মানুষের নিজস্ব জীবনব্যবস্থার রূপকার শিল্পী কামরুল হাসান : আশরাফ হোসেন

20 Apr 2026, 03:05 PM অন্যান্য শেয়ার:
মানুষের নিজস্ব জীবনব্যবস্থার রূপকার শিল্পী কামরুল হাসান : আশরাফ হোসেন

শিল্পী যখন দেখে ফেলেন ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীর অহমিকা, ঘৃণা, রাগ, অন্যায় অত্যাচারে নির্যাতিত হচ্ছে কোনো ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠী। তখন তিনি পাথর হয়ে যান, হৃদয় ক্ষত হয়, ভেঙে পড়েন ঘৃণা, লজ্জায় নিজেকে অসাহায় মনে হয় তখন তাঁর হাতের রং, তুলিই হয় সর্বস্ব আশ্রয়। নিজেকে তখন ব্যর্থ মনে হয়। সমাজের সকল ব্যর্থতা মনে হয় নিজের। শিল্পীর সকল কষ্ট, বেদনা, ব্যর্থতা রূপান্তরিত হয় এক শক্তিতে, তিনি প্রতিবাদ করেন, ঘৃণা ও ক্ষোভে উজ্জীবিত করে তোলেন অবহেলিত, নির্যাতিত অসহায় ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীকে সত্য ও সুন্দরের পথ ধরে চলার জন্য। তিনি চিৎকার দিয়ে বলেন জনগোষ্ঠীর অধিকারের কথা, যদিও সে ভাষার শব্দ নেই। শিল্পীর ভাষা নিঃশব্দ। শিল্পীর ভাষা কেউ বোঝে আবার কেউ বোঝে না। কারণ শিল্পী শব্দ আঁকেন, লিখেন না আর সে শব্দ হয়তো সকলে পড়তে পারেন না। তিনি মুখ দিয়ে না-বলে হাতে এঁকে দেখান। এমনি একজন শিল্পী কামরুল হাসান।

শিল্পী কামরুল হাসান ভোলেননি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের বীভৎসতা, তিনি ভোলেননি মানুষ রচিত দুর্ভিক্ষের কথা, তিনি ভুলতে পারেননি বিশ্ব বেহায়ার দৌরাত্ম্যে কথা, এমনকি তিনি ভুলে যাননি তার প্রিয়তমা স্ত্রীর অবহেলার কথা। আর তিনি এসব ভুলতে পারেননি বলেই এ সকল ক্ষোভ থেকে জন্ম নিয়েছিল একেকটি কালজয়ী চিত্রকর্ম। তাঁর কর্মে ছিল পৌনঃপুনিক বিষয়। দশমিকের পরের অঙ্কগুলো যেমন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বারবার ফিরে আসে তেমনি তার চিত্রকর্মেও বারবার ফিরে এসেছে গ্রামীণ সরলতা, আদিম সভ্যতা, শিশুসুলভতার বিষয়াদি। মিল নেই শহর এবং গ্রামের আদিমতা ও সভ্যতার মাঝে। কামরুল হাসানের কাজে এই অসাদৃশ্য বৈপরীত্যের চিন্তা ও মননের বোধকে জাগিয়েছেন। আমরা তাঁর কর্মে গ্রাম বা রাজনীতি ছাড়াও খুঁজে পাই সাংস্কৃতিকজীবনে ভেঙে পড়া বিক্ষিপ্ত সময় সমাজের সততাহীন স্বাভাবিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ, ক্লেশকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন চিত্রকর্মে। ব্যক্তিসত্তা সমাজ সমগ্রের চিন্তাও বোধ থেকে কতটা দূরে এসব কিছু তুলে এনেছেন কামরুল হাসানের জমিতে কলসী কাঁখে বধূ কন্যা জননী। আরো এঁকেছেন গোরু, মহিষ, হাতি, ঘোড়া, মাঝি ও জেলেদের। গ্রামীণ এ জীবন শহর থেকে অনেক দূরে এবং বৈপরীত্য স্পষ্টতর। তখনকার সময়ে গ্রামের সহজ সরল জীবনযাপনে শহুরে আধুনিকতা ও বিলাসিতা থেকে অনেক দূরে এবং শহুরে আধুনিকতার নামে গ্রামীণ জীবনকে দেখেছে বেশ্যা, চাষা, জাউলা ও বলদ শব্দের মোড়কে। কামরুল তার ছবিতে এদের মর্যাদা দিয়েছেন। নারী মানে বেশ্যা নয়, বলদ মানে জানোয়ার নয়, কৃষক মানে চাষা নয়, জেলে মানে জাউলা নয়। জাউলা, জানোয়ার, বেশ্যা, চাষা এটা শহরে ক্ষমতাবানদের গালি। শিল্পী কামরুল হাসান এমন ছবিই এঁকে গেছেন দিনের পর দিন।

কামরুল হাসান জন্মগ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলায় ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি সরকারি চারুকলা ইনিস্টিউট [বর্তমান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়] কলকাতা থেকে চিত্রকলায় স্নাতক সম্মানের শিক্ষাকোর্স শেষ করেন ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সাথে ঢাকায় চারুকলা ইনিস্টিউট প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি এ ইনিস্টিউটেই শিক্ষকতা করেন ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। কামরুল হাসানের নেতৃত্বে সে-সময়ে ক্ষুদ্র ও কুঠিরশিল্প কর্পোরেশনে ‘নকশা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই নকশা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে প্রায় ১৮ বছর [বিসিক] প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনার মধ্য দিয়ে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭১-এর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তরের শিল্প বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার প্রথম নকশা তিনিই করেন।

শিল্পী কামরুল হাসান গভীরভাবে দেখতেন মানুষের নিজস্ব জীবনব্যবস্থা, তাদের আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, চাল-চলন এবং জীবন যাপনের নানা স্তর, এটা তার অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আরো অভিজ্ঞতা নিয়েছেন বই, স্মৃতি ও ভ্রমণ থেকে। কয়েকজন মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা রূপান্তর করেছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে। সহজ করে বললে ব্যক্তির জীবনব্যবস্থা কীভাবে রূপান্তরিত হয় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, সে ভাবটুকুই প্রকাশ করেছেন তাঁর শিল্পকর্মে।

কামরুল হাসানের ছবি রাজনৈতিক বা যুদ্ধের ছবি বলা যায় না। তবে, সরাসরি বলা না-গেলেও আবার বলাও যায়। তিনি রাজনৈতিক এবং যুদ্ধের ছবিও এঁকেছেন। কিন্তু তিনি উত্তোলিত হাত আঁকেননি, বন্দুকযুদ্ধ আঁকেননি, কোনো লাশের ছবি আঁকেননি। কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেননি। কামরুল হাসানের আঁকা ‘সেই সব জের টেনে’ শীর্ষক ছবিতে নির্যাতন ও নারীর অবয়বের পেছনে ভয়ঙ্কর উদগ্র কামনার পশুরূপীদের মুখোবয়ব এঁকেছেন, এঁকেছেন ধর্ষিতা নারী মাটিতে পড়ে থাকার দৃশ্য। ‘ইমেজ’ শীর্ষক ছবিতে নর-নারীর সামনে থাকা শকুন আর শিয়াল সমাজের দুষ্টু চরিত্রদের রূপক মুখের ছবিই ইঙ্গিত করে। এগুলো সমাজ বা রাজনৈতিক তখনকার সময়ের উপজীব্য ছবি বলেই বিবেচ্য। যদিও রাজনৈতিক সংজ্ঞা ভিন্ন, রাজনীতিতে সাধারণত উঁচুস্বরে শব্দের মাধ্যমে নিজের বা দলের উচ্চতা প্রমাণ করে, মিছিল, বিদ্রোহ, আন্দোলন, প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি জমা দেওয়া থেকে নানা কিছুর আয়োজন থাকে তাদের প্রয়োজনমতো। এবং, এর উত্থান-পতন থাকে, থাকে মারামারি, বিদ্বেষ আহত ও নিহত হওয়ার মতো বড়ো বিষয়। এতো গেল এক ধরনের রাজনীতির একটা চিত্র যা শব্দযুক্ত প্রাথমিকভাব। রাজনীতির আরেকটি দিক তা প্রায় শব্দহীন, অনেকটা মানুষের সহজাত স্বভাব বললেও ভুল হবে না। যেমন ক্ষুধা, কামনা, হিংসা, রিরংসা, ঘৃণা ও লোভ এখান থেকেও জন্ম নেয় একধরনের ক্ষুধা- যে ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ অন্যায় অত্যাচারসহ নানা অনৈতিক কাজ করে থাকে আর এসব বিষয়ও বাদ পড়েনি শিল্পী কামরুল হাসানের ছবির বিষয়বস্তুতে। খুব প্রিয়তম কাছের মানুষটি লালসার অসুখে অসুস্থ হয়, তা কোনো কোনো সময়ে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়েও পড়ে পরিবার, সমাজ এমন কি রাজনীতির মতো প্লাটফর্মেও। এসব অসুখের অসুস্থ মানুষের মুখগুলো বা পাশাপাশি চরিত্রের ফর্ম উঠে এসেছে শিল্পীর ক্যানভাসে বাঘ, হাতি, কুমির, শেয়াল, নেকড়ে, সাপ, শকুন ও প্যাঁচার মতো প্রাণী হয়ে। এ সবই রাজনীতিবিষয়ক। তাঁর ছবিতে রাজনৈতিক বিষয়গুলো এমন নিঃশব্দে উপস্থাপন হয়ে তীব্র চিৎকার দিয়েছে। অনেক জনতার মস্তিষ্কে, হৃদয়ে বেজেছে দামামা। এ ছবিগুলো যেমন বক্তব্য রেখেছে তেমনি রং-রেখায় বর্ণনাও দিয়েছে যথোপযুক্ত।

