শতবর্ষে বিদ্রোহী -ইকবাল খোরশেদ

08 Jun 2021, 02:19 PM সাহিত্যভুবন শেয়ার:
শতবর্ষে বিদ্রোহী -ইকবাল খোরশেদ

একদিকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, অন্যদিকে বর্ষার আগমনী বার্তাবাহী ঝিরিঝিরি ইলশেগুঁড়ি ; একদিকে কালবৈশাখির প্রচণ্ড মাতম, অন্যদিকে জ্যৈষ্ঠের রসালো ফল- আম জাম কাঁঠাল লিচু আনারসের মিষ্টি সুগন্ধ- এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে কাজী নজরুল ইসলামের [১৮৯৯-১৯৭৬] জন্ম। 

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ [২৫ মে ১৮৯৯] বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামের বিখ্যাত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ- দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এবছর নজরুলের ১২২তম জন্মজয়ন্তী এবং তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ।

১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের কোনো এক রাতে কাজী নজরুল ইসলাম একবসায় রচনা করেন বাংলাসাহিত্যের বিপুল প্রভাববিস্তারী কবিতা- ‘বিদ্রোহী’। তিনি তখন মাত্র ২২ বছরের যুবক। প্রথম মহাযুদ্ধ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। ১৯২০ সালে উনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে নজরুল তাঁর সৈনিকজীবন শেষ করে মার্চ মাসে ফিরে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় প্রথমে সতীর্থ কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাসায় ওঠেন। সেখানে কয়েকদিন থেকে অন্যত্র যান, এরপর ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’র আশ্রয় লাভ করেন। সেখান থেকে নজরুল মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে কয়েকটি বাসায় একত্রে বসবাস করেন। শেষে মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে ৩/৪-সি তালতলা লেনে বসবাস করেন।

কলকাতায় ফেরার পর বিপুল উদ্যমে নজরুল সাহিত্য সৃষ্টিতে আকণ্ঠ নিমগ্ন। এ সময়ের মধ্যে লেখা তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা হলো : গল্প : ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘রাক্ষসী’; উপন্যাস : বাঁধনহারা ; কবিতা ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’, ‘আগমনী’, ‘রণভেরী’, ‘আনোয়ার’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি। তবে এ সবকিছুকে ছাপিয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ঘটেছিল তাঁর কাব্যপ্রতিভার সর্বোত্তম প্রকাশ। এই কবিতাটিই নজরুলকে তাঁর কবি-জীবনের শুরুতেই খ্যাতির শিখরে পৌছে দেয়। নজরুল দ্রোহভাবাপন্ন আরও অনেক কবিতা লিখলেও শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্যই তিনি বাঙালির চিরকালের ‘বিদ্রোহী কবি’। এরকম অসাধারণ শব্দচয়ন, স্বতন্ত্র ভাষারীতি ও অভিনব ছন্দের গাঁথুনিতে রচিত বীররসে বলীয়ান কবিতা বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয়টি নেই। বিভিন্ন পুরাণের নির্যাস কী অসীম দক্ষতায় ও কুশলতায় এ কবিতায় সৃষ্টিশীলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। যুদ্ধফেরত এই যুবকের মনে তখন প্রবলভাবে বহমান উপনিবেশবাদের শোষণ ও সা¤প্রদায়িক বিভেদনাশী এক সুগভীর প্রতিবাদী চেতনা। 

কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪-সি বাড়িটি কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার আঁতুড়ঘর। বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মুজফ্ফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ বইয়ে জানান, কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪-সি পুরো বাড়িটি পশ্চিমগাঁর নওয়াব ফয়জুন্নিসা চৌধুরানীর নাতিরা ভাড়া নিয়েছিল। বাড়ির নিচতলার দক্ষিণ-পূর্ব ঘরটি তাঁরা ভাড়া নিয়েছিলেন। মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে নজরুল তালতলা লেনের ভাড়া বাড়িতে একসঙ্গে বসবাস করতেন। মুজফ্ফর আহমেদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর “বিদ্রোহী” কবিতা লিখেছিল। “বিদ্রোহী” কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা।’ মুজফ্ফর আহমদ জানান, নিজের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই কবিতাটি শুনে তিনি কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। ‘এতে নজরুল মনে মনে আহত হয়েছিল নিশ্চয়। আমার মনে হয়, নজরুল ইসলাম শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। তাঁর ঘুম সাধারণত দেরীতেই ভাঙত, আমার মতো তাড়াতাড়ি তাঁর ঘুম ভাঙত না।’ মুজফ্ফর আহমদ আরও জানান, নজরুল সম্ভবত প্রথমে কবিতাটি পেন্সিলে লিখেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম দোয়াত-কলমে কবিতা লিখতেন। দোয়াতের কালিতে বারবার কলমের নিব চুবিয়ে তিনি কবিতা, গল্প, গান লিখেছেন। কিন্তু কালজয়ী ‘বিদ্রেহী’ কবিতা লিখেছেন পেন্সিল দিয়ে। কবিতা লেখার জোশ একেবারে পরিপূর্ণ রাখার জন্যই নজরুল পেন্সিল ব্যবহার করেন। বারবার দোয়াতে কলম চুবিয়ে লিখলে জোশ হারিয়ে যাবে, কবিতার সুর-তাল কেটে যাবে সম্ভবত এই আশঙ্কা থেকেই তিনি পেন্সিল দিয়ে কবিতাটি লেখেন। মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দে কবিতাটি লিখে নজরুল দুনিয়াজোড়া আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাতে সাংবাদিক হিসেবে মুজফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। এরপর অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের যূথবদ্ধতায় স্বরাজের দাবিতে যখন সারাভারত প্রকম্পিত, তখন কবিও তার সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন, মিছিলে সক্রিয় থেকেছেন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ রচনার মাসটিতেই গ্রেপ্তার হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ; পরের মাসেই নজরুল একবসায় লিখে ফেলেন সাড়াজাগানো সংগীত ‘ভাঙার গান’ [কারার ঐ লৌহ কপাট]। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই ইউরোপীয় ধনলোভী উন্মাদনার বিপরীতে সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লবের [১৯১৭] মতো শোষণমুক্তির দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার কালপরিসরেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এম এন রায় মস্কো থেকে যে দূত পাঠিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে মুজফ্ফর আহমদ ও নজরুল ইসলামের একান্ত সাক্ষাৎ ঘটে। এরপরই মুজফ্ফর আহমদ ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কথা ভাবেন। নজরুল অবশ্য পার্টিতে সক্রিয় হননি ; তবে বৈপ্লবিক সমাজ-বদলের চেতনায় ছিলেন দারুণভাবে আন্দোলিত ও উজ্জীবিত।

এই ছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনবোধ ও জীবনাচারের কিছু বৈশিষ্ট্য।

নজরুল যথার্থ অর্থেই ছিলেন সর্বহারা, ‘কলমপেষা মজুর’; তাঁর ছিল না কোনো পিছুটান, মধ্যবিত্তসুলভ দ্বিধার দোলাচল তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। বরং যৌবনের বিপুল উদ্দামতা নিয়ে শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ, দুঃসাহসী, পরিণামভয়শূন্য। শাসক-শোষক আর ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহের কথাই উচ্চকণ্ঠে ব্যক্ত হয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। ফলে তা বিপুলভাবে পাঠকচিত্তে আন্দোলন সৃষ্টি করে। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রায় একইসময়ে ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশ হয় সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ ও মাসিক ‘মোসলেম ভারত’-এ। ওই জানুয়ারিতেই পুনর্মুদ্রণ হয় ‘প্রবাসী’র মাঘ সংখ্যায় এবং ‘সাধনা’র বৈশাখ সংখ্যায় [এপ্রিল ১৯২২]।

‘বিদ্রোহী’র তুমুল জনপ্রিয়তার কারণ, সমকালীন মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদী আবেগ কবিতাটি যথার্থভাবে ধারণ করে। আর এতে প্রতিফলিত হয় নজরুল ইসলামের স্বতঃস্ফ‚র্ত প্রতিভার সর্বময় দীপ্তি। কবিতাটিতে ১৪৭ বার ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন নজরুল। ‘আমি কে’ ? এই প্রশ্ন সৃষ্টির শুরু থেকেই। ‘আমি’র মধ্যেই সকল শক্তির উপস্থিতি এ-কথা নজরুল জানতেন। ব্যাপারটা হচ্ছে নিজেকে চেনা। বৃহৎ সত্তায় নিজেকে দেখতে পাওয়া। নজরুল-প্রতিভার মৌল প্রবণতার উৎসবিন্দুও ‘বিদ্রোহী’। সীমাহীন প্রাণাবেগে উচ্ছল তারুণ্যদীপ্ত বাসনার বিস্তারে ‘বিদ্রোহী’র প্রতিটি উচ্চারণ হয়ে উঠেছে আবেদনময়, চিত্তাকর্ষী ও নির্ভীকতার ইঙ্গিতবাহী। নজরুলের শিল্পীসত্তার মৌল প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতার দুই প্রধান দিকও এখানে স্পষ্ট। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য!’ এই পঙ্ক্তিতে পৌরাণিক আখ্যানের চরিত্র কৃষ্ণের দুই রূপের কথা বলা হলেও এর ভেতরে রোমান্টিসিজমের দুই বৈশিষ্ট্যই প্রোথিত ; প্রেম আর মুক্তির সংগ্রাম। ‘আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ !’ এই শক্তিকে নজরুল খুঁজেছেন পুরাণে। শুধু ভারতীয় পুরাণ নয়, তিনি অনুসন্ধান করেছেন পশ্চিম এশীয় ও গ্রিক পুরাণও। অবগাহন করেছেন ইসলামিক ঐতিহ্যেও। আর এই পুরাণ অনুসন্ধান ও তা আশ্রয় করে আত্মশক্তির অনুসন্ধানই নজরুলের শিল্পীসত্তার এক মৌল বৈশিষ্ট্য। মানুষের মধ্যেকার শুভবোধতাড়িত শক্তির সন্ধান করেছেন নজরুল আর সেই শক্তির সব কল্যাণকর উপাদান একত্র করে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছেন শোষক ও শাসক শ্রেণির অপশক্তির বিরুদ্ধে। বিপ্লবী, শোষণমুক্তি আর স্বাধীনতার চেতনা-প্রবাহী কবিতার প্রকৃত রূপ কী হতে পারে বাংলায় তার একটি মৌলিক ও অনন্যসাধারণ উদাহরণ ‘বিদ্রোহী’র ভেতর দিয়ে কবি নজরুল উপস্থাপন করেন। উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে, তাদের অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কবিতার ভাষায় এমন বাঙ্ময় ও স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল অভূতপূর্ব। বাংলা কবিতার পাঠকদের কাছে এ ভাষা আর এ কণ্ঠস্বর ছিল একেবারেই নতুন ; কালের স্পন্দনকে ধারণ করেও এ-ভাষা কালজয়ী। ফলে বাংলা কবিতার ভাষা বদলেও ‘বিদ্রোহী’র ভূমিকা বাঁক বদলকারী তো বটেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণও।

