জীবন থেকে নেয়া কেবলই একটি সিনেমা নয়

24 Dec 2025, 01:23 PM মুভিমেলা শেয়ার:
জীবন থেকে নেয়া কেবলই একটি সিনেমা নয়

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী আন্দোলন, যেখানে একটি সংসার পুরো দেশকে প্রতিকীরূপে উপস্থাপন করেছে। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...


প্রবাদপ্রতীম নির্মাতা প্রয়াত জহির রায়হান নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তি পায় ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে। ছবিতে অভিনয় করেন রাজ্জাক, সুচন্দা, রোজী সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন, শওকত আকবরসহ আরো অনেকে।

সিনেমাটির যখন শুটিং শুরু হয়, তখন অভিনেত্রী সুচন্দা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। শুরুতে দুই বোনের চরিত্র করার কথা ছিল সুচন্দা ও ববিতার, পরে ববিতার বয়েস কম থাকায় চরিত্র অদল-বদল হয়। বড়ো বোনের চরিত্রে নির্বাচন করা হয় রোজী সামাদ এবং ছোটবোন হয়ে যান সুচন্দা। সিনেমাটিতে বাকিদের পাশাপাশি বাড়ির স্বৈরাচারী বৌ চরিত্রে অভিনয় করেন রওশন জামিল।

সিনেমাটির কাহিনি গড়ে উঠেছে আবহমান বাংলার সাধারণ পরিবারের মতোই একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে। পরিবারটিতে দুই ভাই আনিস [শওকত আকবর] এবং ফারুক [রাজ্জাক], তাদের বড়ো বোন [রওশন জামিল] ও তার ঘরজামাই দুলাভাই [খান আতাউর রহমান]। রওশন জামিলের অত্যাচারে নিরীহ স্বামী এবং দুই ভাইয়ের বাড়িতে থাকা কঠিন, তাদের জীবনে স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। এই বোনের চরিত্রটি দিয়ে মূলত পরিচালক পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদেরই ভিন্ন রূপে উপস্থাপন করেছেন। বাড়িতে সুখে বসবাসের জন্য আনিসকে গোপনে বিয়ে করান তার দুলাভাই, সাথী [রোজী সামাদ] নামের আরেক বাড়ির বড়ো বোনকে তাদের ঘরে তোলা হয়। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করায় সাথী বউ হয়ে ঘরে আসলে তার উপর রওশন জামিলের অত্যাচার চলতে থাকে।

অপর দিকে সাথীর ছোটো বোন বীথিকে [সুচন্দা] আগে থেকেই ভালবাসতেন ছোটো ভাই ফারুক। তাই বাড়িতে পাকাপোক্তভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বীথি ও ফারুকেরও বিয়ে দেওয়া হয়। দুই বোন এক বাড়িতে বিয়ে করে আসায় স্বভাবতই রওশন জামিলের তা-ব কমে যাওয়া অনুমেয় ছিল। তবে এই মহিলার কুটচালে মায়ের পেটের দুই বোনই একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়, যা বিষ খাইয়ে দেওয়া এবং আইন আদালত পর্যন্ত মোড় নেয়। তবে চলচ্চিত্রটির শেষ হয় এক স্থিতিশীল পরিস্থিতির অবতারণায়।

‘জীবন থেকে নেয়া’য় ব্যবহৃত গানগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। চলচ্চিত্রটির সংগীত পরিচালনা করেন সংগীত পরিচালক, গায়ক ও অভিনেতা খান আতাউর রহমান নিজে। যুদ্ধের আগের বছর মুক্তি পাওয়া এই ছবিটির গান মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের বড়ো অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। সিনেমাটিতে ব্যবহৃত হয়েছে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি, যা পরবর্তীকালে একুশের গান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়াও সিনেমাটির সংগীত নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আমাদের জাতীয় সংগীত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ঢাকার নবাব বংশোদ্ভূত খাজা শাহাবুদ্দিন এদেশের রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং ঘোষণা দেয়, ‘রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতি নয়’ তা উপেক্ষা করে ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয় রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি।

যুদ্ধের আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পছন্দের গান ছিল ‘আমার সোনার বাংলা’ যা যুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। চলচ্চিত্রটিতে ব্যবহার করা হয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটি আন্দোলনকারীদের মনকে চাঙা করে। পর্দায় খান আতার স্ত্রী থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ছাদে গিয়ে গাওয়া ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’ চিত্রায়ণের মাধ্যমে পরিচালক রূপকভাবে ফুটিয়ে তোলেন নিজ দেশে থেকেও কেমনভাবে নিজ স্বাধীনতা প্রকাশে পরাধীন, অবরুদ্ধ আমরা।

সিনেমাটির দৃশ্যধারণ শুরু হয় ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দেই, সে বছর জহির রায়হান ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি ও নানা স্থানের মিছিলের দৃশ্যধারণ করেছিলেন। তবে, সে সময় অবশ্য তার লেখা ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিড়ে নিজেকে খুঁজে ফিরছিলেন জহির রায়হান, সেই খুঁজে ফেরা সফল হলো ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটির মাধ্যমে।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ছবিটির শুটিং। সিনেমাটি নিয়ে জহির রায়হানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ পেলে সামরিক সরকার ঘাবড়ে গিয়ে গোপনে চলচ্চিত্রটির কাজ বন্ধ করার নির্দেশনা দেন তথ্য মন্ত্রণালয় ও এফডিসিকে। জহির রায়হানকে টেলিফোনে একটি মহল হত্যার হুমকিও দেয়। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ সামরিক আইন প্রশাসক রাও ফরমান আলী এই চলচ্চিত্রের নির্মাণকাজ বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেন পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি শফিউল আজমকে। ১৩ মার্চ ‘জীবন থেকে নেয়া’র এক্সপোজড ফিল্ম আটকে দেওয়ার নির্দেশ দেয় সরকার। তবে, এসব কারণে সিনেমাটি নির্মাণ থেকে তাকে কখনই পিছপা করতে পারেনি। এমনকি শুটিং চলাকালীন একদিন চলচ্চিত্রটির নায়ক রাজ্জাক ও জহির রায়হানকে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে গিয়ে বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়।

জহির রায়হানকে নিয়ে লেখা গবেষক অনুপম হায়াতের বই থেকে জানা যায়, নির্দিষ্ট তারিখে সিনেমাটি মুক্তি না-পাওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলার জনগণ বিক্ষোভ প্রদর্শনপূর্বক মিছিল ও স্লোগান সহকারে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের কিছু সিনেমাহল আক্রমণ করেছিল। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তৎকালীন সামরিক সরকার সিনেমাটিকে সেন্সর ছাড়পত্র দেয়। সেন্সর বোর্ড সিনেমাটির অনুমোদন দিয়েছিল বটে, তবে প্রজেকশন শেষে তৎকালীন জেনারেল রাও ফরমান আলী পরিচালকের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্রটি ছেড়ে দিলাম, তবে আমি তোমাকে দেখে নেব।’ সিনেমাটি মুক্তির পর ব্যাপক দর্শকপ্রিয়ও হয়, টানা ২৫ সপ্তাহ ধরে সিনেমাটি চলে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে। চলচ্চিত্রটির দৃশ্যধারণ করেন আফজাল চৌধুরী।

কলকাতায় চলচ্চিত্রটির বেশ কিছু প্রদর্শনী হয় এবং তৎকালীন ভারতের সেরা সব চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক সিনেমাটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে জহির রায়হানের সংসারে চলছিল অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। তদুপরি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি দান করে দেন মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে! দেশমাতৃকার প্রতি সত্যিকারের প্রেম বোধহয় একেই বলে।

পরিশেষে : ‘জীবন থেকে নেয়া’ একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও জাতীয়তাবাদী ধারার চলচ্চিত্র, যা ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারণ করে নির্মিত এবং এটি ষাটের দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রথম ‘জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী চলচ্চিত্র’ হিসেবে পরিচিত। এটি মূলত একটি সামাজিক-রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, যা একটি পরিবারের রূপকের আড়ালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বৈরাচারী শাসনের বিরোধিতা এবং বাঙালি জনগণের স্বাধিকার আদায়ের আকাক্সক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছে।

মূল বৈশিষ্ট্য : এটি সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।

জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র : বাঙালি জাতীয় পরিচয় ও চেতনার বিকাশে এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম, যা মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যবহ ও ইঙ্গিতময় গুরুত্বপূর্ণ ছায়াছবি।

রূপকধর্মী : ছবির কেন্দ্রীয় পরিবারটি ছিল তৎকালীন বাঙালি সমাজের প্রতীক, যেখানে ‘বড়ো’ চরিত্রটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এবং ‘ছোটো’ চরিত্রগুলো ছিল সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী।

ভাষার আন্দোলনভিত্তিক : ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও প্রভাব এই চলচ্চিত্রের মূল ভিত্তি ছিল।

সংক্ষেপে, এটি ছিল একটি যুগান্তকারী চলচ্চিত্র যা শুধু বিনোদন নয়, বরং জাতিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।