[পূর্ব প্রকাশিতের পর]
সৈকতের ধারঘেঁষে ছায়াঘেরা মাঠ ও বেঞ্চ, যা পিকনিক আর হাঁটার জন্য উপযুক্ত। এ পথে হাঁটলে সমুদ্রতটের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এছাড়াও অনেকে রকি পয়েন্ট, নৌকা থেকে বা কিছুটা সমুদ্রের জলে নেমে দাঁড়িয়ে ছিপ দিয় মাছ ধরছে। যার যেভাবে সুবিধা সেভাবেই মাছ ধরছে। বালমোরালের আশেপাশে বেশ কিছু সুন্দর ট্রেইল আছে [Bradleys Head walk, Chowder Bay walk]। বাইক চালানো ও দৌড়ানোর জন্য উপযুক্ত। এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও পরিচালিত হয়। শুনেছি গ্রীষ্মকালে খোলা আকাশের নিচের রোটুন্ডায় শিশুদের জন্য থিয়েটার ও গল্প বলার অনুষ্ঠান হয়।
রকি পয়েন্ট দ্বীপ দেখে আমি বেশি আকর্ষিত হয়েছি। সাজানো গোছানো পরিবেশ আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে। এখানে বেশ কয়েকটি বসার জায়গা রয়েছে, যেখানে বসে সমুদ্রের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। আশেপাশে ছড়ানো ছিটানো বড়ো বড়ো পাথর। কয়েকজন আবার সে পাথরের উপর বসে মাছ ধরছে। সবকিছু মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য ছিল। সেখান থেকে ফিরতে মন চাইছিল না। সাধারণত বিবাহ অনুষ্ঠান ও ছবি তোলার জন্য এই দ্বীপটি জনপ্রিয়।
বালমোরাল বিচ ছোটো ও বড়ো সবার জন্যই নিরাপদ ও উপযোগী। এখানে শিশুদের জন্য লাইটগেটেড প্লেএরিয়া রয়েছে, যা শিশুদের খেলার জন্য রঙিন খেলার সামগ্রীসহ নিরাপদ অঞ্চল। লাইফগার্ড নিরাপত্তার জন্য সারাবছর থাকে, বিশেষত গ্রীষ্মে। পর্যটকদের সুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে সেখানে রয়েছে পাবলিক টয়লেট ও চেঞ্জ রুম। আরো রয়েছে পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। প্রচুর ছায়াঘেরা বসার স্থান ও গাছপালা বালমোরাল বিচে বেশ কিছু জনপ্রিয় ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট আছে। এর মধ্যে কিছু শতবর্ষী গাছ রয়েছে। বাথার্ডস প্যাভিলিয়ন যেখানে পাওয়া যায় উচ্চমানের খাবার ও সমুদ্রের দৃশ্য দেখতে দেখতে খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা। The Boathouse Balmoral Beach যাতে পরিবেশিত হয় নাশতা ও কফি। Bottom of the Harbour যা বিখ্যাত ফিশ অ্যান্ড চিপসের জন্য।

সিডনি CBD থেকে বেশ কয়েকটি বাস রয়েছে বালমোড়াল সৈকতে আসার জন্য। এছাড়াও সার্কুলার কী থেকে ফেরি করে Mosman Wharf, তারপর বাস। গাড়িতে শহর থেকে প্রায় ২০ মিনিটের দূরত্বে বালমোড়াল সৈকত। ছুটির দিনগুলোতে বেশি ভিড় হয়। টুপি ও সানস্ক্রিন ক্রিম সাথে আনতে ভুললে চলবে না। সৈকতের কাছাকাছি একটি চিড়িয়াখানা রয়েছে, যা তারাঙ্গা চিড়িয়াখানা [Taronga Zoo] নামে পরিচিত। ঘুরতে যাওয়ার জন্য এটিও একটি ভালো স্থান। আমার যদিও সেখানে ঘুরতে যাওয়া হয়নি। বালমোরাল বিচ এলাকায় বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। চোখে পড়ল, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক-ব্যাগ ও বোতল [One Time Plastic Bag and Bottle] ব্যবহার এখানে নিষিদ্ধ। আর এ কারণে এখানকার পরিবেশ এত সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন। সৈকতের সুরক্ষা ও পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ যেখানে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, তা সৈকতের অবস্থা দেখলে বোঝা যায়। সমুদ্রের প্রাণীদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় তারা যে কতটা সচেতন তা তাদের আচরণেই প্রকাশ পায়। সমুদ্রের পানি ও প্রাণীর ক্ষতি হবে এমন কোনো কিছু তারা সমুদ্রে নিক্ষেপ করে না।
শিশুদের জন্য বালমোরাল সৈকত খুব উপযোগী। ঢেউ না-থাকায় শান্ত জলে স্নোরকেলিং করে জলে থাকা প্রাণী চিনতে খেলা করতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশে শিশুরা বালু নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। বালিতে আঁকিবুঁকি তাদের একটা প্রিয় খেলা। এখানে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে জীববৈচিত্র্যের সাথে পরিচিতি লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। সমুদ্রের কচ্ছপ নিয়ে একটি মিথ রয়েছে। ‘তিলু কচ্ছপের সাগর অভিযান’ অস্ট্রেলিয়ায় একটি প্রচলিত গল্প। গল্পের মাধ্যমে শিশুরা শেখে কীভাবে প্রকৃতির বন্ধু হওয়া যায়। ছোটো ছোটো শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকদের আচরণ দেখে তার প্রমাণ পেলাম।
পানির নীল রং, আকাশের ফিকে গোলাপি আভা এবং সাদা বালু একে করে তোলে এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টিনন্দন স্থান। সূর্যাস্তের সময় এক স্বপ্নময় রঙের খেলার দেখা মেলে এখানে। এই কারণে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে বহু ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পীর মনে।
বালমোরাল বিচ শুধু একটি সৈকত নয়, এটি প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানবিক স্পর্শের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। এর নির্জনতা, সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য একত্রে এক মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে, যা ভ্রমণপিপাসুদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরে দাগ কাটে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা নিঃসঙ্গ ভ্রমণকারী সকলের জন্যই যেন এটি একটি উপযুক্ত স্থান। সৈকতের শান্ত পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, নিরাপত্তা এবং বিনোদনমূলক সম্ভার অনন্য রতেœ পরিণত করেছে সিডনির এই সৈকতকে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই শান্ত স্বর্গভূমি জীবনের ব্যস্ত মুহূর্তগুলোকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দিয়ে মনকে প্রশান্তি দেয়। তাই বলা যায়, বালমোরাল সৈকত কেবল একটি গন্তব্য নয়, এটি অনুভব করার মতো এক স্বপ্নিল আবেশ।