কানিজ পারিজাত : ভালোবেসে বিহ্বল যে-জন : আহমেদ রেজা

05 May 2021, 06:21 PM সাহিত্যভুবন শেয়ার:
কানিজ পারিজাত : ভালোবেসে বিহ্বল যে-জন : আহমেদ রেজা

My love is like a red red rose

That’s new by born in June...

[Robert Burns]

এই সময়ের একজন সক্রিয় আত্মমগ্ন লেখক কানিজ পারিজাত। গত তিন বছরে তিনটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। সেসব বই পাঠকমহলে আদৃত হয়েছে- এমন খবর পাই। তার এবারের রচনা- অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রকাশনা একটি কাব্যগ্রন্থ। সেই বইয়ের নাম- ‘শেষ চুমুকের আগে’। প্রকাশিত হয়েছে এবছরের অর্থাৎ ২০২১ সালের মার্চ মাসে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। বইটি প্রকাশ করেছে মূর্ধন্য। বইয়ের চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন এই সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য চিত্রকর ও লেখক ধ্রুব এষ। তিনি অনেক বইয়ের মনকাড়া প্রচ্ছদ এঁকে নিজের এক স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছেন বইপত্রের জগতে। কানিজ পারিজাত তার এই সদ্য প্রকাশিত বইটি উৎসর্গ করেছেন এদেশের প্রথিতযশা নাট্যপরিচালক কামালউদ্দিন নীলুকে। উৎসর্গপত্রে তিনি লেখেন- ‘উৎসর্গ/কামালউদ্দিন নীলু/নাট্যজগতের অপার বিস্ময়।’

কানিজ পারিজাত যাকে তার বইটি উৎসর্গ করেছেন, সেই কামালউদ্দিন নীলুর সাথে আমার দীর্ঘদিনের সখ্য। প্রসঙ্গক্রমে কবি কানিজ পারিজাত জানান নীলুর পরিচালিত মঞ্চনাটক ‘স্ট্যালিন’ দেখে তিনি বিমুগ্ধ। ওই মঞ্চনাটক দেখে আমারও প্রতিক্রিয়া তেমনই। অবশ্য স্ট্যালিনের কৃতিত্ব ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। পছন্দ-অপছন্দ- এই দুই করমের অনুভূতি তাকে নিয়ে কাজ করে যখন তার কথা মনে করি। শেষমেশ কোনো একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি। কামালউদ্দিন নীলুর নির্দেশিত মঞ্চনাটক ‘স্ট্যালিন’ একটি অসাধারণ প্রযোজনা। তিনি যে একজন অসাধারণ প্রতিভাবান নাট্যনির্দেশক, এই নাটকটি- কেবল এই নাটকটি দেখলে তেমন ধারণা সৃষ্টি হবে একজন দর্শকের মনে। বলা বাহুল্য, তার কর্মজীবনে কামালউদ্দিন নীলু অনেক অসাধারণ মঞ্চনাটক প্রযোজনা করেছেন। এমন একজন নাট্যব্যক্তিত্বকে তার কবিতার বইটি উৎসর্গ করায় আমি কবির মনের খোলা জানালা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা করতে পেরেছি।

কানিজ পারিজাতের কব্যগ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন ফারুক নওয়াজ। প্রায় চার পৃষ্ঠাব্যাপী লেখা ভূমিকায় ফারুক নওয়াজ কেবল কানিজ পারিজাতের শিল্পসাধনার একটা সামূহিক পরিচয় দেননি, প্রসঙ্গক্রমে সমকালের নারী-কবি ও নারী লেখকদের প্রবণতা, সীমাবদ্ধতা ও ঔজ্জ্বল্য বিশ্লেষণ করেছেন। তার সেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে প্রকাশিত মতামতের তারিফ করতেই হয়। সৎ সাহসের অভাব নেই তার- মানতেই হবে। আর, পাকা জহুরির মতন তিনি আমাদের দেশের ভালোমানের নারী লেখকদের অনেকটা যেন খুঁজে বের করেছেন।

কানিজ পারিজাতের কাব্যগ্রন্থে মোট উনপঞ্চশাটি কবিতা রয়েছে। প্রতিটি কবিতায় রয়েছে স্বতন্ত্র নাম। দুই-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশিরভাগ কবিতা প্রতিটি একেক পৃষ্ঠায় উপস্থাপিত হয়েছে। প্রথম কবিতার শিরোনাম- ‘আদিম ঘ্রাণ’। শেষ কবিতার শিরোনাম- ‘জলমানুষের অপেক্ষায়’। প্রথম কবিতা এবং সবশেষ কবিতা- এই দুটি কবিতার শিরোনামের দিকে তাকালে মনে হয়, কবি যেন পথ-পরিক্রমা করছেন। শুরুটা আদিম কোনো বাস্তবতায়, শেষটায় একটা অপেক্ষা। সে অপেক্ষা জলমানুষের জন্য। ‘জলমানুষ’ শব্দটি পড়লেই মনের আয়নায় ধরা দেয় sea girl অর্থাৎ সমুদ্রবালিকার অবয়ব। এর আরো নাম আছে ‘জলকুমারী’। কানিজ পারিজাতের কাব্যগ্রন্থে যার জন্য অপেক্ষায় পাই কবিকে, অথবা কবিতার মূল চরিত্র [Persona]-কে, তিনি অপেক্ষা করছেন, বোধ করি, একজন জলমানুষের জন্য সে মানুষটি কোনো মাধুরীমÐিত নারী নয়, সে মানুষটি পুরুষ। এভাবে কবি আর কবিতার কথক অর্থাৎ Persona একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে যান। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, যে Persona তার এই কবিতায় এবং অন্যসব কবিতায় রয়েছে, সে কবিরই প্রতিনিধি আরেক আবেগাকুল নারী।

সে আবেগের মাঝে যেমন সুখস্বপ্ন আছে, আছে না-পাওয়ার বেদনা। তবে না-পাওয়ার বেদনা কবিকে শেষমেশ হতাশাগ্রস্ত করে না। একটু হতাশ তাকে হতে হয় অনেকটা সময়- সেই হতাশার মাঝেও সে স্বপ্নে বিভোর থাকে। একটা ক্ষীণ আশা নিবু নিবু প্রদীপের মতো জ্বলতে থাকে- এই বুঝি এখন, বা পরে কোনো একসময় ধরা দেবে তার মনের মানুষ, তার স্বপ্নের বরপুত্র। এই স্বপ্ন এবং স্বপ্নের অপর পিঠে অবস্থানরত হতাশা অনেক কবিতায় একধরনের দ্ব›দ্ব তৈরি করে, অনেকটা থিসিস এন্টি থিসিস [thesis- antithesis]-এর সহ-অবস্থানের মতো। কানিজ পারিজাত মেজাজে একজন রোম্যান্টিক কবি। তিনি স্বপ্নচারীÑ স্বপ্ন দেখেন সুখের, প্রেমাস্পদের সাথে আনন্দময় সময়ের। তাই বলে কানিজ পারিজাতের সব কবিতা রোম্যান্টিক আবেগে আর্দ্র- এমন বলা যাবে না। তার কাব্যগ্রন্থে তিনটি এলিজি রয়েছে ; একটি দেশাত্মবোধক কবিতা রয়েছে।

এই কাব্যগ্রন্থে দুটি এলিজি পাশাপাশি রাখা হয়েছে। একটির শিরোনাম ‘তার জেগে উঠবার প্রতীক্ষায়’ ; অন্যটির শিরোনাম ‘সুতোকাটা ঘড়ি’। ‘তার জেগে উঠবার প্রতীক্ষায়’ শীর্ষক কবিতাটি এদেশের প্রথিতযশা স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন স্মরণে লেখা। এই এলিজিটি আর দশটি এলিজির মতন নয় মোটেও। এই কবিতার কোথাও কবি পারিজাত তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র রবিউল হুসাইনের প্রশংসা করেননি, তাকে মেষপালক হিসেবে বর্ণনা করেননি [যেমনটি অনেক পশ্চিমা দেশের কবিতায় দেখি]। এই কবিতায় কবিকে দেখি দুঃখভারাক্রান্ত। রবিউল হুসাইনের চিরকালের জন্য চলে যাওয়ার কথা উপস্থাপিত হয়েছে কয়েকটি শব্দ বারবার উল্লেখের মাধ্যমে। কবি লেখেন-

হায় ! সে চলে যায় ...

সে যায়- সে যায়- সে যায় ...

[তাঁর জেগে উঠবার প্রতীক্ষায়]

এবং এর পরেই কবিকে আরো বেশি আবেগকাতর দেখি। কবি বলেন -

সে চলে যায় শাদা শাদা জুঁই আর কামিনীর ঘ্রাণ মাখা দেখে

[তার জেগে ওঠার প্রতীক্ষায়]

ঠিক এই জায়গায় কবির এলিজিটি ট্র্যাডিশনাল এলিজির মতো হয়ে যায়- নিকটজনের বা ভালোবাসার জনের মৃত্যু হলেও সান্ত¡না এই- ওই ব্যক্তির আত্মা জুঁই আর কামিনীর ঘ্রাণ মাখা দেশে চলে গেছে- অর্থাৎ, সুন্দর সেই ভুবন। এই কবিতার সবশেষ দুই পঙ্ক্তিতে একটি বাঁক নিতে দেখতে পাই কবিকে। কবি বলেন-

আমি দাঁড়িয়ে থাকি-

পুনারায় তার জেগে উঠবার প্রতীক্ষায়।

[তাঁর জেগে উঠবার প্রতীক্ষায়]

এই পঙ্ক্তি দুটি - পড়তে পড়তে উপলব্ধি করিÑ কবি যেন বিশ্বের সকল ঐতিহ্যকে নিজের মাঝে ধারণ করেন। সময় ও সুযোগমতো কোনো একটি পৃথক বা স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের আধারে কবি অবগাহন করেন। তা না হলে তিনি কেন তার প্রিয়জনের পুনরায় জেগে উঠবার, অর্থাৎ পুনরুত্থানের প্রত্যাশা করবেন ?

কানিজ পারিজাতের কাব্যগ্রন্থের আরেকটি অনুপম সুন্দর কবিতা ‘সুতোকাটা ঘুড়ি’ শীর্ষক এলিজিটি। এই কবিতাটি লেখা হয়েছে দীনা আপা স্মরণে। এখানেও কবি তার দীনা আপার প্রশংসা করেননি একবারও [যেমনটি আমরা প্রায়শ কোনো এলিজিতে পাই]। বরং তার প্রিয় এই মানুষটি যে চিরকালের জন্য এক অচেনা পৃথিবীতে গমন করেছে, সেখান থেকে যে আর কখনোই প্রত্যাগমন সম্ভব নয়- এই উপলব্ধি তাকে বিষাদগ্রস্ত করে। তবে, তার চলে যাওয়ার বিষয়টির অবতারণা করতে গিয়ে কবি বলেন-

কালো মেঘের ভেলা ভেসে

সে চলে গেছে দূর...

বহুদূর।

[সুতোকাটা ঘুড়ি]

মেঘের রং কালো। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্বের একটি গানের প্রথম দিকের একটি পঙক্তি-

নীলাকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা ...

