বসন্তে বিদেশ ভ্রমণ : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

11 Mar 2026, 02:02 PM ভ্রমন শেয়ার:
বসন্তে বিদেশ ভ্রমণ : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

মালয়েশিয়ায় আমাদের তৃতীয় দিনটি যথারীতি একইভাবে শুরু হলো তবে এদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে আড্ডাটা আরও জমজমাট ছিল। কারণ, ইতোমধ্যে অনেকের সাথেই পরিচয় হয়েছে, আড্ডায় যেমন জন বেড়েছে তেমনি বিষয়ে এসছে বৈচিত্র্য। ভিন্ন দেশ ভিন্ন সংস্কৃতি আর তাদের গণমাধ্যম এই ছিল আলোচনাল মুখ্য বিষয়। সাথে রাজনীতি-অর্থনীতি এমনকি শো-বিজ জগৎও বাদ যায়নি। খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডার সমাপ্তিতে আমাদের জন্য নির্ধারিত যান হোটেল গেটে হাজির, আমরা তৈরি হয়েই ডাইনিং-এ এসেছিলাম তাই বাস আসতেই একে একে উঠে বসলাম। সেদিনের সেশনে মিডিয়া ও ডিফ্রেম নিয়ে আলোচনা চলল, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর প্রাতিষ্ঠানিক নীতি ও প্রচলিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সেশন বেশ জমজমাট। বিরতির চা-চক্রেও চলে এর রেশ। ওয়ার্কশপ সেশনের সবটাই ছিল বেশ ভালো শুধু দুপুরের খাবার ছাড়া। ভাত-সবজি, মাছ-মাংস সবই ছিল মেন্যুতে কিন্তু তাও যেন আমার ভেতো বাঙালি মন সন্তুষ্ট হতে পারলো না। কারণ, রান্নার ধরনের ভিন্নতা। যা হোক, সকালের চ-চক্রের বিরতিতে চা এবং টা দুটোই মুখরোচক থাকায় খাওয়া মন্দ ছিল না, তাই এ বেলা আধ-পেটা খেয়েও দিনের বাকিটা পার করতে পেরেছিলাম।

সড়ে-তিনটায় সেদিনকার মতো অধিবেশন সমাপ্তিতে হোটেলে ফিরে এলাম। আগেই ঠিক ছিল আজ আমরা পুত্রজায়া যাবো সেই মতো রিসিপশনে ট্যাক্সির কথা বলে রুমে চলে গেলাম। মিনিট পনেরর মধ্যে তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলাম। আমাদের হোটল থেকে পুত্রজায়ার দূরত্ব প্রায় ৩৫ কি.মি.। শহরের কিছুটা ট্রাফিক জ্যাম থাকায় আমাদের পৌঁছুতে প্রায় ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। তবে, শহর কেন্দ্র পেরিয়ে যেতেই নির্মল সাজানো পথ। পথের ধারে নানান ফুলের বাগান। রোড আইল্যান্ড আর রোড সাইডের বাগানে ফুল যেন উপচে পড়ছে। এ আমাদের দেশের দায়সারা রোড সাইড বনায়ন বা সৌন্দর্যবর্ধক বাক-চাতুর্যময় বাগান না, এটা অনেক যত্নে গড়া ফুলের রাজ্য। বুঝা যায় প্রতিদিন নিয়ম করে বাগানে ফুল পাতার যত্ন নেওয়া হয়, কোথাও কোনো ধুলার আস্তরণ নেই। অথচ প্রকৃতিতে তখন পাতা ঝরার সময়, ধুলো ওড়ার সময়। পথে যেতেই দেখা মিলল পুত্রজায়া আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার। রাস্তার একধারে বিশাল লেক আন্য ধারে প্রসাদ আদলের ভবনটি প্রতিরক্ষা দেওয়ালের চারপাশ বাহারি ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো। এত চমৎকার স্থাপনা মনে হলো একটু নেমে দেখি, কিন্তু গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো সুযোগ না-থাকায় চলতি পথেই যতটুকু পারা যায় দেখে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

পুত্রজায়ায় আমাদের মূল গন্তব্য পুত্রা মসজিদ। নান্দনিক কৃত্রিম পুত্রজায়া লেকঘেঁষে গোলাপি গ্রানাইট পাথরে নির্মিত পুত্রা মসজিদ যা গোলাপি মসজিদ নামে পরিচিত তা এই পরন্ত বিকেলে আক্ষরিক অর্থেই গোলাপি আভা ছড়িয়ে চারিদিকে একটি মায়াময় আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যখন পুত্রা মসজিদে পৌঁছাই তখনো আসরের নামাজের সময় বয়ে যায়নি। আমি সুযোগের সদ্বব্যবহার করে এখানে আসরের নামাজ আদয় করে নিলাম। আগেই বলেছি মসজিদটি গ্রানাইট পাথরে নির্মিত, এর নকশায় মালয়, পারস্য ও উত্তর আফ্রিকান স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনের সংমিশ্রণ রয়েছে মসজিদটি। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো যে নয় গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদের মিনারের উচ্চতা প্রায় ১১৬মিটার, এখনো পর্যন্ত এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উঁচু মিনার। মসজিদটি একটি বিশাল অংশ পুত্রজায়া লেকের উপর। বিভিন্ন অংশে বিভক্ত এ মসজিদটিতে নামাজ পড়ার স্থান ছাড়াও রয়েছে আলোচনা করা এবং বই ও কোরআন পড়ার জন্য আলাদা স্থান। পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক নামাজের স্থান। নারীদের জন্য যে-স্থানটি রয়েছে তার পাশে একটি উন্মুক্ত বিশাল বারান্দা যার পুরোটাই লেকের উপর। নামাজ শেষে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই লেকের মনোরম দৃশ্য আর শীতল বাতাস দুটোই মনকে আরও সতেজ করে তুলল। এর সাথে বাড়তি পাওনা ছিল অদূরে সমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত পুত্রা ব্রিজকে দৃশ্যপটে পাওয়া। যেহেতু পুত্রা ব্রিজের অবস্থান আমার জানা ছিল না, তাই এই হঠাৎ দর্শন আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল।

সন্ধে হওয়া অবধি আমরা পুত্রা মসজিদ ও এর আশপাশ ঘুরে কাটিয়ে দিলাম, মসজিদের ঠিক ঢোকার মুখে একটি সুভ্যানির শপ রয়েছে, যেখানে ক্যালিগ্রাফিক শিল্পের নানান নির্দশন রয়েছে, রয়েছে সুরা ও দোয়া’র ক্যালিগ্রাফিক সংকলন। সেখান থেকে একটি সুভ্যানি সংগ্রহ করলাম, আমার ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে। আগেই বলেছিলাম আমাদের দুপুরের খাওয়টা খুব একটা যুতসই ছিল না, এ ছাড়া ঘোরাঘুরিতে সবারই খিদে পেয়ে গেল। ভাবলাম, কিছু খেয়ে নেই। মসজিদ চত্বরটি বিশাল, যেহেতু এখানে প্রতিদিন প্রচুর পর্যটক আসেন তাই এই চত্বরেই রয়েছে একটি ছিমছাম শপিং সেন্টার যার নিচ তলার প্রায় পুরোটাই বাহারি খাবারের দোকানের দখলে। আমরা দেখেশুনে একটি দোকানে ঢুকে পড়লাম। এখানে অবশ্য ইন্ডিয়ানদের আধিপত্য আর খাবার মেন্যুতে দক্ষিণ ভারতের আধিপত্য লক্ষণীয়। তবে, এটা নিশ্চিত এখানে হালাল খাবার পরিবেশন করা হয়। আমরা যে দোকানটাতে ঢুকলাম সেটার মালিক কেরালার এক ভদ্রলোক। আমরা সেখানে মাটনকারি আর তন্দুরি রুটি খেলাম। যদিও হালকা স্নেক্সজাতীয় কিছু খাবো, এ রকম ভাবনা ছিল শুরুতে, কিন্তু সময়ের হিসেব করে দেখলাম ডিনার সেরে নেওয়াই ভালো। খেতে খেতেই কীভাবে ফিরবো তাই নিয়ে আলাপ করছিলাম, আমাদের কথোপকোথনে দোকানের ভদ্রলোক কিছু আন্দাজ করতে পারলো কি না কে জানে তিনি আমাদের কছে জানতে চাইলেন কোনো সাহায্য লাগবে কি না। আমরা তার কাছে জানতে চাইলাম, ফেরার ট্যাক্সি কোথায় পাবো। তিনি জানালেন ট্যাক্সি স্ট্যান্ড সেখান থেকে খানিকটা দূরে সিটি সেন্টারের পথে। মসজিদ চত্বরেও ট্যাক্সি পাওয়া যায়, তবে তা অনিয়মিত। অবশ্য অ্যাপসের মাধ্যমে ট্যাক্সি ডেকে নেওয়া যায়। উনি এ ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিত হয়ে আমাদের সাহায্য করলেন, তিনি তার মোবাইল অ্যাপস দিয়ে একটি ট্যাক্সি কল করলেন। ১০/১২ মিনিট সময় লগবে ট্যাক্সি আসতে। আমরা বিল মিটিয়ে মসজিদের গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম, তখন দিন ফুরিয়ে রাতের সান্ধ অধিবেশন শুরু হয়ে গেছে। চারিদিকে একটি নরম মায়াবি আলো। সেখানে এলোমেলোভাবে আরও কয়েকজন পর্যটকও ট্যাক্সি খুঁজছিলেন। দু/একটা ট্যাক্সির দেখা মিললেই তাদের গন্তব্য কুয়ালালামপুরের দিকে না-থাকায় অপেক্ষমাণ পর্যটকদের অপেক্ষার সময় দির্ঘায়িত হচ্ছিল। আমাদের ট্যাক্সিও নির্ধরিত সময় পার করে এলো, সম্ভবত জ্যাম ছিল।

পরদিন মানে মালয়েশিয়ায় আমাদের চতুর্থ দিন, দিনের শুরুটা অন্যদিনের মতোই, নাশতা করে ওয়ার্কশপে চলে গেলাম। এদিনটা ছিল ওয়ার্কশপের সমাপনী দিন। সেদিন অনেকটা সময় ছিল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিনিময় ও যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দকৃত সময়। লাঞ্চের প্রায় পরপরই সেদিন আমদের ছুটি হয়ে গেল। আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনটর নিজ থেকেই জানতে চাইলেন কুয়ালালামপুরে এসে আমরা শপিং করেছি কি না কিংবা শপিং করতে চাই কি না। এ ক্ষেত্রে দেখা গেল প্রায়ই সবাই শপিং-এ যেতে আগ্রহী, কিন্তু কোথায় গেলে ভালো হবে, সাশ্রয়ী মূল্যে কাক্সিক্ষত পণ্যটি কেনা যাবে এ বিষয়টি আমাদের অজানা, যদিও চলতি পথে কখনোসখনো কোনো শপিং মলে ঢু মারা হয়েছে। তবে, শুধু শপিংয়ের উদ্দেশ্যে এ পর্যন্ত কোথাও যাওয়া হয়নি। এখানে ত্রাতার ভুমিকায় কোর্স কো-অর্ডিনটরÑ তিনি সব ব্যবস্থা করে দিলেন। ঠিক হলো আমাদের শিফটের গাড়িটি প্রথমে আমাদের হোটেলে নিয়ে যাবে। আমরা মিনিট দশেকের মতো সময় পাবো ফ্রেস হওয়ার জন্য, তারপর একই গাড়ি আমাদের মার্কেটে পৌঁছে দিবে।

আগেÑভাগে সেশন সমাপ্তিতে আমরা বেশ খোশ মেজাজেই বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন প্রায় সারাদিনই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল, ফেব্রুয়ারিতে আমাদের দেশে বৃষ্টি না-হলেও মালয়েশিয়ায় দেখলাম অন্য চিত্র, এখানে প্রতিদিনই অল্প-বিস্তর বৃষ্টি হয়। যে-কারণে, এই পাতাঝরা ধুলোমাখা সময়েও প্রকৃতি বেশ ঝকঝকে। তবে, সারাদিনের এই বৃষ্টির যে কি বিড়ম্বনা তা টের পেলাম পথে নেমে, আমাদের প্রতিদিনকার মিনিট পঁচিশের যাত্রাপথ আজ ঘণ্টা পেরোলো। কুয়ালালামপুরে যে এত বিশ্রি জ্যাম হয় তা নিজের অভিজ্ঞতায় না-থাকলে বিশ্বাস করা কঠিন। হ [চলবে]