সেন্টমার্টিন আমাদের গর্ব : আলমগীর হোসেন

25 Jun 2026, 02:00 PM নিবন্ধ শেয়ার:
সেন্টমার্টিন আমাদের গর্ব : আলমগীর হোসেন


বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। কিন্তু এটা কোনো প্রাকৃতিক প্রবাল দ্বীপ নয়। টেকনাফ থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় এটির অবস্থান। দ্বীপটির আয়তন ৮ বর্গ কিলোমিটার। আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে এটা টেকনাফের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল। পরবর্তীসময়ে সমুদ্রে তলিয়ে যায়। ৪৫০ বছর আগে এটি জাগতে শুরু করে। দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৩.৬ মিটার উঁচু। এই দ্বীপটি সর্বপ্রথম আরব বণিকদের নজরে আসে। তারা যাত্রা পথে এখানে বিশ্রাম নিতে আসতো। সেসময় তারা এই দ্বীপের নামকরণ করেন জিঞ্জিরা, পরবর্তীসময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে নামকরণ হয় সেন্টমার্টিন। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাঙালিদের বসতি স্থাপন শুরু হয় প্রবাল দ্বীপটিতে। তারা সুপেয় পানির কষ্ট দূর করতে এখানে প্রচুর নারিকেল গাছ রোপণ করে।

মূলত ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের ফলে [৮.৫ বা তারও বেশি] বঙ্গোপসাগরের তলদেশে আকস্মিকভাবে উপরে উঠে আসার [Co-Seismic uplift] মাধ্যমে, ভারত ও মায়ানমার টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে সৃষ্ট শক্তিশালী প্লেটচ্যুতির ফলে এই ভূ-গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে। এবং, বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপটি ভূপৃষ্ঠে জেগে ওঠে।

দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবাল দিয়ে তৈরি নয়। বরং এটি মৃত প্রবাল ও চুনাপাথরের স্তরের ওপর গড়ে ওঠা প্রবাল বহনকারী একটি বাস্তুতন্ত্র। দ্বীপের ভূ-ত্বকে প্রধানত চুনাপাথর, বালুকা এবং প্রাচীন প্রবালের মৃতদেহর সমন্বয়ে গঠিত শক্ত ও ভঙ্গুর ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো দেখা যায়।

দ্বীপটির ভূতাত্ত্বিক অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উপকূলকে স্থিতিশীল রাখতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন, সুনামি বা জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।

জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল ৩৬ প্রজাতির জীবন্ত এবং ১৯ প্রজাতির জীবাস্ম পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মাছের ২৪০টি প্রজাতি রয়েছে যার মধ্যে ৯৮টি প্রজাতি সরাসরি প্রবালের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, কচ্ছপ, লবস্টার এবং কাঁকড়া পাওয়া যায়। দ্বীপে ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল এবং কেয়া-ম্যানগ্রোভসহ প্রায় ১৫৭ প্রজাতির সúুষ্পক উদ্ভিদ রয়েছে।

আবারো একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক, ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাঙালি ও রাখাইন জনগোষ্ঠী এই দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। যতদূর জানা যায় ১৩টি পরিবার প্রথম এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। তারা সবাই মৎস্যজীবী ছিলেন। আগে থেকে কেয়া ও ঝাউগাছ দেখা যেত, পরে বাঙালি জেলেরা দ্বীপের উত্তর দিকে নারিকেলের বাগান গড়ে তোলেন। কালক্রমে দ্বীপটি নারিকেল গাছপ্রধান দ্বীপে পরিণত হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা দ্বীপের উত্তরাংশকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে অবহিত করে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ জরিপকারী দল এই দ্বীপকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, এবং একজন খ্রিষ্টান সেন্ট মার্টিনের নামানুসারে ‘সেন্ট মার্টিন’ নামকরণ করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন জানান, ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নামানুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। দ্বীপটির তিন দিকের ভিত-শিলা- জোয়ারের সময় তলিয়ে যায়। ভাটার সময় জেগে ওঠে- এগুলো ধরলে দ্বীপটির আয়তন হবে ১০-১৫ বর্গকিলোমিটার। লম্বায় উত্তর-দক্ষিণে ৫.৬৩ কিলোমিটার, প্রস্থে কোথাও ৭০০ মিটার কোথাও ২০০ মিটার। ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তর অংশ নারিকেল জিঞ্জিরা বা উত্তর পাড়া, দক্ষিণ অংশকে দক্ষিণপাড়া বলা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব দিকের লেজের মতো অংশকে গলাচিপা বলে।

দ্বীপটির উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার মাঝখানে মিঠাপানিসমৃদ্ধ জলাভূমি আছে। ফসল উৎপাদনে সহায়ক সামান্য কিছু কৃষিজ পণ্য উৎপাদন হয়ে থাকে। ৪ প্রজাতির উভচর, ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। একধরনের সামুদ্রিক Sea weeds বা Algae শৈবাল প্রচুর পাওয়া যায়।

এছাড়া ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী- মাছের মধ্যে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বেলে কোরাল, রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ, উড়ুক্কু মাছ প্রধান। দ্বীপটি সবুজ সাগর-কাছিম এবং জলপাই রঙা সাগর-কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে খ্যাত। ০৪ জানুয়ারি ২০২২ বন্য প্রাণী [সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা] আইন ২০২২ অনুযায়ী দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

দ্বীপটি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। মানসম্মত আবাসিক হোটেল রয়েছে এবং একটি সরকারি ডাকবাংলোও আছে। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার একটি ইউনিয়ন।

সেন্টমার্টিন আমাদের প্রাকৃতিক গৌরবের অংশ। অপরিকল্পিত পর্যটন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্বীপটি হুমকিতে রয়েছে। মহলবিশেষের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দ্বীপটি যেন আমাদের হাতছাড়া না হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। মানব-সৃষ্ট যেকোনো হুমকির কাছ থেকে দ্বীপটিকে রক্ষা করা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। 

তথ্যসূত্র : রিপোর্ট, স্টার অনলাইন [১২ জানুয়ারি, দ্য ডেইলি স্টার ১২ জানুয়ারি ২০২২], বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, ইন্টারনেট