকাক্সক্ষার উন্মেষ পুরোটাই পরিবর্তন হয়ে গেল।

মাসুদুজ্জামান : দিল্লি থেকে ফিরে এসে কীভাবে কাজ শুরু করলেন ?

তারিক আনাম খান- তবে, ফিরে আসার পর অনেক কষ্ট হয়েছে। কাজ নাই কিচ্ছু নাই। সে অনেক কষ্টের কাহিনি। আজিমপুরে থাকতাম ওখান থেকে হেঁটে মহিলা সমিতি যাচ্ছি বা অন্য কোথাও যাচ্ছি। সামান্য বাস ভাড়া সেটুকুও সংগ্রহ করা মুশকিল। চাকরিবাকরি করছি না মাঝে মাঝে দু’-একটা ওয়ার্কশপ করি খুব সামান্য টাকা, তাও দেয় দেয় না এরকম। এরপরে আলী যাকের সাহেবের সঙ্গে দেখা, আগেই পরিচয় ছিল, সামান্য পরিচয়। উনি বললেন আসো গ্রুপে, আমি বললাম দেখি, আমি আপনারা তো প্রতিষ্ঠিত গ্রুপ, অন্যভাবে কাজ করা যায় কিনা দেখি। এইসময় একদিন মামুন ভাই, আব্দুল্লাহ আল মামুন বললেন কী করছ ? দলে আসো আমরা ওথেলো করব বলে ভাবছি। বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমরা তো এতদিন দেশি নাটক করেছি, ওথোলোটা আমাদের করতে হবে। কেননা, মুনীর চৌধুরীকে আমরা মানি। কবীর স্যারের অনুবাদ আছে ওথোলোটা করতে চাই। বিশেষ করে বললেন যে, টেকনিক্যালি তোমরা শিখেটিখে এসেছ। এরকম দু’-একজনের কাছ থেকে আমি উৎসাহ পেয়েছিলাম- মানে বিশেষ করে আলী যাকের, আব্দুল্লাহ আল মামুন। উনি আমাকে টেলিভিশন নাটকের ব্যাপারেও বললেন। আমি তো অডিশন দিয়ে পাশ করেছি ৭৬ খ্রিষ্টাব্দে। অডিশন দিয়ে পাশ করেছি আমি চিঠি পেয়েছি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে গিয়ে। মামুন ভাই ?খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন তুমি টেলিভিশনে নাটক করো।

আমি তখন সিনেমায় অভিনয় করতে শুরু করেছি দিল্লি থেকে আসার পরে। প্রথম ছবি করি সৈয়দ হাসান ইমামের সঙ্গে ‘লাল সবুজের পালা’। সৈয়দ হাসান ইমামের ছবি করে ফেলেছি- করবী নায়িকা, সুচরিতা ছিলেন, আসাদ, সুবর্ণা, হাসান ভাই নিজে ছিলেন। ঘুড্ডি করলাম সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকির। আসাদের সঙ্গে, সুবর্ণার সঙ্গে তখন পরিচয় হয়।

এইভাবে চলতে চলতে ৮০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তখন এই থিয়েটারে জয়েন করি। ইতোমধ্যে টেলিভিশনে কয়েকটি নাটক করেছি। মামুন ভাই বললেন, তুমি আমার টিভিনাটকে অভিনয় করবে। থিয়েটারে জয়েন করলাম। প্রথম দিকে তো আমি টেকনিক্যালি কাজ করব ওথেলোর সঙ্গে, হবে কি হবে না- কঠিন নাটক আর ওনারা তো ঠিক এটাতে এক্সপোজড না। এসময়ে সৈয়দ হায়দার রিজভী [কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন] এলেন পোল্যান্ড থেকে। উনি বিটিভির প্রডিউসার ছিলেন। ছুটি নিয়ে পোল্যান্ড গিয়েছিলেন ফিল্মের কোর্স করতে, তিনবছরের জন্য। যেহেতু নিউ স্পিরিটেড, তাই আমাদের দেখে ওনার ভালো লাগল, মামুন ভাইকে বললেন, আপনি নতুনদের নিয়ে কিছু করেন না কেন ? কথাটা আমার এখনো কানে বাজে। তারপর মামুন ভাই আমাদের নিয়ে কাজ শুরু করলেন। প্রথম দিকে আমার পাঠ ছিল একটা সোলজারের। তারপরে একটা পাঠ হলো ‘প্রতিহারী’ বলে একটা ক্যারেক্টারের, সেকেন্ড সিনে ছিল। ওই খানে একটা ডায়লগ ছিল আমার। লম্বা টম্বা ছিলাম বলে আমাকে সোলজারের পাটই দিত আরকি। দিল্লিতে থাকতে তো নাটকে লাইট করতাম। অভিনয়ও করেছি আমি। মূল্যায়নে বেস্ট অলরাউন্ডার অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছি। ১৯৭৯-তে যখন ফিরে আসি, তখন লাস্ট পরীক্ষায় আমি ফার্স্টও হই। এইসময় আমার দিল্লিতে ও কলকাতায় নাটকের চাকরিও হয়ে গিয়েছিল। দিল্লিতে কোর্স শেষে ওরা ফেলোশিপ দেয়। ছয় মাসের ফেলোশিপ স্টাইপেন্ডসহ। আমিও পেলাম যেহেতু রেজাল্ট ভালো ছিল। কিন্তু আমি বললাম না, যদি থিয়েটার করতে চাই তাহলে দেশে করাই বেটার। আমি আবার ওখানে যাব আবার ফিরব। আজকে যে অবস্থা এটা বুঝলে তখন ফিরতাম না হয়ত। ফিরে আসার পরে ওখানে আবার একটা উইং হলো চিলড্রেন্স থিয়েটার উইং। সেখানেও বলল এসে জয়েন করো, কাজ করো। আমি বললাম, না। তখন রুদ্রদা মানে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক। রুদ্রদা বললেন, আমরা ‘থিয়েটার ফর ডেভেলপমেন্ট’ নামে একটা এনজিও করেছি, বস্তি থেকে শুরু করে মানুষের উন্নয়নে থিয়েটার নিয়ে কাজ করব, তুই আয়। বলেছি, আমি যাব না। এর আগে নান্দিকারে ওয়ার্কশপ করিয়েছি কিন্তু সেখান থেকে নান্দিকারের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়েছিল। উনি চাইতেন আমি ‘নান্দিকারে’ও কাজ করি। তো সেই সময়ে আমি দেখা করলাম। তারপর বললাম, না রুদ্র দা, আমি আসলে নিজের দেশেই যা কিছু করার করব। আমার এখনো মনে পড়ে, উনি একটা বই দিয়েছিল আমাকে ওনার লেখা। বইটার মধ্যে লেখা ছিল ‘পুনরাগমনচ’! রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর সই করা। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাংলাদেশে থাকব, কাজ করব। যা সংগ্রাম এখানেই। থিয়েটারে কাজ শুরু করলাম, শুরু হলো ওথেলোর রিহার্সাল। সোলজার ও প্রতিহারীর রিহার্সাল চলছে, একদিন হলো কি একটা চরিত্র ছিলো মন্টানোর। সোর্ড ফাইট ছিল আমরা শিখেটিখে এসেছি। মামুন ভাই বললেন, ও করুক। এরপর হঠাৎ একদিন কাস্টিং ফাইনাল হলো, আমি ওথেলো। ডেসডিমোনা হচ্ছে তারানা হালিম। কিছুদিন পরে অবশ্য তারানা চলে যায় তখন ফেরদৌসি ভাবি করতেন ডেসডিমোনা। এর মাধ্যমেই আমার নিয়মিত মঞ্চে ঢোকা। এই করেই থিয়েটারের সঙ্গে পথচলা শুরু। প্রথমে গিয়েছিলাম থিয়েটারের সঙ্গে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নিয়ে ন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট আইটিআই-এর একটা আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে, সিউলে। আমি গিয়েছিলাম লাইট এবং সেট কীভাবে কী হবে মানে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে গিয়েছিলাম একাশি খ্রিষ্টাব্দে। এর পাশাপাশি আমি মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গেও কাজ করতে শুরু করেছি। তার কালচারাল টিমের সঙ্গে আমি হংকং ব্যাংকক, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান কান্ট্রিজ সুইডেন, ডেনমার্কেও শো করতে গিয়েছি টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে। তখন লাইট করতাম বঙ্গভবনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। এগুলো কিন্তু পথ চলতে সাহায্য করেছে, অর্থ উপার্জন ও অন্যান্য দিকে। এইভাবেই ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে আট বছরের মতো আমি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তারপরে নিজের দল তৈরি করা- মনে হলো যে আমরা একটু অন্যভাবে কাজ করি। তখন থেকেই নাট্যকেন্দ্রের জন্ম হয়।

