টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট উচ্চারণ, সুন্দর বাচনভঙ্গি ও আকর্ষণীয় চেহারা এবং দর্শকপ্রিয়তা বা জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে যেক’জন সংবাদ উপস্থাপক এগিয়ে আছেন বাংলাভিশন চ্যানেলের ফারহানা তৃনা তাদের মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তিশিল্পী, প্রশিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। সংবাদ উপস্থাপনা এবং আবৃত্তি- দুই ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। দর্শকপ্রিয় এই সংবাদ উপস্থাপক ও আবৃত্তিশিল্পীকে নিয়ে লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...
সাংস্কৃতিক পটভূমি ও পথচলা
ফারহানা তৃনা বেড়ে উঠেছেন গানের সুর ও কবিতার ছন্দে। শৈশবে মায়ের কাছেই আবৃত্তিচর্চার হাতে খড়ি। মায়ের আগ্রহেই ছোটোবেলায় ভর্তি হন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। তালিম নিয়েছেন গান, নাচ ও আবৃত্তিতে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আবৃত্তির সাংগঠনিক চর্চার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে সুনামের সঙ্গে আবৃত্তি পরিবেশন করে আসছেন। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে তার সাংস্কৃতিক যাত্রার শুরু। এরপর এটিএন বাংলা, এনটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাজ করলেও ক্যামেরার সামনে উপস্থাপনার প্রতি তিনি বিশেষ টান অনুভব করেন। এখন সংবাদ উপস্থাপনা তার কাছে কেবল একটি পেশা নয়, বরং একটি সম্মানজনক শিল্পমাধ্যম। বিটিভি, এশিয়ান টিভি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির পর বর্তমানে তিনি বাংলাভিশনের সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপক হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন। বাংলা ও ইংরেজি- উভয় ভাষায় সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় তিনি সমান পারদর্শী। এছাড়া বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রেও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কাজ করছেন।
নেপথ্যের গল্প
এই অবস্থানে পৌঁছাতে তাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, নিরন্তর অনুশীলন ও আত্মবিশ্বাসের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, অডিশন এবং ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে তিনি আজকের অবস্থান তৈরি করেছেন। তার কাছে সংবাদ উপস্থাপনা কেবল একটি পেশা নয়, বরং দায়িত্ব, বিশ্বাস ও পেশাদারিত্বের একটি জায়গা। এই দীর্ঘ পথচলায় পরিবারের অবদানকে তিনি বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন। মায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন ও উৎসাহেই তার সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনা, আর পরিবারের সার্বিক সহযোগিতাই তাকে সংবাদ উপস্থাপনা ও আবৃত্তি- দুই অঙ্গনেই সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। সংবাদ উপস্থাপনার মতো সময়নিষ্ঠ পেশায় পরিবারের এই সহযোগিতাকেই তিনি নিজের অন্যতম বড়োা প্রাপ্তি বলে মনে করেন।

উপস্থাপনার শৈল্পিক দিক
সংবাদ উপস্থাপনা তার কাছে কেবল স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনানো নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন সংবাদ উপস্থাপকের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো সমসাময়িক বিষয়ে সচেতনতা, শুদ্ধ উচ্চারণ, আত্মবিশ্বাস, সময়ানুবর্তিতা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে স্থির থাকার মানসিকতা। লাইভ সম্প্রচারে হঠাৎ ক্যামেরা স্ট্যান্ড ভেঙে পাশেই পড়ে যাওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনাও তাকে বিচলিত করতে পারেনি। সংবাদ থামিয়ে না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন পেশাদারিত্বই একজন সংবাদকর্মীর সবচেয়ে বড়ো পরিচয়।
সংবাদ উপস্থাপনার বাইরে
সংবাদ উপস্থাপনার বাইরে আবৃত্তিই তার সবচেয়ে বড়ো ভালোবাসার জায়গা। নতুন প্রজন্মের মধ্যে শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তিচর্চা ছড়িয়ে দিতে বর্তমানে নিজের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘কাব্য কুহুক’-এর মাধ্যমে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের আবৃত্তি ও উপস্থাপনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তার গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় ‘একটি বাংলাদেশ’, ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ নজরুল’, ‘বৈশাখি আবাহন মা-মাটির জয়গান’ এবং ‘বর্ষা বিদায়’সহ একাধিক আবৃত্তি প্রযোজনা মঞ্চায়িত হয়েছে।
তার প্রকাশিত একক ও দ্বৈত আবৃত্তি অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘পথের বাঁধন’, ‘বৃষ্টি ভেজা ভোর’ ও ‘নিমন্ত্রণ’। ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে তার একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে’ প্রশংসিত হয়।
দেশের গ-ি পেরিয়েও আবৃত্তির মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বইমেলা, গঙ্গা-যমুনা উৎসব এবং মল্লভূমি কবিতা উৎসবে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আবৃত্তিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ‘কাজী সব্যসাচী ২০২৪’ পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা।
জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘আবৃত্তি অনলাইন’ থেকে প্রকাশিত ‘আবৃত্তি জার্নাল’-এর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর দীর্ঘ পাঁচ বছর একটি স্বনামধন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বর্তমানে ফেলোশিপ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত আছেন। পাশাপাশি সংবাদ উপস্থাপনা, আবৃত্তি, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন- এই চারটি ক্ষেত্রকে ঘিরেই তার বর্তমান কর্মব্যস্ততা।
ব্যক্তিগত জীবনে অবসর খুব একটা পান না। কাজের ফাঁকে সময় কাটে আবৃত্তিচর্চা, নতুন প্রযোজনার পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তার বাইরে যেটুকু সময় পান, পরিবারের সঙ্গেই কাটান এবং সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। আবৃত্তির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা আবৃত্তিকে আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখেন তিনি।