শীতে আবারো প্রাণ ফিরে পেল খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য

24 Dec 2025, 01:18 PM অভোগ শেয়ার:
শীতে আবারো প্রাণ ফিরে পেল খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য


শীত মানেই মাটির চুল্লিতে ধোঁয়া ওঠা, কড়াই ভর্তি টগবগে রস আর দূর থেকে ভেসে আসা এক পরিচিত সুঘ্রাণ- নলেন গুড়ের। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গুড় শুধু একটি খাদ্য নয় ; এটি গ্রামীণজীবনের সংস্কৃতি, কৃষকের পরিশ্রম আর বাংলার উৎসব-অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবারের অঁভোগ আয়োজনে খেজুরের গুড় নিয়ে লিখেছেন শহিদুল ইসলাম এমেল ...


খেজুরের গুড় এক ধরনের মিষ্টিজাতীয় সুস্বাদু খাবার যা খেজুরের রস থেকে তৈরি করা হয়। বাংলা অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহ করে থাকেন। আগুনের উত্তাপে রসকে ঘন ও শক্ত পাটালিগুড়ে পরিণত করা হয়। ধরন অনুযায়ী খেজুরের গুড়কে ঝোলা গুড়, দানাগুড়, পাটালি, চিটাগুড়, নলেন গুড়, হাজারি গুড় ইত্যাদি ভাগে ভাগে ভাগ করা যায়।

ইতোমধ্যেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে শীত নেমে এসেছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন গাছিরা। ভোরের কুয়াশা ভেঙে মাঠে অথবা রাস্তার ধারে সারি সারি খেজুর গাছ থেকে শোনা যায় টুপটাপ রস ঝরার শব্দ। যশোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাজারগুলোসহ সারাদেশেই পাওয়া যাচ্ছে খেজুর গুড়।

গবেষকদের মতে, বাংলায় খেজুর গাছের রস থেকে গুড় তৈরির ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। মুঘল আমলে গুড় ছিল বাংলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপণ্যের একটি। একইসঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল হাজারো পরিবারের জীবিকা।

তবে, ঐতিহ্যটি এখন নানা কারণে হুমকির মুখে। গাছিরা জানাচ্ছেন, গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, রস সংগ্রহের ঝুঁকি এবং বাজারে ভেজাল গুড়ের প্রতিযোগিতা বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে নতুন খেজুর গাছ রোপণ ও গাছিদের প্রশিক্ষণ দিলে এই ঐতিহ্যবাহী এই কৃষিশিল্প আবারো প্রাণ ফিরে পেতে পারে। এত কিছুর পরেও খেজুর গুড়ের বাজারে শীতের এই ব্যস্ততা প্রমাণ করেÑ বাংলার মানুষ এখনো ভুলে যায়নি সেই সুগন্ধী মিষ্টান্নের স্বাদ এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শৈশব, স্মৃতি আর সাংস্কৃতিক পরিচয়।


ইতিহাসের পথ ধরে

ধারণা করা হয়, বাংলার মাটিতে গুড় তৈরির প্রাচীনতম চর্চা শুরু হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব যুগেই। প্রাচীন আর্য ও দ্রাবিড় সভ্যতার খাদ্যতালিকায় মিষ্টান্ন হিসেবে গুড়ের উল্লেখ রয়েছে। তবে, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় বানানোÑ এটি মূলত পূর্ব-ভারতের অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলায়, এক বিশেষ ঐতিহ্য হিসেবে বিকশিত হয়। মুসলিম শাসনামলে খেজুর গুড়ের ব্যবহার আরো ব্যাপ্তি লাভ করে। শীতের শুরু মানেই রস সংগ্রহের প্রস্তুতি, আর গ্রামবাংলায় অতিথি আপ্যায়নে খেজুর গুড়ের পিঠা বা দুধ-চিড়ার বিশেষ স্থান ছিল। মুঘল আমলে প্রাদেশিক রাজস্ব দপ্তরের নথিতেও গুড়ের উৎপাদন ও বাণিজ্যের উল্লেখ রয়েছে।



রস সংগ্রহের শিল্প

খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা নিছক শ্রম নয়, এটি এক ধরনের শিল্প। গাছের গায়ে খাঁজ কেটে ওপরে ওঠেন গাছি। ধারালো ছেনি দিয়ে নিখুঁতভাবে কেটে দেন ‘গাশ’, আর নিচে বাঁধা হয় মাটির কলসি। শীতের রাতে টুপটাপ ঝরে পড়ে প্রাকৃতিক মিষ্ট রসের ফোঁটাÑ যা ভোরে সংগ্রহ করা হয়। এতটাই নাজুক এই রস যে, একটু সূর্যের আলো লাগলে বা সামান্য অসাবধানতায় তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।


গ্রামীণজীবনে খেজুর গুড়ের ভূমিকা

বাংলার শীতকালীন খাদ্যসংস্কৃতি খেজুর গুড় ছাড়া ভাবাই যায় না। পিঠা-পায়েস থেকে শুরু করে মুড়ি, চিড়া, দুধÑ সবকিছুতেই গুড়ের ব্যবহার অনন্য। গুড় শুধু খাবারের স্বাদ বাড়ায় না ; গ্রামবাংলায় এটি ছিল অতিথি আপ্যায়নের অনন্য উপায়।

একসময় অনেক পরিবারই সারাবছরের মিষ্টির চাহিদা এই গুড় দিয়ে পূরণ করত। এমনকি শিশুর জন্ম, বিয়ে, পৌষসংক্রান্তির মতো আনন্দঘন মুহূর্তেও গুড় ছিল অপরিহার্য।


অর্থনৈতিক ঐতিহ্য

খেজুর গুড় বহু জেলায় শ্রমজীবী মানুষের মৌসুমি আয়ের বড়ো উৎস। যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ- এ অঞ্চলে গুড় শুধু খাবার নয়, বরং একটি ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক সম্পদ। শীতের বাজারে নলেন গুড়ের জন্য যেমন ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকে, তেমনি বিদেশেও এর চাহিদা বাড়ছে। বাংলার এই মিষ্টান্ন এখন অনেক দেশেই “উধঃব চধষস ঔধমমবৎু” নামে পরিচিত।


ঐতিহ্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ

যান্ত্রিকীকরণ, রস সংগ্রহের ঝুঁকি এবং খেজুর গাছের সংখ্যার ক্রমহ্রাসÑ সব মিলিয়ে এই ঐতিহ্য আজ চাপে। তবু অনেক গাছি এখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বজায় রেখে চলেছেন এই মিষ্টিময় পেশা। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে খেজুর গাছ লাগানো ও গুড় উৎপাদন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এই ঐতিহ্য আরো ভালোভাবে টিকে থাকবে।


শেষকথা : বাংলার স্বাদ, বাংলার গল্প

খেজুর গুড় শুধুই একটি খাদ্য নয়- এটি বাংলার মাটির ঘ্রাণ, শীতের সকালের স্মৃতি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সাংস্কৃতিক পরিচয়। তাই খেজুর গুড়ের ইতিহাস মানেই বাংলার ইতিহাস ; খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য মানেই বাঙালির মিষ্টিময় জীবনযাত্রার গল্প।