বালমোরাল সৈকত : সিডনির হৃদয়ে এক শান্ত স্বর্গ : ফারহানা খানম

21 Jul 2025, 02:40 PM ভ্রমন শেয়ার:
বালমোরাল সৈকত : সিডনির হৃদয়ে এক শান্ত স্বর্গ : ফারহানা খানম

আজ সমুদ্র দেখার পালা। খুব কাছাকাছি একটা সমুদ্র সৈকত আছে। সিডনির বিলাসবহুল এবং ঐতিহাসিক সমুদ্র সৈকতটি দেখতে বেশ সুন্দর। তাই ঠিক হলো আমরা সেখানেই যাব। সূর্যাস্ত দেখব, মনস্থ করে দুপুরের খাবারের পর রওনা দিলাম। আমাদের যাত্রা শুরু হলো বাসে। খুব কম সময়ে আমরা সেখানে পৌঁছলাম। আমাদের বাসের শেষ গন্তব্যস্থল এটি। নেমে চোখ ও মন দুই জুড়িয়ে গেল। দেখতে পেলাম, সামনে শান্ত জলের এক সৈকত। উল্টো দিকে আবাসিক ভবন। পাহাড়ের কোলে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য চমৎকার। শিশুরা বালুতে খেলাধুলা করছে। কেউ পানিতে সাঁতার কাটছে, কেউ রোদ পোহাচ্ছে, কেউ মাছ ধরছে। কোথাও একা একজন, আবার কোথাও বা দুজন মিলে সমুদ্রের পাড়ে রাখা বেঞ্চিতে চুপ করে বসে আছে। কেউ-বা পাড় ধরে হাঁটাপথে হাঁটছে। এদেশে ঘুরতে এসে আমার মনে হলো, প্রকৃতি যেন তার অপূর্ব শিল্পকর্মে সজ্জিত করেছে বিশাল বিস্তৃতির দেশ অস্ট্রেলিয়াকে। রেইন ফরেস্ট, পাহাড়, মরুভূমি ও অসংখ্য সমুদ্রতটের দেশ এটি। এদের মধ্যে এক বিশেষ স্থানে রয়েছে বালমোরাল সৈকত।

বালমোরাল ক্যাসেল অ্যাবারডিনশায়ার, স্কটল্যান্ডের একটি বড়ো এস্টেট হাউজ। বালমোরাল ছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারের গ্রীষ্মকালীন বাসভবন। বালমোরাল নামটির উৎপত্তিস্থল এখান থেকেই। সাদা বালির রং ও ব্রিটিশ প্রভাবের প্রতীক হিসেবে সৈকতের এই নামকরণ। বালুর সৈকত বালমোরাল অবস্থিত মোসম্যান [Mosman] এলাকার মধ্যে, নিউ সাউথ ওয়েলসের সিডনির উত্তরে এর অবস্থান। এটি সিডনির বন্দর অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। সৈকতের পশ্চিমে মিলসনস পয়েন্ট এবং পূর্বে মনাভ্যালি অবস্থিত। সিডনি CBD [Central business district] থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। সৈকতের দুটি অংশ রয়েছে। একটি বালমোরাল বিচ, অন্যটি এডওয়ার্ডস (Edwards) বিচ- দুটি অংশ একটি ছোট্ট পাথরের বেষ্টনী দ্বারা বিভক্ত। পাথরের প্রাচীর বালমোরাল সৈকতকে করেছে নিরাপদ। সাগরের হাঙরসহ অন্যান্য বড়ো জলজ প্রাণী বেষ্টনী ভেদ করে বালমোরা সৈকতে আসতে পারে না, যা সৈকতকে করেছে নিরাপদ। উত্তর-পূর্ব দিকে মুখ করে আছে বন্দরের সৈকতগুলো। এর সামনের খোলা অংশ, এ স্থানটি সাঁতার কাটা ও রোদ পোহানোর জন্য উপযুক্ত। শান্ত, বড়ো ও ঢেউবিহীন জল বালমোরাল সৈকতের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ। এখানে সমুদ্রের ছোটো ছোটো ঢেউয়ের দেখা মেলে। শিশুদের জন্য নিরাপদ এবং পরিবারসহ বেড়ানোর একটি আদর্শ সৈকত এটি। ‘বালমোরাল’ ঢালের আশেপাশে ব্যয়বহুল আবাসিক ভবন রয়েছে। এখানের বাসিন্দারা সৈকতের দৃশ্য উপভোগ ও সানিধ্যে থাকার সুযোগ পায়।

