কবিতার গানে সুরারোপের অন্যতম : কারিগর শাহীন সরদার

24 Dec 2025, 01:20 PM সারেগারে শেয়ার:
কবিতার গানে সুরারোপের অন্যতম : কারিগর শাহীন সরদার

‘কবিতার গান’-খ্যাত সুরস্রষ্টা, সংগীতপরিচালক, বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী শাহীন সরদার বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম। কবিতার কাব্যময়তাকে সুরের বাঁধনে বেঁধে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক স্বতন্ত্র ধারা। আনন্দভুবনের সঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেন তার সংগীতজীবনের শুরু, অনুপ্রেরণা, ও কবিতার গান তৈরির পেছনের গল্প। বিস্তারিত লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল ...


সংগীতজীবনের সূচনালগ্ন ও অনুপ্রেরণা

শাহীন সরদারের সংগীতজীবনের সূচনা হয় এক বিশেষ সময়ে। তিনি জানান, তার অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন তার সহোদর বড়ো ভাই সরদার আলাউদ্দিন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’র গান শুনে শুনেই তার গানের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। বড়ো ভাই সরদার আলাউদ্দিনের গান এবং অন্যান্য শিল্পীদের দেশাত্মবোধক গান তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৩১ বছর বয়সে বড়ো ভাই অকাল প্রয়াত হন। এই বেদনা সত্ত্বেও বড়ো ভাইয়ের গাওয়া গান ও তার স্বদেশ প্রেমের চেতনাই তাকে সংগীতের পথে অনুপ্রাণিত করে তোলে।


আনুষ্ঠানিক তালিম ও দীক্ষা

আনুষ্ঠানিক তালিমের প্রয়োজন অনুভব করে শাহীন সরদার ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে শাস্ত্রীয় সংগীতের উপর দীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও তিনি ছুটে যান বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে। তিনি উচ্চাঙ্গসংগীত ও নজরুলসংগীতের তালিম নেন ওস্তাদ আমানুল্লাহ খান, অবনী মোহন দে, বদরুল আলম ও মো. রফিকুল ইসলামের কাছে। পরবর্তীসময়ে লোকসংগীত শেখার তীব্র আগ্রহ নিয়ে ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে ভর্তি হন ‘ছায়ানটে’। সেখানে অধ্যক্ষ সন্জীদা খাতুন ও ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান তার পরীক্ষা নেন এবং তাকে সরাসরি লোকসংগীত বিভাগের চতুর্থ বর্ষে ভর্তি করে নেন- যা তার মেধার বিশেষ স্বীকৃতি। ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান তাকে বিশেষভাবে স্নেহ করতেন এবং ক্লাস শেষেও বিশেষ তালিম দিতেন।



শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও সুর সৃষ্টির প্রবণতা

শিল্পী হিসেবে শাহীন সরদারের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে। তার সুর ও কণ্ঠে ১৪টি গানের একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশিত হয় কনকর্ড এন্টারপ্রাইজ থেকে, যার সংগীত পরিচালনা করেছিলেন পান্না দাস। তিনি বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হলেও বাণিজ্যিক ধারার গান তার মনের চেতনার বিপরীত ছিল।

এ সময় তার মনে সুর সৃষ্টির তীব্র চেতনা কাজ করতে শুরু করে। বিখ্যাত গীতিকবিদের কাছে যাওয়া তার জন্য কঠিন হওয়ায় তিনি প্রখ্যাত কবিদের লেখা কবিতাগুলো সুর করার পথ বেছে নেন। গত শতকের আটের দশক থেকেই তিনি সুর সৃষ্টির এই চেতনা লালন করেন এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতব্যক্তিত্ব সলিল চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ ও শেখ লুৎফর রহমানের সুর করা কবিতার গান তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।


কবিতার গানের পথচলা

কবিতার গান রেকর্ড করার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে। এই প্রথম তিনি কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ [শিল্পী সুবীর নন্দী] এবং জসীমউদ্দীনের ‘নিমন্ত্রণ’ [শিল্পী সামিনা চৌধুরী]-এ সুরারোপ করে রেকর্ড করেন। এই রেকর্ডিংয়ের প্রযোজনা করেন একুশে টিভির প্রযোজক কাওসার মাহমুদ।

এরপর, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে বিটিভিতে তার সুর ও সংগীত পরিচালনায় বরেণ্য শিল্পীরাÑ সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, শাম্মী আখতার, ফেরদৌস আরা ও সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে ৫টি কবিতার গান নিয়ে ‘কবিতার গানে স্বদেশ’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়।


প্রথম কবিতার গানের অ্যালবাম

শাহীন সরদারের তত্ত্বাবধানে প্রথম কবিতার গানের একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে, তার কন্যা ঐশিকা নদীর কণ্ঠে। ‘কবিতার গান’ শীর্ষক এই অ্যালবামটি প্রযোজনা করেন অশোক পাল। অ্যালবামে জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, সমুদ্র গুপ্ত, নাছির আহমেদ, শংকর শাঁওজাল ও সুমন সরদারÑ মোট দশজন বিখ্যাত কবির এগারোটি কবিতা স্থান পায়। এটি বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম কবিতার গানের একক অ্যালবাম হিসেবে সুধীমহলে বেশ প্রশংসিত হয়। এছাড়া তার সুর করা কবিতার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, শাম্মী আখতার, সামিনা চৌধুরী, ফেরদৌস আরা, প্রিয়াঙ্কা গোপ, মিজান মাহমুদ রাজিব, ঐশিকা নদীসহ বিভিন্ন শিল্পীদের দিয়ে।


মুক্তিযুদ্ধের কবিতার গান

শাহীন সরদার বেশকিছু দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধের গান সৃষ্টি করেছেন। তিনি নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’: এটি একটি জনপ্রিয় কবিতা যা শাহীন সরদার সুরারোপ করে গানে রূপ দিয়েছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুলে ধরে। সুমন সরদারের ‘শিশিরধোয়া মাঠ পেরিয়ে’: এটিও শাহীন সরদারের সুরারোপ করা একটি দেশাত্মবোধক গান। এছাড়াও তিনি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা থেকেও গান তৈরি করেছেন।


আন্তর্জাতিক অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সম্প্রতি তার সুর করা কবি জীবনানন্দ দাশের ‘তোমরা যেখানে সাধ’ কবিতা থেকে একটি গান গেয়েছেন ভারতের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী শুভমিতা ব্যানার্জী। এটি তার জীবনের এক ভিন্ন অনুভূতি, যা তার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেছে।

এছাড়া, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে তার সুর ও সংগীত পরিচালনায় বিভিন্ন গীতিকবিদের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন মো. রফিকুল আলম, সুবীর নন্দী, শাম্মী আখতার, আবুবকর সিদ্দিক, রুমানা ইসলাম, রাজা বশীর, বাবুল রেজা, হুমায়রা বশীর, চম্পা বণিক, সাব্বির, পুলক, মুহীন, ছন্দা চক্রবর্তী, তানজিলা করিম স্বরলিপি, মনিরা রওনক বুবলী, ঝিলিক, লিজা, ঐশিকা নদী প্রমুখ। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে শাহীন সরদার বলেন, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক কিছু করতে না-পারলেও তিনি আরো কিছু বিখ্যাত কবির স্বদেশ প্রেমের কবিতা সুর করে রেখেছেন, যা সুযোগ পেলে রেকর্ড করার ইচ্ছে আছে।


কাজের স্বীকৃতি ও জন্মস্থান

দীর্ঘ কর্মজীবনে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি মনে করেন। তবুও তিনি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ বেতারের শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়াও ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সম্মাননা [২০০৮], স্বপ্নকুঁড়ি সম্মাননা [২০১৩], রোদশী সম্মাননা [২০০৭] বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা [২০১৮]-সহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে তার সুর ও সংগীত পরিচালনায় বিটিভির পঞ্চাশ বছর পূর্তির থিম সং মনোনীত হয়েছিল। শাহীন সরদারের জন্ম ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার শ্রীধরপুর গ্রামে। যদিও শৈশবের কিছুকাল তিনি গ্রামেই কাটিয়েছেন, পরবর্তীসময়ে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পুরানো ঢাকার নারিন্দায় এবং ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে থেকে অদ্যাবধি ঢাকার মোহাম্মদপুরে বসবাস করছেন।


তরুণদের প্রতি পরামর্শ

তরুণ সুরকার ও শিল্পীদের উদ্দেশে শাহীন সরদারের পরামর্শ খুবই গুরুত্বপূর্ণÑ তিনি বলেন, ‘বাংলার আবহমান লোকজ সুরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে নতুন সৃষ্টির আলোকে তরুণদের এগিয়ে যেতে হবে। নতুন একটি মৌলিক গানকে মনেপ্রাণে আত্মস্থ করেই যেন রেকর্ড করে, এতে গানের প্রাণ পাওয়া যাবে।’