ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আটরশি-পুকুরিয়া সড়কের পাশে বাইশরশি নামক স্থানে প্রাচীন জমিদারবাড়িটি এখনো ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। প্রায় তিন শত বছর পূর্বে মুঘল শাসনামলে জনৈক রঘুরাম সাহা নামে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ফাতেহাবাদ [ফরিদপুর জেলার প্রাচীন নাম] অঞ্চলে বেশ কয়েকটি পরগনার জায়গির লাভ করে জমিদারি শুরু করেন। রঘুরামের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে উদ্ধরচন্দ্র সাহা জমিদার হন। তিনি বরিশাল জেলার কালায়া অঞ্চলের কয়েকটি পরগনা ক্রয় করে জমিদারির সীমা বিস্তৃত করেন। উদ্ধরচন্দ্র সাহার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে হরেকৃষ্ণ সাহা জমিদারি লাভ করেন। তিনিও পিতার মতো পটুয়াখালির বাউফল অঞ্চলের কয়েকটি পরগনা ক্রয় করে জমিদারির সীমানা আরো বিস্তৃত করেন। জমিদার হরেকৃষ্ণ সাহার তিন ছেলে। বড়ো ছেলে রামজয় সাহা, মেজ ছেলে ধনঞ্জয় সাহা ও ছোটো ছেলে রঞ্জন সাহা। হরেকৃষ্ণ সাহা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে মৃত্যুর আগেই বড়ো ছেলে রামজয় সাহাকে জমিদারির দায়িত্ব প্রদান করেন। পিতার মৃত্যুর পর রামজয় সাহা ছোটো দুই ভাইকে নিয়ে একত্রে বসবাস করতেন। তখন জমিদারবাড়ির বাহিরের দিকে একতলা কাচারিভবন ও দুর্গামন্দির এবং জমিদারবাড়ির অন্দরমহলের সম্মুখভাগের তিনটি ভবন ও ভেতরের আরো তিনটি ভবন পরিবার ও আত্মীয়দের বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হতো। জমিদার রামজয় সাহার মৃত্যুর পর বড়ো ছেলে বৈকুণ্ঠ সাহা ও ছোটো ছেলে নীলকণ্ঠ সাহার মধ্যে জমিদারি ভাগ হয়ে যায়। তখন ছোটো ছেলে নীলকণ্ঠ সাহা জমিদারবাড়িটির পূর্বাংশে একই নকশায় আরো একটি একতলা কাচারিভবন ও দুর্গামন্দির নির্মাণ করেন। বসবাসের জন্য আলাদাভাবে পুরাতন ভবনের পাশেই অন্দরমহল হিসেবে আরো পাঁচটি নতুন দোতলা ভবন নির্মাণ করেন তিনি।
জমিদার বৈকুণ্ঠ সাহার কোনো সন্তান ছিল না। তিনি মহীমচন্দ্র সাহাকে দত্তক নেন। নীলকণ্ঠ সাহার দুই ছেলে ছিল। বড়ো ছেলে রাজেন্দ্র সাহা এবং ছোটো ছেলে দেবেন্দ্র সাহা। জমিদারবাড়ির বৈকুণ্ঠ সাহার অংশটি বড়ো তরফ এবং নীলকন্ঠ সাহার অংশটি ছোট তরফ নামে পরিচিত ছিল। জমিদার বৈকুণ্ঠ সাহার মৃত্যুর পর দত্তক পুত্র মহীমচন্দ্র সাহা বড়ো তরফের জমিদার হন। জমিদারি লাভের পর মহীমচন্দ্র সাহা আরো কয়েকটি পরগনা ক্রয় করে জমিদারি আরো বিস্তৃত করেন। নীলকণ্ঠ সাহার মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে রাজেন্দ্র সাহা ও দেবেন্দ্র সাহা ছোটো তরফের জমিদারি লাভ করেন। ইংরেজ সরকারের অনুগত ও বিশ্বস্ত জমিদার ছিলেন তাঁরা। দক্ষতার সাথে জমিদারি পরিচালনা ও খাজনা আদায়ে সফলতার জন্য তৎকালীন ইংরেজ শাসাক [ব্রিটিশ সরকার] তাঁদের ‘রায়চৌধুরী’ উপাধি প্রদান করে। এরপর থেকেই বাইশ রশির পরবর্তী জমিদারগণ বংশ পদবি সাহার পরিবর্তে ‘রায়চৌধুরী’ ব্যবহার করতে থাকেন।
জমিদার বাড়িটির দক্ষিণ পাশ দিয়ে বাড়ির বুক চিরে সদরপুর উপজেলার আটরশির ও পুকুরিয়া সড়ক চলে গেছে।
পঞ্চাশ একর জমির উপর নির্মিত বাইশরশি জমিদারবাড়িটি বড়ো তরফ ও ছোটো তরফ দুটি অংশে বিভক্ত। জমিদারবাড়ির বড়ো তরফ অংশের অন্দরমহলে ৬টি দোতলা ভবন এবং ছোটো তরফ অংশের অন্দরমহলে ৫টি দোতলা ভবন রয়েছে। অন্দরমহলের দক্ষিণ পাশে বাহিরের দিকে দুই তরফের একটি করে একতলা কাচারিভবন ও দুর্গামন্দিরসহ দুই অংশে ১৫টি স্থাপনা ছিল। এছাড়াও জমিদার বাড়িটির কাচারিভবনের দক্ষিণ পাশে আড়াইশ’ বছরের প্রাচীন রাধাকৃষ্ণমন্দির ও শতবর্ষ প্রাচীন দোলমন্দির রয়েছে।
জমিদার বাড়ির পশ্চিম অংশে বড়ো তরফের অন্দরমহলের দুটি ভবন সম্পূর্ণরূপে এবং দুটি ভবন আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।
বড়ো তরফ ও ছোটো তরফের দোতলা বিশিষ্ট অন্দরমহলে নিচতলা ও দোতলায় একাধিক শয়নকক্ষ, অতিথিকক্ষ, বৈঠকখানা, রংমহল, দাসদাসী ও কর্মচারীদের থাকার কক্ষসহ শতাধিক কক্ষ ছিল। জমিদার বাড়ির সীমানার মধ্যে একসময় পাঁচটি শান বাঁধানো দিঘি ছিল। জমিদারবাড়ির পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে বড়ো দুটি দিঘি এখনো টিকে আছে। পূর্ব পাশের দিঘিতে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা বাঁধানো ঘাট ও প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। অন্য দিঘিটি রাধাকৃষ্ণ ও দোলমন্দিরের দক্ষিণে। এই দিঘির উত্তর ও দক্ষিণে বাঁধানো ঘাট ও প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে। দিঘিটির উত্তর পাড়ে আড়াইশ’ বছরের প্রাচীন রাধাকৃষ্ণমন্দিরটির ছাদ ও দেয়াল ধসে পড়েছে। পাশের শত বছরের প্রাচীন দোল মন্দিরটি এখনো অক্ষত রয়েছে।
আঠারো শতকের প্রতাপশালী এই জমিদার-পরিবার ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলের বাইশটি জোতমহাল বা পরগনায় তাঁদের জমিদারি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এজন্য তাঁদের বাইশরশি জমিদার বলা হয়। খাজনা আদায়ের জন্য ফরিদপুরের নগরকান্দা ও চরকৃষ্ণপুর এবং বরিশালের কালিয়া ও পটুয়াখালির বাউফলে তাঁদের কাচারিভবন এখনো সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

ফরিদপুরে শিক্ষা বিস্তারে বাইশরশি জমিদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জমিদার মহেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে বাইশরশিতে তাঁর মা শিব সুন্দরী চৌধুরানীর নামে একটি উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন করেন। জমিদার রমেশ চন্দ্র রায়চৌধুরীর আর্থিক সহযোগিতায় ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ। পরবর্তীকালে ফরিদপুরের সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজে প্রতিষ্ঠার নেপথ্যেও তাঁদের সহযোগিতা ছিল।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ বিভক্তির পর জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হলে জমিদার সুকুমার রায় বাহাদুর চৌধুরী ছাড়া জমিদার পরিবারের সবাই কোলকাতা চলে যান। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে হানাদার বাহিনীর আতঙ্কে জমিদার সুকুমার রায় বাহাদুর চৌধুরী আত্মহত্যা করেন। এরপর থেকে দীর্ঘদিন বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। স্বাধীনতার পর বাড়িটির একতলা কাচারিভবনে কয়েক বছর সদরপুর উপজেলা ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। সংস্কারের অভাবে কাচারিভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলে পাশে নতুন একটি একতলা ভবন তৈরি করে ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশাল এই জমিদার বাড়িটির অন্দরমহলের দুই অংশই সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বাড়িটির অনেক জমি দখল হয়ে গেছে। বর্তমানে জমিদার বাড়ির মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে।
জমিদার বাড়িটির বিভিন্ন ভবন নির্মাণে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং ও দেশীয় স্থাপত্যরীতি লক্ষ্য করা যায়। বাড়িটি নির্মাণে উপকরণ হিসেবে ইট, চুন, সুরকি, কাঠ ও লোহার ভীম ব্যবহার করা হয়েছে। ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায় বাইশরশি অঞ্চলের আড়াইশ’ বছরের প্রাচীন জমিদার বাড়িটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন।
লেখক : গবেষক, লেখক এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা