আলোচনা-সমালোচনা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যারা ভালোবেসে ঘর বেঁধেছেন, তাদের গল্পগুলো কোনো নাটক বা সিনেমার চেয়ে কম রোমান্টিক নয়। ভক্তদের কাছে প্রিয় শিল্পীর এই বাস্তব জীবনের প্রেমকাহিনিগুলো সব সময়ই অনুপ্রেরণা আর কৌতূহলের এক অন্যরকম উৎস। এমনই এক যুগলের নাম আঁচল ও সৈয়দ অমি। ভালোবেসে বিয়ে করে খুব সুখে আছেন তারা। অভিনেত্রী আঁচল ও তরুণ সংগীতশিল্পী সৈয়দ অমি প্রমাণ করেছেন জীবন যেখানে যেমনই হোক, ভালোবাসার জয় সবখানেই সুনিশ্চিত। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...
অভিনেত্রী আঁচল প্রতিবারই প্রেমে পড়েছেন এবং সেই প্রেম বিয়ে পর্যন্তও গড়িয়েছে। কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি বেশিদিন। আবারো প্রেমে পড়েন তিনি, প্রেমিক তরুণ কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ অমি। সেই প্রেম বিয়ে পর্যন্তও গড়ায়। প্রায় তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন তারা। পারিবারিক আয়োজনে বিয়ে হলেও বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে।
এখন তারা বেশ খোশ মেজাজেই আছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় তাদের হাসি-খুশি ছবি ও রিলস দেখা যায়। দেখে সহজে অনুমেয় যে, তারা বেশ সুখে আছেন।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিয়ের কথা বলেন তিনি। এর আগে কিছু সংবাদমাধ্যমে কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ অমিকে প্রেমিক হিসেবে দাবি করা হলেও তিনি মূলত স্বামী। আর বিয়ের বিষয়টি কেন আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, সেটিও জানান আঁচল।
এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী আঁচল আঁখি বলেন, ‘সৈয়দ অমি আসলে আমার প্রেমিক নয়, স্বামী। বিয়ের আগে আমাদের প্রেম করা হয়নি। একটি গানের মিউজিক ভিডিও নিয়ে কয়েকবার কথা হয়েছিল। আর গানটি রিলিজের পর হয়তো দুই থেকে তিনবার দেখা হয়েছিল আমাদের। এরপর যা হওয়ার-সব উভয় পরিবারের সম্মতি এবং আয়োজনেই হয়েছে।’
২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর। তখন ‘ও জান রে’ গানটির ভিডিওতে কাজ নিয়ে কথা হয় অমি-আঁখির। এরপর আরও কয়েকবার কথা হয়। তারপর জানুয়ারির ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে শুটিং হয় গানটির। যা প্রকাশ হয় ওই মাসেই। গানটি ভালো সাড়াও পায় শ্রোতামহলে।
একসঙ্গে কাজ থেকে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর প্রসঙ্গ উঠতেই আঁচল বলেন, ‘না, আসলে প্রেম নয়। গানটি প্রকাশের পর শ্রোতামহলে ভালো সাড়া পায়। আমারও অনেক প্রিয় হয়ে ওঠে গানটি। এ কারণে ওকে ফোন করে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম আমি। তখন ও আমাকে বলে, ‘আপু, তাহলে তোমাকে একদিন ট্রিট দেব আমি।’ এটা ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে।
সৈয়দ অমি আগে থেকেই অনেক শ্রদ্ধা ও সম্মান করেন আঁচলকে। মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে যা বেশ ভালো করেই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন অভিনেত্রী। এ কারণে গায়কের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিলেন বলে জানান তিনি। আঁচল বলেন, “এটা ফেব্রুয়ারি মাস ছিল। ট্রিট দেওয়ার দিন সে আমার সামনে নিচের দিকে মুখ করে তাকিয়ে ছিল। বলে, ‘আপু, তোমাকে খুব পছন্দ করি বলে একটা কথা বলতে চাচ্ছি, যদি তুমি কিছু মনে না করো।’ এরপর আমি বলে, হ্যাঁ বলো। তারপর সে দেখি নিচের দিকে তাকিয়ে সরাসরি আমাকে বলছে, ‘তোমাকে আমি বিয়ে করতে চাই’।”
‘তার এ কথায় তো আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। বলে কী ছেলে ? প্রথমে তো ফ্রেন্ডশিপ করবে, তারপর ধীরে ধীরে প্রেমের দিকে, এরপর বিয়ে। কিন্তু নাহ্। এ ছেলে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিল ! আমি ওকে বলি, এই ছেলে, কী বলছ তুমি ? চিন্তাভাবনা করে বলছ ? তারপর সে আমাকে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি অন্যদের মতো ফ্রেন্ডশিপ করব, রিলেশনে যাব এবং কিছুদিন পর ছেড়ে চলে যাব, এরকম নই। আপনাকে আমি সারাজীবনের সঙ্গী হিসেবে চাই। আপনি আমার ফ্যামিলি দেখেন। যদি ভালো না লাগে, পছন্দ না-হয়, তাহলে আপনি আমাকে বলেন। এরপর আমি আর আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু বলব না।’ এরপর সেখান থেকে আমি সিলেটে শুটিংয়ে যাই।

২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিয়ে হয় অমি-আঁচলের। এ ব্যাপারে আঁচল বলেন, ‘ওই বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসাদিবসে আমাদের দেখা হয়। আমি তখন বলি যে, চলো, তোমার মা’র সঙ্গে দেখা করব আমি। এরপর ওর গ্রামের বাড়িতে রওনা হই। তখন আমি তো ওর বাড়িতে গিয়ে অবাক। সেখানে দেখি ওর পরিবারের সবাই বিয়ের আয়োজন প্রায় প্রস্তুত করে রেখেছে। আমি ঠিক কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি যেন নিজের মধ্যে নেই। ওর পরিবারের লোকজন যা বলছে তাই করছি আমি। আমাদের ওইদিনই বিয়ে হতো। কিন্তু যেতে রাত হওয়ায় পরদিন বিয়ে হয়। পরে আমাকে একদিন থাকতে বলা হয়। এরপর আমি আমার বাড়িতে জানাই। তারা সেখানে যায়। তারপর ১৫ তারিখে বিয়ে হয় আমাদের।’
এদিকে বিয়ের প্রায় তিন বছর হলেও বিষয়টি এখনো অনেকটা অপ্রকাশিত। যদিও কাছের মানুষ এবং ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীরা বিষয়টি জানেন বলে দাবি আঁচলের। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের পারিবারিক আয়োজনে বিয়ে হয়। এরপর অবশ্য সবাইকে নিয়ে বড়ো করে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পর জুনে আমার শাশুড়ির মৃত্যু হয়। স্বাভাবিকভাবে পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যুতে এমন আয়োজন করা উচিত নয়। একারণে আমরা আর বড়ো করে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করিনি।’
২০১১ খ্রিষ্টাব্দে ‘ভুল’ সিনেমার মাধ্যমে বড়োপর্দায় অভিষেক হয় আঁচলের। তবে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে চিত্রনায়ক বাপ্পী চৌধুরীর সঙ্গে ‘জটিল প্রেম’ সিনেমা করে পরিচিতি পান তিনি। একযুগের বেশি সময় ক্যারিয়ারে ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান ও আরেফিন শুভর মতো অভিনেতাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করেছেন। আর সবশেষ নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর পরিচালিত ‘ঘর ভাঙা সংসার’ সিনেমায় দেখা গেছে এ অভিনেত্রীকে।
‘ভুল’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রাঙ্গনে অভিষেক হয় হাসনাহেনা আঁখি আঁচলের। সেই ছবিতে আঁচলের নাম ছিল আঁখি। অভিষেকেই সবাইকে চমকে দেন আঁচল। কারণ তিনিই প্রথম কোনো নবাগত নায়িকা যার পর পর দুই সপ্তাহে দু’টি ছবি মুক্তি পায়। তার দ্বিতীয় ছবি ‘বেইলি রোড’। ছবিগুলো খুব ব্যবসা না করলেও আঁচলের অভিনয় ও সুন্দর মুখশ্রী খুব সহজেই দর্শকের নজর কাড়ে। ‘ভুল’ ও ‘বেইলী রোড’ ছবি দুটোর পর তিনি ‘ভালোবাসার রংধনু’ ও ‘জটিল প্রেম’ ছবিতে কাজ করেন। ‘জটিল প্রেম’ ছবির পাশাপাশি চুক্তিবদ্ধ হন ‘প্রেম প্রেম পাগলামী’ এবং ‘কি প্রেম দেখাইলা’ ছবিতে। এরপর তিনি ‘কী দারুণ দেখতে’, ‘ফাঁদ’, ‘আজব প্রেম’ এবং ‘স্বপ্ন যে তুই’ ছবিতে অভিনয় করেন। আঁচল প্রথম ক্লাস এইটে পড়াকালীন এসিআই-এর একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হন, বাবা-মা’র অগোচরেই। অভিনয় শুরুর আগে তিনি কিছু বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেলিং করেন। এগুলো হলোÑ ‘শরীফ মেলামাইন’, ‘তিব্বত কদুর তেল’ আর ‘বোটানিক অ্যারোমা ফেয়ারনেস ক্রিম’। মডেলিং-এর পাশাপাশি ‘মহানগর নাট্যাঙ্গন’ এবং ‘রেনেসাঁ থিয়েটারে’ও যোগ দেন অভিনয় শেখার জন্য। মায়ের বাড়িও ছেড়েছিলেন আঁচল প্রেমের টানে। ‘এ কেমন প্রেমের গল্প’ ছবি নির্মাণের মাধ্যমে জুয়েল নামে এক প্রযোজকের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ছবিটি পরিচালনা করার কথা ছিল ফয়সাল রদ্দির। কিন্তু ছবির শুটিংয়ের আগেই প্রযোজক জুয়েল ও অভিনেত্রী আঁচলের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। তারপর প্রেম। নির্মাতা সূত্রে জানা যায়, ছবি নির্মাণের ইচ্ছে ছিল না প্রযোজকের। ছবি ছিল উপলক্ষ্য মাত্র। আঁচলের সঙ্গে প্রেম করতেই প্রযোজকের ছবি নির্মাণে আসা। ছবি শুরুর আগেই প্রেম শুরু হয়ে যাওয়ায় সাইনিং এবং ফটোসেশনের পর আর বেশি বিনিয়োগ করতে হয়নি প্রযোজকের। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর গোপনে বিয়ে করেন এবং চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান আঁচল। কিন্তু এ বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ এপ্রিল স্বামী জুয়েলকে তালাক দেন তিনি। সিনেমায় এখন নিয়মিত নন আঁচল। তবে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনচিত্রে আর মিউজিক ভিডিওতে প্রায়ই দেখা যায় তাকে।