একটি প্রণয়াখ্যান -ম্যাক্সিম গোর্কি

26 Apr 2022, 01:06 PM সাহিত্যভুবন শেয়ার:
একটি প্রণয়াখ্যান -ম্যাক্সিম গোর্কি


অনুবাদ : কাজী দীশু

কথায় কথায় আমারই পরিচিত এক ভদ্রলোক সেদিন আমাকে বলেছিলেন : ছাত্রাবস্থায় যখন মস্কোয় থাকতাম, বাধ্য হয়েই সেই ধরনের এক মহিলার কাছাকাছি আমায় থাকতে হয়েছিল। আশা করি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, কি ধরনের মহিলার কথা আমি বলতে চাইছি।
পোলান্ডের মেয়ে। সবাই তাকে টেরেসা নামেই ডাকত। বেশ লম্বা। সুঠাম ঠিক বলব না, তবে একেবারে বেটপ চেহারা নয়। জ্বলজ্বলে দু’টো চোখের ওপর একজোড়া ঘন কালো ভ্রু। লম্বাটে মুখ ; শুকনো খড়ের মতো- ফ্যাঁসফেঁসে। খনখনে গলার স্বর আর মেছুনীর মতো পেশিবহুল দুটো হাত। সবকিছু মিলে মহিলাটি ছিল আমার কাছে রীতিমতো আতঙ্ক।
আমি থাকতাম ছাদের ঘরে, আর ঠিক উল্টো দিকের ঘরটাই ছিল তার। কখনোই আমি আমার দরজা খুলে রাখতাম না। যদি টের পেতাম, মহিলাটি ঘরে আছে। তবে ওর ঘরে থাকা আর আমার দরজা বন্ধ করে থাকা- এ দুটোর মধ্যে যোগাযোগ ছিল দৈবাৎ। কেননা, ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যেত সিঁড়িতে, নয় চাতালে। আর দেখা হলেই, ও আমার দিকে তাকাত ওর জ্বলজ্বলে চোখ দু’টো তুলে, হাসত ঠোঁট মুচড়ে। আমার কাছে কেমন যেন অদ্ভুত লাগত ওর হাসিটা। কখনো কখনো ওকে দেখতাম চুরচুরে নেশায় মাতাল। এলোমেলো চুল, শান দেয়া ইস্পাতের মতো ঝকঝকে চোখ আর একমুখ জ্বালাভরা হাসি দিয়ে সিঁড়িতে ও টাল সামলাত। আর সেই অবস্থায় দেখা হলেই ও মুখ খুলত ; জিজ্ঞেস করত- ছাত্তর বাবু যে। কেমন আছ ? অজানা এক আতঙ্কে ঠিক এই সময়টায় শিউরে উঠতাম আমি।
মহিলার এই অযাচিত অভিবাদনের হাত এড়াবার জন্যে বিশেষ করে নিজেকে শঙ্কামুক্ত করার নিমিত্তে, অনেক সময় ইচ্ছে হতো, ঘরটা বদলে নেই, কিন্তু নিতে পারিনি। কেননা, আমার ঘরটা ছিল ভারি সুন্দর। খোলা জানালা দিয়ে আকাশের অনেকখানি নীল দেখা যেতÑ অনেকখানি ফাঁকা। নিচে রাস্তার কোনো হল্লা-ই আমার ঘরের প্রশান্তি নষ্ট করতে পারত না। তাই নীরবেই এই অবাঞ্ছিত হাতছানিকে সহ্য করে যেতাম।
একদিন সকালে কৌচে জড়সড় হয়ে বসে আজকের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার একটা যুতসই কারণ মনে মনে খাড়া করছিলাম, এমন সময় আমার বন্ধ দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো টেরেসা। খনখনে গলায় অভিবাদন জানালো- ‘সুপ্রভাত, ছাত্তরমশাই।’
- ‘কি চাই ?’- প্রায় চমকে উঠেছিলাম।
সাহসে ভর করে তাকালাম তার দিকে। মনে হলো এ-যেন আর এক টেরেসা। কেমন যেন একটা সংকোচ আর লজ্জার ছায়া দেখলাম তার মুখে।
- ‘একটা অনুরোধ জানাব, রাখবে ?’
ততক্ষণে নিজেকে আমি অনেকখানি সামলে নিয়ে আবার আগের মতোই জড়সড় হয়ে বসেছি আমার কৌচে। অনুরোধের ভঙ্গিটা দেখে আবার যেন সেই অজানা আতঙ্ক আমার শিরদাঁড়ায় শিরশির করে উঠেছিল। মনে মনে বলতে পারেন প্রায় প্রমাদ গুণতে শুরু করে দিয়েছিলাম- ‘সর্বনাশ ! শেষে কি ... হে ঈশ্বর, আমায় শক্তি দাও।’
আমার উত্তরের প্রত্যাশা না রেখেই মহিলাটি বলল- ‘ছাত্তরমশাই, আমি আমার দেশের একটা ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠাব, লিখে দেবে।’
উহ্ মনে অকারণে কী উদ্বেগই না জড়ো হয়েছিল। কেটে যেতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সঙ্গে সঙ্গেই কৌচ থেকে প্রায় এক লাফে টেবিলে এসে, সামনে এক টুকরো কাগজ টেনে নিয়ে কাছে ডাকলাম তাকে। তারপর সামনের চেয়ারে বসতে বলে জিজ্ঞেস করলামÑ ‘কী লিখতে হবে বলো।’
মহিলা এসে বসল বটে তবে কেমন যেন জড়োসড়ো।
- ‘কী হলো ? চুপ করে গেলে যে ! কাকে চিঠি লিখবে ? ঠিকানা কী ?’
খুব ছোটো গলায় আমতা আমতা করে জবাব দিল-
- ‘বলেশ্লভ্ কাশপুট। ঠিকানা হলো ভ্যাপ্তসিয়ানা শহর, ওয়ারশ রোড।’
- ‘ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি বলে যাও।’
প্রায় আধবোঁজা চোখের ফাঁক দিয়ে এরপর সে বলে চলল তার চিঠির ভাষ্য, আর আমি লিখতে লাগলাম :
- প্রিয় বোলস... আমার প্রিয় ... আমার হৃদয়-বল্লভ ! মেরি মাতা তোমার মঙ্গল করুন। আমার জীবন-সর্বস্ব... আমার সোনাÑ তুমি কি তোমার ছোট্ট পাখি টেরেসাকে ভুলে গেলে ? কতদিন- হ্যাঁ কত্তোদিন হয়ে গেল বল তো ? অভাগী টেরেসাকে একটা চিঠি লেখার কথাও কি তোমার মনে নেই ?’
প্রায় হেসে ফেললাম, আর কি ? মাথায় পাঁচ ফুট লম্বা, পাথরের চেয়েও ভারি, বলে কিনা ‘হতভাগী ছোট্ট পাখি।’ আহা অভাগী ছোট্ট পাখির মুখটা কী ফ্যাকাসেই না হয়ে গেছে- যেন সদ্য বের হয়েছে রান্নাঘর থেকে। ধুয়ে মুছে আসার সময়টুকুও পায়নি।
- ‘বোলস কে ?’ চিঠি লেখা শেষ করে কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করি।
- ‘বোলস।’ আমার প্রশ্নে একটু যেন অসুন্তুষ্টই হয়েছিল সে।

বলল- ‘বোলস- হ্যাঁ, তার নাম বোলস- আমার ইয়ে, মানে ইয়ংম্যান।’
- ‘ইয়ংম্যান’- অজান্তে বোধহয় ভেতরের কৌতুকটা প্রকাশই করে ফেলেছিলাম।
- ‘কেন ? আমি মেয়ে নই ? আমার কি কোনো ইয়ংম্যান থাকতে নেই ?’ বেশ যেন উষ্মাই প্রকাশ পেল মেয়েটির গলায়।
বিস্মিত হয়েছিলাম আমি- বলে কী মেয়ে ! হা ঈশ্বর।
- ‘কতদিন ধরে সে তোমার- মানে ইয়ংম্যান।’- তবু জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি।
- ‘ছ’বছর।’
-‘ছ’বছর।’- মনে মনে আউড়ে গেলাম।
-‘ধন্যবাদ’- আর কথা বাড়াবার কোনো সুযোগ না দিয়ে মেয়েটি বললো- ‘তোমার যদি কোনো কাজ থাকেও আমায় বলতে পার।’
- ‘না, কোনো কাজ নেই।’
- তোমার সার্ট বা ট্রাউজারের কোনো মেরামতির কাজও কি নেই ?’
- ভেতরে ভেতরে আমি কেন যেন মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠলাম। প্রায় খিঁচিয়ে উঠলাম তাকে।
ও আর দ্বিরুক্তি না করে চলে গেল।
সপ্তাহখানেক কি দু’সপ্তাহ পর। তখন সন্ধ্যা নামছে। ধূপছায়া অন্ধকার। জানালার ধারে বসে শিস্ দিচ্ছি আর মনের অবসাদ কাটাবার উপায় চিন্তা করছি। বড্ড একঘেঁয়ে লাগছিল। আবহাওটাও ম্যাড়মেড়ে। বাইরেও যেতে ইচ্ছে করছিল না। নেই কাজ ত খৈ ভাজ। আত্মরতি করেছি। নিজেকে নিয়েই ভাবছিলাম। এ কাজটা আরো বাজে। হঠাৎ বন্ধ দরজাটা খুলে গেল।
- ‘ছাত্তরমশাই-এর নিশ্চয়ই কোনো কাজের চাপ নেই, তাই না ?’ বলতে বলতেই ঘরে ঢুকল টেরেসা।
আঁৎকে উঠে বিরক্ত হয়েছিলাম- আবার টেরেসা !
- ‘না। কেন ?’
- ‘তাহলে আর একটা চিঠি লিখে দেবার কথা বলতাম।’
-‘কাকে ? বোলসকে ?’
- ‘না। এবারের চিঠিটা তারই জবানীতে।’
- ‘কী বললে ?- একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম।
- ‘মাফ করো ছাত্তরমশাই’- আমার একটু রুক্ষু-সূক্ষ্ম ভাব দেখেই হয়ত আমতা আমতা করে বলেছিল- ‘আমার এক বন্ধুর জন্যেই তোমার কাছে এসেছি। ঠিক বন্ধু নয়, বলতে পারো আমার খুবই পরিচিত এক পুরুষ। আমারই নামে তারও এক প্রেমিকা আছে। আর তারই জবানীতে তার প্রেমিকা টেরেসাকে একটা চিঠি লিখে দিতে হবে।’
ওর আঙুলগুলো আঙুলের খিলানে তখন কাঁপছিল। জড়িয়ে যাচ্ছিল কথাগুলো। প্রথমদিকে কেমন যেন গোলমেলে লাগছিল ব্যাপারটা। তারপর সবকিছু বুঝতে পেরেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম-
- ‘দেখো বেশ বুঝতে পারছি, বোলস বা টেরেসা নামে কেউ কোথাও নেই। তুমি আমাকে গণ্ডা গণ্ডা মিথ্যে বলে যাচ্ছ। ওসব নিয়ে আর কখনো বিরক্ত করতে এসো না, - যাও।’
ওর চোখ-মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। ঝোড়ো বাতাসে পাতার মতো কাঁপতে শুরু করেছিল। পায়ে পায়ে পিছু হাঁটছিল। কেঁপে উঠছিল ঠোঁট দুটো- কী যে বলতে চাইছিল। দেখছিলাম আর ভাবছিলামÑ কিছু কি ভুল করলাম আমি ?
-‘ছাত্তরমশাই।’ শেষে যেন বুকফাটা একরাশ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো ওর কাঁপা কাঁপা ঠোঁট থেকে।
তারপর এক ঝটকায় আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল নিজের ঘরের দরজায়। দেয়ালের আড়ালেও দরজার সেই ভীষণ শব্দের আওয়াজ আমার কানে এসে বাজল।
হয়ত ওর কোনো কোমল জায়গায় আঘাত দিয়ে ফেলেছি। ভেবে মনটা আমার একটু খারাপই হয়ে গেল। কী দরকার ছিল, অকারণ এই অস্বস্তি- যাকগে যা হবার হয়ে গেছে। ঠিক করলাম, ওকে ডেকে আনি, যা বলে লিখে দিই।
টেরেসার ঘরে ঢুকলাম। সাদা-মাটা ঘর। হাতের ওপর মাথা রেখে ও টেবিলে মুখ গুঁজে বসেছিল।
‘শোন।’ ডাকলাম আমি।
মেয়েটা যেন শুনতেই পেল না।
জানো, যখনই এসব কথা মনে পড়ে নিজের কাছেই নিজেকে কী যে বিশ্রী লাগে।
- আবার ডাকলাম আরো একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে।
এবার চেয়ার ঠেলে একলাফে উঠে এসে ও দাঁড়াল আমার মুখোমুখি। ভেজা চোখ দুটো তার ঝকঝক করছিল ধারালো ইস্পাতের মতো।
আমার কাঁধে হাত রেখে ফ্যাঁসফেসে স্বরে বলল- ‘তুমি ঠিকই বলেছ ছাত্তরমশাই ; বোলস নামে কেউ নেই, টেরেসা নামেও কেউ নেই।’ তারপর সজোরে একটা ধাক্কা দিল আমার কাঁধেÑ ‘কিন্তু তাতে তোমার কী ? দু’কলম চিঠি লিখে দিলে তোমার কি ক্ষতি হতো শুনি ?... ঠিকই বলেছ... বোলস, টেরেসা কেউ নেই... কেউ নেই। শুধু আমি আছি- আমি।’
- ‘মাফ করো।’ কেমন যেন বিব্রত বোধ করছিলাম।... ‘কী বলছ, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। বোলস...’
- ‘কেন তুমি ত বলেছ বোলস নামে কেউ নেই, ঠিকই ত বলেছ।’
- ‘আর টেরেসা ? .. টেরেসা নামে ...’
- ‘না টেরেসা নামেও কেউ নেই। কিন্তু আমি। আমারই নাম টেরেসা। টেরেসা তো আমি নিজে।’
মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল। ভাবতে চেষ্টা করছিলাম, সত্যি সত্যিই কি মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেল- আর তার জন্য কি দায়ী আমি ? ততক্ষণে টেবিলের ড্রয়ার থেকে কি একটা কাগজ টেনে বের করে এনে দাঁড়াল সে আমার সামনে।
‘চিঠি লিখে দিতে তোমার যদি এতই বিরক্তবোধ হয়, তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে লেখাবো’
ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর টেরেসার। দেখলাম কিছুদিন আগেও যে চিঠিটা আমার কাছ থেকে লিখে নিয়ে গিয়েছিল, ওর হাতে সেই চিঠিটা।
আমার বোধশক্তি আরো একবার ধাক্কা খেল।
‘দ্যাখো টেরেসা, তোমার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি যখন তোমাকে চিঠি লিখে দিয়েছি, আর আবার দেব বলেও ডাকতে এসেছি, তখন ওসব কথা কেন ? তাছাড়া, ওই চিঠিটাও তো এখনো বোলসকে পাঠাওনি দেখছি।’
‘কোথায় পাঠাবো ? কাকে পাঠাবো ?’
‘কেন বোলসে। ওই যে কি ঠিকানাটা যেন।’
‘বললাম ত ছাত্তরমশাই, ও নামে কেউ নেই- কেউ নেই। তুমিও তো বলে দিয়েছ, কেউ নেই।’ এসব কি নিছক পাগলামি। তাই যদি হয়, তারও ত একটা সীমা আছে।
ওর ঘর থেকে চলেই আসছিলাম। কিন্তু ওর ক্ষুব্ধ কণ্ঠের খাপছাড়া কথায় আবার আমায় দাঁড়াতে হলো।
‘ও নামে যদি এই সংসারে কেউ না থাকে, তাতে কার কি এলো গেল। আমি ত বারবার বলছি, বোলস নামে কেউ নেই- কেউ নেই।’
বলল বটে, কিন্তু ওর হাত আর কাঁধের ঝাঁকানি দিয়ে এমন এক অভিব্যক্তি প্রকাশ করল, যার অর্থ কেন ও নামে কেউ থাকবে না।
আমি বলছি- আছে, নিশ্চয়ই আছে। আমি-আমি কি মানুষ নই- ওকি থাকতে পারে না আমি জানি না, নেই ... তবুও তাকে চিঠি লিখে তো আমি কারো ক্ষতি করছি না।
‘কাকে লিখে ?’
‘কেন বোলসকে- আমার বোলসকে।’
‘এই তো বলছ, ও নামে কেউ নেই। তাহলে আবার ...’
‘তাতে তোমার কি ? ঝাঁঝিয়ে উঠেই মুহূর্তে উদাস হয়ে গেল টেরেসা। আমি তাকে চিঠি লিখছি, জানি সে আছে। সে আমাকে... হ্যাঁ সে আমাকে লিখেছে... আমাকে, তার টেরেসাকে। আমি আবার তাকে লিখছি। সে আবার আমাকে ...।’
এতক্ষণে আমার কাছে সমস্ত ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। লজ্জায়, নিজের ওপর নিজেরই ঘৃণায় আমি সঙ্কুচিত হয়ে যেতে লাগলাম।
আমারই সামনে মাত্র হাত তিনেক দূরে দাঁড়িয়ে এক নারী, এই পৃথিবীতে যাকে ভালোবাসা দেবার কেউ নেই ; সে নিজের শান্তি খুঁজে নিয়েছে নিজের মধ্যেইÑ আপন কল্পনায়।
‘জানো’, তেমনি উদাস তার স্বর। ‘তুমি আমার জবানীতে বোলসকে যে চিঠি লিখে দিয়েছিলে, সেটা আমি আর একজনকে পড়তে দিয়েছিলাম। সে পড়েছে, আর আমি শুনেছি। শুনেছি আর অনুভব করেছি, আমার সামনে দাঁড়িয়ে বোলস... আমার বোলস। আর আমি তোমাকে যে চিঠি লিখে দিতে বলেছিলাম, মানে বোলসের হয়ে আমাকে... টেরেসাকে, সেটাও আমি আর একজনকে দিয়ে পড়াতাম। শুনতাম আর অনুভব করতাম বোলসকে আমার কাছে... আমার খুব কাছে। সব অবসাদ আমার ঘুচে যেত।
-‘হায় হতভাগিনী।’ নিজের উদ্গত দীর্ঘশ্বাস নিজেই সংযত করে নিয়েছিলাম। তারপর থেকে সপ্তাহে দুটো দিন আমি ওর জন্যে নির্দিষ্ট করে রেখেছিলাম। ও আসত আমার ঘরে, আমি লিখে দিতাম ওর চিঠি। টেরেসার চিঠি লিখে দিতাম বোলসকে আর জবানী লিখে দিতাম টেরেসাকে। বিশেষ করে জবানীগুলো আমি বেশ দরদ দিয়েই লিখতাম। শুধু লিখে দিতাম না, পড়েও শোনাতাম। ও শুনত,... দেখতাম ছলছল করে উঠত ওর চোখ দুটো তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ত। যদিও ওর ফ্যাঁসফেঁসে গলায় সে কান্নার সুর কিছুটা বেসুরো হয়েই বাজত, তবুও দেখতাম ওর দুচোখের বাঁধ ভেঙে অঝরে ঝরে পড়ত পানি।
আর... আর এই কাল্পনিক বোলসের চিঠি দিয়ে ওকে কাঁদানোর বিনিময়ে টেরেসা প্রায় প্রায় একরকম জোর করেই আমার শার্ট আর মোজার ফুটোফাটাগুলো মেরামত করে দিত।
এর প্রায় তিন মাস পর ঠিক কী কারণে জানি না, টেরেসা কয়েদ হয়ে গেল। এই নচ্ছাড় পৃথিবীতে এতদিনে সে আর নিশ্চয়ই বেঁচে নেই।...
কাহিনিটা শেষ করে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আমার সেই পরিচিত ভদ্রলোকটি আর কোনো কথা বলেনি- কেবল শুনতে পেলাম একটা দীর্ঘশ্বাস আর তার দুচোখে দেখলাম টলটল করছে অশ্রু।
[Love story ]

লেখক : অনুবাদক, কবি
অলঙ্করণ : পারিসা ফারজিন