গঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়ি : মোশাররফ হোসেন

01 Oct 2026, 01:54 PM অন্যান্য শেয়ার:
গঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়ি : মোশাররফ হোসেন


কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গঙ্গাটিয়া গ্রামে জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে সাত কিলোমিটার উত্তরে গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। জমিদারপুত্র মানব বাবুর নামে বাড়িটি পরিচিত। বাড়ির পূর্ব পাশে বিশাল প্রবেশদ্বার। বাড়িতে ঢোকার পর প্রথমেই চোখে পড়বে বহির্মহলের একতলা বৈঠকখানা। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা বৈঠকখানাটির পূর্ব পাশে লাগোয়া টানা বারান্দা। এই ভবনটি প্রায় আড়াই শত বছর প্রাচীন। পশ্চিম পাশের অন্দরমহলের তিনতলা ভবনটি তিন শত বছর প্রাচীন। স্থাপত্য নকশা ঠিক রেখে ভবন দু’টি একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। বাড়িটিতে এখনো পিতলের তৈজসপত্র, কাঠের খাট, বসার চেয়ারসহ বেশ কিছু প্রাচীন জিনিসপত্র রয়েছে। গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িটির উত্তরসূরী শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর তথ্য মতে, বাড়িটির একতলা ভবন ও পশ্চিম পাশের তিনতলা ভবন দু’টি যথাক্রমে চারশত বছর প্রাচীন।

গঙ্গাটিয়া জমিদারের বংশধরেরা রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ গোত্রের সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। পূর্ব পুরুষেরা ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে এসে বাংলায় বসতি স্থাপন করেন। পরিবারটির মূল পেশা ছিল দেবদেবীর পূজা-উপাসনা করা। ইংরেজ শাসনামলের প্রথমদিকে ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলের পর সূর্যাস্ত আইনে ময়মনসিংহের আঠারো বাড়ি জমিদারেরা নিলামে অত্র অঞ্চলের জমিদারি কিনে নেন। আঠারো বাড়ি জমিদারদের ক্রয় করা ষোল আনা থেকে পত্তনি সূত্রে দুই আনা পান ইংরেজ প্রশাসনের আইনজীবী শ্রী দীননাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের সৈয়দপুর ও গঙ্গাটিয়া মৌজা দু’টি এই দুই আনার অংশ ছিল। এই দুই আনার সাথে হোসেনশাহী পরগনার এক তৃতীয়াংশ ক্রয় করে আঠারো বাড়ি জমিদারদের অধীনে উপজমিদার হিসেবে তালুকদারি শুরু করেন। শ্রী দীননাথ চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর তার পুত্র অতুল চন্দ্র চক্রবর্তী তালুকদারির দায়িত্ব পান। ইংরেজ শাসকরা তাকে চৌধুরী উপাধি প্রদান করে। চৌধুরী উপাধি পাওয়ার পর তিনি বাড়ির বিশাল একটি তোরণ তৈরি করে নিজ পুত্র শ্রীধরের নামে নামকরণ করেন। শ্রী অতুল চন্দ্র চক্রবর্তী চৌধুরীর মৃত্যুর পর শ্রীধর চক্রবর্তী চৌধুরী তালুকদারির দায়িত্ব পান। তিনি ছিলেন এই বংশের তৃতীয় উপ জমিদার। শ্রীধর চক্রবর্তী চৌধুরীর মৃত্যুর পর তালুকদারির দায়িত্ব পান পুত্র শ্রী ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তিনি একাধারে এসরাজ বাদক ও চিত্রশিল্পী ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিষ্য ছিলেন ।

