[পূর্ব প্রকাশিতের পর]
এখানে খাওয়ার জন্য রেমাক্রি বাজারে যেতে হয়। তবে হঠাৎ গেলেই খাবার পাওয়া যাবে না। আগে থেকে বলে রাখতে হয়। অবশ্য এ দিকটা গাইডই বুঝে নেয়। দুপুরের খাওয়া শেষে ঘণ্টাখানেক ঘরে বসে আড্ডাবাজি করে আবার ঝিরিপথে। অবশ্য এ বেলায় খুব বেশি সময় পাওয়া যায়নি জলকেলির জন্য; কারণ পাহাড়ে সন্ধেটা ঝুপ করে নেমে আসে। তাই আমরাও ফিরে এলাম। সন্ধেবেলা চা-নাশতা শেষ করে আমরা দাওয়ায় বসলাম, এদিকে আমাদের গাইড দু’জন তখন বারবিকিউ এর প্রিপারেশনে ব্যস্ত। সন্ধেটা রাতের রূপ নিতেই আমরা পাহাড়ে জ্যোৎ¯œার দেখা পেলাম। এটা ছিল আমাদের জন্য বাড়তি পাওনা, কেননা আমরা অমাবশ্যা-পূর্ণিমার দিনক্ষণ মিলিয়ে যাইনি। কিন্তু ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল। ভাগ্যই বলবো, কেননা সীমহীন এই সৌন্দর্য যা কেবল অনুভব করা যায়, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না তার সাক্ষী হওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। ভেবেছিলাম যতক্ষণ জেগে থাকবো তুমুল গালগপ্পে সময় যাবে। কিন্তু আমরা তখন মৌন। নীরবতাই যেন তখন প্রকৃতির একমাত্র সঙ্গী, সঙ্গে দিগন্ত আলো করা জ্যোৎ¯œা। রাত গভীর হয়, নিয়ম মেনে রাতের খাবার শেষ করে আমরাও ঘুমুতে গেলাম। পরদিন ভোর থেকে আবারও একটা লম্বা সফর...।
আমাদের আসল অ্যাডভেঞ্চার শুরু হলো পরদিন ভোরে, সকাল সকাল নাশতা করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম, কারণ পথ অনেক লম্বা। যারা নিয়মিত ট্রেকিং করে তারা রেমাক্রি থেকে নাফাখুম যেতে সময় নেয় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আর আমাদের মতো অ্যামেচারদের কত সময় লাগতে পারে তা নিশ্চিত নয়, তাই হাতে সময় নিয়েই বের হওয়া। রেমাক্রি থেকে নাফখুম যাওয়ার এই পথটি বড়োই বিচিত্র, বন্ধুদের শব্দের প্রকৃত ব্যাখ্যা এখানে দৃশ্যমান। সমতল পথ এখানে খুবই বিরল, পুরো পথের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জলমগ্ন সেখানে জোঁক আর ধারলো পাথরের গুপ্ত আস্তানা আবশ্যিকভাবেই আছে। আর বাকি পথের কিছুটা বালি আর পাহাড়ি ঢাল। যদিও দু’-একদিনের মধ্যে বৃষ্টির দেখা ছিল না, তবে পাহাড়ি ঢালের কিছু কিছু অংশে রোদ না-পড়ায় তা ছিল পিচ্ছিল।
শুরুটা ছিল বেশ প্রাণবন্ত আর প্রাণোচ্ছল, পথও অতো খারাপ না, আমরা অনেকটা আয়েশীভাবেই পথ চলছিলাম। পথে ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝিরি যেখান থেকে আমরা আমাদের পানির বোতলগুলো রিফিল করে নিলাম। রেমাক্রি থেকে নাফাখুম পথে যে জলমগ্ন পথটি পাড়ি দিতে হয় তা কি সাঙু নদীর উজানের অংশ না খাল এ বিষয়ে বেশ ধোঁয়াশা রয়েছে। স্থানীয়রা আবশ্য একে রেমাক্রি খাল বলে চেনে, তাই