সংগীতের ভুবনে তার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল একেবারেই নিঃশব্দ এক মুহূর্ত থেকে। সময়টা ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এক বন্ধুর অনুরোধে খালি গলায় গেয়ে উঠেছিলেন দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড লালন-এর আলোচিত গান- ‘এক চোখেতে হাসন কান্দে, আরেক চোখে লালন’। সেই এক গানেই বদলে যায় তার জীবন। দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার পরিবেশনা, রাতারাতি পরিচিতি পান ‘লালনকন্যা’ নামে। সেই তরুণীই বর্তমান সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল কণ্ঠশিল্পী শাহরীন সুলতানা মীম। তিনি রিয়্যালিটি শো বাংলার গায়েন সিজন ২-এর ফাইনালিস্ট। তার সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠার গল্প লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল...
সংগীতের পথে প্রথম পদচারণা
শাহরীন সুলতানা মীমের সংগীতজীবনের শুরুটা কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে নয়। ছেলেবেলায় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন এবং সবসময় পুরস্কার জিততেন। তবে ক্লাস থ্রিতে পড়াকালীন একবার কোনো পুরস্কার না-পাওয়ার কষ্ট তাকে নাড়িয়ে দেয়। তার মনে হয়েছিল, হয়তো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে না-পারার কারণেই এমনটা হয়েছে।
সেই অভিমান থেকেই জন্ম নেয় জেদ। সেই জেদ থেকেই শুরু হয় সংগীত শেখার পথচলা। স্থানীয় সংগীতগুরু সঞ্জয় কুমার ওঝা-র কাছে তার গানের হাতে খড়ি। পরবর্তীসময়ে তপন কুমার নট্ট, জয় প্রকাশ বিশ্বাস ও সুমন দাসের কাছেও তালিম নেন।
তখনো শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন স্পষ্ট ছিল না। তবে, একজন মানুষ শুরু থেকেই বিশ্বাস করতেন, তিনি শিল্পী হবেন। সেই মানুষটি তার বাবা। পরিবারের সবার সমর্থনই আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর বড়ো শক্তি বলে মনে করেন মীম।
‘বাংলার গায়েন’ থেকে জাতীয় পরিচিতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভাইরাল পরিবেশনার পর সুযোগ আসে দেশের জনপ্রিয় সংগীত রিয়েলিটি শো ‘বাংলার গায়েন সিজন-২’-এ অংশ নেওয়ার। মেধা, কণ্ঠশক্তি ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে তিনি জায়গা করে নেন ফাইনালিস্ট তালিকায়। একটি বিশেষ পরিবেশনার পর বিচারকদের কাছ থেকে পাওয়া স্ট্যান্ডিং ওভেশন আজও তার জীবনের অন্যতম বড়ো প্রাপ্তি। মীমের ভাষায় ‘একটা গান শেষে যখন বিচারকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান, সেটা একজন শিল্পীর জন্য বিশাল পাওয়া। সেই মুহূর্তগুলো আমাকে আজও অনুপ্রাণিত করে।’

প্রথম মঞ্চে গান আর দর্শকের ভালোবাসা
প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার অনুভূতি তার কাছে এখনো অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন আমার গানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়, তখন নিজেকে সার্থক মনে হয়। দর্শকদের চোখে আনন্দ দেখেই অভিভূত হই।’
শাহরীন সুলতানা মীম বর্তমানে মৌলিক গান, টেলিভিশন লাইভ শো, স্টেজ প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাশাপাশি সিনেমায় প্লেব্যাক করার সুযোগও এসেছে তার ঝুলিতে। তবে, ব্যস্ততার কারণে মৌলিক গানে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে আক্ষেপ রয়েছে তার। ইতোমধ্যে বেশকিছু মৌলিক গান প্রকাশ পেয়েছে। আসন্ন ঈদ ঘিরে আরও কিছু নতুন গান প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
মাটি ও মানুষের গান
মীমের গানের শুরু লালনগীতি দিয়ে। তাই ফোক তার অন্তরের গভীরে গাঁথা। অনেকেই মনে করেন, ফোক গানের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। তবে, এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন মীম। তিনি বলেন, ‘ফোক হচ্ছে মাটি ও মানুষের গান। ফোকগান এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়। তবে, শিল্পীর কণ্ঠে যখন নিজস্বতা হারায়, তখনই শ্রোতাদের ভালোবাসা পায় না।’ ফোকের পাশাপাশি আধুনিক গান, নজরুলসংগীত ও গজল গাইতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি। অবসরে তিনি নিজেই নিজের গান শোনেন। প্রিয় শিল্পী নির্দিষ্ট না থাকলেও প্রিয় গানের তালিকায় লালনগীতি ও নজরুলসংগীতই বেশি।
ব্যক্তিজীবনে নতুন অধ্যায়
সম্প্রতি দাম্পত্যজীবনে পা রেখেছেন মীম। নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো যাচ্ছে। আমার স্বামীর মতো সুন্দর মানসিকতার মানুষ খুব কম দেখেছি। সংসারের জটিলতা তার কারণে টেরই পাই না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’

উচ্চশিক্ষা ও আগামীর পথচলা
মীম ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ‘ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তার কাছে পড়াশোনাটা অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পের মতোই মনে হচ্ছে, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। মেধার এই স্বাক্ষরকে পূর্ণতা দিতে এবং নিজেকে জ্ঞানের গভীরতায় আরও সমৃদ্ধ করতে পিএইচডি করবেন তিনি।
এই স্বপ্নের পথে তার পরিবারের সমর্থন অপরিসীম। বিশেষ করে, তার স্বামীর প্রবল ইচ্ছা আর উৎসাহে হয়তো আগামী ঈদের আগেই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিবেন প্রবাসে। তাই কর্মজীবন নিয়ে আপাতত ভাবছেন না তিনি। জীবনের এই পর্যায়ে তার সমস্ত মনোযোগ ও সাধনা এখন কেবল গবেষণাকে কেন্দ্র করেই। নিজেকে পূর্ণরূপে প্রস্তুত করেই পা রাখবেন আগামী দিনের কর্মব্যস্ততায়।
শেকড়ের টান
মীমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বরিশালের রামনগরে। শেকড়ের সেই টান এখনো প্রবল। অবসর খুব একটা পান না। তবে, সময় পেলেই ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন। প্রিয় খাবার মিষ্টান্নজাতীয় যেকোনো পদ। সবচেয়ে প্রিয় ঋতু বসন্ত। যদিও তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখন যেন বসন্তও আগের মতো নেই।’
সামনে পথচলা
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিকেলের গান গাওয়া থেকে শুরু করে জাতীয় টেলিভিশনের মঞ্চ- এই যাত্রা তার জন্য সহজ ছিল না। তবুও প্রতিটি ধাপেই তিনি পেয়েছেন পরিবার, শুভাকাক্সক্ষী আর শ্রোতাদের ভালোবাসা।
শাহরীন সুলতানা মীম আজ শুধু ‘লালনকন্যা’ নন- তিনি নিজস্ব স্বর ও সত্তায় বেড়ে ওঠা এক প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পী। সামনে তার স্বপ্ন- আরও মৌলিক গান, আরও বৈচিত্র্যময় কাজ এবং ফোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া। মাটি ও মানুষের গান বুকে নিয়ে তার এই নিরন্তর পথচলা সংগীতপ্রেমীদের জন্য এক আশাবাদের গল্প।