মাসুদুজ্জামান : নাট্যকেন্দ্রের জন্ম এবং প্রথম প্রযোজনা সম্পর্কে কথা যদি বলেন-

তারিক আনাম খান- নাট্যকেন্দ্র’র যাত্রা শুরু হয় ১১ অক্টোবর ১৯৯০। তখন এরশাদ/স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ১১ অক্টোবরের আগের দিন জিহাদ শহিদ হয়েছিল। পরের দিন সারাদেশে হরতাল আধাবেলা। ওইদিন করব কি করব না, নতুন দল এক্সপোজ হবে, সবার মধ্যে উত্তেজনা। আফজাল আমাদের লোগো করে দিয়েছে, কাউকে কিন্তু বলিনি দলের নাম কী হবে। নামটা দিয়েছিলেন আলী যাকের সাহেব, ‘নাট্যকেন্দ্র’। ওই লোভে যে, সব নাটকের দলের কেন্দ্র হয়ে উঠবে এরকম একটা মানে আরকি। যাতে প্রফেশনাল থিয়েটার স্পিরিট থাকবে। আমাদের দলের কাজের ধরনটাই হচ্ছে যে, নতুনদের ইন্টারভিউ হবে, সেখান থেকে বাছাই হবে, তারপর ওয়ার্কশপ করবে, এরপর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়ে দলে আসবে কাজ করবে। অর্থাৎ একটা এডুকেশনাল স্পিরিট থেকে পুরোটা দেখা হবে। তখন সাথে তৌকির আহমেদ, ঝুনা চৌধুরী ও মেঘনা ছিল। পরবর্তীসময়ে ওয়ার্কশপ শেষ করে জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিমসহ আরো অনেকেই যুক্ত হলো। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় জার্মান কালচারাল সেন্টারে দলের শুভ সূচনা হলো, আমরা তখন কোনো নাটকের ঘোষণা দিইনি। প্রথমে আমরা ভাবছিলাম যে, সৈয়দ শামসুল হকের ‘জুলিয়াস সিজার’র একটা রূপান্তর আছে, ‘গণনায়ক’ এবং আর একটা মাথার মধ্যে ছিল আর্থার মিলারের ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’, যেটা ফতেহ লোহানীর অনুবাদ- ‘একজন ফেরিওয়ালার মৃত্যু’। মানে আমরা একটু সিরিয়াস টাইপের নাটকের দিকে ঝুঁকেছিলাম। পরে দলে বসে সবাই মিলে একদিন পড়লাম ‘বিচ্ছু’। সবাই খুব যারা বিশেষ করে তরুণ তারা উৎসাহী হয়ে বলল, এইটা করি, এইটা করি। তারপরে ‘বিচ্ছু’ করলাম আমরা। মলিয়্যেরের ‘দ্য স্ক্রাউন্ডেল স্ক্যাপি’র রূপান্তর- ‘বিচ্ছু’ মঞ্চে আনলাম। পরে ‘বিচ্ছু’ এমন পরিমন্ডণে প্রসংশিত ও জনপ্রিয় হলো যে, আমরা শো করে কূল পেতাম না। আমার মনে আছে, সেই সময় যখন কেবল ‘মহিলা সমিতি’ ও ‘গাইড হাউজ’ মঞ্চ ছিল, দুই মাসে আমরা ১৯টি শো করেছি। আর ওই বছরই ১১ অক্টোবর প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে ৫০তম মঞ্চায়ন করি আমরা। গড়ে প্রতিমাসে তখন ৫ টার মতো করে শো করেছি।