আমরাও একে রেমাক্রি খালই ধরে নিলাম। রেমাক্রি খালের ধারঘেঁষে সরু পথ কোথাও কোথাও তা আবার খালে ডুব দিচ্ছে তখন আমাদেরও নামতে হচ্ছে হাঁটুজলে। আমাদের গাইড অবশ্য যথেষ্ট সচেতন তিনি আগে আগে পথ দেখিয়ে আমাদের যথাসম্ভব নিরাপদে রাখতে চেষ্টা করছেন। এমনিতে খালটি শান্ত, তবে পাহাড়ি পাথুরে নদীর সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ, যার শুরুটা নাফাখুমের জলপ্রপাত থেকে। জলপ্রপাতের স্রোতের ওঠানামার সাথে এই খালের চরিত্রও যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে, তাই আপত শান্ত খালকে খুব একটা ভরসা করা যায় না। পথে যেতে যেতে এই আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ মিলল। এরই মধ্যে হঠাৎ ঘূর্ণী দৃশ্যমান হয়, আমরা আরও সাবধান হই। জায়গাগুলো আমরা সারিবেঁধে একটি দড়ি ধরে এগুচ্ছিলাম, এক্ষেত্রেও আগ্রগামী আমাদের গাইডদ্বয়। অবশ্য দুজনের একজন সামনে আর একজন পেছনে থেকে বেরিকেড তৈরি করে নিয়েছে, মাঝখানে আমরা আনাড়ি অভিযাত্রীরা।
খাল অবশ্য এখানে হাঁটুজল নিয়েই বহমান, আর পুরো পথটাই এমন আমরা কখনো খালের এপার কখনো ওপার করে পথ চলছি। এপারের পথ যখন খালের ধারে এসে শেষ হয়, তখন গন্তব্য ওপার আবার ওপারের পথ যখন জলে ¯œান করবে বলে পথ হারায় তখন আবারও এপারে না এসে গতি নেই। তবে, খালের শেষভাগে এসে পাড় বেশ উঁচু হতে হতে পাহাড়ি বাঁকে মিশে গেছে। পথের এ অংশটুকু আরো জটিল এবং বিপজ্জনক। বেশ সাবধানে আমাদের এগুতে হয়েছে। এরপর উঁচু একটি পাথরের চাঁই ডিঙিয়ে আমরা অবশেষে সেই কাক্সিক্ষত গন্তব্যে।

ঝিরি, ঝরনা, জলপ্রপাত এবারের ভ্রমণে এসে এদের বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম। ঝিরি ঝরনার ছোটো বোন, এটা জানা ছিল কিন্তু রেমাক্রি ঝিরি আবার আমাকে ভাবনায় ফেলে দিল। কারণ, মোটামুটি বিস্তৃত জায়গাজুড়ে বিভিন্ন ধাপে পানি গড়িয়ে পড়ছে যাকে এককথায় ঝরনার ছোটো বোন বলা চলে না। এদিকে আবার নাফাখুম জলপ্রপাতটি দেখে আমার এটিকে ঝরনার বড়ো বলে ভাই মনে হলো। ‘নাফাখুম’ একটি মারমা শব্দ যার বাংলা প্রতিশব্দ করলে দাঁড়ায় ‘মাছ জলপ্রপাত’, এই নামকরণের পেছনে প্রকৃত কারণটি যে কী তা অজানা। তবে অনেকেই বলেন, রেমাক্রি খালে এই জলপ্রপাতের ¯্রােতের বিপরীতে এক বিশেষ ধরনের মাছ পাওয় যায়; যার কারণে এই জলপ্রপাতের নাম ‘নাফাখুম’, ‘নাফা’ মানে ‘মাছ’ আর ‘খুম’ মানে জলপ্রপাত। যাহোক, তাত্ত্বিক আলোচনা ছেড়ে মুক্ত আকশের নীচে অপরূপ জলরাশির উত্তাল রূপের কাছে ফিরে আসি। জলপ্রপাত যতই মনোমুগ্ধকর হোক না কেন, আদতে এটি বেশ বিপদসংকুল। বেশ উঁচু থেকে বিশাল জলরাশি জোটবেঁধে নিচে চাওড়া পাথুরে চাঁইয়ের উপর আছড়ে পড়ছে। নিজের শক্তি জাহিরে কোনোরকম কার্পণ্য