একদিকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, অন্যদিকে শেফালি ফুল ফোটার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি— এই দ্বিমাত্রিক প্রাকৃতিক আবহ আর আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, জামরুলের মতো রসালো ফলের সুগন্ধে প্রকৃতি যখন আমোদিত, ঠিক সেই মোহনক্ষণে বাংলা ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার অজয় নদীর দক্ষিণে চুরুলিয়ার বিখ্যাত কাজী পরিবারে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। ধূমকেতুর মতো নিজের আবির্ভাবের কথা কবি নিজেই বলেছেন তাঁর ‘চিরনির্ভয়’ কবিতায় : ‘অবিশ্বাসীরা শোনো, শোনো সবে জন্মকাহিনী মোর/আমার জন্মক্ষণে উঠেছিল ঝঞ্ঝা তুফান ঘোর।’ এ-কারণেই হয়ত নজরুল জীবনভর ছিলেন জ্যৈষ্ঠের ঝড়ের মতোই উন্মাতাল ও ধাবমান। তাঁর একহাতে যেমন ছিল প্রেমে অবগাহনের মোহন সুরের বাঁশি— ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী’, তেমনি অন্য হাতে ছিল সমরাস্ত্র— ‘আর হাতে রণতূর্য’।
নজরুলের সাহিত্যসাধনার স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে তাঁর চিরপ্রেমী, চিরবিরোহী ও চিরবিদ্রোহী সত্তায়। নজরুলের বিদ্রোহ ও সমাজসচেতনতা বিষয়ক কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : অগ্নিবীণা [১৯২২], বিষের বাঁশি [১৯২৪], ভাঙার গান [১৯২৪], সাম্যবাদ [১৯২৫], সর্বহারা [১৯২৬], ফণিমনসা [১৯২৭], সন্ধ্যা [১৯২৮ ও ১৯২৯], প্রলয় শিখা [১৯৩০]। আর প্রেম ও আত্মচেতনমূলক কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : দোলন চাঁপা [১৯২৩], ছায়ানট [১৯২৫], পুবের হাওয়া [১৯২৫], সিন্ধু হিন্দোল [১৯২৭], চক্রবাক [১৯২৯]।
পরাধীন ব্রিটিশ-ভারতে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের তূর্য-নিনাদ বাজিয়ে বাংলাসাহিত্য-আকাশে আবির্ভূত হন— ‘আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’ ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেন আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হওয়া উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল যতদিন পর্যন্ত বন্ধ না-হবে ততদিন তিনি শান্ত হবেন না। তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন পরাধীনতা, দাসত্ব ও প্রতিক্রিয়াশীল জীর্ণ সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। পরাধীন মানুষের মনে তীব্র আঘাত হেনে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে প্রতিবাদ জানাতে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন নজরুল।
বাল্যকালে পিতৃহারা নজরুলের নাম রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’। এই নামেরই অবশ্যাম্ভাবী পরিণতি হিসেবে তাঁকে জীবনভর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হয়েছিল। দারিদ্র্যের অনলে পুড়ে কবি পরিণত হয়েছিলেন খাঁটি সোনায়— ‘হে দারিদ্র্য তুমি করে করেছ মহান/তুমি মোরে দানিয়াছ খ্র্রিষ্টের সম্মান।’ সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব, পরাধীনতার গ্লানি, স্বদেশবাসীর প্রতি ব্রিটিশরাজের অত্যাচার ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপে বিক্ষুব্ধ হওয়া, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন দেশবাসীর আত্মঘাতি জীবনদর্শন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রভৃতি নজরুলের বিদ্রোহীচেতনার মনোভূমি নির্মাণের নিয়ামকশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এ-ছাড়াও সিপাহী বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব জালিয়ানওয়ালা বাগের নির্মম হত্যাকাণ্ড, দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ এবং পরপর সংঘটিত দুটি বিশ্বযুদ্ধ নজরুলের কবিমানস গঠনে দূরসঞ্চারী ভূমিকা রাখে।
নজরুলের মতো এমন তেজদীপ্ত সমাজ ও রাজনীতিসচেতন দ্রোহী ও প্রেমিক প্রতিভা বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে বিরল। তৎকালীন উপনিবেশবাদ, সামাজিক রাজনৈতিক অন্যায় অনাচার অবিচার আর সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের বিদ্রোহী কবিতায় এমন সর্ববিনাশী দ্রোহী উচ্চারণ আর কাউকে করতে দেখা যায় না : ‘আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়মকানুন শৃঙ্খল। আমি মানি না কোনো আইন/ আমি ভরা তরী করি ভরা ডুবি, আমি টর্পেডো, ভীম ভাসমান মাইন।’
নজরুল সাম্রাজ্যবাদী শোষণমুক্তির কথা ছাড়াও শ্রেণিহীন সর্বশোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। এ-প্রসঙ্গে ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের ‘কৃষকের গান’ কবিতার দুটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে : ‘আজ চারিদিক হতে ধনিক বণিক শোষণকারীর জাত,/ও ভাই জোঁকের মতন চুষছে রক্ত কাড়ছে থালার ভাত।’ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন নজরুল। তাঁর কবিতায় যেমন হিন্দু পুরাণপ্রসঙ্গ, তেমনি অবলীলায় ব্যবহার করেছেন আরবি-ফারসি ও ইসলামি শব্দ। তাঁর কাছে হিন্দু-মুসলমানে কোনো প্রভেদ ছিল না।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যখন তীব্রতর হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ অনেক ক্ষেত্রে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ ও সাম্প্রদায়িক হানাহানি চরম আকার ধারণ করেছিল। দেশপ্রেম ও ত্যাগের চেয়ে মানুষের কাছে ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক পরিচয় বড়ো হয়ে উঠেছিল। জাতির এমন দুর্দিনে সঠিক ঐক্যের অভাব এবং নেতৃত্বদানকারীদের দুর্বলতা কবিকে গভীরভাবে ব্যথিত ও চিন্তিত করেছিল। এমন রাজনৈতিক পরিবেশে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল থেকে প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত কলকাতার হ্যারিসন রোড, চিত্রপুর ডেক এলাকাসহ নানা স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চলে। অসাম্প্রদায়িক চেনতায় ঋদ্ধ কবিমন কেঁদে ওঠে স্বদেশের এমন বিদ্বেষপূর্ণ রূপ দেখে। তখন কবি রচনা করেন ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতা ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধসহ বেশ কিছু অসাম্প্রদায়িক কবিতা, গান ও প্রবন্ধ। ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতায় কবি সমাজ ও দেশের কর্ণধার বা নেতৃত্বদানকারী [‘কাণ্ডারী’ বা নাবিক] ব্যক্তিবর্গকে চরম দায়িত্বহীনতা ও দলাদলি ভুলে জাতিকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য সতর্ক ও সজাগ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সমস্ত বিভ্রান্তি ও অরাজকতা ছাপিয়ে কবি দেশের সংগ্রামী যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তির লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় কবি বলেন : ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ? ওই জিজ্ঞাসে কোন্? জন ?/ কাণ্ডারী ! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র !’ কবিতাটি পরে ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়।
‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থদ্বয়ে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও পরাধীনতার বন্ধন মোচনের তীব্র আর্তি পরিলক্ষিত হয়। ‘বিষের বাঁশি’র ‘বিদ্রোহের বাণী’ কবিতায় বিদ্রোহভাব ফুটে উঠে চমৎকার বাকভঙ্গিমায় : ‘যেথায় মিথ্যা ভণ্ডামি ভাই করব সেথায় বিদ্রোহ/ধামাধরা, ঝামাধরা মরণভীতু চুপ রহো।’
‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থটি অসহযোগ আন্দোলনের প্রাণোন্মাদনাকেই বহন করেছে। এ-কাব্যের ‘ভাঙার গান’, ‘জাগরণী’, ‘মিলন গান’, ‘দুঃশাসনের রক্তপান’ প্রভৃতি কবিতায় বিদেশি শাসকদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর কবি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য কামনা করেছেন।
১৯২২ সালে ১১ আগস্ট ধূমকেতু পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য করে লিখেন ‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ এ-কবিতা প্রকাশের অপরাধে কবি প্রথম কারারুদ্ধ হন। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দেও একবার তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়, গণমানুষের পক্ষে কথা বলার কারণে। কোনো নির্যাতন বা দমননীতিই নজরুলকে তাঁর অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো লেখনি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি তিল পরিমাণও।

কখনো দ্রোহী, কখনো প্রেমিক, কখনো প্রকৃতির পূজারি আবার কখনও মরমি সাধক নজরুল মূলত যৌবনের কবি। যৌবনের ধর্মই হচ্ছে প্রেম ও বিদ্রোহ। যা সমসাময়িক আবেগ দ্বারা চালিত। নজরুল আবেগে বিহ্বল হয়েছিলেন। কখনো সে আবেগ সংগ্রামমুখী আবার কখনো তা প্রেমধর্মী। মানুষের মুক্তি তিনি চেয়েছিলেন এবং সে-জন্য সংগ্রামেও লিপ্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সংগ্রামশীল প্রেয়সীর নত নয়ন তাঁর দৃষ্টিতে ভাসে এবং তিনি বিদ্রোহীর রক্তরথের চূড়ায় প্রিয়ার নীলাম্বরী শাড়ির আঁচল ওড়াতে চান। বিদ্রোহের সানাই বাজার মুহূর্তেও কবির গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি মনে পড়ে। মনে আসে চপল মেয়ের ভালোবাসার কথা। কেননা কবির প্রেমিকসত্তা ও দ্রোহীসত্তা পরস্পরের হাত ধরে চলে— ‘আমি গোপনপ্রিয়ার চকিত চাহনি/ছল করে দেখা অনুখন।/আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা তার কাঁকন চুড়ির কঙ্কন।’ [বিদ্রোহী] প্রেমের অপার রহস্যের অনুসন্ধানি ও আবেগাপ্লুত কবি ‘দোলান চাঁপা’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূজারিণী’ কবিতায় উচ্চারণ করেন : ‘তবু তব চোখে-মুখে এ অতৃপ্তি, এ কি স্নেহ-ক্ষুধা ! মোরে হেরে উছলায় কেন তব বুক-ছাপা এত প্রীতি-সুধা ?/সে রহস্য, রাণী/কেহ নাহি জানে/তুমি নাহি জান/আমি নাহি জানি।/ চেনে তাহা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ—/কাথা হ’তে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান।’ একই কাব্যগ্রন্থের ‘কবি-রাণী’ কবিতায় উচ্ছ্বসিত হয়ে কবিতা লেখার প্রেরণাদাত্রী প্রিয়ার উদ্দেশে বলেন : ‘তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি।/আমার এ রূপ- সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।
‘পূজারিণী’ কবির মানস প্রিয়া। নিজ হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছেন তার বেদীমূলে। তবুও বিরহকাতর কবি এ কাব্যের ‘অভিশাপ’ কবিতায় অভিমানে বলে ওঠেন— ‘যেদিন আমি হরিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে/ অস্তপারের সন্ধ্যা তারায় আমার খবর পুছবে-/বুঝবে সেদিন বুঝবে !’
নারীর শক্তি ও সাহসে চিরবিশ্বাসী নজরুল নারীকে ভালোবাসার পাশাপাশি কখনো-বা অবিশ্বাস-অভিমানে এবং বিরহে কাতর হন। নজরুল মনে করতেন প্রেম সত্য, প্রেমের পাত্র-পাত্রী নয় ; এবং এটা আদর্শের কথা নয়, বাস্তবের কথা, অভিধানের কথা নয়, অভিজ্ঞতার কথা।
অতৃপ্তি ও বেদনা প্রেমের কবিতার সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য। প্রেমানুভূতির প্রায় সর্বত্রই বিরহ ব্যথায় ম্লান হয়ে থাকে। প্রেমিক চিরদিনই বহন করে এক নীরব বেদনা। এই বেদনাই ব্যক্ত হয়েছে নজরুলের ‘দোলন চাঁপা’সহ অন্যান্য প্রেম বিষয়ক কবিতাবলিতে। ‘ছায়ানট’ কাব্যগ্রন্থের ‘চৈতী হাওয়া’ কবিতায় হারানো প্রিয়ার খোঁজে ব্যাকুল হয়ে কবি লেখেন : ‘হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর,/আজকে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাপার।/শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল,/কেন তুমি ফুটলে সেথা, ব্যথার নীলোৎপল ?’
আদতে নজরুলের বিদ্রোহের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে আত্মপ্রতিষ্ঠার বাণী। পরাধীন দেশের বেদনা ও শাসকের অত্যাচার, অন্যায়, অবিবেচনা, শোষণ এবং বঞ্চনা কবিকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই ছিল নজরুলের একমাত্র কাম্য। আর এ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই নজরুল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেছিলেন। এই যে কবিসত্তার বিদ্রোহী জাগরণ এটা কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে নজরুলের মন যে বিদ্রোহের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল সে মনোবিদ্রোহের মধ্যে ছিল তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতাজাত অনুভূতির প্রগাঢ় চেতনা। প্রেম প্রকাশের ক্ষেত্রে নজরুলের দ্বিমাত্রিক চেতনা লক্ষযোগ্য। কখনো প্রেমিক সত্তা নিরঙ্কুশভাবে বিলীন প্রেমাষ্পদের কাছে আবার কখনো-বা প্রেমবিদ্রোহ জাগরুক থাকে বিরহের যূপকাষ্ঠে নিজেকে বলি দিয়ে। প্রেমের ক্ষেত্রে নজরুলের এই যে দ্বিমুখী-চেতনাপ্রবাহ মূলত তাঁর বিদ্রোহীচেতনাকেই প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
উপমহাদেশের নবজাগরণ এবং মুসলিম রেনেসাঁর অন্যতম প্রাণপুরুষ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার অনন্য রূপকার কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহীচেতনা আমাদের জড়তা ও হতাশামুক্ত করে প্রতিনিয়ত সাহসী করে তোলে। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষকে সদা-সর্বদা জাগ্রত ও উজ্জীবিত হতে প্রেরণা জোগায়। তাই এখনো আমরা সঙ্কটে নৈরাজ্যে নৈরাশ্যে মাথা তুলি দাঁড়াই, হয়ে উঠি প্রতিবাদমুখর।
ছবি : সংগ্রহ