শ্রী ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী ছিলেন আঠারো বাড়ি জমিদারির অধীনে গঙ্গাটিয়ার শেষ তালুকদার বা উপজমিদার। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভক্তির পর সকল হিন্দু জমিদার ও তালুকদার ভারতে চলে গেলেও শ্রী ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার-পরিজন নিয়ে পূর্ববঙ্গে থেকে যান। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত তিনি তালুকদারি [জমিদারি] করেন। এই পরিবারের চার পুরুষ প্রায় দেড়শত বছর কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গঙ্গাটিয়ার উপজমিদার বা তালুকদার ছিলেন।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি আক্রমণ করে শ্রী ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী, তার ভাইয়ের এক ছেলে ও তিনজন গ্রামবাসীসহ মোট ৫ জনকে হত্যা করে। জমিদার বাড়ির প্রবেশ মুখে পূর্ব উত্তর পাশে তাদের সমাধিসৌধ রয়েছে।

গঙ্গাটিয়া জমিদার ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর ছেলে শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী বাবার স্মৃতি ধারণ করে এখনো বাড়িটিতে বসবাস করছেন। পিতার তালুকদারি [জমিদারী] দেখলেও দীর্ঘ জীবনে তিনি নিজে জমিদার ছিলেন না। তবে, ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির পশ্চিম পাশের তৃতীয় তলায় শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুর এবং দ্বিতীয় তলায় তার ছোটো ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী এখনো বসবাস করেন। অন্যান্য কক্ষে কয়েকজন কর্মচারী বাস করেন।

কিশোরগঞ্জ জেলার গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির চারপাশে এখনো প্রাচীন সীমানা দেয়ালটি বিদ্যমান রয়েছে। দক্ষিণ পাশের সীমানা দেয়ালঘেঁষে একতলা কাচারি ভবন ছিল। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা কাচারি ভবনগুলো খাজনা আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হতো। প্রধান প্রবেশ দ্বারের দক্ষিণে আরো একটি ছোটো প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রজারা জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করে কাচারি ভবনে গিয়ে খাজনা প্রদান করতেন। এখন কাচারি ভবনটি নেই। ভবনটি ভেঙে সেখানে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করা হয়।

গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির মূল ভবনের পশ্চিম-দক্ষিণে এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে মালখানা। অদূরে রয়েছে প্রাচীন শ্মশান। জমিদার বাড়ির পূর্ব দিকে রয়েছে একটি বিশাল দিঘি।

জমিদার বাড়ির আঙিনার বিশাল খোলা জায়গায় বাগান ছিল। এখন সেখানে নানা রকম সবজি ও ফল চাষ করা হয়।

গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির বৈঠকখানায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় গানের আসর বসতো। ভারতবর্ষের অনেক প্রখ্যাত শিল্পীরা আসরে অংশ নিতেন। ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী অনুপ ভট্টাচার্যকে এই আসরে মাঝে মাঝেই দেখা যেত। এখনো গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির বৈঠকখানায় গানের আসরের আয়োজন করা হয়। গঙ্গাটিয়া জমিদারের বর্তমান বংশধর শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীও একসময়ে ভালো গান করতেন। প্রবীণ বয়সে এখনো মাঝেমধ্যে গেয়ে ওঠেন।

গঙ্গাটিয়া জমিদারদের পূর্ববর্তী বংশধরেরা এই বাড়িটি নির্মাণের পূর্বে আরো একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। কালের আবর্তে সেই বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তবে, সেখানে এখনো দু’টি পুকুর ও ধ্বংসপ্রাপ্ত শিব মন্দিরের অস্তিত্ব বর্তমান।

গঙ্গাটিয়া জমিদারেরা প্রজাদের কল্যাণে জমিদারি অঞ্চলে বিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, বাজার নির্মাণ করেন। এছাড়াও সরকারি অফিসের জন্য অনেক ভূমি দান করেছেন। শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী নিঃসন্তান। তার পূর্বপুরুষেরা গঙ্গাটিয়া জমিদারদের সকল জমিজমা দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দান করে গিয়েছেন ।

গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির ভবনগুলো ইন্দো-ইউরোপীয় রীতিতে ইট, চুন, সুরকি দিয়ে নির্মিত। বাড়িটি এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলার গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির প্রাচীন স্থাপনাগুলো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

লেখক : গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা