[পূর্ব প্রকাশিতের পর]
আমি তাগুস নদীর তীর ধরে হাঁটছি কোথাও বসতে ইচ্ছে করলে বসছি, আবার হাঁটছি। এই পুরো জায়গাটি পর্যটকদের জন্য কতটা আকর্ষণীয় তা পর্যটকদের ভীড়ই বলে দিচ্ছে। আমি শুরু করেছিলাম প্রাকা দো কমেরসিও থেকে, যদিও গত রাতে এদিকটা ঘুরে গিয়েছিলাম তবে দিন আর রাতের দৃশ্যপট স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন। সকালের সোনালি মিষ্টি রোদে বিস্তৃত প্রাকা দো কমেরসিও বেশ জমজমাট, আগেই বলেছি এটা লিসবনের বাণিজ্যিক স্কয়ার। এই স্কয়ারের রয়েছে বিশাল প্রবেশদ্বার, অনেকটা দিল্লি গেটের আদল, তারপর দু’দিকে বিশাল ভবন আর সামনে খোলা তাগুস নদী। ইউরোপে এই প্রথম একটি নদীর দেখা পেলাম যাকে সত্যিকার নদী বলা যায়। যদিও কাল রাত পর্যন্ত এটাকে আমি সমুদ্র ভেবেছিলাম। এই ভুলের পেছনে কারণও ছিল, আসলে এর আগ পর্যন্ত আমি যে-কয়েকটি নদী দেখেছি সেগুলোকে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নদী না বলে লেক বলা যায়। তাই বিস্তৃত তাগুস নদীকে আমি ভেবেছিলাম আটলান্টিকের কোনো অংশÑ তবে, আদতে আটলান্টিকের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী তাগুস মাঝে মাঝে তার চরিত্র বদলে সাগরের মতো আচরণ করে। মূলত এর ঢেউ আর বিস্তৃতিই আমাকে বিভ্রান্ত করেছে।
সকালের এই মিঠেকড়া রোদেলা সময়ে ঢেউগুলো যেন রোপার ঝিলিক দিচ্ছে। রাতে যে জেটিমতো জায়গাটি দেখে গিয়েছিলাম সেখানটায় আবার এলাম। এখানে এসে নদীর জলে পা ভেজানোর সুযোগ আছে কিন্তু জায়গাটা বেশ পিচ্ছিল, তাই স্বাদ থাকলেও সাহস করলাম না। ইউরোপীয়দের মধ্যে সুযোগ পেলেই সাঁতার কাটার বেশ ঝোঁক। তাগুসে সাতার কাটার কোনো বিধি নিষেধ না থাকায় বেশ কিছু পর্যটককে দেখলাম সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে। তাগুসের পুরো তীরটি বাঁধানো। মসৃণ পায়ে চলার পথ, পথের ধারে রয়েছে স্ট্রিটশপ ; যেখানে বাহারি পণ্যের পসরার মধ্যে আমার নজর কাড়লো এমন একটি শপ যেখানে এক তরুণী হাতে আঁকা ছবির ফটোগ্রাফ বিক্রি করছেন। প্রতিটি ছবিতে প্রচীন লিসবনের চিত্র জীবন্ত হয়ে আছে। বেশ আকর্ষণীয়, যেহেতু এগুলো হাতে আঁকা ছবির প্রতিকৃতির তাই দাম বেশ কম। সেখান থেকে অনেক বেছে বেছে তিনটি ছবি কিনে নিলাম। দোকানি চমৎকার করে ছবি তিনটি প্যাকেট করে দিল। এরপর আমি আবারও হাঁটতে শুরু করলাম। কতদূর যাব তা নির্ধারিত না- তবে, সময়ের দিকে লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে। এরমধ্যে আমি নদী তীরবর্তী একটি চমৎকার জায়গায় গিয়ে থামলাম সেখানে যে-বিষয়টি আমার নজর কেড়েছিল তা Almada Negreiros Monumento. আলমাদা নগেরেইরোস ছিলেন একজন পর্তুগীজ লেখক, পর্তুগীজ শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে তিনি একজন অগ্রদূত। তাকে পর্তুগীজ শৈল্পিক আন্দোলনের একজন পথনির্দেশক হিসেবে দেখা হয়। তাকে স্মরণ করে তাগুস নদীর তীরে তৈরি করা হয়েছে Almada Negreiros Monumento & Lounge| Almada Negreiros Lounge মূলত একটি রোস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁটি পুরোটাই নদীর উপরে। বেশ চমৎকার একটি পরিবেশ, নদীর উপর খোলা আকাশের নিচে, এখানে বসলে মনে হয় যেন জাহাজের ডেকে বসে আছি। নদীর তীর বেশ লম্বা জায়গাজুড়ে কাচের দেয়াল যেন নদী নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। এটা আসলে একটা ফটোশুট পয়েন্ট, পর্যটককে আকর্ষণ করার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে।

আমি এই পর্যন্ত নিজে সীমা নির্ধারণ করে নিলাম, অবশ্য এরপর যতদূর যাওয়া যায় শুধুই নির্জন নদীতীর। Almada Negreiros Lounge-এ কিছু সময় কাটিয়ে আমি ফেরার পথ ধরলাম। টানা আধ ঘণ্টা হেঁটে আমি ফিরে এলাম আমার গেস্ট হাউজের কাছাকাছি। এখান থেকে মেট্রো মাত্র মিনিট পাঁচেকের পথ। হাতে আরো কিছু সময় থাকায় আমি কাছাকাছি অলিগলি ঘুরে বেড়ালাম। আগেই বলেছি, লিসবন শহরের এই অংশটি পুরানো ঢাকার আদল তাই এর অলিগলিতেও অনেক দর্শণীয় স্থাপনা রয়েছে। এই যেমন শান্তা জাস্তা লিফ্ট [Elevador de Santa Justa] এটি এমন একটি লিফ্ট যা সমতল আর পাহাড়ি রাস্তার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে জনসাধারণের চলাচলকে সহজ করে তুলেছিল। লিসবনের ডাউন-টাউন [Baixa] এবং কারমো স্কয়ার যা the higher Largo do Carmo, নামে পরিচিত এই দুই গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী এই ব্রিজ বা লিফ্টটি লিসবনের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা। এরকম অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে বেলা ১.৩০ মিনিট বেজে গেল, এবার লিসবনকে বিদায় জানাতে হবে। আমি এখন সেই বাঙালি ভাইয়ের মুদি দোকানে। সেখান থেকে আমার ল্যাগেজ নিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি মেট্রোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মেট্রোতে করে আমার এয়ারপোর্ট পৌঁছুতে সময় লাগল আধঘণ্টা। এরপর সিকিউরিটির ঝামেলা শেষ করে প্রায় ঘণ্টাখানেকের অবসর, এই ফাঁকে কিছু খেয়ে নিয়ে এ দোকান, সে দোকান ঘুরে সময় কাটিয়ে দিলাম।
২৬ তারিখ সন্ধ্যায় আমি আবার প্যারিসে ফিরে এলাম। এর পরের সময়টা ছিল খুবই ব্যস্ততার। কারণ, ২৭ তারিখে আমি বারগেনে ফিরে যাব, সুতরাং ১৭ দিনের প্যারিস আবাসের পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে হবে। আক্ষরিক অর্থেই সে সময়টা আমি গোছগাছে অতিক্রম করেছি। ২৭ তারিখ অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ আমি প্যারিস থেকে বারগেনের পথে, আমার কাজিনের পুরো পরিবার আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে গেল, আমার মনে পড়ে সিকিউরিটি চেকিং, এরপর যতদূর পর্যন্ত আমাকে দেখা গেল আমার ভাই [কাজিন] হাত নেড়ে গেল। তবে, চোখের পানি আড়াল করতেই যেন দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো ছিল। আমার অবস্থাও তাই এই ক’দিনে আমার সাথে ভাতিজাদ্বয়ের সম্পর্কটা খুব মধুর হয়ে উঠেছিল, আমি যখন একেবারেই ওদের দৃষ্টির আড়ালে তখন আমার অবস্থা আমার কাজিনের মতো। মনে হলো যেন নিজের বাড়িই ছেড়ে যাচ্ছি।
