বাংলা ভাষার দুঃখ বেশ প্রাচীন। হাজার বছর ধরে বাংলা ভূখ- শাসন করেছে কোনো-না-কোনো বিদেশি শক্তি। বাংলা ভূখ-ের দাপ্তরিক ভাষা তাই কখনোই বাংলা ছিল না। ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসনকালে ছয়শো বছর ফারসি ছিল বাংলার দাপ্তরিক ভাষা। হাজার বছর আগে ‘প্রাকৃত’ ভাষা থেকে সৃষ্ট বাংলা ভাষায় কথা বলে এদেশের কৃষক-শ্রমিক, জেলে-তাঁতি, কামার-কুমোর-সহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। কৃষিপ্রধান এই দেশে মানুষ লীলাবতী খনার বচন থেকে শিক্ষা নিয়ে কৃষিকাজ করে। হাজার বছর পূর্বে সৃষ্ট খনার বচন খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত। স¤্রাট আকবর কৃষির সুবিধার জন্য বাংলা পঞ্জিকা চালু করেছিলেন ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। তবুও একশ্রেণির মানুষ যুগে যুগে বাংলা ভাষা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং বাঙালিকে বারবার ভাষার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ কালপর্বে কিংবা তারও পরে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাঙালি ভাষার জন্য যে-আন্দোলন করেছে, যে-আন্দোলনে পাকিস্তান সরকার গুলি করে ছাত্র-জনতা হত্যা করেছে, সে আন্দোলন ছিল ভাষার রাজনৈতিক সংগ্রাম ; বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার সংগ্রাম। বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির সাংস্কৃতিক লড়াই কিন্তু শুরু হয়েছিল সেই মধ্যযুগে। যে-লড়াই করেছেন মূলত বাঙালি কবিরা। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত একাধিক কবির কবিতায় বাংলা ভাষার সংগ্রাম সুস্পষ্ট।
মধ্যযুগের অন্যতম কবি সৈয়দ সুলতান আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের কবি। তাঁর রচনাসমূহের মধ্যে ‘নবীবংশ’ অন্যতম সেরা কাব্যগ্রন্থ। তিনি বাংলায় কবিতা লিখেছিলেন বলে তাঁকে ‘মোনাফেক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এর প্রতিবাদে তিনি লিখেছিলেন :
‘যারে যেই ভাষে বিধি করিল সৃজন
সেই ভাষ তাহার অমূল্য রতন।’
মধ্যযুগের আরেক খ্যাতিমান কবি আবদুল হাকিম জন্মগ্রহণ করেন ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর নিবাস ছিল নোয়াখালিতে। তিনি একাধারে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। বাংলা ভাষার প্রতি অসামান্য শ্রদ্ধাবোধ ছিল আবদুল হাকিমের। তাঁর বাংলা ভাষার প্রীতির সাক্ষ্য পাওয়া যায় ‘নূরনামা’ কাব্যে। তিনি লিখেছেন :
‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥’
কবি রামনিধি গুপ্ত পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় জন্মেছিলেন ১৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে। মাতৃভাষা ত্যাগ করে যারা অন্য ভাষায় কথা বলতে বা সাহিত্য সৃষ্টি করতে আগ্রহী তাদের উদ্দেশে রামনিধি গুপ্ত উচ্চারণ করলেন চিরকাল স্মরণযোগ্য পঙ্ক্তি :
‘নানান দেশের নানান ভাষা,
বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা’।
পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কুমারহট্ট গ্রামে ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মেছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। বাংলাকে ভালোবেসে তিনি লিখলেন :
‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা
মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা!’
তাঁর এই কবিতা গান হিসেবে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ-সহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এই কবিতাগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, যুগ-যুগ ধরেই ‘বাংলা ভাষা’র ওপর আঘাত এসেছে এবং কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকেরা তা প্রতিহত করেছেন। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার কথা তো সবারই জানা। বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী মাইকেল ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, মাতৃভাষা ছাড়া উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। তাই তিনি মাতৃভাষার বন্দনাগীত গাইলেন ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় : ‘হে বঙ্গ ভা-ারে তব বিবিধ রতন’Ñ এই বাক্য দিয়ে কবিতা শুরু করেছেন, শেষ করেছেন এই বলে যে, ‘পালিলাম আজ্ঞা সুখে ; পাইলাম কালে / মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।’
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশ ভাগের পরপরই নতুন করে বাংলা ভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানি শাসকেরা বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি চরম অবজ্ঞা পোষণ করে বাঙালি জাতিকে নতুন করে যে-পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে, তার পরিণাম ছিল ভয়াবহ। পাকিস্তানি নব্য উপনিবেশবাদী শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই এদেশের নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাতে থাকে। তাদের প্রথম ফন্দি ছিল কীভাবে বাংলার মানুষের মুখের ভাষা ছিনিয়ে নেওয়া যায়। এরই অংশ হিসেবে তারা বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাঙালির ঘাড়ে পাকিস্তানি সংস্কৃৃতি চাপিয়ে দেওয়ার নীলনকশা প্রস্তুত করে। তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে এক সমাবেশে ঘোষণা দেন : টৎফঁ ধহফ টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ কিন্তু এদেশের ছাত্র-যুবকেরা সে সমাবেশেই ঘড়, ঘড়, ওঃ পধহ’ঃ নব ধ্বনি তুলে তার এ-ধৃষ্টতাপূর্ণ ঘোষণার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানি সরকার সব প্রতিবাদকে পাশবিক শক্তি দিয়ে দমনের চেষ্টা চালায়। কেবল ভাষা-সংস্কৃতিই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও পূর্ব-বাংলার মানুষদের শোষণ করতে থাকে পাকিস্তান সরকার। পূর্ব-বাংলার সম্পদ কেড়ে নিয়ে উন্নয়ন করতে থাকে পশ্চিম-পকিস্তানের। ফলে তাদের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় এদেশের মানুষ। বাংলার দামাল ছেলেরা শুধু নয়, সর্বস্তরের মানুষ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বজ্র কঠিন শপথ গ্রহণ করে। বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ঐতিহাসিক ভাষা-আন্দোলন। এ আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়ায় ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের বাঙালি জনগণ।
এমন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন ভাষা-আন্দোলন দানা বাঁধছিল তখন শুরু থেকেই পূর্ব-বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে নানাভাবে ভূমিকা রাখে। তার মধ্যে ভাষার জন্য কবিতা ও গান রচনা অন্যতম। একুশে ফেব্রুয়ারি বা ভাষা আন্দোলন-কে উপজীব্য করে এদেশের সকল কবিই কবিতা রচনা করেছেন। একুশের রক্তাক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত রচিত প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। কবিতাটি লেখা হয়েছিল ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং ‘সীমান্ত’ পত্রিকার সম্পাদক মাহবুল উল আলম চৌধুরী লিখেছেন অমর এই কবিতা। ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি করেছে এবং বহুজন হতাহত হয়েছেÑ এই খবর তাঁকে বেদনাহত করে তোলে। বেদনামথিত, আবেগতাড়িত ও প্রতিবাদী পঙ্ক্তিমালা ‘কাঁদতে আসি নি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। তিনি যখন কবিতাটি রচনা করেন তখন তিনি ফেরার। তাঁর মাথার ওপর ঝুলছে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা। শুধু তাই নয়, তাঁর গায়ে তখন একশো চার ডিগ্রি জ¦র এবং জলবসন্ত দেখা দিয়েছে। ওই অবস্থায় তিনি মুখে মুখে রচনা করেন ১২০ চরণের দীর্ঘ কবিতাটি। তিনি বলে চলেন, তাঁর রাজনৈতিক এক সহকর্মী কবিতাটি কাগজে লিপিবদ্ধ করেন। সে-রাতেই চট্টগ্রামের ‘কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে’ গোপনে ছাপানো হয় কবিতাটি এবং পরদিন লালদিঘি মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাঠ ও বিলি করা হয়। ওই দিনই কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করে সরকার।