মাসুদুজ্জামান : নাট্যকেন্দ্রের আগে আপনি বেশ কিছু নাটক রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়েছেন। সেগুলোও বাংলাদেশের জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম, সেই বিষয়ে যদি একটু বলেন-

তারিক আনাম খান- ও হ্যাঁ। আমাদের ইচ্ছে ছিল যে, আমরা একটা প্রফেশনাল থিয়েটার করব। আমি সৈয়দ জামিল আহমেদ, খ. ম. হারুন ঢুকে গেছে বিটিভির প্রডিউসার হিসেবে। খ্রিষ্টাব্দেক করবে করবে বলে ভাবছে। তো আমরা প্রথমে একটা অনুবাদ ও রূপান্তর করতে শুরু করলাম। জামিল নির্দেশনা দেবে, নিকোলাই গোগলের ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’। নাটকের এসেন্সটা আধুনিক, সোশ্যাল রিলেভেন্স যেমন আছে, আমলাতন্ত্র এবং সেটার ব্যবহারও আছে, সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর কমেডি। থিয়েটার করে রুটি রুজি হবে। এই লক্ষ্যেই কিন্তু আমরা এই নাটকটার কাজ শুরু করি। কেননা, দীর্ঘদিন করা যাবে। মানুষ একসেপ্টও করবে। খ্রিষ্টাব্দেকের মোহাম্মদপুরের বাসায় বসে আমি আর জামিল মিলে রূপান্তরের কাজ করতাম। এটা আমার জন্য বড়ো শিক্ষা ছিল। এর মধ্যে খ্রিষ্টাব্দেকও বিটিভিতে জয়েন করল, কাজটা এগলো না। জামিলও বলে থাক, বাদ দিই। এরমধ্যে আমি বিএ পরীক্ষা দিয়ে পাশ করি। টুকটাক ফ্রিল্যান্স করছি। কিন্তু মাথার মধ্যে আছে যে প্রফেশনাল থিয়েটার করব। কিছুদিন পরে যখন কামালউদ্দিন নীলু, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, কামরুজ্জামান রুনু এনএসডি থেকে ফিরে এলো। তখন সবাই মিলে ভাবলাম, কী করা যায়। হোয়াই নট টেক মলিয়্যের। আমার এখনো মনে আছে, মলিয়্যেরের মাইজার আমি রূপান্তর করতে শুরু করি, জামিলের তত্ত্ববাবধানে, ও-ই ডিরেকশন দেবে। আমরা কমেডিই করব এবং বিভিন্ন জায়গায় শো করে বেড়াবো। আলিয়ঁস ফ্রসেজ-এর সঙ্গে কথা বললাম, আমাদের সাহায্য দরকার, যেহেতু মলিয়্যের ফ্রান্সের, ওরা বলল, ঠিক আছে তোমরা করো আমরা কিছুটা হলেও আছি। এরমধ্যে আমি পুরোটা রূপান্তর করে ফেললাম। জামিল গাইড করত আমি টিএসসির উপরে দোতলায় একটা রুমের মধ্যে বসে অনুবাদ করতাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তখন আন্তঃহল নাট্যোৎসব চলছে। প্রত্যেকেই আবার ওখানে যুক্ত হলো ডিরেকশন ও টেকনিক্যাল কাজ করে সেখানে কিছু পয়সাকড়ি পাওয়া যায়। অনেকেই কাজ করল, নীলু করল, জামিল তো করেইছে। আমিও যুক্ত হলাম এস এম সোলায়মানের লেখা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার ‘ইলেকশন ক্যারিকেচার’ নাটকটা নিয়ে। ফজলুল হক হলের হয়ে নাটকটা মঞ্চায়ন হয়েছিল, আমি নির্দেশনা দিলাম। এর মধ্যে আমরা মানে নীলু, ভাস্বর, খ্রিষ্টাব্দেক, নূপুর, মুন্নী সব এনএসডিয়ান মিলে একটা দলের পরিকল্পনা করলাম নাম দিলাম, ‘নাট্যদল’। এই দলের লোগো ডিজাইন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। এখনো মনে আছে, একটা ফ্রেমের মধ্যে জাস্ট একটা এক্সক্লামেশন/বিস্ময়বোধক চিহ্ন। নাট্যদল নাম দেওয়ার কারণ, যে বিভিন্ন দলের সদস্যদের নিয়েই প্রফেশনাল দল করব। এখান থেকেই মলিয়্যেরের মাইজার অবলম্বনে ‘কঞ্জুস’ করব। জামিল ডিরেকশন দেবে। রিহার্সাল শুরু করলাম। রিহার্সাল করতাম আলিয়ঁস ফ্রাসেজ-এ সকাল বেলায়। কথা ছিল আলিয়ঁস ফ্রাসেজ আমাদের কিছু টাকা দেবে প্রাথমিকভাবে এবং রিহার্সালের স্পেস দিবে। একটা মলিয়্যের ফেস্টিভ্যালও করেছিলাম সে-সময়, মলিয়্যেরের জীবনী নিয়ে। তখন আলিয়ঁস ফ্রাসেজ-এর ডিরেক্টর ছিলেন প্যাট্রিক ফস্টাস। ফিলিপ বলে একজন ছিল কালচারাল অফিসার ফ্রেঞ্চ এম্বাসির। এরই মধ্যে জামিল ‘নান্দিকারে’ আবার একটা সেট করতে চলে গেল। পরে সবাই মিলে ডিসিশন নিলো কামালউদ্দিন নীলুই ডিরেকশন দেবে। নূপুর, খ্রিষ্টাব্দেক, লিয়াকত আলী লাকিও ছিল। সেটা তার প্রথম এক্সপোজার মঞ্চনাটকের। প্রথম শো হয়েছিল আলিয়ঁস ফ্রাসেজ-এর উদ্যোগে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে। ওইখানে সৈয়দ আলী আহসান অতিথি ছিলেন। আরও অতিথি হিসেবে এসেছিলেন ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাসেডর। প্রথমে উনি কথাবার্তা বলে চলে যাবেন নাটকটা একটু দেখে। কিন্তু নাটকটা প্রথম থেকেই কমেডি এবং ওই স্পিরিটে ধরার পরে একদম হিলারিয়াস হিসেবে মানুষ খুব এনজয় করল এবং এলিট অব দ্য সোসাইটি ইনভাইটেড ছিল। আমি করেছিলাম মাইজারের ক্যারেকটার, হায়দার আলী। ফ্রেঞ্চ এ্যাম্বাসেডরের একটা ডিনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। উনি বাংলা বোঝেন না কিন্তু দর্শকের পালস, অভিনয় দেখে উনি ওনার সেক্রেটারিকে বলেছিলেন, ডিনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করতে, নাটকটা পুরো দেখে তারপর যাবেন। তিনি নাটকটা দেখে খুব খুশি হয়ে পরবর্তীসময়ে আমাদের সম্মানে একটা পার্টিও দেন। আলিয়ঁস ফ্রাসেজের স্পন্সরে বিভিন্ন জায়গায় আমরা কল শো করব। চট্টগ্রামে আমরা দুটো শো করেছিলাম, শিল্পকলা একাডেমির অডিটরিয়ামে হয়েছিল। বগুড়ায় বোধহয় করেছিলাম। আমাদের ইচ্ছা ছিল এটাকে আমরা প্রফেশনাল থিয়েটারে রূপ দেব। তারপর ওরা ‘কঞ্জুস’ নাটকটা বই হিসেবে প্রকাশ করে। আমি থিয়েটারে যখন ঢুকি তখন বলেছিলাম যে, আমাদের ‘নাট্যদল’ একটা প্রফেশনাল থিয়েটার, আমাকে কিন্তু ঐটাতে কাজ করার অনুমতি দিতে হবে।