কানিজ পারিজতের কল্পনায় রয়েছে- কালো মেঘ, অচেনা বন্দর, অচেনা সময়। খুব সহজ করে কথা বলেন তিনি। বলেন কী হলো এবং সেই হওয়ার ফলস্বরূপ কী কী কার হবে না। এই না হওয়ার বর্ণনা অসাধারণ :

‘আহা, মেঘরং গায়ে মেখে সে বুঝি দাঁড়াবে না

আর ওই খোলা দরোজায়

সবুজ ঘাসের বুকে আঁকবে না কখনোই

তার কোমল পায়ের ছাপ

.............

উদ্ধৃত এই পঙ্ক্তিগুলো বলে দেয় প্রতিদিনের সাধারণ চিত্রকে কী অসাধারণ শিল্প-ভাষায় উপস্থাপনের পারঙ্গমতা কবির।

কানিজ পারিজাতের এই কাব্যগ্রন্থে একটি দেশাত্মবোধক কবিতা রয়েছে। কবিতাটির শিরোনাম- ‘সবুজ মানুষ’। মাত্র পঁচিশটি পঙ্ক্তির মাধ্যমে তিনি একাত্তরের এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র চিত্রণ করেন। কবিতাটিতে রয়েছে একই সঙ্গে বর্ণনা এবং সংলাপ। চরিত্রের একটি কোরাস, অর্থাৎ ‘সবাই’ অন্যজন সেই ছেলেটি অর্থাৎ একজন মুক্তিযোদ্ধা। কবিতাটি শেষ হয় সেই ছেলেটির মুখ-নিসৃত বয়ানের মাধ্যমে-

‘ছেলেটির উত্তর :

আমি এক সবুজ মানুষ-

বুকপকেটে প্রিয় সবুজ স্বদেশ-

চোখের তারায় লাল সূর্যছায়া-

কণ্ঠে আমার মায়ের গান-

স্বাধীনতার সোনালি সোপান।’

[সবুজ মানুষ]

এমন বর্ণনার মাঝে আমাদের কবির প্রিয় মাতৃভূমির লাল-সবুজ পতাকা আর জাতীয় সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর ভক্তির পরিচয় পাই। কবিতাটি এককথায় অনবদ্য।

কানিজ পারিজাতের কাব্যগ্রন্থের আরেকটি ভিন্ন মেজাজের কিবতার শিরোনাম- ‘বাইপাস’। ক্রমশ নগরায়ণের প্রভাব পড়ছে চারদিকে। এই বাস্তবতার সুফল রয়েছে অনেক। কিন্তু নগরায়নের ফলে বাংলার লোকায়ত জীবন এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কিছু যে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে- এই বাস্তবতাও আমাদের খেদের সাথে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কাজিন পারিজাতের ‘বাইপাস’ শীর্ষক কবিতায় আমাদের শ্যামল বাংলার অপরূপ সুন্দর প্রকৃতির বর্ণনা রয়েছে :

‘দু’পাশে আহত দুর্বা- হলদে সবুজ ;

ভাঁটফুল আর কুন্দের ঝাড়ে নীল প্রজাপতি

দূরের মাঠে ধানটুনি আর ঘাসফড়িং

জানো বটগাছটা এখনো তেমনি দাঁড়িয়ে- পথের বাঁকে

আর সেই যে জোড়া শালিক- ওরা এখনো বনে থাকে

গাছের ডালে’

[বাইপাস]

কবিতায় প্রকৃতির এই বর্ণনা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালি, ইছামতী, আরণ্যক প্রভৃতি উপন্যাসে আমরা যেন শত বছরের বাংলার প্রকৃতিকে পাই। এখনো সেই প্রকৃতি অনেকটা তেমনই আছে- সেরকম সুন্দর ও মায়াবতী। তারপরও কবিতার কথকের প্রেমাস্পদ এ জগতে প্রবেশ করে না। কথক বলে :

শুনেছি নতুন পথ ধরে হেঁটে যাও পুবে- বাইপাস !

এই পঙ্ক্তিটি পড়তে পড়তে সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ছবি পথের পাঁচালির বিশেষ একটি দৃশ্য মনে পড়ে। দুর্র্গা আর অপু কাশবনের মাঝে লুকিয়ে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে দ্রুত ধাবমান রেলগাড়ির দিকে। অদৃশ্যের কী নির্মম খেলা- সেই নগরজীবনের ভেতরই একসময় প্রবেশ করতে হয় অপু ও তার বাবামাকে। তার আগেই দুর্গা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। ‘বাইপাস’ কবিতার কথকও [একজন নারী] হয়ত ক্রমশ হারাতে বসেছে তার প্রেমাস্পদকে। এই কবিতার শেষ দুই পঙ্ক্তি মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের The Road not Taken কবিতাটি স্মরণ করিয়ে দেয়। কবি কানিজ পারিজাত লেখেন-

‘মেঠোপথটা হাতছানি দিয়ে ডাকে

আমার আর বাইপাস খোঁজা হয় না’

[বাইপাস]

শেষমেশ প্রেমাস্পদের চাইতে বেশি টান দেয় হৃদয়কে সেই মেঠোপথ যে পথে রয়েছে ভাঁটফুল, কুন্দ, প্রজাপতি ইত্যাদি। এ-কারণে তার আর বাইপাস খোঁজা হয় না। প্রকৃতির প্রতি এমন দুর্নিবার টান কবিতাকে অসাধারণ ব্যঞ্জনা দিয়েছে। রবার্ট ফ্রস্টের The Road not Taken কবিতায়ও দেখি- শেষমেশ কথক অর্থাৎ Persona সন্তুষ্ট থাকে যে পথে সে গেছে, তাকে নিয়ে। যে পথে সে যায়নি, সে পথ নিয়ে ভাবনা আছে, আছে কল্পনা, কিন্তু শেষমেশ কোনো আক্ষেপ নেই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

‘আমি ভালোবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা।’

নগরায়নের প্রভাব যে সর্বক্ষণ ও সর্বত্র ইতিবাচক নয়, সেকথা আরো কিছু কবিতায় সরাসরি অথবা ইঙ্গিতে বলা হয়েছে। যেমন, ‘স্মৃতির ইথানল’ কবিতায় কবি ঘোষণা দেন :

‘ফোন বুথগুলো অচল’,

ডাক বাক্সগুলোয় মরিচা ;

ইথারে নেই সেই চেনা কম্পন

ফিকে হয়ে আসে ঘ্রাণ’

[স্মৃতির ইথানল]

তবে, খানিক বাদে কবি তার গল্পকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যান। বলেনÑ

‘ক্ষয়ে গেছে আয়না-

মনের আয়না’

তাহলে, কথা হচ্ছে আয়না কোনো মূর্ত বস্তু নয়, বরং বিমূর্ত বাস্তবতা। তার কেবল অনুভব করতে হয়, উপলব্ধি করতে আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যতম বস্তুর আয়নার সাথে ব্যক্তিমনের মাঝে সৃষ্ট ‘আয়নার’ মিল রয়েছে। বাইরের আয়নায় যেমন ময়লা জমতে পারে তার ঔজ্জ্বল্য হ্রাস পেতে পারে, মনের আয়নাতেও সেইরকম ঘটনা ঘটতে পারে। কবি বলেন :

‘ক্ষয়ে গেছে আয়না

মনের আয়না ;

ধূসর কাচে ঝাপসা তোমার মুখ

অস্পষ্ট অবয়ব’

[স্মৃতির ইথানল]

