বসন্তে বিদেশ ভ্রমণ : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

22 Feb 2026, 03:24 PM ভ্রমন শেয়ার:
বসন্তে বিদেশ ভ্রমণ : সৈয়দা তাসলিমা আক্তার

২০২০-এর ফেব্রুয়ারি হঠাৎই একাদশে বৃহস্পতিরূপে একটা সুযোগ আমাকে ধরা দিল। এটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, অনেকটা হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। যারা আমার মতো ছা-পোষা সরকরি কর্মচারী, তারা মাত্রই জানেন সরকারি চাকরিতে সরকারি আদেশে বিদেশে কোনো দাপ্তরিক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে পারাটা কতটা সৌভাগ্যের বিষয়। বলতে দ্বিধা নেই, এই সৌভাগ্য নিজ থেকেই আমাকে ধরা দিয়েছিল, যেখানে আমার অফিসের প্রায় ৮০/৯০ শতাংশ কর্মকর্তারা কখনোই এ ধরনের সুযোগ পাননি। এটা নিঃসন্দেহে খুবই বাজে ব্যাপার, যেখানে অন্যান্য অফিস বা ক্যাডারে কর্মরতদের প্রায় শতভাগ প্রতিবছর কোনো-না-কোনো অজুহাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ে বিদেশ পরিভ্রমণ করে আসছেন। এখানেও বিষয় আছে, মন্ত্রণালয়ে যারা কর্মরত তারা অবশ্য এদিক থেকে কিছুটা সুবিধাভোগী বলা যায়। তারা মাঝে-সাঝে বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও অধিদপ্তরের অধমদের জন্য এটা একপ্রকার সোনার পাথরবাটি। প্রশ্ন আসতেই পারে, যারা যাচ্ছে তারা কি শুধু ঘুরতে যাচ্ছে না কি, অবশ্যই না, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় বা বিনিময়ে যাচ্ছেন, অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যেই যাচ্ছেন। তবে এই অভিজ্ঞতা কিন্তু সকলের জন্যই প্রয়োজন। শুধু মন্ত্রণালয়ে যারা আছেন তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠলে কি মাঠ পর্যায় বা প্রান্তিক কাজগুলোতে সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়ে? পড়ে না তাই সবাইকেই উচ্চতর পর্যায় থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়াটাই কিন্তু প্রশাসন থেকে বৈষম্য নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে। সে যাক, পাওয়া না পাওয়ার গল্পও থাক, ফিরে আসি আমার নিজস্ব ভ্রমণ অভিজ্ঞতায়।

ফেব্রুয়ারির ১২ থেকে ১৪ তারিখ কুয়ালালামপুরে গণমাধ্যম নীতি ও নৈতিকতা বিষয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল, সালটা ২০১৯। করোনা তখনও মহামারি রূপ নেয়নি, তবে আশঙ্কা আর আতঙ্ক দুটোই ছিল, ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা জারি ছিল। বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে, সামান্য জ¦র বা কাশি হলেই এয়ারপোর্ট থেকে সোজা করেনটাইন। আমার ফ্লাইট ছিল ১১ তারিখ সকালে আর আমি অফিসিয়াল অর্ডার পেয়েছি ১০ তারিখ বিকেল সাড়ে পাঁচটায়, আর এর পরপরই টিকেট কনফার্ম করা ব্যাগ-পত্তর গোছানো সব করতে একটু তাড়াহুড়াই হয়ে গেল। মনে হতেই পারে, আমি যেহেতু জানি কর্মশালার তারিখ নির্ধারিত এবং আমি সেই কর্মশালায় যোগ দিব বলে অফিস আমাকে মনোনীত করেছে তবে কেন শেষ মুহূর্তে এই তাড়াহুড়া, আসলে অফিসিয়াল অর্ডার না-হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টাই অনিশ্চিত। আর আমাদের মন্ত্রণালয়ে যারা এ ধরনের অফিসিয়াল অর্ডার-এর দাপ্তরিক নথি নিয়ে কাজ করেন, তাদের উদ্দেশ্য-বিধেয় বোঝা ভারি ঝকমারি। যা হোক, শেষ পর্যন্ত ১১ তারিখ সকালে সহি-সালামতে প্লেনে চড়ে বসলাম। একই যাত্রায় আমার সঙ্গী ছিলেন আরও দু’জন সহকর্মী যদিও তাদের একজনের সাথে আমার সেদিনই প্রথম পরিচয়। শিউলী আর গাফ্ফারী। গাফ্ফারীকে আমি আগে থেকেই চিনি। বলতে দ্বিধা নেই, এই দু’জন সহকর্মী থাকার কারণে আমি অল্প সময়েও মালয়েশিয়ার বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পট ঘুরে দেখতে সক্ষম হয়েছিলাম।

ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরে সরাসরি ফ্লাইট টাইম ঘণ্টা চারেকের একটু এদিক-সেদিক হবে। আমরা বাংলাদেশ সময় সড়ে এগারোটায় কুয়লালামপুরে পৌঁছুলেও তখন সেখনে দুপুর দেড়টা। এয়ারপোর্টের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হোটেলে পৌঁছুতে পৌঁছুতে দুপুর প্রায় বিকেল ছুঁয়ে গেল। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেস হয়ে আমরা প্রথমেই পেট পুজোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কুয়ালালামপুরে আমাদের হোটেলের আশেপাশেই অনেক বাঙালি খাবার হোটেল থাকায় আমাদের খাবারের জন্য খুব ভাবনা-চিন্তায় পড়তে হয়নি। আর মালয়েশিয়া যেহেতু মুসলিম প্রধান দেশ তাই হালাল-হারাম নিয়েও নিশ্চিন্তে থাকা গেল। খাওয়া-দাওয়া শেষে রুমে ফিরে একটু গুছিয়ে নিয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম শহর দেখবো বলে। যেহেতু কুয়লালামপুরে এটাই আমাদের প্রথমদিন আর নতুন একটি শহর তাই আদতে আমরা তেমন কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই অর্থাৎ উদ্দেশ্যহীনভাবেই শহর দেখতে বের হলাম। তবে পুরোপুরি উদ্দেশ্যহীন বলা যাবে না। কেননা, টুুইন টাওয়ার দেখার একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল, তবে পথ-ঘাট জানা না থাকায় একটু দ্বিধা ছিল যে, আদতে সেদিন এত অল্প সময়ে তা সম্ভব কি না।

আমাদের হোটেল থেকে হাঁটা দূরত্বে যে মেট্রো স্টেশনটা রয়েছে, আমরা বেশ ধীরে-সুস্থে সেখানে চলে গেলাম, কিন্তু কোথায় মেট্রো স্টেশন এ দেখি বিশাল এক শপিংমল। মেট্রো কই ? আবার এদিকে গুগোল ম্যাপ বলছে এটাই মেট্রো স্টেশন। বেশ কিছুক্ষণ চললো গবেষণা। বুঝলাম এই মলের তৃতীয় তলায় মেট্রো স্টেশন। তবে এখান থেকে টুুইন টাওয়ার পর্যন্ত মেট্রো যায় কি না তাও জানা নেই। যা হোক দেখি কী হয়Ñ এই ভাবনা থেকেই স্টেশনের পথে পা বাড়ালাম। অবশ্য পথে একজন প্রবাসী বাঙালির দেখা পেয়ে গাফ্ফারী তাকে পাকড়াও করলো, তার কাছ থেকে জেনে নিয়ে আমরা আবার মেট্রো স্টেশনের দিকে এগুলাম। আমরা নির্ধারিত স্টেশনে নেমে স্টেশন থেকে বের হয়ে দেখলাম পথের পাশে একটি বিশাল হল ঘরের মতো, ভাবলাম এ বুঝি আরেকটা স্টেশন, তাই সেদিক না-গিয়ে গুগোল মামাকে অনুসরণ করে টুুইন টাওয়ারের পথে এগুলাম এতে যা ঘটলো আমরা টুইন টাওয়ার ঠিকই খুঁজে পেলাম কিন্তু কোনোভাবেই পুরো টাওয়ারটাকে একসাথে দেখতে পেলাম না। মনে একটা খটকা ছিল ঠিকই, যে এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। টুইন টাওয়ারের পুরোটা একসাথে দেখার জন্য নিশ্চয়ই একটা ভিউ পয়েন্ট থাকবে। কিন্তু আমরা আশেপাশে তেমন কাউকে পেলাম না, যে আমাদের সাহায্য করতে পারে, তাই অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে উল্টো পথে হেঁটে বেড়ালাম।

পরদিন সকাল থেকে ওয়ার্কশপের কার্যক্রম শুরু, আমরা সকাল সকাল তৈরি হয়ে হোটেলের ডাইনিং-এ নাশতা সেরে তৈরি। নির্ধারিত সময়ে বাস এসে আমাদের নিয়ে গেল। সকালে নাশতা করতে করতে অনেকের সাথে পরিচিত হলাম যারা যারা কর্মশালায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে এসেছে। এর মধ্যে পাপুয়া নিউ গিনি থেকে যে ভদ্র মহিলা এসছেন তিনি বেশ স্বপ্রতিভ। এছাড়া চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়ার প্রতিনিধিও ছিল। নাশতা সারতে সারতে তাদের সঙ্গে কিছু আলাপ হলো এরপর টিফিন ব্রেকেও আরও অনেকের সঙ্গে কথা হলো; জানা হলো তাদের সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম নিয়ে। বিকেল চারটায় সেদিনের মতো কর্মশালায় সমাপ্তি। আয়োজকদের বাসেই হোটেলে ফিরে আসা। আগের দিন যে বিষয়টা খেয়াল করেছিলাম মালয়েশিয়ায় সূর্যের আলো অনেকক্ষণ পর্যন্ত থাকে অর্থাৎ এখানে দিনের পরিধি বেশ বিস্তৃত। তাই হিসেব কষে নিয়েছিলাম কতটা সময় পাবো ঘোরাঘুরির জন্য। বিকেল সাড়ে চারটায় হোটেলে পৌঁছে মিনিট দশেকের মধ্যে বেরিয়ে পড়লে ঘণ্টা তিনেক দিনের আলো পাওয়া যাবে, সেই মতো অ্যাপ দেখে কাছে-পিঠে দু-একটা জায়গা ঠিক করে রেখেছিলাম। হোটেলে পৌঁছে রিসিপশনে লোকেশন জানিয়ে একটি টেক্সি ডাকতে বললাম, আরও জানালাম যে, আমরা মিনিট দশেকের মধ্যে বের হবো। এরপর চটজলদি রুমে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলাম, ততক্ষণে অবশ্য টেক্সি হাজির।

আমাদের আজকের গন্তব্য বাতু কেভস (ইধঃঁ ঈধাবং), কুয়ালালামপুর শহর থেকে তের কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এ স্থানটি হিন্দুদের তীর্থস্থান। এটি মূলত একটি চিনামাটির পাহাড়ে অনেকগুলো গুহার সমাহার। চিনামাটির পাহাড় থেকে প্রবাহিত সাংগাই বাটুু নদীর নাম থেকে এ স্থানটি বাটুু কেভস নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সমতল থেকে প্রায় ১০০ মিটার উচ্চতায় বাটু কেভস-এর অবস্থান, দক্ষিণ ভারতীয় ব্যবসায়ী কে. থাম্বুস্বামী পিল্লাই এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা, মন্দিরটি বিভিন্ন কারুকার্যে সাজানো। পুণ্যার্থীরা ২৭২টি সিঁড়ি বেয়ে এই মন্দিরে পৌঁছে নিজেদের ভক্তির প্রমাণ দেয়। আমি চেষ্টা করেছিলাম গুহামুখ পর্যন্ত পৌঁছুতে তবে বেশি দূর এগুতে পারিনি। বাতু কেভস চত্বরঘিরে বেশ জমজমাট মেলা বসেছে, যেমন আমি কান্তজির মন্দিরচত্বরে দেখেছি। সচরাচর পুজো সামনে রেখে যে-ধরনের মেলার আয়োজন হয় তেমনি আরকি। মুড়ি-মুড়কির সাথে উপমহাদেশীয় হস্তশিল্পের বিভিন্ন পণ্যের সমারোহ রয়েছে, এছাড়া শাড়ি ও তৈরি পোশাক বিক্রির দোকানও ছিল মেলা চত্বরে। মেলায় প্রচ- ভীড়। মনে হলো এ যেন মালয়েশিয়া নয়, ভারত বা বাংলাদেশের কোনো মেলা। [চলবে]