মাসুদুজ্জামান : আপনি অভিনয় করেন, নির্দেশনা এবং নাট্যরূপও দিয়েছেন। আপনার খ্যাতিও অভিনেতা হিসেবে। আসলে কোন কাজটা সবচাইতে বেশি পছন্দ করেন। মানে মনে করেন এইটাই আমার মূল কাজ।

তারিক আনাম খান- যেকোনো ধরনের ক্রিয়েটিভ কাজই আমাকে খুব ইন্সপায়ার করে। আমি যখন লাইট করি তখন লাইটের যে চলমানতা আছে, সেটাকে খুব উপভোগ করি। আমি টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে সরকারি সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে লাইট করেছি। আমি মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে কাজ করে নতুনভাবে লাইটটাকে বুঝতে শিখেছি। ওনার পায়ের কাছে বসে থেকেই আসলে শিল্পের ভাবনাগুলো আমার মধ্যে নতুনভাবে সঞ্চারিত হয়েছে। যদি লিখতে বসি তবে আমি খুবই ডেসপারেট হয়েই লিখতে বসব এবং সেটার মধ্য থেকেই আনন্দ নেব। তবে, যদি বলি এসবের মধ্য থেকে আমাকে কোনটা বেশি টানে, তাহলে বলব এখনো অভিনয় করতে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত বোধ করি। অনেক বেশি চার্জড মনে হয়, প্রতিনিয়ত অনেক বেশি সৃষ্টিশীল জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করি। সার্বক্ষণিকভাবে চিন্তা করি কোনভাবে করব, কীভাবে করি। একটি ভালো চলচিত্র কিংবা একটি ওয়েব সিরিজ বা একটি টেলিভিশন নাটকে যখন ঠিকঠাক মতো চরিত্র পাই তখনই মনের মধ্যে চ্যালেঞ্জ আসে। ইন্সপায়ার্ড হই প্রচ-। ডিরেকশনের কাজটাও খুব পছন্দ করি। তবে যদি বলতে হয় কোন দিকটা আমাকে সবচেয়ে উজ্জীবিত বা অনুপ্রাণিত করে তাহলে বলব, হয়ত অভিনয়। ডিরেকশন দিলেও কোন অসুবিধা নাই ফুললি চার্জড থাকি ডিরেকশনের কাজে। তখন হয়ত সারাদিন ভাবছি কীভাবে কী করা যায়। খেয়াল করে দেখলে বোঝা যাবে যে, আমার নির্দেশিত নাটকগুলোতে মূলত অভিনয়ের জায়গাটা আমি খুব বেশি ধরার চেষ্টা করি। সেটা ‘বিচ্ছু’ হোক, সেটা ‘তুঘলক’, ‘সুখ’, ‘জেরা’, ‘প্রজাপতি’, ‘ক্রুসিবল’, ‘আরজ চরিতামৃত’- যেটাই বলি না কেন, মনে হয় আমার সামনে কতগুলো চরিত্র আছে, তাদের বিভিন্ন ফিলোসফি আছে, তাদের বিভিন্ন মোটিভেশন আছে, তারা একেক জায়গাতে বিলং করে তাদের আন্তঃসম্পর্কের একটা জায়গা আছে। এগুলোকে কীভাবে সৃষ্টি করা যায়। ঐ জন্যে আমি, আমার রিহার্সালে আমি আজকে একরকম করলাম। কিন্তু কালকে আরেকটা নতুন আইডিয়া নিয়ে কী করে একজন অ্যাক্টরকে চ্যালেঞ্জ করা যায় বা অন্য একটা ভাবনা কীভাবে কাজ করা যায়। তখন মূলত আমি অভিনয়টাকেই ভিজ্যুয়ালাইজ করে সেটাকে একটা সুরে বেঁধে লাইট, সাউন্ড, কোরিওগ্রাফি, কস্টিউম সব মিলিয়ে ঐ মুহূর্তটাকে দৃশ্যমান করি। আমার মনে হয় আসলে নাটক হলো কতগুলো মুহূর্তের যোগ। আমি মনে করি, এটা অনেকটাই মালা তৈরি করার মতো একটা একটা ফুল দিয়ে গেঁথে পুরো একটা মালা তৈরি করা সুন্দর করে। তার জন্য অনেকগুলো উপাদান থাকে। তাই এখনো পর্যন্ত থিয়েটারের নির্দেশনায় আমি মূলত আমার অ্যাক্টরকেই দেখি।

