জঙ্গলবাস : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

25 Jun 2026, 02:05 PM ভ্রমন শেয়ার:
জঙ্গলবাস : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার


[পূর্ব প্রকাশিতের পর]


রাতে বেশ দেরি করে ঘুমালেও ঘুম কিন্তু সকাল সকালই ভেঙে গেল। এছাড়া আজ আমরা পশুর নদীতে নৌকা ভ্রমণে যাবো সেই বিষয়টিও মাথায় ছিল। নাশতা সেরে আমরা তৈরি হয়ে নিলাম, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে গতকালই জানিয়েছিলাম যে, আমরা নৌকায় ঘুরবো, সেইমতো তারা বনবিভাগের সশস্ত্র গার্ডসহ নৌকার জন্য রিকুইজিশন দিয়ে রাখে। বেলা ১০টা নাগাদ নৌকা এসে হাজির। আমরা ছয়জন ছাড়া আরো চারজন মোট দশজন আমরা নৌকার যাত্রী। এখানেও আমরা সৌভাগ্যবান বলতে হবে, নৌকা যখন একটি সরু ক্যানেলে ঢুকলো তখনই নামলো ঝুম বৃষ্টি, শুনতে আপদ মনে হলেও ঘন গভীর বনের মাঝ দিয়ে মাথার সিঁথির মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলা রুপালি জলের ধারার সাথে বৃষ্টি রুপোর জলের মিতালি, এর যে সৌন্দর্য তা আসলে চাক্ষুস না-করলে বলে বোঝানো যাবে না। সঙ্গে ছাতা থাকলেও তাতে এ বৃষ্টি খুব একটা বাধা মানেনি। আমরা প্রায় কাকভেজা হয়েই আমাদের ভ্রমণ পর্ব সারলাম। মাঝে অবশ্য বন-বিভাগের অফিস চত্বরও ঘুরে এলাম। যদিও পুরো চত্বরটাই জলে থইথই। এখানেই দেখা মিললো মায়াবী বন হরিণীর।

নৌকাভ্রমণ শেষে রুমে ফিরে একে একে গোসল সেরে নিতে নিতে বেলা দুপুরে গড়ালো। খেতে খেতে ভাবছিলাম, বিকেলটা কীভাবে কাটানো যায়। রিসোর্টের লোকজনের সাথে কথা বলে জানলাম কাছেই বৈকালিক হাট বসে, চাইলে ঘুরে আসতে পারি। আমরাও রাজি হয়ে গেলাম। বেলা সাড়ে চারটা নাগাদ দুটো ভ্যান সঙ্গী করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বিকেলের সোনালি আলোয় মেঠো পথভেজা বাতাসে প্রকৃতির নরম আদর মেখে আমরা পথ চলছি। রাস্তা মূলত একটি বাঁধ, যার একধারে পশুর নদী অন্য ধারে লোকালয়। আর পশুর নদীর উপরে রয়েছে বেশ কিছু রিসোর্ট। এই রিসোর্টগুলো মূলত কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম এই কনসেপ্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। এখানকার রিসোর্টগুলোতে প্রায় সকলকর্মীই স্থানীয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি বড়ো অংশের সোর্স স্থানীয় বাজার বা কমিমিউনিটি। নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের একটি সহজ উপায়। তবে, আশঙ্কা অন্য জায়গায়, সেটা হচ্ছে পরিবেশ, যদিও বলা হচ্ছে ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম তবে কতটা ইকো-ফ্রেন্ডলি তা নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। প্রশাসনের দায় আছে এখানে, যদিও এই ইকো-ট্যুরিজম বিষয়ে আমাদের নীতিমালা সুস্পষ্ট না তবে এবিষয় নিয়ে বিস্তারিত ভাবনার অবকাশ আছে। এটাকে একটি সুনিদিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেতে পারে, যাতে পর্যটন ও পরিবেশ পাশাপাশি ভালো থাকে।