সমুদ্র মানেই বালু। এখানেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বালমোরাল সমুদ্র সৈকতে পরিষ্কার বালুতে খালি পায়ে হাঁটাচলা যেমন আরামদায়ক, তেমনি রোমাঞ্চকর। শিশুরা সে সাদা বালুতে নানারকম খেলায় মত্ত। আর তাদের বাবা-মায়েরা তাদের খেয়াল রাখায় ব্যস্ত। এখানে ঘুরতে এসে লোকজন যে-কাজগুলো করতে পারে তার মধ্যে রয়েছে মাছ ধরা, সাঁতারকাটা, প্যাডল বোর্টিং, কায়াকিং, স্কুবা ডাইভিং ইত্যাদি। মৃদু ঢেউয়ের স্বচ্ছ পানিতে স্বচ্ছ জলরাশিতে বালুর নিচে শৈবাল ও পাথরের গুহা দেখা যায়। যা ছোটো জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। এই জলে বাস করে ছোটো কচ্ছপ, কাঁকড়া, জেলিফিশ, রিফ ফিশসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী। আর রঙিন মাছেদের ঝাঁকের সাথে দেখা মিলবে স্নোরকেল করতে গেলে। জীববৈচিত্র্যের এই প্রাচুর্য বালমোরাল সমুদ্রকে করেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত।

গত শতকের নয়ের দশকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বালমোরাল সৈকত। ঐতিহাসিক দিক থেকেও এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের আগে বালমোরালে বাস ছিল আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের। ইয়ারা ভাষাভাষী ক্যামেরেগাল বংশীয় আদিবাসী ছিল এ অঞ্চলের বাসিন্দারা। এ স্থানটিকে তারা সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহার করত। ১৯২৬-২৭ সালে ট্রামে ভ্রমণকারী দর্শনার্থীদের কথা ভেবে এসপ্ল্যানেট বরাবর প্রোমেনেড নির্মাণ করা হয়। এই কাজের সময় যে খনন করা হয়, তাতে আদিবাসীদের কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে প্রায় আটটি কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল, যা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে আদিবাসীদের অস্তিত্বের কথা।

ঐতিহাসিক নিবন্ধনে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের বালমোরাল সমুদ্র সৈকত সংরক্ষিত এলাকা। এডওয়ার্ড, সৈকতও এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বালমোরাল সৈকত ও এডওয়ার্ড সৈকত দুটোকেই একত্রে বালমোরাল সৈকত বলে। বালমোরাল সৈকতের ঐতিহাসিক স্থাপনায় রয়েছে তিনের দশকের নির্মিত রোটুন্ডা (Rotunda) ও বাথার্ডস প্যাভিলিয়ন (Bathers Pavilion)। সৈকতে সাঁতার কাটতে আসা সাঁতারুদের জন্য স্নানঘর (Bathers Pavilion) প্রথম ১৯২০ সালে নির্মিত হয়। যা ছিল সাঁতারুদের কাপড় পরিবর্তন ও বিশ্রামের স্থান এবং একইসাথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। পরবর্তীসময়ে এটি ভেঙে পুনরায় ১৯২৯ সালে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন আর্ট-ডেকো স্টাইলের ভবন। বর্তমানে রেস্টুরেন্ট ও অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তেমনিভাবে রোটুন্ডাও সিডনির এই সৈকতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি ১৯৩০ সালে মোসম্যান কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত সমুদ্র সৈকত উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে নির্মিত হয়। সৈকতের পাশে পার্কভূমিতে শতবর্ষী স্থাপনাটি অবস্থিত। একটি ক্লাসিক ‘ব্যান্ড স্ট্যান্ড’ ধাচের কাঠামো, যা দেখতে অনেকটা গম্বুজ আকৃতির ‘ছাউনিবিশিষ্ট মঞ্চ’। এর অবস্থান অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে। ‘ব্রাস ব্যান্ড’ কনসার্টের জন্য জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল ১৯৩০ এবং ১৯৪০ এর দশকজুড়ে। বর্তমানে উৎসব, অনুষ্ঠান এবং বিবাহের জন্য ব্যবহৃত হয়। আমরা সেখানে দুটি বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতে পাই। দুপক্ষের লোকজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছবি শুট করছিল। যে কারণে বাথার্ডস প্যাভিলিয়ন আর রোটুন্ডায় ছবি তুলতে পারিনি। কারণ, দুটি স্থাপনাই দুই দল বর-কনের দখলে ছিল। আর তাই তাদের মাঝে গিয়ে ছবি তোলা অশোভনীয় দেখাচ্ছিল। রোটুন্ডা ছবি তোলার জন্য একটি বিশেষ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে রেখেছে। এর ভেতর দাঁড়িয়ে বর-কনে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ফটোশুট করেই চলেছে। ভিক্টোরিয়ান যুগে প্রচলিত এমন ছায়াঘেরা কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল মূলত সংগীতানুষ্ঠান, বক্তৃতা ও সামাজিক মিলন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য। সাদা রঙের গম্বুজ আকৃতির ছাউনির নিচে বসে লোকেরা উপভোগ করত ব্যান্ডের পরিবেশনা, পড়ত কবিতা। এমন একটি স্থাপনার নিচে বসে একা সময় কাটানো কম আনন্দের বিষয় নয়। 

[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]