কবিতার শিরোনামটি [বিদ্রোহী] কাজী নজরুল ইসলামের নামের সঙ্গে উপাধি হিসেবে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে তাঁর পরিচয়কে বিশেষভাবে অর্থবহ করে তোলে। এই কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলাসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আসনও স্থায়ী হয়ে যায়। নজরুল তাঁর যৌবনের উন্মাদনা দিয়ে, অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা দিয়ে, চিন্তার ঔদার্য্য দিয়ে, মানবিকতার বিশ্বপ্রাণিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে- এবং প্রকরণকৌশলে স্বকীয় ভাষাভঙ্গি দিয়ে নিঃসংকোচে বাংলাসাহিত্যের মূল আসরে গিয়ে নিজ শক্তিবলেই আসন করে নেন। কারও আহ্বানের অপেক্ষা তাঁকে করতে হয় না। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভূমিকা এ-ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। 

নজরুলের কবিতায় বিশেষত ‘বিদ্রোহী’-তে আরবি-ফারসি শব্দগুচ্ছের সৃষ্টিশীল প্রয়োগে যা বাঙ্ময় ও গতিশীল, এটি তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আয়ত্ত করেছেন। সমসাময়িক কালে লেখা ‘অগ্নিবীণা’র অন্যান্য কবিতাও একই আলোকে দীপ্তিমান। আমরা স্মরণ করতে পারি, বাংলা ভাষাকে সংস্কত ভাষার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে রবীন্দ্রনাথকেও তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল রক্ষণশীলদের সঙ্গে। এ-ক্ষেত্রে নজরুলের নতুন কাব্যভাষা ছিল তাৎপর্যময় এক মোক্ষম প্রতিবাদ। এই ভাষা তাঁর নিজ সমাজ-শ্রেণির সাহিত্যানুরাগীদের মনের সংকোচ ও দ্বিধা দূর করতে রেখেছে অসামান্য অবদান। উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণে বাঙালি মুসলিম মানসে যে দৈন্য ও হীনম্মন্যতা জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল, নজরুলের দুর্দান্ত ও তেজদীপ্ত আবির্ভাবে তার অবসান ঘটে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন অনেকেই। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ‘অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করছিল এ যেন তাই ; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এই যেন বাণী।’ প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন, ‘এ কবিতা যে বাংলাদেশকে মাতিয়ে দেবে তাতে আশ্চর্য হবার কী আছে।’ নজরুল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শোনান! শুনে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেন। তবে বিদ্রোহী কবিতা জ্বালা ধরিয়েছিল নজরুলবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে। তারা কেউ কেউ ব্যঙ্গও করেছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে সেগুলো উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি না।

শতবর্ষে উপনীত হয়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও তার অম্লান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বব্যাপী ধনতন্ত্রের শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক সকল বৈষম্যই বিদ্যমান। ‘অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণে’র তলে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল’ এই বাংলায় তো বটেই সারাবিশ্বের আকাশে-বাতাসে এখনও প্রতিনিয়ত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত। পৃথিবীতে যত দিন শাসক আর শোষক থাকবে, ততদিন অন্যায়-অত্যচারের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের বিদ্রোহ-ও থাকবে, আর কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আবেদনও ততদিন পর্যন্তই অটুট থাকবে।