কোনো এলাকা সম্পর্কে জানতে হলে সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা বোধ করি চায়ের দোকান, যেখানে সবসময়ই ঝড় বয়ে যায়, না ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন নয়, এ ঝড় আলোচনার, কখনো রাজনীতি, কখনো অর্থনীতি কখনো পরিবেশ অথবা পাশের বাড়ির কেচ্ছা কোনো বিষয়য়ই এর আওতার বাইরে নয়। আমরা যখন দাকোপে সময়টা ২০২৪ এর আক্টোবর, দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে বিশাল পরিবর্তন, সোসাল মিডিয়ার অপপ্রচারে তখন সংখ্যা লঘু একটা ইস্যু, আতি জ্ঞানীদের কথায় আচরণে গেল গেল রব, আর আমরাও ঘরে বসে হাতি-ঘোড়া মারছি, কে কত ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। ভাবছেন বেড়ানোর গল্পে এতো জটিল বিষয়ের অবতারণা কেন? আসলে ভ্রমণ আমাদের বিভিন্ন এলাকা সম্পর্কে যেমন জানতে সাহায্য করে তেমনি বিভিন্ন এলাকার মানুষ এবং স্থানীয়দের মনসতত্ত্ব সম্পর্কেও জানতে সাহায্য করে। দাকোপ এলাকায় আপত দৃষ্টিতে হিন্দু ও মুসলিম এই দুই ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীরই প্রধান্য রয়েছে। এবং এরা পাশাপাশি মিলে-মিশে বেশ ভালো আছে। কারোই কথায়-আচরণে অন্যের প্রতি বিতৃষ্ণা লক্ষ্য করা যায়নি। বাজারে চায়ে আড্ডায় দেখা মিললো ভিন্ন মত, ভিন্ন আদর্শের মানুষের, তর্ক হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে কিন্তু ঝগড়া যাকে বলে তাতো হচ্ছে না। এই জন্যই জ্ঞান অর্জনের জন্য ভ্রমণকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাট-বাজার ঘুরে চা শিঙাড়া খেয়ে যখন আবার ফেরার পথ ধরলাম তখন সূর্য তার পালা শেষ করে চাঁদের হাতে পরবর্তী পালার দায়িত্ব দিয়ে বিশ্রামে চলে গেছে। যদিও চাঁদের আলস্য তখনো কাটেনি, দেখা মিলে কি মিলে না এইরকম। বেশ খানিকটা পথ আঁধারেই চলতে হলো। তবে, কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো এটা তো সেই পথ না যে পথে আমরা এসেছি, ভ্যান চালককে জিজ্ঞেস করতে জানালো এটা লোকালয়ের ভেতর দিয়ে অন্য এক পথ, হঠাৎ পথ পরিবর্তনের কারণ কি জানতে চাইলে জানালো বাঁধের উপরের পথটি অনেক খানাখন্দে ভরা অন্ধকারে চলতে গিয়ে খানায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে তাই ঘুর পথে যাওয়া। প্রথমে একটু খটকা লাগলেও পরে মনে হলো, এই ভালো নতুন একটি পথ চেনা হলো। লোকালয় ছাড়িয়ে খোলা প্রান্তর চাঁদের আলোয় মেটে রঙের ধান খেতে ভেজা বাতাসের লুটোপুটি সব মিলিয়ে এক আপরূপ যাত্রাপথ।

ফিরে এসে সরাসরি রুমে গিয়ে কিছুটা সময় নিজের মতো করে সময় কাটিয়ে রাত সাড়ে নটা নাগাদ খেতে নামলাম, আজকের মেন্যু ছিল মুগরির বারবি কিউ সঙ্গে পরোটা। খাওয়ার পর আবার টং-দোকানে চা পান, বলা হয়নি রিসোর্টেই একটি টং-দোকান আছে মূলত গ্রোসারি শপ হলেও এখানে চা পাওয়া যায়, দোকান লাগোয়া লম্বা করে বেঞ্চ পাতা যেখানে বসে চা খেতে খেতে আড্ডা চলে। এরপর কিছুক্ষণ রিসোর্টের আনাচেকানাচে ঘুরেফিরে বেড়ালাম, পরদিন আমরা এখান থেকে বিদায় নেব তাই শেষবারের মতো একটু ঘুরে দেখা। রাতের অর্ধেকটা আগের রাতের মতোই গেল। আড্ডা আর গানে গানে রাতের অর্ধেকটা পার করে তারপর ঘুমুতে গেলাম, আজও চাঁদ আমাদের সাথে জেগেছিল।