নেই বরং আছড়ে পড়ার তীব্র গর্জন আমাদেরও সতর্ক করে। সাবধান, পা হড়কালে রক্ষা নেই, একেবারে ছাতু। অবশ্য তুখোড় সাতারুরা পাথরের চাঁই এড়িয়ে ঝাপ দিচ্ছে সেই উত্তাল জলরাশিতে। আমরা যেহেতু কেউই সাঁতারে পারদর্শী নই তাই আতি সাবধানে জলপ্রপাতের উপরে বিভিন্ন ছোটো পাথরের খাঁজে নিজেদের বন্দি করে উপর থেকে নেমে আসা পানির শান্ত ¯্রােতের শীতল পরশ নিচ্ছিলাম। নাফাখুমের উপর যে পথ দিয়ে পানি এসে জমা হয়, সে জায়গাটা অনেকটা মৌচাকের মতো ছোটো ছোটো পাথুরে খাঁজে বিভক্ত, যে-কারণে উজান থেকে নেমে আসা পানি এতসব খাঁজ আর পাথুরে চাঁইয়ে ধাক্কা খেতে খেতে খানিক গতি হারায়, যেখানে উপরে দিকটাতে কিছুটা অংশে পানির ¯্রােত কম। নতুবা আমাদের পক্ষে উপরে থাকা অসম্ভব হতো।
শেষ শরতের পরিষ্কার ঝকঝকে দিনে গরম নেহায়েত কম না। তবে, পানি এতই শীতল যে, গরমকে পাত্তা না-দিয়েও থাকা যায়। ঘণ্টা দুয়েক ঝা-চকচকে রোদকে রীতিমতো পাত্তা না-দিয়ে নাফাখুমের উপরে পাথুরে চত্বরে কাটিয়ে দিলাম। জায়গাটা অনেকটা ওয়েস্টার্ন সিরিজে পড়া পাহাড়ি বেসিনের মতো, যেখানে একধারে শীতল পানির প্রবাহ অন্য পাশে সবুজ তৃণভূমি। আমরা যখন নাফাখুমের দিকে যাচ্ছিলাম পুরো পথটাই ছিল সবুজের নানান সেডের সমারোহ, কোথাও হালকা সবুজ কোথাও গাঢ় হতে হতে পীতবর্ণ আবার কোথাও টিয়ে পাখির রং। যতক্ষণ পথে ছিলাম ততক্ষণ একটা তাড়া ছিলÑ কতক্ষণে নাফাখুম পৌঁছাবো তাই হয়তো পথের সৌন্দর্য তেমনভাবে উপভোগ করা হয়নি। তারপরও যতটুকু কোনোভাবেই দৃষ্টি এড়ায়নি তার সৌন্দর্যও ভাষায় প্রকাশ দুরূহ।
নাফাখুম দেখার যে আকুতি এবং আক্ষরিক অর্থেই দুবারের সাধনায় তার সাক্ষাৎ পাওয়া, এ গল্প তো আগেই করেছি। তবে, যখন সেই কাক্সিক্ষত সময়ে পৌঁছালাম, সে সময় যেন সময় থমকে গেল, ভাষাও শব্দ হারালো তাই এর সঠিক বর্ণনা দেওয়া সহজ নয়। তবে, এটুকু বলতে পারি, সাড়ে তিন ঘণ্টায় চড়াই উৎরাই পার হয়ে যখন নাফাখুম পৌঁছালাম তখন সব কষ্ট-ক্লেশ নিমিষেই যেন উধাও হয়ে গেল। যদিও যারা নিয়মিত ট্র্যাকিং করেন তাদের এ পথটুকু যেতে সময় লাগে বড়োজোর আড়াই ঘণ্টা আর আমাদের মতো আনাড়িদের সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। তবে, সময় বা খাটুনি দুটোই পুষিয়ে যায়। সময় এখানে যেন খুব দ্রুত বয়ে চলে, মনে হলো এই তো এলাম কিন্তু ফেরার সময় হয়ে গেল, দিনের আলোয় ফিরে আসতে হবে। আমরা আবার পথে নামলাম।
রাতটা আবার চাঁদের আলোর মায়বী পরশে কেটে গেল, খানিক আড্ডা আর আনেকটা নীরবতা পেরিয়ে আমরা রাতের খাবারের তোড়জোড় করলাম। আগামীকাল ভোরে আমরা ফিরে যাবো আমাদের চেনা লোকালেেয়, সাথে থাকবে পাহাড়ের গভীর সৌর্ন্দয় আর নাফাখুমের উত্তাল জলকেলীর অমলিন স্মৃতি। হ [সমাপ্ত]