বনের পাখি স্বাগতা

12 Jun 2024, 12:12 PM কাভার স্টার শেয়ার:
বনের পাখি স্বাগতা

গুলশানের একটি আলিসান বাড়িতে বসবাস স্বাগতার। বাসায় ঢুকতে আলিয়া শরীরের গন্ধ শুঁকে নিলেন, কী চমকে গেলেন! একজন মেয়ে কেন শরীরের গন্ধ শুঁকবে! আলিয়া কোনো মেয়ে না, আবার মেয়ের চেয়ে কমও নয়, আলিয়া স্বাগতা ও হাসান আজাদ দম্পতির পোষা একটি সারমেয়ের নাম; নতুন কেউ এলে সবাইকে শুঁকে তার গন্তব্যে চলে যায়, স্বাগতা আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন কথাগুলো। স্বাগতাকে দেখেই বোঝা গেল রূপসজ্জার কাজ শেষ। ওয়ের্স্টান একটি পোশাক পরেছেন দেখতে অনেকটা পশ্চিমাদের মতো মনে হলেও পুরোপুরি নন, বাঙালিদের গঠনই এমন যে, অন্যরকম পোশাকে পশ্চিমা মনে হলেও আকৃতিতে কিন্তু বাঙালিয়ানাই রয়ে যায়। ঠোঁট এঁকেছেন লাল টুকটুকে লিপস্টিক দিয়ে, চুলগুলো ছেড়ে রেখেছেন। আমন্ত্রণ জানালেন চা-চক্রে। চা-এর আড্ডায় কথা হলো নানা বিষয়ে, গল্প যেন থামছেই না, ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আড্ডার সমাপ্তি ঘটিয়ে শুরু হলো ফটোসেশন। ফটোসেশনের পরপরই শুরু হলো সাক্ষাৎকার পর্ব। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন শেখ সেলিম...

আজ যারা অভিনয়শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাদের অনেকেই এসেছেন মঞ্চ থেকে। টেলিভিশন, বড়োপর্দা কিংবা ওটিটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অনেকে মঞ্চ ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু অভিনয়শিল্পী জিনাত সানু স্বাগতার ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। তিনি টেলিভিশন, বড়োপর্দা ও ওটিটিতে কাজ কমিয়ে যুক্ত হয়েছেন থিয়েটারে। গেল ৩ জুন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত পালা নাটক ‘বনের মেয়ে পাখিতে’ অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন সাজ্জাদ সাজু। এতে ‘পাখি’ চরিত্রে অভিনয় করেন স্বাগতা। মঞ্চের কাজ নিয়ে স্বাগতা বলেন, “ছোটোপর্দার ব্যস্ততা পেছনে ফেলে নাটকের মহড়ার জন্য কয়েক সপ্তাহ সময় দিয়েছি। বেশ কষ্ট করে নাটকের মহড়ায় অংশ নিয়েছি। দর্শক নাটকটি দেখে আনন্দিত হয়েছেন বলে সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। অনেক গুণী নাট্যজনেরা এসেছিলেন নাটক দেখতে। তাদের মুখে ছিল আমার প্রশংসা। এতে সামনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।” এখন থেকে টিভিনাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চেও কাজ করার ইচ্ছের কথা জানান তিনি।

সবাই মঞ্চ থেকে পর্দায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন, আপনি এর উল্টো পথে হাঁটছেন। এমন কথার পিঠে স্বাগতা বলেন, “এর আগে শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চে কাজ করেছি। এরপর এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি, যার ফলে আর কাজ করা হয়ে ওঠেনি। যখন ‘বনের মেয়ে পাখি’তে কাজ করার সুযোগ এলো, দেখলাম এখানে ষোলটি গান আছে, নাচ আছে এবং নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে, তখন দেখলাম এটা একটা ভালো সুযোগ। বিশ্বের নামীদামি অনেক শিল্পীরা কিন্তু একটা সময় মঞ্চে এসে নিজেকে আবার ঝালিয়ে নেন, আমি দেখলাম এইরকম একটি কাজ করতে পারলে আমার অভিনয়টাকেও একটু পোক্ত করতে পারব। সেক্ষেত্রে পরবর্তীকাজের জন্য আমি নিজেকে আরো পোক্তভাবে তৈরি করতে পারব। সেজন্য কাজটি করা। তাছাড়া বর্তমানে ইউটিউবে যেসব কাজ দেখছি, সেখানে কাজ করার জায়গা খুবই কম, আমি নিয়মিত অভিনয় করতে চাই, কিন্তু সেভাবে কাজ করা হয়ে উঠছিল না, তাই প্রশান্তির জন্য কাজটি করছি। কাজটি চ্যালেঞ্জিং ছিল, নিজেকে তৈরি করতে টানা ১২দিন রির্হাসেল করতে হয়েছে। পুরো ইউনিটকে পেয়েছি মাত্র চারদিন, তবে নাটকের নির্দেশক সাজু ভাই আমাকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কারণ, মঞ্চে কাজের জন্য যা প্রয়োজন আমার মধ্যে তা ছিল, গান, নাচ দুটোই আমার আয়ত্তে।”

বর্তমানে টেলিভিশনে অনেক সিনিয়র শিল্পীদের দেখা যাচ্ছে না, এই বিষয়ে স্বাগতা বলেন, “এর মূল কারণ গল্প, এখন গল্প নিয়ে খুব একটা কাজ হচ্ছে না, এখন কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে। যে কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে আমার মনে হয় না এখানে অভিনয়শিল্পীদের প্রয়োজন আছে, সে কারণে আমাদের নেওয়া হচ্ছে না, বাজেটও থাকছে না। যার ফলে সেভাবে আমি কাজও করতে পারছিলাম না, একপ্রকার ডিপ্রেশনের মধ্যে ছিলাম, যখন কাজী নজরুল ইসলামের এই পালা নাটকে কাজ করার সুযোগ পেলাম, কাজটি করে আমি যেন রিল্যাক্স পেলাম। নাটকটি করার পর অনেক দল থেকেও ডাক পাচ্ছি।”

একটা সময়ে একাধিক টিভি চ্যানেলে উপস্থাপনা করেছেন স্বাগতা। এখন সেইভাবে দেখা যায় না, এই প্রসঙ্গে স্বাগতা বলেন, “এখন ইচ্ছে করেই উপস্থাপনা কমিয়ে দিয়েছি, বাজেটও কম। সবশেষ করেছি ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’, এটা করে বেশ সাড়া পেয়েছি। তবে এবারের ঈদে তিন পর্বে ছায়াছন্দ অনুষ্ঠানে দর্শক দেখতে পাবে আমাকে।”

অভিনয় ও উপস্থাপনার পাশাপাশি গানেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন স্বাগতা। একাধিক অ্যালবামও প্রকাশ পেয়েছে তার, গানের কী অবস্থা জানতে চাইলে স্বাগতা বলেন, “গানের চর্চা এখনো করছি, এখনো উচ্চাঙ্গসংগীত শিখি। হাসান আজাদের [জীবনসঙ্গী] সঙ্গে দুটি গান করে রিলিজ দিয়েছি, সেটারও ফিডব্যাক ভালো পেয়েছি। আর একটি পরিকল্পনা রয়েছে, সেটা হলো আমাদের বিয়ের ভিডিও এখনো প্রকাশ করিনি। আমার ইচ্ছে আছে একটি গানের মাধ্যমে আমাদের বিয়ের ভিডিও প্রকাশ করার। এটার কাজও প্রায় শেষের দিকে। আশা করি খুব শিগ্গিরই এটা প্রকাশ করতে পারব।”

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন আসছে, মিডিয়া অঙ্গনও এর বাইরে নয়, একের পর এক প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে আমাদের মিডিয়ায়ও। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। সেখানেও যুক্ত হয়েছেন স্বাগতা। তার প্রথম অভিনীত ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজ হচ্ছে ‘পাঁচফোড়ন’ সেটা হৈচৈতে প্রকাশ পেয়েছে। প্রথম কাজের সফলতার পর অভিনয় করেন ‘কাইজার’ নামে একটি কনটেন্টে। সেখানেও ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন তার অভিনয়ের।