সকালে উঠে নাশতা করে গোছগাছ সেরে ফেরার জন্য প্রস্তুত হলাম। একটু আগেভাগেই রওনা হওয়ার চেষ্টা করলাম। কারণ, ফেরার পথে আমরা করমজল নামবো। যদিও আমি এর আগে একাধিকবার করমজল গিয়েছি কিন্তু আমাদের দলের অনেকেই প্রথমবারের মতো সুন্দরবনের এদিকটায় বেড়াতে এসেছে, তাই উৎসাহের কমতি নেই। যে-নৌকা করে আমরা রিসোর্টে এসেছিলাম আজ আবার সেই নৌকা করেই রওনা হলাম, গন্তব্য করমজল। অবশ্য করমজল আমাদের যাত্রা পথেই পড়বে, এটি মোংলা বন্দর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে, পশুর নদীর গাঘেঁষে একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে কৃত্রিম কুমির প্রজননকেন্দ্র, রয়েছে হরিণের অভয়ারণ্য। এছাড়া সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার আর বনের ভেতরে কাঠের ট্রেইল- সব মিলিয়ে বেশ ভরপুর আয়োজন। পর্যটকও নেহায়েত কম হয় না, তবে এদের বেশিরভাগই স্থানীয়। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে করমজল পুরো পানিতে থইথই। আমরা প্রায় হাঁটুজল ভেঙে টিকেট কেটে মূল কেন্দ্রে প্রবেশ করলাম। শুরুটায় ভেবেছিলাম নৌকা থেকে নামা ঠিক হবে কি না, পরে সাহস করে নেমেই পড়লাম। তারপর আর কিছুই বাদ রাখলাম না- এমাথা ওমাথা পুরোটাই ঘুরে পশুর নদীর ধারে বসে ডাব খেয়ে কিছুটা নীরবে নদীর জলের গান শুনে আবার রওনা হলাম। আমরা যখন মোংলা পৌঁছালাম তখন দুপুর, ঝুম বৃষ্টিতে চারিধার ঝাপসা। এর মধ্যেই ভিজে ভিজে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বলা হয়নি আমরা আসার দিন যে গাড়িটায় এসেছিলাম সেটা আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। ফেরার পথে রেন্ট-এ কারের যে-গাড়িটা আমাদের নিতে এসেছে সে গাড়িটা আরামদায়ক হলেও ড্রাইভার যাচ্ছেতাই। গাড়ি চালাচ্ছে না উড়াচ্ছে বুঝতে পারছি না। প্রথম প্রথম একটু সাবধান করার চেষ্টা করে পরে ফি-সাবিল্লিøলাহ করে ছেড়ে দিলাম, যা আছে কপালে।

আগেই পরিকল্পনা ছিল, ফেরার পথে খুলনা বেতার কেন্দ্র হয়ে আসবো, সেইমতো বন্ধু কলিগ রোকনের সাথে কথা হয়েছিল। খুলনা বেতার কেন্দ্রটা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত, তবে আমরা শহরের ঢোকার মুখেই বিরতি নিলাম। কারণ, দুপুর অনেক আগেই এসে ফিরে গেছে কিন্তু আমাদের খাওয়া হয়নি। রোকনের কাছ থেকে জেনে নিয়ে কামরুলের হোটেলে লাঞ্চ করলাম, মেন্যুতে নিশ্চিতভাবে খুলনার বিখ্যাত চুইঝালের মাংস ছিল। খাওয়া শেষ হতেই রোকন এসে গেল আমাদের বেতারে নিয়ে যাবে বলে। অবশ্য সে এসে খানিকক্ষণ ঝাড় দিল কারণ লাঞ্চটা সে আমাদের অফার করেছিল কিন্তু আমরা সুকৌশলে তা নিইনি। যা হোক, বেতারে যাওয়ার দুটি কারণ ছিল প্রায় বছর পনের আগে একবার খুলনা বেতার ঘুরে গেছি, এর মধ্যে আর আসা হয়নি আর দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে একটু ফ্রেস হওয়ার দরকার ছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম, এবার একবারে একটানা পথচলা। হ [সমাপ্ত]