মাসুদুজ্জামান : আপনি মঞ্চে বিভিন্ন কালজয়ী চরিত্র যেমন ওথেলো, তুঘলক, বিচ্ছুর চাঁদ সওদাগর বা ক্রুসিবলের জন প্রক্টর কিংবা টেলিভিশন ও চলচিত্রে নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেইসব চরিত্রের ডায়ালগ বা ম্যানারিজম জনপ্রিয় হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্র আলাদা আলাদা করে নির্মাণ করেছেন কীভাবে ? কোনো মেথড অবলম্বন করেন কি?

তারিক আনাম খান- এক তো হচ্ছে, আমার শুরু থেকেই মেথড স্কুলের মধ্য থেকেই আসা- সেখানে একটা ডিসিপ্লিন থাকতে হবে, পড়তে হবে- এমন নয়। এমন টেলিভিশন নাটক এখনো পর্যন্ত হয়নি। এখন তো প্যাকেজ অনেক বেশি খোলা। ক্যারেক্টার জানি না, স্ক্রিপ্ট জানি না, ইম্প্রোভাইজ হতে পারে। কিন্তু বেসিকটা আমার থাকতে হবে। আমার প্রস্তুতি থাকতে হবে যে, আগামীদিনে আমি কী করতে যাচ্ছি এবং সেটায় আমার পারপাসটা কী ? ওটাকে রক্তমাংসের শরীর দেওয়া একটা মানুষ রূপে তৈরি করা। অবশ্যই তার পেছনে নিজের পর্যবেক্ষণ, কল্পনা বিভিন্ন উপাদান মেশানো। আমি মনে করি, শিল্প আসলে স্বাভাবিক নয়, এটা একটা পারপাসফুল জায়গা। স্বাভাবিক মানুষের জীবনের চাহিদা মেটানোর জন্য। তাদের জীবনের ভালো দিকগুলোকে সুন্দর দিকগুলোকে উন্মোচিত করার জন্যে যেন তারা আনন্দের সঙ্গে পৃথিবীতে বাঁচতে পারে তার পরিবারের সঙ্গে। আমি যখন ‘বিচ্ছু’ করেছিলাম অনেক কিছুর মধ্যে আমার মনে হয়েছিল যে, এ নাটক দেখার পরে ‘মহিলা সমিতি’ বা ‘গাইড হাউজ’ থেকে শান্তিনগর মোড় পর্যন্ত কেউ রিকশা না নিক। একটা অদ্ভুত আনন্দ নিয়ে যেন সে এখান থেকে বেরোয় এবং বাড়িতে ফিরে তার মা বা তার স্ত্রী বা তার সন্তানকে একটা হাসিমুখে যেন আলিঙ্গন করে।

আমার যদি ওয়ার্কশপ থাকে কোনো একটা দলের সঙ্গে, আমি পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া কখনো ওয়ার্কশপে যাই না। জিজ্ঞেস করি, কারা আসছে নতুন কি না, তাদের এক্সপোজার কী, তোমরা কী চাও ? আমি বিশ্বাস করি, অনুশীলনটা হচ্ছে মূল। আমি এখনো যেকোনো নাটকের শুটিংয়ে এটলিস্ট আমার কো-অ্যাক্টরদের ডেকে বলি, আমরা একবার পড়ি এসো। তারপরে ভাবনা গুলো কী ? এই ভাবনাগুলোর বিস্তারটা আমার কাছে খুব ইম্পর্টেন্ট মনে হয়। আমার ভাবনাটা যেন থ্রু ক্যামেরা, থ্রু লেন্সেস, থ্রু এডিটিং দর্শকের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। হয়ত একটা সংলাপ খুব ড্রল করে বললাম একটা জায়গায় থামলাম তাকিয়ে থাকলাম, মাথা নামিয়ে নিলাম বা হঠাৎ একটা ধাক্কা দিলাম। ধরো একটা নাটক করলাম, যেখানে একজন লোক, জীবনে ভালো লাগছে না তার, সে পার্কের মধ্যে চলে গেছে গভীর রাতে। তো কয়েকটা ছিনতাইকারী এসে সব নিয়ে নেবে, জিজ্ঞেস করল, ‘চাচা মিয়া এতরাতে কই যান ?’ তো ডায়লগটা হয়ত ছিলো যে, জীবন অমুক তমুক জমুক ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি ওসব কিছু না বলে বললাম, ‘আত্মহত্যা করতে।’ এটা এত নির্লিপ্ত ও নন ড্রামাটিক্যালি বলা যে, দর্শকদের মধ্যে ধাক্কা লাগবে, একটা লোক এত সহজে আত্মহত্যার কথা বলতে পারে নাকি। নিজের মধ্যে একটা ভাবনার জায়গা লাগে, না হলে হয় না। সেটা আমি সবসময় মোটামুটি ওয়ার্ক আউট করেই যাই। হয়ত সেই কারণে কিছু ভেরিয়েশন হয়, হয়ত পুরোপুরি আহরণ করতে পারি না, কিন্তু সেটা হয়।

