বাংলার জলজ রত্ন ইলিশ শুধু একটি মাছ নয় ; বরং বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ, অর্থনীতি ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পদ্মা-মেঘনা, যমুনা কিংবা সমুদ্রের গভীর জলে জন্ম নিয়ে সেখান থেকেই বাঙালির রসনায় আসে এই মাছ। রান্না থেকে উৎসব, স্মৃতি থেকে সাহিত্যের পাতায়- ইলিশের উপস্থিতি যেন এক অবিচ্ছেদ্য গাথা। এর স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও সৌন্দর্যের জন্য বাঙালি জাতি গর্ব করে।
‘ইলিশ’ শব্দের শেকড় প্রাচীন বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার ‘ইলিষ’ বা ‘ইলিশা’ থেকে। প্রাচীন লিপি ও লোককথায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সংস্কৃত শব্দ ‘ইলিশা’ মূলত নদীর এক প্রজাতির মাছকে বোঝায়। ইংরেজিতে এই মাছকে ‘HilsaShad’ বলা হয়।
মধ্যযুগীয় আরবি ভ্রমণ কাহিনিতে ‘Al-Ilish’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা সম্ভবত মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে বাংলা থেকে আরব দেশে গিয়েছিল। তখন থেকেই ইলিশ আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত হয়।
জাতীয় মাছ ইলিশ কেন
ইলিশে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা রক্তের কোলেস্টেরল ও ইনসুলিনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এসব পুষ্টিগুণের কারণে এটি মাছের রাজা ও বাংলাদেশের জাতীয় মাছ।
বাংলাদেশের নদীমাতৃক সমাজে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদ বহুল প্রচলিত। দেশে চারশতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও মোট উৎপাদিত মাছের এক দশমাংশের বেশি ইলিশ।
বাংলাদেশে প্রধানত তিন প্রজাতির ইলিশ পাওয়া যায় : Tenualosailisha, Tenualosattoil, Tenualosakelee
অন্য তথ্য অনুযায়ী : পদ্মইলিশ [ইলিশ] অভিপ্রয়াণ করে নদীতে আসে, প্রধান প্রজাতি, চান্দিনা ইলিশ সম্পূর্ণ সামুদ্রিক, নদীতে আসে না, গুর্তা ইলিশ সম্পূর্ণ সামুদ্রিক।
কী খেয়ে বাঁচে ইলিশ
ইলিশ মূলত প্ল্যাঙ্কটোন ভোজী। নীল-সবুজ শৈবাল, ডায়াটম, ডেসমিড, কোপিপোড, রটিফার এইসব ইলিশের খাবার তালিকায় থাকে। খাদ্যাভ্যাস বয়স ও ঋতুর সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় উদ্ভিদকণা গ্রহণ করে, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় প্রাণিজ কণা ও জৈব আবর্জনাও খায়।
প্রজননের সময় খাবার গ্রহণ অনেক কমিয়ে দেয়, কিন্তু ডিম ছাড়ার পর প্রচুর পরিমাণে খেয়ে থাকে।
ইলিশ মাছের জীবনচক্র ও প্রজনন
ইলিশ অ্যানাড্রোমাস মাছ, অর্থাৎ অধিকাংশ জীবন সমুদ্রে কাটিয়ে প্রজননের জন্য নদীতে উঠে আসে। ইলিশ এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। বছরে এক থেকে দুইবার প্রজননে অংশ নেয়। প্রধান প্রজননকাল : দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু শুরু থেকে শীতের শুরু [মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত], দ্বিতীয় প্রজননকাল : জানুয়ারি থেকে মার্চ বড়ো নদীর বাঁক ও অগভীর ঘোলা জলে সন্ধ্যা ও ভোরে ডিম দেয়। এক মা ইলিশ একবারে আড়াই থেকে ষোল লক্ষ ডিম দিতে পারে। ডিম ফুটতে ১৮-২৪ ঘণ্টা লাগে, পোনা কয়েক সপ্তাহ নদীতে বেড়ে সমুদ্রে ফিরে যায়।
ইলিশ ধরা বেশি হয় বর্ষা ও শরৎকালে। বর্ষায় নদীর পানি বাড়ার ফলে ইলিশের উজানমুখী যাত্রা সহজ হয়। আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনায় সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। শীতকালে সমুদ্রে ধরা হলেও স্বাদ তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশ সরকার প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরাকে নিষিদ্ধ করেছে অক্টোবর মাসে ২২ দিনের জন্য। মার্চ-এপ্রিল মাসে ১০ ইঞ্চির কম আকারের কিশোর ইলিশ [জাটকা] ধরা নিষিদ্ধ। এর উদ্দেশ্য ইলিশের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। এই সময় মৎস্যজীবীদের বিকল্প খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
ইলিশ সাধারণত বঙ্গোপসাগরের লোনা পানিতে বাস করে। বর্ষার জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তারা নদীতে আসে। নদীর মিঠাপানি ও পলি মিশ্রিত জল প্রজননের জন্য আদর্শ। পদ্মা-মেঘনা জলাশয় ইলিশের জন্য স্বর্গতুল্য।

ইলিশের চড়া মূল্যের নানা কারণ
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, প্রজনন রক্ষার জন্য মৌসুমভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা, নদী ও সমুদ্রদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, রপ্তানিযোগ্য উচ্চমানের ইলিশের উচ্চমূল্য
বিশেষ করে পদ্মার ইলিশের মূল্য সবসময় শীর্ষে থাকে, কারণ এর স্বাদ ও গন্ধ অনন্য।
ইলিশ শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিতে ভরপুর, প্রোটিনে সমৃদ্ধ, ওমেগা-৩ ফ্যাটিঅ্যাসিডে ভরপুর, হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর, ভিটামিন এ, ডি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাসের উৎস, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও চোখের দৃষ্টি রক্ষায় সহায়ক।
ইলিশের সঙ্গে বাঙালির আবেগ গভীর ও অবর্ণনীয়। বর্ষার গরম দুপুরে গরম ভাতের সঙ্গে ইলিশ ভাজা বা পাতায় মোড়া ইলিশ রান্নাঘরের গন্ধ ও স্মৃতির ডাক। ঈদ, দুর্গাপূজা, পয়লা বৈশাখের মতো উৎসবে ইলিশ থাকে এক সম্মানিত অতিথি। অনেকের কাছে নদী থেকে তাজা ইলিশ আসাটাই একটি উৎসব।
বাংলাসাহিত্যে ইলিশ বহুবার এসেছে
জসীমউদ্দীনের কবিতায়, সৈয়দ মুজতবা আলীর রম্য রচনায়, হুমায়ূন আহমেদের গল্পে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতেও নদীর মাছের প্রসঙ্গে ইলিশের উল্লেখ পাওয়া যায়। বুদ্ধদেব বসু তো আস্ত একটি কবিতাই লিখেছেন ‘ইলিশ’ শিরোনামে।
ইলিশ
বুদ্ধদেব বসু
আকাশে আষাঢ় এলো, বাংলাদেশ বর্ষায় বিহ্বল।
মেঘবর্ণ মেঘনার তীরে-তীরে নারিকেলসারি
বৃষ্টিতে ধূমল : পদ্মাপ্রান্তে শতাব্দীর রাজবাড়ি
বিলুপ্তির প্রত্যাশায় দৃশ্যপট-সম অচঞ্চল।
মধ্যরাত্রি ; মেঘ-ঘন অন্ধকার ; দুরন্ত উচ্ছল
আবর্তে কুটিল নদী ; তীর তীব্র বেগে দেয় পাড়ি
ছোট নৌকাগুলি ; প্রাণপণে ফ্যালে জাল, টানে দড়ি
অর্ধ-নগ্ন যারা, তারা খাদ্যহীন, খাদ্যের সম্বল।
রাত্রিশেষে গোয়ালন্দে অন্ধ কালো মালগাড়ি ভরে
জলের উজ্জ্বল শস্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,
নদীর নিবিড়তম উল্লাসের মৃত্যুর পাহাড়।
তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে-ঘরে
ইলিশ ভাজার গন্ধ ; কেরানির গিন্নির ভাঁড়ার
সরস সর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা, ইলিশ-উৎসব।
[দময়ন্তী, জুন ১৯৩৮]

পদ্মা নদীর ইলিশের খ্যাতি
পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে, যার মধ্যে পদ্মার ইলিশ সবচেয়ে খ্যাতনামা। পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার খাবার ও পানির প্রবাহের কারণে পদ্মার ইলিশের শরীরে উৎপন্ন চর্বি স্বাদের ক্ষেত্রে বিশেষ। ইলিশ সমুদ্র থেকে আসার পর ডিম ছাড়ার জন্য নিজের জন্মস্থানেই ফিরে আসে। ফলে পদ্মার ইলিশের স্বাদ ও মান বছরের পর বছর ধরে অটুট থাকে।
জাটকা ও সংরক্ষণ আইন
জাটকা হলো ছোটো ও কিশোর ইলিশ [দৈর্ঘ্য ১২-২০ সেমি] যাদের বয়স সম্পূর্ণ হয়নি। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে জাটকা ধরা নিষেধ। আইন থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে জাটকা আহরণ হচ্ছে, যা ইলিশের প্রজননের জন্য হুমকি। ১৯৯২-৯৪ সালের জরিপে প্রতিবছর ৩৫০০-৪০০০ মেট্রিক টন জাটকা ধরা পড়ে, যার অর্ধেক বা তার বেশি মেঘনায়।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ইলিশ এসেছে বিভিন্নভাবে। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে সাধারণত পান্তা-ইলিশ ভোজের আয়োজন করা হয়। বিয়ের সময় ইলিশ তাতওয়া উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। গায়ে হলুদের দিনে বরের পরিবার কনের পরিবারকে একজোড়া ইলিশ উপহার দেয়। যাহোক, ইলিশের অভাবের কারণে, আজকাল এটি প্রায়শই পশ্চিমবঙ্গে রুইমাছ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, যখন বাংলাদেশে ঐতিহ্যটি অব্যাহত রয়েছে।
অনেক বাঙালি হিন্দু পরিবার বিভিন্ন পূজার শুভদিনে জোড়া ইলিশ বা দুইটি ইলিশ মাছ কেনেন। সরস্বতী পূজা ও লক্ষ্মী পূজায় জোড়া ইলিশ কেনা খুব শুভলক্ষণ হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু এই প্রথা পশ্চিমবঙ্গ [ভারত] ও বাংলাদেশের হিন্দুদের মাঝে প্রচলিত। তাদের অনেকে লক্ষ্মী দেবীকে ইলিশ মাছ উৎসর্গ করেন। অনেকেই ইলিশ উৎসর্গ ছাড়া পূজাকে অসম্পূর্ণ মনে করেন।
ইলিশ শুধুমাত্র একটি মাছ নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পদ্মা-মেঘনার ঢেউয়ে ভেসে আসা রুপালি ইলিশ যতদিন থাকবে, ততদিন বাঙালির ভাতের থালা এবং মন দুটোই থাকবে ভরপুর। হ
গ্রন্থনা : ফাতেমা ইয়াসমিন