সুরের জাদুকর রাকিব হাসান

25 Jan 2026, 05:01 PM সারেগারে শেয়ার:
সুরের জাদুকর রাকিব হাসান

‘সংগীত হচ্ছে একটি গুরুমুখী বিদ্যা। একে ধারণ করতে হয়, সাধনা দিয়ে দিনে দিনে নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে হয়।’ কথাগুলো বলছিলেন বর্তমান সময়ের উদীয়মান সংগীতশিল্পী রাকিব হাসান। যার সুমধুর কণ্ঠ আর মাটির গানের প্রতি অকৃত্রিম টান খুব অল্প সময়েই তাকে পৌঁছে দিয়েছে অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে। নিজের অদম্য প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন জনপ্রিয় ব্যান্ডদল ‘ফ্ল্যাশব্যাক’। এবারের আনন্দভুবন সারেগারে আয়োজনে এই তরুণ শিল্পীর সংগীত জীবনের চড়াই-উতরাই ও আগামীর স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...


শেকড় থেকে শিখরে

টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানার ভেঙ্গুলা গ্রামে বেড়ে ওঠা রাকিবের গানের হাতেখড়ি গ্রামের স্কুলেই। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের আগে থেকেই স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। ইসলামি সংগীত থেকে শুরু করে দেশাত্মবোধক-  সব বিভাগেই প্রথম হতেন তিনি। সেই ছেলেবেলার প্রতিভাই আজ তাকে বড়ো মঞ্চের সারথী করে তুলেছে। 

করোনাকালীন বিষন্নতা থেকে ‘ইউকেলেলে’র ঝংকার

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সারাদেশে করোনাকালীন স্থবিরতা যখন সহপাঠীদের বিষন্নতায় ডুবিয়ে দিচ্ছিল, রাকিব তখন খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের পথ। তখন তার অনেক বন্ধুই শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যান। সেই সময়ে তিনি শহর না ছেড়ে একাকিত্বকে সঙ্গী করে ইউটিউব দেখে দেখে আয়ত্ত করেন ‘ইউকেলেলে’ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানো। সেই থেকে শুরু ; এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গান আপলোড করতেই চারদিক থেকে আসতে থাকে দর্শক-শ্রোতাদের প্রশংসা। দর্শকদের সেই ভালোবাসাই তাকে পেশাদার সংগীতের পথে অনুপ্রাণিত করে।

‘ফ্ল্যাশব্যাক’ ব্যান্ড ও বর্তমান ব্যস্ততা

বর্তমানে স্টেজ শো, টিভি লাইভ এবং মৌলিক গান নিয়ে কাটছে রাকিবের ব্যস্ত সময়। তার ব্যান্ড ‘ফ্ল্যাশব্যাক’-এ তার সাথে রয়েছেন আরেক ভোকালিস্ট অনিক সূত্রধরসহ একঝাঁক তরুণ মেধাবী মিউজিশিয়ান। গত একবছরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৪০টিরও বেশি সফল স্টেজ শো করেছেন তারা। ২০২৬-এর শুরুতেই তার বেশ কিছু মৌলিক গানের কাজ শেষ করেছেন। সেগুলো পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেবেন। ১৫ জানুয়ারি 'ভালোবাসার সীমা নাই' শিরোনামে তার একটি মৌলিক গানের ভিডিওচিত্র প্রকাশ করেছে ধ্রুব মিউজিক স্টেশন। লুৎফর হাসানের কথা ও সুরে গানটিতে কন্ঠ দিয়েছেন রাকিব, লুৎফর হাসান ও শেখ সোলাইমান। দোতারা বাজিয়েছেন শিফা এবং সঙ্গীত আয়োজন করেছেন তরিক।

ফোক-ফিউশন : মাটির টানে নতুন প্রজন্মের সন্ধানে

রাকিব নিজেকে একজন ‘ফোক স্পেশালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তিনি বলেন, ‘গ্রামের বাউল, জারি-সারি আর বেহুলা-লক্ষিন্দরের গান শুনে বড়ো হয়েছি। সেই মাটির গানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমি চাইছি আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ফিউশনে ফোক গানগুলোকে আজকের প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতে।’ 

গুরুমুখী বিদ্যার সন্ধানে

একটা সময় পর্যন্ত স্বশিক্ষিত হলেও রাকিব উপলব্ধি করেন, সংগীতের গভীরে যেতে হলে ওস্তাদের সান্নিধ্য অপরিহার্য। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশালের সংগীত শিক্ষক মামুন রনি স্যারের কাছে নিয়মিত তালিম নিচ্ছেন।


জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত

সংগীতজীবনে অনেক বড়ো মঞ্চে গাইলেও সিলেটের কুলাউড়ায় লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের রাতের কথা কোনোদিন ভুলবেন না রাকিব। আলেমদের বাধা সত্ত্বেও প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভাবনীয় নিরাপত্তায় হাজারো মানুষের সামনে যখন তিনি ফোক-ফিউশন পরিবেশন করেন, তখন পুরো সিলেট যেন এক সুরে মেতেছিল। হেলিকপ্টার টহল আর উপচে পড়া ভিড়ের সেই স্মৃতি আজও তাকে রোমাঞ্চিত করে।

আগামীর লক্ষ্য ও নতুনদের প্রতি পরামর্শ

আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ২০০টি মৌলিক গান এবং একটি সমৃদ্ধ ইউটিউব চ্যানেল গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন রাকিব। নতুনদের উদ্দেশ্যে তার স্পষ্ট বার্তা- ‘হতাশ হওয়া যাবে না। শুদ্ধভাবে শিখে এবং সংগীতকে ধারণ করার মানসিকতা নিয়ে এই সংগীতজগতে আসতে হবে।’

সংগীতের পাশাপাশি গ্রামের কাদামাটির মানুষের সাথে হাডুডু খেলতে ভালোবাসা এই মাটির সন্তান স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার কণ্ঠের ফোক গান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরবে।