বসন্তে বিদেশ ভ্রমণ : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

20 Apr 2026, 03:00 PM ভ্রমন শেয়ার:
বসন্তে বিদেশ ভ্রমণ : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]


আগেই বলেছি ওয়ার্কশপের শেষদিন আমরা সদলবলে শপিং করতে গিয়েছিলাম। গাড়ি আমাদের যে-মার্কেট প্লেসে নামিয়ে দিয়েছিল সেটা অনেকটা আমাদের নিউ মার্কেটের মতো ঘিঞ্জি এলাকা। পুরো এলাকাটায় মনে হয় অনেক ছোটো-বড়ো মল বা চেইন স্টোর রয়েছে। প্রথমেই আমরা একটা বড়ো মলে ঢুকলাম। তবে, ঢোকার আগে একটু ধন্দে ছিলাম যে, ঠিকঠাকমতো জিনিসপত্র খুঁজে পাবো তো ! কেননা, ভাষার একটি বাধা তো আছেই। এরকম ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ইংরেজিটাও খুব একটা কাজে দেয় না, কিন্তু দোকানের ভেতর ঢুকে মনে হলো আমি যেন ইস্টার্ন প্লাজার মতো কোনো বাংলাদেশি মলে এসেছি। প্রায় সকল সেলসম্যান বাংলাদেশি, দু’একজন আছেন ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি। এখানে আসলেই সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়। আমি মূলত আমার একবছর বয়সী ভাতিজির জন্য কিছু টয়লেট্রিজ আইটেম কিনবো বলে এখানে এসেছি। শিশুদের সেকশনটি ছিল সবার উপরের ফ্লোরে, পরপর দুটো ফ্লোর একটিতে ড্রেস এবং তার উপরের ফ্লোরে প্রসাধনী। ড্রেসের মূল্য এবং মান আমাদের দেশের তুলনায় খুব একটা যুতসই মনে হলো না। তাই আর সেদিকে নজর দিয়ে সময় নষ্ট না-করে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মনোনিবেশ করলাম। এখানে খুব একটা সময় খরচ না-হওয়ায় পুরো মলটা ঘুরে-ফিরে দেখছিলাম। মলের একদম নিচে সম্ভবত বেজমেন্ট জুড়ে পুরোটাই কম্বলের সেকসন। এগুলো এত কালারফুল আর তুলতুলে ছুঁয়ে দেখতেও ভালো লাগছিল। কোয়লিটিও খুবই ভালো। ভাবলাম, একটি নিয়েই যাই। কিন্তু কোনটা নেওয়া ঠিক হবে সেটা বুঝতে না-পেরে একজন সেলসম্যানকে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো যেটার ওজন যত বেশি সেটা তত ভালো। আমার সাড়ে পাঁচ কেজি ওজনের একটা কম্বল পছন্দ হওয়ায় সেলসম্যান জানালেন এগুলো খুব সাধারণ মানের তিনি আমাকে একটা সাড়ে নয় কেজি ওজনের কম্বল কিনতে পরামর্শ দিলেন। নিঃসন্দেহে সেটা সুন্দর, আসলে সবই সুন্দর কিন্তু সাড়ে নয় কেজির কম্বল তুলতে গিয়ে মনে হলো এটার জন্য মুটে লাগবে আর আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে আসলে অতো ভারি কম্বলের প্রয়োজনও পড়বে না। অনেক দ্বিধা আর দোদুল্যমানতায় শেষ পর্যন্ত সাত কেজি ওজনের একটি কম্বল কিনেই ফেললাম। তারপর ঘটলো বিপত্তির এটা নিয়ে তো আমি আর দু’পাও হাঁটতে পারি না। সে এক বিশাল বিড়ম্বনা, কে জানতো একটা কম্বল বহন করা এত কষ্টসাধ্য হবে। আমার এই অদ্ভুত অসাহয়াত্ব দেখে আমাদের ওয়ার্কশপের অসমীয়া পার্টিসিপেন্ট এগিয়ে এলেন। আসলে এই তিনদিনে আমরা মোটামুটি পরিচিত আর যেহেতু একই হোটেলে থাকছি কিছুটা হৃদ্যতা তৈরি হয়েছে আমাদের সবার মধ্যে। সেও আমাদের শপিং পার্টনার ছিল, তার শিশুকন্যার জন্য ড্রেস পছন্দ করতে সে যখন হিমশিম খাচ্ছিল তখন অবশ্য আমিই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম। আসলে আমাদের তিনদিনের ওয়ার্কশপ এতটাই ইনক্লুসিভ ছিল যে, মনে হচ্ছিল আমরা অংশগ্রহণকারীরা একে-অন্যের বহুদিনের পরিচিত।

শপিং করলেই আমার বাইরে খেতে ইচ্ছে করে, আমি আমার ইচ্ছের কথা প্রকাশ করলাম কিন্তু কারোই তেমন আগ্রহ দেখা গেল না। আমি ট্রিট দিতে চাই এটা জানানোর পরও দেখলাম সবাই নিরাসক্ত-নিরামিষ, যদিও আমাদের অসমীয়া বন্ধু আক্ষরিক অর্থেই নিরামিষভোজী তাই তার আগ্রহ আরও কম, অগত্যা আমাকে ইচ্ছের জলাঞ্জলি দিতে হলো। ফেরার পথে আরও এক কাহিনি, শপিং মলের খুব কাছেই বাস স্টপ যেখান থেকে আমাদের গন্তব্যের বাস আসার কথা আমরা অপেক্ষা করছিলাম, সাধারণত মিনিট ১০-এর মধ্যে বাস আসার কথা কিন্তু আধঘণ্টটা পরেও যখন বাস এলো না তখন আশ-পাশের পথচারীদের সাথে কথা বলে জানলাম আজ এই সার্ভিসটি বন্ধ, মাঝখান থেকে আমাদের আধাঘণ্টা সময় নষ্ট। তারপর যথারীতি মেট্রোতে ফেরা, হোটেলে পৌঁছুতে পৌঁছুতে রাত প্রায় ৯টা। এরপর আবার রাতের খাবারের জন্য বের হতে হলো, রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ডিনার সেরে আমরা হোটেলে ফিরলাম। পরদিন সকাল সকালে বের হবো তাই রিসিপশনে সকালের জন্য ট্যাক্সির কথা বলে রাখলাম। ও, হ্যা আমাদের পরদিনের গন্তব্য গ্যাংটিং হাইটস।

মালয়েশিয়ায় আমাদের চতুর্থ দিন, সকাল সকাল তৈরি হয়ে নাশতা সেরে নিলাম। এর মধ্যেই ট্যাক্সি এসে হাজির, আমরা বেরিয়ে পড়লাম গ্যাংটিং হাইটস-এর উদ্দেশে। আমাদের আবাস এরিয়া থেকে গ্যাংটিং হাইটস-এর দূরত্ব প্রায় ৬০ কি.মি. ট্যাক্সিতে যেতে সময় নিয়েছিল প্রায় ঘণ্টাদেড়েক। মনোরম নিরিবিলি রাস্তা, মাঝে মাঝে ঘন বৃক্ষরাজি ভেদ করে পথ চলে গেছে। পথের প্রতিটা বাঁকই যেন সৌন্দর্যের ডালা সাজিয়ে পথচারীদের জন্য অপেক্ষমাণ। শুধু সুন্দর বললে ভুল হবে, সৌন্দর্যের সাথে মিশে আছে এক মায়াময় শ্যামল ¯িœগ্ধতা। আসলে মালয়েশিয়ায় নিয়ম মেনেই বন তৈরি ও এর যথাযথ যতœ-আত্তি হয়, তাই চারি দিকে সবুজের অবারিত সমাহার।

গ্যাংটিং হাইটস মালয়েশিয়ার একটি জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। এর অবস্থান ও উচ্চতা একে বিশেষত্ব দিয়েছে তার সাথে রয়েছে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এ পর্যটন কেন্দ্রটি মূলত স্কাই কেবলের জন্য বিখ্যাত। শহরের নির্দিষ্ট স্থান থেকে এখানে স্কাই ক্যাবলে করে যাওয়া যায়। আমরা অবশ্য সরাসরি ট্যাক্সি করেই হাইল্যান্ডে উঠে গেছি। হাইল্যান্ডের উপরে যেন একটি ছোটোখাটো শহর- রয়েছে হোটেল, শপিং মল, ক্যাফে, ক্যাসিনো আর বিভিন্ন রাইডস। এর মধ্যে আওয়ানা স্কাই ক্যাবল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আওয়ানা স্কাই ক্যাবল কার লাইনের দৈর্ঘ্য ২.৪ কিলোমিটার। এর মোট তিনটি স্টেশন একটি তো আওয়ানা যা গ্যাংটিং হাইটস-এ, অন্যটি শহরের মূল ভূ-খ-ে, যার নাম স্কাই অ্যাভিনিউ স্টেশন আর মাঝের স্টেশনটির নাম চিন সিউ স্টেশন, যেখানে একটি প্রাচীন চিনামন্দির রয়েছে, যা গুহামন্দির নামেও পরিচিত। এই পুরো পথটি স্কাই ক্যাবল কারে অতিক্রম করতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। আর পুরো পথটি চলে গেছে প্রাচীন রেইন ফরেস্টের উপর দিয়ে। চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, এটাই আসলে এই পথের মূল আকর্ষণ।

গ্যাংটিং হাইটস-এ পৌঁছে আমরা শুরুতেই চলে যাই ক্যাবল কার টিকেট কাউন্টারে। কারণ, এখানে ভীড়টা বেশি আর আমরা দুপুরের মধ্যে কুয়ালালামপুর ফিরবো, তাই আগেভাগে ক্যাবল কার রাইড সেরে নিতে চাইছিলাম। ভ্রমণের শুরুতেই জানিয়েছিলাম, আমরা বাংলাদেশ থেকে মোট তিনজন গিয়েছিলামÑ আমি, গাফ্ফারী আর শিউলি। আর মালয়েশিয়ায় আমরা তিনজনই একসাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি, বলা বাহুল্য এখানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শিউলির অবশ্য উচ্চতাভীতি থাকায় সে ক্যাবল কারে উঠতে রাজি হয়নি, তাই আমি আর গাফ্ফারী ভ্রমণটা সেরে নিলাম। নিচে বিস্তৃত সবুজের সমারোহ তার উপর আমরা যেন পৃথিবীর প্রান্ত অতিক্রম করছি, আসলেই অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। আমরা মাঝের স্টেশনে, মানে চিন সিউ স্টেশনে নামিনি, পরে অবশ্য আফসোস করেছি।

ক্যাবল কার থেকে নেমে আমরা বিশাল শপিং মলের অলিগলি ঘুরে বেড়ালাম, তারপর এলাম মিনি থিম পার্কে, তার পাশেই ক্যাসিনো। ক্যাসিনোর ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ না-থাকায় থিম পার্কেই কিছুটা সময় কাটালাম, ছবি তুললাম, এরপর হালকা কিছু ¯œ্যাকস খেয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার পথে ট্যাক্সি পেতে সময় লেগেছিল। যা হোক, শেষ পর্যন্ত খুব বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি, যদিও ট্যাক্সি আমাদের হোটেল পর্যন্ত যেতে রাজি হয়নি তাই বুকিট বিনতান পর্যন্ত আমরা ট্যাক্সি নিলাম, এতে অবশ্য আমাদের সুবিধাই হলো। এটা একটা মার্কেট প্লেস, আমাদের কিছু কেনাকাটা করা দরকার ছিল; আমরা সেখান থেকে কেনাকাটা সেরে মেট্রোতে একবারে হোটেলে পৌঁছুতে পারবো। হলোও তাই। তবে, হোটেলে ফেরার আগে আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিলাম।

আমাদের ফেরার ফ্লাইট ভোর রাতে, তাই পুরো বিকেল-সন্ধেটা আমরা আশপাশ ঘুরে দেখবো- এই পরিকল্পনায় দুপুর না-ফুরাতেই বেরিয়ে পড়লাম, আজ আমরা শিউলির এক বন্ধুদম্পতির অতিথি হয়ে শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি, যার মধ্যে সিটি সেন্টার, পার্ক, মসজিদ এবং সবচেয়ে কাক্সিক্ষত টুইন টাওয়ার। প্রথম দিন দিক ভুলে টুইন টাওয়ারে পরিপূর্ণ সৌন্দর্য দেখা হয়নি। আজ হোস্ট দম্পতির সহযোগিতায় আর সে ভুল হয়নি। তবে, যদি আজ না আসা হতো তবে নিঃসন্দেহে আফসোস থেকে যেত।

আমরা সন্ধ্যা পার করে একেবারে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। আমাদের ল্যাগেজ মোটামুটি গোছানোই ছিল, শুধু শেষ মুহূর্তে সবকিছু চেক করে নিয়ে হোটেল ফর্মালিটিস মিটিয়ে রাত সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। প্রায় ঘণ্টাদেড়েকের পথ, রাত বারোটায় আমরা এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাই। এরপর বোডিংসহ যাবতীয় কাজ শেষ করে আমরা দুই ঘণ্টার জন্য ঝাড়া হাত-পা। বিশাল এয়ারপোর্ট প্রায় নিস্তব্ধ, অধিকাংশ দোকান-পাটও বন্ধ, তাই সময় যেন থেমে আছে। আমরা ক’জন এই থেমে যাওয়া সময়কে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। ঘড়ির কাঁটা যেন কোনোভাবেই তিনটের ঘরে যেতে রাজি নয়। অবশেষ ঘোষণা হলো গেট ওপেনের, আমরা ততক্ষণে লাইনে দাঁড়িয়ে। অবশেষে ফিরতি প্লেনে, প্লেনের জানালা দিয়ে বিদায় জানালাম রাতের ঝিকিমিকি তারার আলোতে জ¦ালতে থাকা কুয়লালামপুরকে।