ভবিষৎ প্রসঙ্গে স্বাগতা বলেন, “আমি একজন শিল্পী। আমার পারর্ফম করতে খুবই ভালো লাগে। ভালো ভালো কাজ চাই, যাতে করে মন দিয়ে কাজটা করতে পারি। সেইসঙ্গে হাসানের সঙ্গে যেন ভালোভাবে সংসার করতে পারি।”

হাসান আজাদ স্বাগতার জীবনসঙ্গী। গেল বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সুরকার, লেখক ও কম্পোজার হাসান আজাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন স্বাগতা। কেমন চলছে সংসার জানতে চাইলে স্বাগতা বলেন,“শুকরিয়া আমরা অনেক ভালো আছি, আমার স্বামী হাসান একজন গুণী মানুষ। তিনি গান করেন, লেখেন, কম্পোজ করেন, পিএইচডি হোল্ডার, বেশিদিন হয়নি বাংলাদেশে এসেছেন, আমি চাই তিনি এই দেশে কোনো ইন্সটিট্যুটে পড়ান, একজন পার্টনার যদি আর একজনের মন না বোঝে তাহলে সংসার করা মুশকিল, আলহামদুল্লিাহ হাসান আমার সবকিছুতে অ্যাপ্রিসিয়েট করেন। স্বামী হিসেবে তিনি অসাধারণ, আমাকে অনেক ভালোবাসেন। আমার কাজে উৎসাহ জোগান, এ-ই বড়ো প্রাপ্তি আমার জন্য।”

ঈদের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বলেন,“ঈদুল আজহা মানে স্যাক্রিফাইস। বরাবরেমতো এবারও পশু কোরবানি দেব এবং কোরবানির মাংস যেন প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছে সে ব্যবস্থা করবো”

গেল ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় মিশুক মনিরের দেয়ালের দেশ সিনেমাটি। এই সিনেমায় একটি চরিত্রে অভিনয় করেন স্বাগতা। ছবিটি দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও প্রশংসিতহয়েছে। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে নূরুল আলম আতিকের ‘মানুষের বাগান’ ছবিটি।

অভিনয়ের পাশাপাশি স্বাগতা একটি প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজের নতুন প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী স্বাগতা। 

ছবি : জাকির হোসেন . রূপসজ্জা- মো. রশিদ

স্বাগতাসমগ্র

সাড়ে তিন বছর বয়সে ‘লিনজা’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মাধ্যমে শোবিজে পা রাখেন স্বাগত। এরপর শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন ‘সম্মান’, ‘সতীপুত্র আবদুল্লাহ’ ও ‘টপ মাস্তান’ চলচ্চিত্রে। স্বাগতা ছেলেবেলা থেকে গান গাইতেন। ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় ছড়াগান বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে মান্নার বিপরীতে ‘শত্রু শত্রু খেলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এর আগে, ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘ইউ গট দ্য লুক’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে তার অভিনীত ‘সূচনা রেখার দিকে’ সেন্সর ছাড়পত্র পায়। কিন্তু চলচ্চিত্রটি আজও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি।

ছোটোপর্দায় স্বাগতার অভিষেক ঘটে আবদুল্লাহ আল মামুন নির্দেশিত ‘এক জনমে’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের মাধ্যমে। তার অভিনীত প্রথম একক নাটক হলো ‘ইচ্ছেপূরণ’।

স্বাগতা অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনাও করেন। তিনি ‘মহাকাল’ নামে একটি ব্যান্ডদল গড়ে তুলেছিলেন। সে দল পরবর্তীসময়ে ভেঙে যায়। তার প্রকাশিত অ্যালবামগুলো হলো,‘মহীনের ঘোড়াগুলি’, ‘স্বপ্নচূড়া’, ‘মহাকাল’ ও ‘ভালোবাসি তোমাকে’। এছাড়াও তিনি ‘প্রাণকোলা’, ‘কোকোলা নুডলস’, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক’ ও ‘গ্রামীণফোন’-এর বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হন। এছাড়াও তিনি টানা কয়েকবছর ‘নীলাঞ্জনা পল্লী আনন্দভুবন ঈদফ্যাশন শো’তে অংশ নেন র‌্যাম্প মডেল হিসেবে।