আমি যখন বারগেনে পৌঁছালাম তখন বারগেনও খুব বিষণœ ছিল, চেনা মানুষের সংখ্যা কমে গিয়েছিল- কেননা, ইতোমধ্যে ফারজানাসহ [কলিগ] আমার আরো বেশ কয়েকজন সহপাঠী দেশে ফিরে গেছে। অবশ্য এখন আমাদেরও ফেরার সময় হয়ে গেল, আর গুনেগুনে চার দিন, তারপরেই নিজের দেশে, নিজের ঘরে আর আপনজনের সান্নিধ্যে। আমি সম্ভবত অনেকবার এ-কথাটি বলেছি যে আমি খুব হোম সিক। যে-কারণে বারগেনে আমার অবস্থানকাল অনেক সময়ই অসহ্য ঠেকেছে। শুরুর ক’টা দিন তো শুধু দিন না সময়-ক্ষণ হিসেব করতাম। তবে, ধীরে ধীরে কিছুটা মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। তবে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বারগেন উইনির্ভাসিটির এক্সচেঞ্চ এডুকেশন প্রোগামে যুক্ত হতে পারার বিষয়টি আমার জন্য একটি উন্মুক্ত দিগন্তের সাথে পরিচিত হওয়ার অন্যতম সুযোগ ছিল এবং বলতে দি¦ধা নেই, আমি এই সুয়োগের সদ্ব্যবহারে সচেষ্ট ছিলাম। এই পাঁচ মাসে আমি প্রায় ১২টি দেশ ভ্রমণ করতে পেরেছিলাম। তবে, একটা আক্ষেপ রয়ে গেল যে, একলা ভ্রমণের যে-সাহস আমি শেষ সময়ে এসে দেখিয়েছিলাম এটা যদি শুরুর দিকে করতে পারতাম তবে হয়ত ১২টির বদলে ২৪টি দেশে যেতে পারতাম, তবে যা হলো তাই বা মন্দ কি।
বারগেনে আমার শেষ ক’টা দিন খুব স্বাভাবিকভাবেই বেশ ব্যস্তায় কেটেছে, পাঁচ মাসের সাজানো আবাস ছাড়তে হবে। উইরোপে আবার এসব ক্ষেত্রে কিছু কঠিন নিয়ম আছে। কঠিন হলেও নিয়মগুলো কিন্তু ভালো। এই যেমন, আমি আমার হোস্টেল ছেড়ে দেব সেক্ষেত্রে শুধু নিজের জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিলে হবে না বরং হোস্টেল রুম, কিচেন, বাথরুম সব ঝকঝকে তকতকে করে রেখে আসতে হবে, নইলে হোস্টেল ভাড়া নেওয়ার সময় যে-জামানত দিতে হয়েছিল তা ফেরত পাওয়া যাবে না। তাই সময় নষ্ট না করে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নেমে পড়লাম। শেষ সময়ে এসে দেখি টুকটাক কিছু কেনাকাটা বাকি একফাঁকে বেরিয়ে সেটাও সেরে নিতে হলো। এখানে যার কথা না বললেই নয় সে হচ্ছে ফারজানা, বারগেনে আমার প্রতিবেশী, প্রবাসী বাঙালি। আমার পাঁচ মাসের প্রবাসজীবনে ফারজানার কাছে আমি নানাভাবে ঋণী, আরও অনেকের প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ, তানিয়া, জুবায়ের, বিশাল, সুস্মিতা, বেনিয়ামিন ভাই এমনি আরো অনেকে। প্রবাসজীবনে কারো সাথে নিজ ভাষায় কথা বলতে পারাটাও অনেক আনন্দের, যারা আমার প্রবাসের মন খরাপের সময়ে আমার পাশে ছিলেন তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা।