নগর জীবনের বাস্তবতাই এমন। স্মৃতি হয়ে যায় ধূসর, অস্পষ্ট। এই ঘটনাটি কবিতার কথককে বিষন্ন করে। নিজের মনের আয়নায় সে ভালো করে তাকিয়ে উপলব্ধি করে তাই তো, তার প্রেমাস্পদকে সেভাবে, অর্থাৎ স্পষ্টভাবে, আর দেখা যাচ্ছে না। এই সহজ স্বীকারোক্তি কবিতার কথকের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয় পাঠকের কাছে। সহজ করে কঠিন কথা বলার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে কথকের। কিন্তু, আরো কথা আছে। বিষন্নতার মাঝে আচ্ছন্ন না থেকে কথক আরেকবার জেগে উঠতে চায় এক অভাবিত শক্তি নিয়ে। সেই ঘোষণা কবিতার শেষ চার পঙ্ক্তিতে রয়েছে :

ইথানল খুঁজে ফিরি

স্মৃতির ইথানল ;

কাচ ঘষে দেখবো তোমায়

স্পষ্ট আগের মতো !

[স্মৃতির ইথানল]

বিগত দিনে কথক আবার ফিরে যেতে চান। কারণ, বিগত দিনগুলো ছিল সোনালি আভায় উজ্জ্বল। বর্তমানটা বরং ছায়াচ্ছন্ন। এই উজ্জ্বলতা আর আবছা অন্ধকারের উপস্থিতি, অর্থাৎ পূর্ণ প্রেম আর প্রেমের মাঝে কোথাও একটা ফাঁক বা ফাঁকি প্রেমিক বা প্রেমিকার মনে দোলাচল সৃষ্টি করে, একধরনের অস্থিরতার উদ্রেগ করে। এমনই দ্ব›দ্বমুখর অনুভূতি কানিজ পারিজাতের অনেক কবিতায় উপস্থিত। এসব কবিতার বেশ কয়েকটিতে আমরা একটা ছোটোগল্প পাই। সেসব গল্পের চরিত্র দুজন- আমি এবং আমি যাকে ভালোবাসি। কখনো তার বর্ণনা ‘সে’ হিসেবে, কখনো কথক তাকে সরাসরি ডাকে, কথার সাথে কথা বলে বা তাকে বার্তা পাঠায়- নীরবে, নিভৃতে। তখন ‘সে’ আর ‘সে’ থাকে না, হয়ে যায়- ‘তুমি’।

এই আমি আর সে/তুমি-র গল্প বা কথা আছে অনেক কবিতায়। কানিজ পারিজাতের প্রথম কবিতা থেকে শুরু করে অনেকগুলো কবিতায় এমন প্রেমের আবেগ পাই। সেজন্য কানিজ পারিজাতকে রোম্যান্টিক ধারার কবি বলা যেতে পারে। তার কাব্যগ্রন্থের একটা recurrent character, বা এভাবে বলা যায়- বারবার উল্লেখ করা চরিত্র, হচ্ছে ‘রূপময়ী’। সে ‘রূপময়ী’র আরো নাম রয়েছে। কখনো সে ‘রাজসিক’, কখনো-বা ‘জলমানুষ’। কখনো কখনো সে আর আমি মিলে হয়ে ওঠে আমরা। যে নামেই উপস্থাপিত হোক-না-কেন, সেই অতি প্রিয়জন যে প্রেমিকার হৃদয়ে তোলপাড় তোলে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই, বাস্তবতা-বিবর্জিত না হয়েও, স্বদেশ ও সমকাল চর্চিত থেকেও শেষমেশ কবি রোম্যান্টিক আর্দ্রতায় আচ্ছন্ন থেকে যান। এটাই কবি কানিজ পারিজাতের লেখা ‘শেষ চুমুকের আগে’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের প্রধান প্রবাহ। তার সারস্বত সাধনায় তিনি সফল হোন- এমন আশা করি, বিশ্বাসও করি। জয়তু কানিজ!


বই : শেষ চুমুকের আগে

লেখক : কানিজ পারিজত

প্রকাশক : সঞ্জয় মজুমদার

প্রকাশনা : মূর্ধন্য

প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৬৪


লেখক : গবেষক, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়