শিল্পী কামরুল হাসানের ছবি কারোর ড্রইং রুমে, স্টুডিওতে বা ইজেলেই সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। তাঁর শিল্প শিল্পের বাজার, প্রদর্শনী এবং সমঝদারদের এড়িয়ে মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল। এবং জনপ্রিয়তার এটি একটি কারণ বলে মনে করি। এ কারণে ছবি শুধু ছবিই ছিল না, কামরুল হাসানের নামসহ একটি শক্তি হয়ে উঠেছিল। তাঁর এই ইমেজ শিল্প-সংশ্লিষ্ট বোধি মানুষগুলোর কাছে দূরদর্শিতার বিষয় হয়ে উঠেছিল যা আজও বিদ্যমান আর রাজনেতৈক দুষ্টু চক্রের কাছে সত্য সুন্দর মানুষ হয়ে ওঠার আহ্বান ছিল। শিল্পীর ছবি নিরন্তর সত্য ও সুন্দরের আহ্বান করে। কামরুল হাসানের ছবিও এর ব্যতিক্রম নয়।

শিল্পী কামরুল হাসানের কাজের মূল হচ্ছে একক ‘ভিন্নতা’। তিনি একই মুখের মধ্যে অন্য মুখ এঁকেছেন, একটি টেকচারে আরেকটি টেকচার চড়িয়েছেন। তার ছবিতে দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট মানুষের অবয়বের উপর আরেকটি অনির্দিষ্ট শেয়াল, গাধা বা ঘোড়ার মুখাবয়ব এঁকেছেন, এভাবে তিনি এক ভিন্নতা তৈরি করেছেন, এসব গাধা শিয়াল বাঘ বা কুমির এসবই লোকজ স্মৃতির অভিজ্ঞতা। এই যে তাঁর কাজে মানুষের অবয়বে জানোয়ার বা পশুদের অবয়ব সরল ও সহজভাবে রেখায় টেনে চরিত্রের যে ভিন্নতা প্রকাশ করেছেন। একইভাবে পর্দার আড়ালে থাকা মুখগুলো যেভাবে সমাজে মেলে ধরেছেন তা কেবল কামরুল হাসানের ছবিতেই উন্মোচিত হয়েছে। শিল্পীর ক্যানভাসে গড়া শিল্পকর্মে তিনি যে প্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ করেছেন, সে বেশির ভাগ প্রতিক্রিয়াই তিনি নিজস্ব থেকে সামাজিক ও রাজনীতিতে রূপান্তর করেছেন। এমন একটি নিজস্ব ছবি ‘তিনকন্যা’ এখানে খুব যতœ করে তিনজন নারীকে এঁকে একটি স্থবির মুহূর্ত থেকে রেখা টেনে দিয়েছেন জমির শেষ আইল পর্যন্ত। জমির পেছনে আলতো করে সবুজে ঢেকেছেন প্রকৃতির পাতায় পাতায়। ফাঁকে ফাঁকে আকাশের ক্ষণিক এবং ক্ষুদ্র আভাস মাত্র। ত্রয়ী নারীদের শরীরে রয়েছে বয়ঃসন্ধির সন্ধিক্ষণ। এই কৌনিকতার মধ্য দিয়ে ব্যঞ্জনা টেনেছেন আপন মনে। তিনি বারবার নারী ফিগারে বাঁকা বিরাগে, রিরংসা নির্মিতি করেছেন, করতে চেয়েছেন, দেখাতে চেয়েছেন মানুষের পশুত্ব ও তার পতন। এ শুধু নারীর দেহে নয়, এককথায় মানুষের অবয়বেও এঁকেছেন এমন করেই। মানুষের পশুবৃত্তির পাশবিকতাকে।

এই মহান শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি কবিতা উৎসবের মঞ্চে। তিনি বাংলা একাডেমি, আর্ট অ্যাসাম্বেল গ্যালারি, শিল্পকলা একাডেমী, এ ছাড়া ৬টি জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীসহ সমকালীন চারুকলা প্রদর্শনী, ড্রেসডেন, জিডি আর, ফুকুও, জাপান, হংকং, মালয়েশিয়া ভারত এবং দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী ১৯৮১/৮৩ ও ৮৬-তে একক এবং যৌথ প্রদর্শনী করেন।

তিনি প্রসিডেন্ট পদক, একুশে পদক, বাংলাদেশ চারুশিল্প সংসদ সম্মাননা এবং মাহবুউল্লাহ ট্রাস্ট স্বর্ণপদক পান জীবদ্দশাতেই। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক শিল্পী কামরুল হাসানের বিশেষ গ্যালারিতে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার পেইন্টিংস ও ড্রইং। দেশ-বিদেশে ও ব্যক্তিগত সংগ্রহেও রয়েছে আরো অনেক পেইন্টিংস। 

লেখক : ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী