বর্ষা নাকি এক ঘরবন্দি সময় অথচ বর্ষা এলেই আমার মন উড়ু উড়ু করে। ইচ্ছে করে সাগরপাড়ে গিয়ে সমুদ্রের পাগলা ঢেউ দেখি, নদীর উপরে অলস বসে চিত্রার রূপ দেখি অথবা পাহাড় বেয়ে ছুটে চলা ঝর্নার উন্মাদনা দেখি। সবসময় যে এই ইচ্ছে পূরণ হয় তা নয়, আবার কখনো কখনো আংশিক পূরণ হয়। যেমন সমুদ্্ের গিয়েছি কিন্তু বর্ষা তখন বিদায় নিয়েছে, আর পাহাড়ে কাগজের বর্ষায় যাওয়া হলেও বাস্তবে বৃষ্টির ছিটেফোঁটার দেখা নেই। তবে, এবারের গল্প ভিন্ন। আগস্টের প্রথম, ক্যালেন্ডারের পাতায় সময় তখন ভাদ্র, একটি নারী ট্রাভেল গ্রুপের সাথে রওনা হলাম সুনামগঞ্জের পথে। কোনো বাণিজ্যিক ভ্রমণদলের সাথে এটা আমার দ্বিতীয় যাত্রা, অবশ্য দু’টি ভিন্ন দল, তবে কোনোটাই খুব একটা সুুখকর নয়। সে অন্য গল্প, তবে কোনো ক্ষেত্রেই কিন্তু প্রকৃতি আমাকে নিরাশ করেনি।
দিনটি বৃহস্পতিবার, আমি আর আমার একজন সিনিয়র ব›ধু কাম আপা দু’জনে চলে গেলাম যাত্রাবাড়ি, সেখান থেকে আমাদের বাসযাত্রা শুরু। শুরুটা বেশ ভালোই ছিল সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত। বাসে উঠে গুছিয়ে নিয়ে বসলাম, বাস সবে চলতে শুরু করেছে তখনই আমাদের ঠিক সামনের সিটের একজন যাত্রী হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন আর সেদিকে তাকাতেই দেখলাম একজন কিশোর বাসের জনালার ধার থেকে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল সেইসঙ্গে নিয়ে গেল সহযাত্রীর সাধের মোবাইল, সে তখন ফোনে তার যাত্রার বিবরণী শেয়ার করছিল তার কোনো পরিচিতজনকে। আচমকাই যেন উচ্ছল পরিবেশটা কিছুক্ষণের জন্য গুমোট হয়ে রইলো। বাস চলতে শুরু করলে একসময় শহরের জ্যাম ছেড়ে আমরা অনেকটা মুক্ত মহাসড়কে, রাতের হালকা ঠান্ডা বাতাস শরীরের সাথে সাথে মনকে শান্ত করে তোলে। ধীরে ধীরে গুমোট ভাবও কেটে গেল, সবাই আবার হালকা মেজাজে খোশগল্পে মেতে উঠি।
আমি আর কাউসার আপা পাশাপাশি বসে চলমান জীবনের তাবৎ বিষয় নিয়ে গল্প জুড়েছি। বাসের মধ্য বিরতি পর্যন্ত চলে আমাদের গুজগুজানি, বিরতিতে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করে টুকটাক কিছু খেয়ে নিয়ে আবার বাসে উঠে বসি। এরপরও কিছুক্ষণ গল্পের গুণগুনানি চলে, এক সময় খেয়াল করলাম কাউসার আপা ঘুমে ঢুলছেন, আমি সচারাচর বাস জার্নিতে ঘুমুতে পারি না। তাই কানে ইয়ার বাট গুজে গান শোনায় মন দিলাম। সম্ভবত ভোরের দিকে হালকা ঝিমুনি এসেছিল কিন্তু প্রচণ্ড শব্দ আর ঝাঁকুনিতে চমকে উঠলাম। আসলে শুরু থেকেই আমাদের বাসচালক বেশ বেপরোয়াভাবেই ড্রাইভ করছিলেন, সুনামগঞ্জের এই রাস্তাটা বেশ সরু হওয়ায় পাশাপাশি দুটো বাস এমনিতেই চলতে কষ্ট হয় সেখানে যদি কে আগে যাবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে তাহলে তো কথাই নেই। অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া, যা হোক, এরপর কোনোরকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই আমরা গন্তব্যে পৌঁছালাম। আসলে দূর যাত্রার বাসগুলোর চালকদের অধিকাংশই বেশ অস্থির, এরা কোনোরূপ নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না আর সেটা যদি হয় নন-এসি তাহলে তো কথাই নেই। একেবারে লাগামছাড়া।
বাস থেকে নেমে হাঁটা দূরত্বে ঘাট, ঘাটে আমাদের তরী প্রস্তুত। আমরা চটপট নৌকায় উঠে পড়লাম। এগুলোকে হাউজ বোট বলে, রবীন্দ্রযুগের বজরার বর্তমান বাণিজ্যিক সংস্করণ এই হাউজ বোট। আমরা সকাল সকাল সুনামগঞ্জ পৌঁছালেও বোট ভাসাতে বেশ দেরি হলো, কোন একজন যাত্রী যিনি চট্টগ্রাম থেকে এসে আমাদের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, তিনি বেশ দেরী করে ফেললেন। অবশেষে বেলা দশটায় আমরা জলে ভাসলাম, মানে আমাদের বোট আরকি। এর মধ্যে নাশতা পরিবেশন করা হলো খিচুড়ি, ডিমের ভুনা, সবজি এইসব। সকালের খাবারটা আমরা বোটের ভিতেরে বসেই খেয়ে নিলাম। আগেই বলেছিলাম, এই সব গ্রুপ ট্যুরে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়, তার অন্যতম কারণ তাদের কথা আর কাজের অমিল। যেমন বলা হয়েছিল আরামের সাথে লাক্সারি যাত্রা কিন্তু আদতে এর কোনোটারই দেখা নেই। আমি ভ্রমণ করতে পছন্দ করি, সবধরনের ভ্রমণেই আমি অভ্যস্ত সে হোক বাজেট ট্রিপ অথবা লাক্সারী, কিন্তু সবকিছুর জন্যই মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন। যখন আমি জানবো যে আমাকে কি ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে হবে, তখন কিন্তু সে পরিস্থিতি আমার কাছে ততটা জটিল লাগবে না যেটা হুট করে চলে আসা একটি জটিল পরিস্থির ক্ষেত্রে হবে। যাই হোক, এই ফাঁকে ট্রাভেল গ্রুপটার নাম বলে রাখি, ‘ফ্লাই ফর লেডিস’। এরপর প্রায় ঘণ্টাতিনেক হাওরের জলে ভেসে বেড়ানো, চারিধারে জল থইথই খুব দূরে দূরে দুয়েকটা বাড়ি, মাঝিরা এখানে সেখানে জাল ফেলছে। কিশোরেরা নৌকা বেয়ে কোথাও যাচ্ছে। হাওরের জলে জলপাখিদের আনা-গোনা, সে এক নয়নজুড়ানো দৃশ্য। এরপর একজায়গায় এসে আমরা থিতু হলাম সেটাও হাওরের মাঝে। আশেপাশে অনেক বোট সবাই থেমে আছে। কারণ, খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম এখন লাঞ্চ টাইম, আর টানা বোট চালানোও খুব ক্লান্তিকর। তাই মাঝে মাঝে কিছুক্ষণের বিরতি। এরপর খানিক বিরতিতে আবার ভেসে চলা। চলতি পথে জাদুকাটা নদীর সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে যাওয়া। চলতে চলতে বিকেলে আমার সেদিনকার মতো নোঙর ফেলাম। এই ঘাট থেকে আমরা শিমুল বাগান যাবো এর আগে অবশ্য বারেকের টিলায় উঠবো

অনেকটা চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা বারেকের টিলায় পৌঁছুলাম। সেখান থেকে বহুদূর পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হয়। যেহেতু আলো থাকতে থাকতেই আমাদের শিমুল বাগানটাও দেখতে হবে, তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বারেকের টিলায় খুব বেশি সময় থাকা সম্ভব হয়নি। বারেকের টিলা থেকে নেমে আমরা আবার ঘাটে ফিরে এলাম, সেখান থেকে খেয়া পারাপারে শিমুল বনে। শিমুল বনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল আমার বহুদিনের। তবে, সেটা এই সময়ে না। বসন্তের শিমুল বন দেখবো বলে বেশ কয়েকবছর পরিকল্পনা করেও সফল হতে পারিনি। আসলে ব্যাটে-বলে মিলছিল না। এখন যখন শিমুল বনে এলাম তখন তার বসন্ত বহুদূর। তবে, কিশোরী পল্লবের ঘনসবুজ শিমুল বনের শ্যামলরূপ যতটা নয়ন না-জুড়ায় তার চেয়েও বেশি মনকে শান্ত করে তোলে। বিকেলের পড়ন্ত বেলায় সুর্য যেন লাজে রাঙা হয়ে ঘরে ফিরছে, যেন নতুন বৌ। এরপর ঘন সবুজ বনে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এলো আমরা বোটে ফিরে এলাম।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙলো প্রচণ্ড গরমে। কারণ কী ? জনলাম জেনারেটর বন্ধ, অথচ এরকমটা হওয়ার কথা ছিল না। গরমে কাউসার আপা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, কিন্তু ট্যুর টিমের সমন্বয়কদের কোনো হেলদোল নেই। কিছুক্ষণ পর ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে গরম কিছুটা কমলো, আমরা নিলাদ্রী লেকের উদ্দেশে বের হলাম অবশ্য এর মধ্যে আমরা লাকমাছড়া মিস করে ফেলাম। তবে, বৃষ্টিতে লেকে নৌভ্রমণ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ভ্রমণ দলের বেঁধে দেওয়া সময়ে আমাদের নৌকায় ফিরে আসতে হলো। কারণ, এবার নোঙর তোলার পালা। নৌকায় ফিরে কাউসার আপা কেবিনে ঢুকে গেলেও আমি ছাদে উঠে গেলাম। সেখানে বসেই প্রকৃতি দেখতে দেখতে সকালের নাশতা সেরে নিয়ে টানা তিন ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজলাম। এও এক অনন্য অভিজ্ঞতা। নৌকা যখন ওয়াচ টাওয়ারে পৌঁছালো তখন অনেকেই বয়া বা লাইফ জ্যাকেট নিয়ে হাওরে নেমে পড়লো। আমি আর দু’জন একটি ছোটো ডিঙ্গি করে চারপাশটা ঘুরে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরলাম। কাউসার আপার পানিতে ভয় কাজ করে বলে তিনি হাউজ বোটেই রয়ে গেলেন। আধঘণ্টার মতো ভেসে আমরা ফিরলাম, নৌকাও চলতে শুরু করলো। বাকিটা সময় হাউজ বোটে থেকে প্রকৃতি ও তার যত্নে লালিত পাখ-পাখালি দেখে সময় কেটে গেল। দুপরের খাওয়া, বিকেলের নাশতা আমি বোটের ছাদে বসে খেয়ে নিলাম। তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে আমরা গোছগাছে মন দিলাম, এবার কেননা নীড়ে ফেরার তাড়া...