আমার ডিরেক্টরের সঙ্গে অন্তত যারা সিরিয়াস কাজ করে, চরিত্র নিয়ে আলোচনা করি, তাদের সেটে কিছু-না-কিছু মাথার মধ্যে না নিয়ে আমি যাই না। অনেক সময় আমার ইনপুটও দিই যে, এটাকে এইভাবে না করে ওইভাবে ভাবো না। এখানে ভাল লাগছে না গল্পটা এইভাবে। অনেক নাটক আছে, মনে হচ্ছে যে, করার জন্য করা- একটা হিরোকে যার ভিউ আছে, ভ্যালু আছে, তাকে নিয়েই ভাবা- আমি বলছি না এটা কোন জায়গায় পৌঁছুবে, কিন্তু আমি জানিয়ে ওখানে আমার কাজ করার কোনো ইন্সপিরেশন নাই বিশেষ কোনো জায়গা নেই সেটা আমি করবো না। আমার থিয়েটারের মধ্যেও যে বিশ্বাস নাউ অ্যান্ড হেয়ার- এখন এখানে। সেইটা ফিল্ম এবং নাটকের মধ্যেও ইট হ্যাজ টুবি ইমিডিয়েটলি, এখানেই। হয়ত আমাদের অভিজ্ঞতার কারণে এসে যায়, পারি।

মাসুদুজ্জামান : অভিনয়শিল্পী হিসেবে টেলিভিশন, ফিল্ম, নাকি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম- কোনটাকে আপনার বেশি সম্ভাবনার জায়গা বলে মনে হয় ? বর্তমানে কোন মাধ্যমে মানুষের কাছে বেশি পৌঁছানো যায় বলে মনে করেন-

তারিক আনাম খান : আমি যদি থিয়েটারের কথা দিয়ে শুরু করি, আমাদের দর্শক ঢাকা শহর ও আশপাশ মিলিয়ে কত হবে ? পাঁচ, দশ হাজার ? পনের বা বিশ হাজার! লম্বা টানা শো করলে তার বেশি দর্শক কিন্তু নাই। তবুও একটু অন্য ঘরানার মানুষগুলো কিন্তু করছে। যারা একটু ভাবনাচিন্তা করে সাহিত্য ও নানা কিছুই নিয়ে। পপুলার ট্রেন্ডেরও কাজ আছে থিয়েটারে, তাই বলে কি থিয়েটার পুরোনো হয়ে গেছে ? বাতিল হয়ে গেছে ? তা তো না। ফিল্ম একসময় খুব জায়গা নিয়ে ছিল। ফিল্মমানেই প্রফেশনাল, এখানে টাকার লগ্নি আছে। কিন্তু টিকল না। অদ্ভুত রকম মেলোড্রামা জনবিচ্ছিন্ন গল্প, মানুষগুলো অদ্ভুত চেনা যায় না। লাউড এন্টারটেইনমেন্ট যেটাকে আমি বলব, সময়ের সঙ্গে যদি না যাওয়া যায় তাহলে মুশকিল। একটা পর্যায়ে দেখা গেল আমাদের ফিল্মে একধরনের কাটপিস একটু অন্যধরনের সুড়সুড়ি টাইপের জিনিসপত্র, সেটাও টিকল না। টেলিভিশননাটক আমাদের এখানে খুব উজ্জ্বলভাবে শুরু হয়েছে। আমি বলব, বিটিভির কথা। ‘সংশপ্তক’ থেকে শুরু করে ‘মাটির কোলে’, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত পার্ল এস বাকের ‘গুড আর্থ’ অবলম্বনে ‘মাটির কোলে’। ও হেনরির নাটক হয়েছে এখানে। ম্যাক্সিম গোর্কি থেকে শুরু চেখভ হয়েছে। একসময় ইউজেন ইয়োনেস্কো, পিরান দেল্লো, মলিয়্যের-এর নাটক করেছি। ‘বারোরকম মানুষ’র মতো গল্প তৈরি করেছি আমরা। আমরা তথাপি করেছি যেখানে সেই সময় এয়ারপোর্ট দিয়ে কীভাবে চোরাচালান হয় গডফাদার র‌্যাকেটটা কী ? ভালো ভালো লেখকদের গল্প-উপন্যাস নিয়ে নাট্যরূপ দিয়ে কাজ হয়েছে। আব্দুস শাকুরের, শওকত আলীর গদ্য নিয়ে কাজ হয়েছে। আরও এই যে সাহিত্যের সঙ্গে যোগ এবং নাটকগুলো বা হুমায়ূন আহমেদের নাটকগুলো যদি তুমি বলো ছোটো ছোটো মোমেন্টস তৈরি করে মানুষের মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন, দুঃখ-বেদনা নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’। যখনই কমার্শিয়াল হয়ে গেল তখনই কিন্তু আস্তে আস্তে জায়গাটা আমরা হারিয়ে ফেললাম। ওটিটি ইজ আ নিউ কনসেপ্ট। ওটিটি বাংলাদেশে শুরুটা ভালো হয়েছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে আবার একটু কোথাও জানি ঢিলা হচ্ছে। অন্যরকম ফিল্মের একটা জায়গা দেখা যাচ্ছিল। কোন অডিয়েন্সকে টার্গেট করছ কারা দেখবে মার্কেটিং, পাবলিসিটি, সিনেপ্লেক্স অনেক কিছুই আছে। আবার এটাও অস্বীকার করা যাবে না শাকিব খানের একটা অডিয়েন্স আছে। টিপিক্যাল সুন্দর নাচ-গান এরকমও অনেক দর্শক দেখতে চায়। এটাকে আমি বলব না যে ফেলে দেওয়ার মতো। টেলিভিশনের গতি আমরা এখানে হারিয়ে ফেলেছি। সারাপৃথিবীতে টেলিভিশন তো সক্রিয়। কন্টেন্টে যে জায়গাটা ধরার কথা ছিল সেটা হচ্ছে ডেইলি সোপ বা সিরিয়াল সেগুলোর বেলায় আমরা ফেল করেছি। কিন্তু অন্যান্য জায়গায় তো আছে। এরকম বহু সিরিয়াল আছে। কোথাও গিয়ে যেন আমার মনে হয় আমরা একটু উপরে উপরে হয়ে গেছি। আবারও বোধহয় ওই লোকগুলোকে দরকার- একটু সাহিত্যজীবন সমাজ এগুলোর মধ্যে ইনডেপথ ঢোকাটা খুব দরকার বলে আমার মনে হয়। শিক্ষার জায়গাটা এখনো খুব জরুরি মনে হয় আমার কাছে।

মাসুদুজ্জামান : আপনার কখনো কি মনে হয়েছে যে, এই চরিত্রটা আমি করি নাই বা এই চরিত্রটা যদি করতে পারতাম বা করবো। বা কোন বিশেষ কোন চরিত্রের কথা মনে পড়ে? যেটা করতে চান।

তারিক আনাম খান- ঠিক ওইরকম নয়। কিন্তু যখন বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকাই তখন দেখি, আমরা মানে আমাদের যাদের একটু বয়স হয়েছে তাদের নিয়ে পৃথিবীতে প্রচুর কাজ হয়েছে বিভিন্ন ধরনের। ধরো দ্য ফাদার বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা অ্যান্থনি হপকিনস অস্কার পেলেন। একেবারেই তার ওপর চরিত্রটা করা ডিমেনশিয়া আছে ইল্যুশন তৈরি হয় এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের এখানে অনুপস্থিত। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশের কথাও ভাবি, কারও সাথে তুলনা করছি না, আমি একজন ক্ষুদ্র অভিনেতা সেসব লোকজনের তুলনায়। সেখানে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে যে-ধরণের কাজগুলো হয় বা আরও আরও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রচুর অভিনেতারা আছে, যাদের নিয়ে কাজ হচ্ছে। ধরো আল-পাচিনোর কথা- সব নাম মনে থাকে না। এদের নিয়ে প্রচুর কাজ হচ্ছে। তাই মনের মধ্যে আছে যে একটু যদি কাজ হতো আমি আমার একার কথা বলছি না। আমাদের এখানেও অনেক অভিনেতা আছে, যেমন আলী যাকেরের কথাই বলি। ভালো অভিনেতার যেসব গুণাবলি তা সবই তার ছিল। তিনি খুব সিরিয়াস অ্যাক্টর। তাকে নিয়ে কয়টা কাজ হয়েছে ? থিয়েটারে তিনি মহীরুহ এ ব্যাপারে অস্বীকার করা যায় না। আমাদের আসাদুজ্জামান নূরকে নিয়ে কয়টা কাজ হয়েছে। আরও যদি বলি আমাদের হুমায়ূন ফরীদি তো মারাই গেল খুব সাধারণ বাণিজ্যিক ছবি করে। হুমায়ূন ফরীদির মতো অ্যাক্টরকে নিয়ে মনে রাখার মতো কোনো কাজ ফিল্ম বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে কয়টা হয়েছে! এই ক্ষোভ ঠিক ক্ষোভ না, কষ্টটা আছে। বহুদিন ধরে ভাবছিলাম মঞ্চে আমি তুঘলকটা আবার করব। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে গেলাম। এই ধরণের চরিত্রগুলো ক্লাসিক হয়ে আছে এগুলোর জন্য অভিনেতার একধরনের আকাক্সক্ষা থাকে। আমাদের এখানে ফিল্ম বা ওটিটিতে যদি চ্যালেঞ্জ নিয়ে এ ধরনের বড়ো কাজ হতো তাহলে ভালো হতো।

মাসুদুজ্জামান : আপনি অনেকদিন বিজ্ঞাপন বানিয়েছেন এবং অনেক ভালো ভালো বিজ্ঞাপন আপনার হাত দিয়ে হয়েছে, বিজ্ঞাপনটা বানানো আপনি ছাড়লেন কেন ?

তারিক আনাম খান- বিজ্ঞাপন বানানোর প্রসঙ্গে বলতে গেল বলতে হয় প্রথমে বিজ্ঞাপনী এজেন্সি করি সেখান থেকে বুকিং টুকিং দিতাম। পরে একদিন হঠাৎ করেই একটা মেকিংয়ের মধ্যে চলে গেলাম। সে সময় বিজ্ঞাপনগুলো যাকে দিয়ে বানাতাম একটা কাজ ও করতে পারলো না, কিন্তু করতে তো হবেই নিজেই বানানোর উদ্যোগ নিলাম। বানাতে গিয়ে মনে হলো কাজটা তো আমি করতে পারি। হোয়াই নট। শুরু করলাম। কয়েকটা হিট-টিট হয়ে গেল। তারপরে বিজ্ঞাপন নির্মাতা হিসেবেই আমার সত্যিকার অর্থে আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে। বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেই অভিনয়ের থেকে হয়ত বেশি কিছুটা অর্থ উপার্জন করতে পেরেছি। সেটা চলার পথে আমাকে সাহায্য করেছে, থিয়েটার করতে সাহায্য করেছে। একসময় এমনও হয়েছে যে মাসে ১৫/১৬টা বিজ্ঞাপন করেছি ছোটোবড়ো মিলিয়ে। একটা সময় গিয়ে এমন নয় যে মনে হয়েছে যে ধুত্তুরি এই একই জিনিস করছি তা না। করপোরেট কালচারের জায়গাটাতে বিস্তার করে গেল। যেটাতে আমি ঠিক অভ্যস্ত হতে পারিনি। আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইয়াং এক্সিকিউটিভসরা কাজ করে বেশি। বিজ্ঞাপন মানেই হচ্ছে বিপণন কমিউনিকেশন। সো তারা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করে তাদের গ্রুপের সঙ্গে কাজ করতে। আমাদের বয়সও বেড়ে গেল। মার্কেটে নতুন মেকার এলো বয়সে তরুণ, তাদের জায়গা করে দেওয়া দরকার। তবে এখনও টুকিটাকি করছি। ইদানীং আবার বিজ্ঞাপনে মডেলিংও করা শুরু করেছি যেহেতু আমাকে অনেক জায়গায় ফিট করে বয়েস টয়েস মিলিয়ে। বিজ্ঞাপনের মধ্যে আমার সবসময় চ্যালেঞ্জ মনে হয়েছে যে ৩০-৪০ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো গল্পটা বলতে হয়। সেখানে জীবনের একটা গল্প থাকে সেই সাথে প্রোডক্টটাকেও অরিয়েন্টেড করতে হয়। এটা বেশ চ্যালেঞ্জিং তাই ছোট্ট একটা মিউজিকের বিট একটা তাকানো ঘোরানো একটা ছোট্ট হাসি অনেক কাজ করে।

মাসুদুজ্জামান : প্রায় ছয় দশকের আপনার এই শিল্পযাত্রা। যদি বলি আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের মঞ্চ, টেলিভিশন, ওটিটি আর চলচিত্রের নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কি? ভবিষ্যতে কোথায় যেতে পারি আমরা ?

