লোকগান শুধু একটি সংগীতধারা নয়, এটি বাংলার মাটি, মানুষ, নদী, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করে চলেছেন তরুণ লোকসংগীতশিল্পী, গবেষক ও শিক্ষক কানিজ খন্দকার মিতু। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে এটিএন বাংলার জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘মেঘে ঢাকা তারা’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি আলোচনায় আসেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শিল্পী হিসেবে যেমন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি লোকগানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চান মূল্যবান সম্পদ। আনন্দভুবনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেছেন তার সংগীতজীবনের শুরু, সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং লোকগান নিয়ে ভাবনার নানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...
শৈশবের গান থেকে গুরুমুখী বিদ্যার পথচলা
কানিজ খন্দকার মিতুর সংগীতজীবনের শুরু একেবারে শৈশবে। কোনো আনুষ্ঠানিক পরিবেশ নয়, বরং শুনে শুনেই গানের প্রতি তার ভালোবাসা জন্ম নেয়। ছোটোবেলায় তিনি ব্র্যাক স্কুলে পড়তেন। সেখানে হারমোনিয়াম বা তবলার মতো বাদ্যযন্ত্র না থাকলেও শিক্ষকগণ মুখে মুখে গান শেখাতেন। সেই সহজ-সরল শিক্ষাই ছিল তার সংগীতজীবনের প্রথম ভিত্তি।
পরে সেলিম পারভেজের কাছে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গান শেখা শুরু করেন। তবে তার সংগীতজীবনের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয় গুরু গোলাম রব্বানী রতনের সান্নিধ্যে। আজও তিনি নিজের সংগীতচর্চার প্রতিটি ধাপে গুরুর নির্দেশনাকে অনুসরণ করেন এবং মনে করেন, একজন শিল্পীর জীবনে গুরুর ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।
রিয়েলিটি শো বদলে দিয়েছিল জীবনের মোড়
২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে গুরুমুখী বিদ্যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ তার জীবনে নিয়ে আসে বড়ো পরিবর্তন। এটিএন বাংলার জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘মেঘে ঢাকা তারা’-তে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত তার মিডিয়া-জীবনের সূচনা।
তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্রী। হঠাৎ করেই টেলিভিশনে নিজের উপস্থিতি, সংবাদপত্রে নিজের ছবি ও সাক্ষাৎকার- সবকিছু যেন নতুন এক স্বপ্নের দরজা খুলে দেয়। এর আগে পরিবারের অনেকেই পড়ালেখা নষ্ট করে গান শেখা সময়ের অপচয় মনে করতেন। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। পরিবার তাকে পূর্ণ সমর্থন দিতে শুরু করে। সেই প্রেরণাই তাকে আরো গভীরভাবে সংগীতচর্চায় মনোযোগী করে তোলে।

নদীপাড়ের মেয়ের হৃদয়ে লোকগানের জন্ম
টাঙ্গাইল জেলার ভুয়াপুর উপজেলার গোবিন্দাসী গ্রামের যমুনা পাড়ে বেড়ে ওঠা মিতুর শৈশব কেটেছে লোকজ সংস্কৃতির আবহে। গ্রামের যেকোনো অনুষ্ঠান মানেই লোকগান। ছোটোবেলা থেকেই সেই গান শুনে শুনে তার মনে জন্ম নেয় লোকগানের প্রতি গভীর অনুরাগ।
তার বিশ্বাস, মানুষ ছোটোবেলায় যা শুনে বড়ো হয়, সেটাই তার হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যায়। তাই লোকগান তার কাছে শুধু সংগীত নয় ; এটি শিকড়ের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের একটি নাম।
লোকগান হারিয়ে যাচ্ছে- এই ধারণা মানতে নারাজ
অনেকের ধারণা, লোকগানের আগের মতো জনপ্রিয়তা নেই। তবে এই মতের সঙ্গে একমত নন কানিজ খন্দকার মিতু। তার মতে, আজও সবচেয়ে বেশি কভার গান হচ্ছে লোকগান। পরিবর্তন এসেছে শুধু পরিবেশনা ও বাদ্যযন্ত্রে। একসময় বাঁশি, ঢোল, তবলা আর হারমোনিয়ামের ব্যবহার বেশি ছিল। এখন সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পিয়ানো, গিটার, অর্কেস্ট্রা ও আধুনিক প্রযুক্তি।
তিনি বিষয়টিকে পোশাকের পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেন। যেমন সময়ের সঙ্গে মানুষের পোশাকের ধরন বদলেছে, তেমনি বদলেছে সংগীতের উপস্থাপনাও। তবে মূল সুর ও ঐতিহ্য অটুট থাকলেই লোকগান কখনো হারিয়ে যাবে না। বরং নতুন প্রজন্মের রুচি অনুযায়ী উপস্থাপন করতে পারলে তারাও লোকগান আপন করে নেবে।
প্রিয় গান, গবেষণা আর নতুন সৃষ্টির স্বপ্ন
নিজের গাওয়া গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় একটি আধ্যাত্মিক মৌলিক গান- ‘তুমি ছাড়া আর দুঃখ কবো কারে, দেখলা না দয়াল তুমি আমারে’। গানটির কথা ও সুর করেছেন তার গুরু গোলাম রব্বানী রতন। শুধু মঞ্চে নয়, ব্যক্তিগত সময়েও তিনি গানটি গুনগুন করে গেয়ে থাকেন।
বর্তমানে তিনি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান, দেশ-বিদেশের কনসার্ট এবং নতুন গান নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিজের ফেসবুক পেজের জন্য একাধিক মৌলিক ও কভার গান প্রস্তুত করেছেন। কিছু গানের ভিডিও নির্মাণের কাজ শেষ হলেই সেগুলো প্রকাশ করবেন।

শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষক- তিন পরিচয়ের এক মানুষ
গান গাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকতা করছেন কানিজ খন্দকার মিতু। তার মতে, শিক্ষকতা শুধু শেখানোর কাজ নয়, বরং শেখারও একটি বড়ো মাধ্যম।
তিনি বলেন, তার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার সুযোগ হয়। গবেষণায় পাওয়া জ্ঞান তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নেন, আবার শিক্ষার্থীদের নতুন ভাবনাও তাকে সমৃদ্ধ করে। এই আদান-প্রদানই তার কাছে শিক্ষকতার সবচেয়ে বড়ো আনন্দ।
বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত সাধক উকিল মুন্সিকে নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। তার লক্ষ্য শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং লোকগানের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, পা-ুলিপি ও অপ্রচলিত গানগুলো সংরক্ষণ করা।
লোকসংগীতের হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনতে চান
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে মিতু জানান, বাংলার লোকগানের বিশাল ভা-ার থেকে অসংখ্য গান হারিয়ে গেছে, আবার অনেক গান বিলুপ্তির পথে।
তিনি সেই গানগুলো সংগ্রহ করে নতুনভাবে রেকর্ড করতে চান। বিশেষ করে উকিল মুন্সির অপ্রচলিত গানগুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার ইচ্ছা তার প্রবল। পাশাপাশি লোকগানের ইতিহাস ও গবেষণাভিত্তিক লেখালেখিও চালিয়ে যেতে চান।

নতুন শিল্পীদের জন্য বার্তা
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি তার পরামর্শ অত্যন্ত স্পষ্ট। তার মতে, শুধু সুন্দর কণ্ঠ থাকলেই একজন ভালো শিল্পী হওয়া যায় না। সংগীত একটি গুরুমুখী বিদ্যা। তাই অবশ্যই একজন দক্ষ শিক্ষকের কাছে নিয়মিত তালিম নেওয়া এবং প্রতিদিন চর্চা করা জরুরি। তার ভাষায়, ‘শেখার কোনো শেষ নেই। আপনি যত ভালোই গান গাইতে পারেন না কেন, নিয়মিত চর্চা এবং গুরুর কাছে শিক্ষা আপনাকে আরো সমৃদ্ধ করবে।’
জীবনের রঙে এক সহজ-সরল মানুষ
কানিজ খন্দকার মিতুর শিক্ষাজীবনের শুরু নিজ এলাকার ব্র্যাক স্কুলে। পরে গোবিন্দাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। গোবিন্দাসী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং লোকমান ফকির ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত।
তার প্রিয় শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন সায়ন চৌধুরী অর্ণব, বারী সিদ্দিকী, সুবীর নন্দীসহ আরো অনেক গুণী শিল্পী। তার প্রিয় ঋতু বর্ষা- বিশেষ করে আষাঢ়ের মেঘলা আকাশ আর চারদিকে থইথই পানি তাকে ভীষণ টানে। কালো তার প্রিয় রং। আর খাবারের তালিকায় সবচেয়ে বেশি পছন্দ ভর্তা, ডাল ও গোরুর মাংস।
শেষকথা
লোকগান শুধু মঞ্চে গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না কানিজ খন্দকার মিতু। তিনি চান, গবেষণা, সংরক্ষণ ও আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলার লোকসংগীত নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে আবারো শক্তভাবে জায়গা করে নিক। শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষকÑ এই তিন পরিচয়কে একসূত্রে গেঁথে তিনি এগিয়ে চলেছেন একটি স্বপ্ন নিয়ে- বাংলার লোকসংগীতের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছে নতুন গান, নতুন গবেষণা এবং নতুন সৃষ্টির পথে।