দেখতে দেখতে ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেল, রাত পোহলেই নতুন বছর আর আমারও নির্বাসিত জীবনের সমাপ্তি, সকাল হলেই মুক্ত পাখি ডানা মেলবে। ৩১ ডিসেম্বর উইরোপজুড়ে থারটি ফাস্ট নাইট, যার অন্যতম আকর্ষণ ফায়ার ওয়ার্কস। স্টুডেন্ট হাউজের স্বম্ভবত আমি ছাড়া হাতে গোনা দু-চারজন বাদে প্রায় সবাই ইউনিভর্সিটি চত্বরে, যেখানে বারগেন সিটি কর্তৃপক্ষ ফায়ার ওয়ার্কস-এর আয়োজন করেছে। ও আচ্ছা বলা হয়নি, ইউরোপে কিন্তু আমাদের দেশের মতো নিজ উদ্যোগে চাইলাম আর আতশবাজী কিনে নিয়ে বাসার ছাদে উঠে গেলাম আর সারারাত ধরে কা-জ্ঞানহীনভাবে আতশবাজী ফুটিয়ে গেলাম, এমনটি হবার জো নেই। যদি কেউ এটা করে থাকে তবে তাকে অবশ্যই চৌদ্দশিকের ভেতরে নিজের জায়গা বুঝে নিতে হবে। প্রতিটি শহরে ফায়ার ওয়ার্কস-এর জন্য নির্ধারিত জায়গা থাকে এবং সিটি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময় ও স্থিতি মেনে ফায়ার ওয়ার্কস চলে। বারগেনে ঘণ্টা দেড়েক সময় নির্র্ধারিত ছিল ফায়ার ওয়ার্কস-এর জন্য। এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ ও পরিবেশনা, যদিও আমি যাইনি, তবে পরে জেনেছিলাম। আমি কেন যাইনি, পেছনের কারণটি ছিল আমি ভেবে নিয়েছিলাম সম্ভবত প্রায় সারারাত্রি ফায়ার ওয়ার্কস আর কনসার্ট চলবে আর এদিকে ভোরবেলা আমার ফ্লাইট, সুতরাং আমি কোনো রিস্ক নিতে চাইনি। কিন্তু সাড়ে এগারোটায় শুরু হয়ে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল শুনে আমার খুব আফসোস হয়েছিল। যাহোক, চেষ্টা করছিলাম তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ব, কিন্তু বাড়ি ফিরার উত্তেজনায় ঘুমও যেন পালিয়ে গেল।
আমরা বেশ কিছু সময় হাতে নিয়েই বের হলাম, আমি এবং আরও সাতজন সহপাঠী। আজ বারগেনে আবহাওয়া খুব বিক্ষিপ্ত, মনে হচ্ছে ঝড় হবে। আমরা সকালের প্রথম মেট্রো ধরে এয়ারপোর্টে চলে এলাম। এর মঝে ঝড়ো হাওয়া রীতিমতো তা-ব চালাচ্ছে, বারগেনের এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমাদের বোর্ডিং শেষে লাগেজ জমা দিয়ে হালকা নাস্তা করে ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষ করছি, এদিকে এয়ারপোর্টের স্ক্রিনে একের পর এক ফ্লাইট ক্যান্সেলের নোটিশ যাচ্ছে, আমাদের ফ্লাইটও ডিলে হচ্ছে, আশঙ্কা হচ্ছে আবার না আমাদের ফ্লাইটও ক্যান্সেল হয়। যাহোক, সব জল্পনা আর চিন্তার অবসান ঘটিয়ে আমরা বারগেন থেকে অসলোর পথে, সেখানে আমাদের দুই ঘণ্টার ট্রানজিট। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এখানে বেশ কিছু সময় ডিলে হয়। বিকেল প্রায় সাড়ে চারটায় আমরা অসলো থেকে আবার যাত্রা শুরু করি। রাতের কোনো একসময়ে আমরা ইস্তাম্বুল পৌঁছি, সেখানে তিন ঘণ্টার যাত্রা বিরতি, এরপর আমাদের ফাইনাল ডেস্টিনেশন, আমার দেশ। ২ জানুয়ারী ২০১৯ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে এসে আমরা নতুন বছরের নতুন সুর্যোদয় দেখি...।