তারিক আনাম খান- আমি কিছু দিন আগেও খুব মনে করতাম যে, বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। বাংলাদেশের তারুণ্য অদ্ভুতভাবে দেশকে অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে কোথাও একটু হতাশার একটা জায়গা যেন মনে হয়। কী হলো! হলো কী ? আমার মনে হতো আমাদের চলচ্চিত্রের যে ভাবনা সেগুলো খুব ইউনিক। নতুন নতুন ভাবনাচিন্তাগুলো চলচ্চিত্রে আসা শুরু হয়েছিল। হঠাৎ করে সেগুলোতে কোথায় যেন ভাটা পড়ে গেল। এর সঙ্গে বিপণন, ব্যবসাসহ অনেক কিছু জড়িত। পৃথিবীর সব জায়গায়ই চলচিত্র বা শিল্প বাণিজ্য ছাড়া তো নয় । মনে হয় কোথায় গিয়ে যেন আমরা কোটারির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। এগুলো থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। তা না হলে নতুন আলো দেখব না। ওই আলোটা দেখতে চাই। সেজন্য দরজা জানালা খোলা রাখার ব্যাপারটা খুব প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়। তা না হয়ে যদি আমরা ওই একটা কুয়োর মধ্যে পড়ে যাই তাহলে মনে হবে যে, আমিই শ্রেষ্ঠ। সেখান থেকে বেরিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন জায়গার খোঁজ করা উচিত আমাদের। আরেকটা বড়ো জিনিস মনে হয় যে, আমাদের শেখা খুব জরুরি। সেটা ফিল্মের ওপরে হোক, মানে ডিরেক্টরিয়াল কাজ হোক, টেকনিক্যাল কাজ হোক, অভিনয়ের কাজ হোক বা স্ক্রিপ্ট রাইটিং হোক। এই জন্য প্রশিক্ষণ খুব দরকার। আমি চাই যে, আমার ছেলে বা পরবর্তী প্রজন্ম নতুন ভাবে এগিয়েছে। তাদের জন্য বিশাল কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিল্পকে। সেটা হতে পারে আমাদের পেইন্টিং, সেটা হতে পারে আমাদের মিউজিক। সেটা হতে পারে আমাদের চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে পথে পথে গল্প ছড়িয়ে আছে। আমরা কি আমাদের ফোকলোরগুলোকে নিয়ে খুব আধুনিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে চর্চা করেছি ? করিনি। কোথায় যেন একধরনের ভয় গ্রাস করছে যেটা ঠিক লাগছে না। আর্টিস্ট হ্যাজ টু বি ভেরি কারেজিয়াস। তাকে বলতে দিতে হবে। তাকে বেঁধে দিলেই কিন্তু সৃষ্টিবন্ত বন্ধ, প্রগতি বন্ধ। সেটা হলে আমরা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা অদ্ভুত জায়গায় পড়ে যাব। সেটা বোধহয় ভালো হবে বলে মনে হয়না। তরুণদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। উদার মানসিকতায় তাদের মনন গড়তে হবে। এইটুকুই।

মাসুদুজ্জামান : সবশেষে আমাদের তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের উদ্দেশে কী বলবেন ?

তারিক আনাম খান- আমার মনে হয়, আমি যা বলেছি তাতে যথেষ্ঠ ইংগিত আছে। তারপরও বলি, পথ আসলে বন্ধুর, সেখানে যুদ্ধ করে যাওয়াটা খুব জরুরি বলে আমার মনে হয়। নির্দিষ্ট করা উচিত যে, তুমি কি চাও। যদি মনে হয় যে এই দুনিয়াতে আমি আছি আমার কিছু বলার আছে তাহলে সে বন্ধুর পথটা অতিক্রম করতে হবে। উন্মুক্ত এই পৃথিবীতে সব কিছু কি নেয়ার মতো সবকিছু কি বিশ্বাস করার মতো! তোমাকে নির্ধারণ করতে দেবে কী হবে তোমার সংস্কৃতি ? সংস্কৃতি তো মানুষকে ভালোভাবে বাঁচতে শেখায়। পাশের মানুষটার প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। একা যদি হাজার কোটি টাকার মালিক হতে চাও তাতে খুব সুখ হবে কি ? হাজার কোটি টাকা নিয়ে তো লোকজন পালিয়ে টালিয়ে গেছে। তুমি কী চাও- এটা তোমাকে নির্ধারণ করতে হবে। পয়সার প্রয়োজন আছে আজকের দুনিয়াতে সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সৎ এবং পরিশ্রমের উপার্জনটা দিনশেষে সুখই দেয়। সুতরাং তরুণদের পরিশ্রম করতে হবে। তারুণ্যের পরিশ্রমেই আগামীদিনের পৃথিবী। পরিশ্রম না করলে তুমি তা ফেস করতে পারবে না। পিছিয়ে পড়বে। সম্ভাবনা আছে এবং তারুণ্য তো সবসময় নতুনকে নেয়। সুতরাং নতুন সমৃদ্ধ সমাজের জন্যে খুব পরিশ্রম করতে হবে।

মাসুদুজ্জামান : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

তারিক আনাম খান- আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আনন্দভুবনের পাঠক এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে। হ

ছবি : জাকির হোসেন