দেশে সবচেয়ে বড়ো বিনোদন মাধ্যম ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন। বাংলাদেশ টেলিভিশন [বিটিভি] প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে। স্বাধীনতাদিবস ও বিজয়দিবস উপলক্ষে বিটিভি নিয়মিতভাবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক প্রচার করেছে। এরপর আকাশ সংস্কৃতির বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। আত্মপ্রকাশ করে স্যাটেলাইট চ্যানেল। স্যাটেলাইট চ্যানেলের যাত্রার শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটক প্রচার করে চ্যানেলগুলো। এখনো তা অব্যাহত আছে। একটা সময় পাল্লা দিয়ে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো মুক্তিযুদ্ধের নাটক প্রচার করলেও এখন অনেক কমে এসেছে। বিস্তারিত লিখেছেন শেখ সেলিম...
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার হওয়া প্রথম নাটকটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের। ‘বাংলা আমার বাংলা’ নাটকটি লিখেছিলেন ড. ইনামুল হক, প্রযোজনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের আলোচিত মুক্তিযুদ্ধের নাটক ‘জনতার কাছে আমি’। আমজাদ হোসেনের লেখা নাটকটি মুস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় প্রচার হয়। এ সময়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক ‘এরা ছিল এধারে’। মোর্শেদ চৌধুরীর লেখা নাটকটি প্রযোজনা করেছিলেন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জেসমিন চৌধুরীর লেখা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ নাটকটি প্রযোজনা করেন আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম। শুধু তা-ই নয়, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে টিভি নাটকে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বহুবার। একটা সময়ে এসে দেশের একমাত্র টেলিভিশন বিটিভিতে মুক্তিযুদ্ধের নাটক স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে নির্মিত হতে থাকে। আশির দশকের কাছাকাছি সময়ে এসে আরও কিছু চেতনাসমৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের নাটক বিটিভিতে প্রচার হয়। এরমধ্যে জিয়া আনসারীর ‘কোনো এক কুলসুম’, আতিকুল হক চৌধুরীর ‘কম্পাস’, রাবেয়া খাতুনের ‘বাগানের নাম মালানীছড়া, জোবেদ খানের ‘একটি ফুলের স্বপ্ন’ এবং রাজিয়া মজিদের ‘ জোৎস্নার শূন্য মাঠ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বলতে গেলে, আশির দশকেই বেশি চেতনাসমৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের টিভি নাটক নির্মিত হয়েছে। হাবিবুল হাসানের রচনায় ও আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় ‘আমার দ্যাশের লাগি’ নাটকটি সে সময়ের দর্শককে মুগ্ধ করেছে। এছাড়া মমতাজ উদ্দীন আহমেদের লেখা মোস্তফা কামাল সৈয়দের প্রযোজনার ‘এই সেই কণ্ঠস্বর’ নাটকটি দর্শকপ্রিয়তা পায়। সে সময়ের আলোচিত মুক্তিযুদ্ধের টিভি নাটকের মধ্যে আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘আয়নায় বন্ধুর মুখ’ ও ‘একটি যুদ্ধ অন্যটি মেয়ে’, আসাদুজ্জামান নূরের ‘এ মোর অহংকার’, রাহাত খানের ‘সংঘর্ষ’, আল মনসুরের ‘শেকল বাঁধা নাও’ ও ‘নয়ন সমুখে তুমি নাই’, আতিকুল হক চৌধুরীর ‘যদিও দূরের পথ’ ও ‘স্বর্ণতোড়ন’, মামুনুর রশীদের ‘খোলা দুয়ার’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। খ- নাটকের পর গত শতকের আটের দশকের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি ও চেতনা নিয়ে ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ শুরু হয়। সাইফুল বারীর লেখায় জিয়া আনসারীর প্রযোজনায় ‘জোনাকী জ্বলে’ এবং আমজাদ হোসেনের লেখায় ফখরুল আবেদীনের প্রযোজনায় ‘জন্মভূমি’ নামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ধারাবাহিক নাটক বিটিভিতে প্রচার হয়। বিটিভির পর দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়। ফলে টিভি মিডিয়া বিস্তৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়। তবুও ১৯৯০-এর পরে বিটিভিতে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের নাটকই সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এরমধ্যে হাবিবুল হাসানের ‘মেঘের ছায়ার নিচে’, আখতার ফেরদৌস রানার ‘সেই এক গায়েন’, মোস্তফা কামালের ‘পোড়া মাটির গন্ধ’, বুলবন ওসমানের ‘পুষ্পের পবিত্রতা’, নাসির আহমেদের ‘কোন এক বুলা গল্প’, মুহম্মদ রওশন আলীর ‘নীল নকশা’ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এছাড়া বিটিভিতে প্যাকেজের আওতায় ফেরদৌস হাসানের ‘ঠিকানা’ এবং রেজানুর রহমানের ‘পতাকা’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দে বিটিভিতে প্রচারিত তারিক আনাম খানের ‘জেরা’ নাটকটিও ভালো নাটক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সে সময়ে আবুল হায়াতের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক টেলিফিল্ম ‘পিতা’ দর্শকের কাছে প্রশংসিত হয়। এটিএন বাংলা সাইদুর রহমান জুয়েলের পরিচালনায় ‘কোন সীমানায় মুক্তি’ নামের একটি মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক নাটক প্রচার করে। একই চ্যানেলে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে মামুনুর রহমানের নাটক ‘অচেনা বন্দর’ আলোচিত হয়। এটিএন বাংলার আলোচিত নাটকের মধ্যে ‘একটি আত্মহত্যা’ ও ‘তুফান আলীর ভূত’ অন্যতম। চ্যানেল আই প্রচারিত ‘বিজয় নিশান’, ‘গল্পের শেষ আছে’, ‘ধূসর অ্যালবাম’, ‘স্মৃতি সপ্তাহ’, ‘অগ্নিদিনে তাহারা’, ‘খোঁজ’, ‘স্পার্টাকাস ৭১’, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ নাটকগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রবলভাবে ফুটে ওঠে। একুশে টিভিতে প্রচারিত হয় ‘পাপপুণ্য’, ‘বলাকা’, ‘জন্ম’ প্রভৃতি। এনটিভিতে দেখানো হয় ‘শেকড়’, ‘মুক্তি’, ‘পেছনে তখন’ ইত্যাদি। এছাড়া আরটিভি, বাংলাভিশন, বৈশাখী টিভি, মোহনা, বিজয় ও দেশ টিভি প্রচার করে একাধিক মুক্তিযুদ্ধের নাটক। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে আলোচিত হয় ফেরদৌস হাসানের নাটক ‘দাগ’। একই বছর সৈয়দ শামসুল হক রচিত ও আশরাফী মিঠু পরিচালিত ‘ম্যাজিক’ নাটকটিও বেশ প্রশংসা অর্জন করে। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে তাহের শিপনের ‘কক্ষপথের যুদ্ধ’ মুক্তিযুদ্ধের একটি ভালো নাটক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। ওই বছরের ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক প্রচার করা হয়। এরমধ্যে ১৬ পর্বের প্রতিদিনের ধারাবাহিক ‘মুক্তিযুদ্ধ-১৯৭১’ নাটকটি উল্লেখযোগ্য। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে ‘ট্রানজিস্টার’ নামের নাটকটিও আলোচনায় আসে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটকগুলোর মধ্যে ‘গুডবাই কমান্ডার’, ‘পেজ সিক্সটিন’, ‘সাক্ষাৎকার’, ‘বাংলাদেশ’, ‘জনক ৭১’, ‘শহীদ মোসাম্মৎ কুলসুম বেগম’, ‘পালকি’ এবং ‘ডায়রি-৭১’ বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। এরপর থেকে দেখা যায়, প্রতিবছর স্বাধীনতা বা বিজয়দিবস এলে টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করে মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ নাটক। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ এবং ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে আমরা পাই ‘সেলিব্রেটি ৭১’, ‘একজন দুর্বল মানুষ’, ‘ঋণ শোধ’, ‘আলোর মিছিলে ওরা’, ‘একটি লাল শাড়ির গল্প’, ‘বীরমাতা’, ‘এবং অতঃপর’, ‘কাঁটা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ৭১’, ‘এ কোন ভোর’, ‘অলিভ গাছ, ক্রিস্টাল নদী’, ‘রক্তস্নান’, ‘ছোট বাড়ি বড়ো বাড়ি’, ‘আলোর পথে’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘বৈঠা’, ‘ফসিলের কান্না’, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে’, ‘পতাকা’, ‘একাত্তরের দিনগুলি’, ‘অবশিষ্ট বুলেট’, ‘অবহন’, ‘শুক্লপক্ষের আহ্বান’, ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসি’ প্রভৃতি। এছাড়া ফরিদুর রেজা সাগরের ছোটকাকু সিরিজের মুক্তিযুদ্ধের একটি বিখ্যাত গল্প নিয়ে আফজাল হোসেনের নির্মাণ এবং অভিনয় ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। বর্তমানে আবার কমে এসেছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক টিভি নাটক। তবে চলতি বছর বিটিভিসহ বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটক প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।