1. amin@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন
  2. tajharul@bol-online.com : আনন্দভুবন : আনন্দভুবন

৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

মোট আক্রান্ত

২৫২,৪৪৯

সুস্থ

১৪৫,৫৮৬

মৃত্যু

৩,৩৩৩

  • জেলা সমূহের তথ্য
  • ঢাকা ৫২,২৯৮
  • চট্টগ্রাম ১৪,৭৪৬
  • নারায়ণগঞ্জ ৫,৯৮২
  • কুমিল্লা ৫,৬৭৯
  • বগুড়া ৫,০৯৪
  • ফরিদপুর ৪,৮১১
  • খুলনা ৪,৫৫৩
  • সিলেট ৪,৪৭৫
  • গাজীপুর ৪,৩২৭
  • কক্সবাজার ৩,৪৭৩
  • নোয়াখালী ৩,৩৪৬
  • মুন্সিগঞ্জ ৩,১২৬
  • ময়মনসিংহ ২,৮২৮
  • বরিশাল ২,৪৭৯
  • কিশোরগঞ্জ ২,০৯১
  • যশোর ২,০২২
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১,৯৫১
  • দিনাজপুর ১,৯২৯
  • চাঁদপুর ১,৮৭৫
  • কুষ্টিয়া ১,৮৪১
  • গোপালগঞ্জ ১,৭৯৩
  • টাঙ্গাইল ১,৭৯৩
  • রংপুর ১,৭৯২
  • নরসিংদী ১,৭৫৬
  • সুনামগঞ্জ ১,৫৫০
  • সিরাজগঞ্জ ১,৫৩৯
  • লক্ষ্মীপুর ১,৪৭২
  • ফেনী ১,৩৬০
  • রাজবাড়ী ১,৩৫১
  • হবিগঞ্জ ১,২২৬
  • মাদারীপুর ১,২২৪
  • শরীয়তপুর ১,১৩৯
  • রাজশাহী ১,০৮৫
  • পটুয়াখালী ১,০৬৬
  • ঝিনাইদহ ১,০৫২
  • মৌলভীবাজার ১,০৪৬
  • জামালপুর ৯৮২
  • নওগাঁ ৯৬০
  • মানিকগঞ্জ ৯০৬
  • পাবনা ৮৫২
  • নড়াইল ৮৫১
  • জয়পুরহাট ৭৮২
  • সাতক্ষীরা ৭৮০
  • চুয়াডাঙ্গা ৭৫৯
  • পিরোজপুর ৭৩৯
  • গাইবান্ধা ৬৯৮
  • নীলফামারী ৬৮০
  • বরগুনা ৬৫৭
  • রাঙ্গামাটি ৬৫৭
  • নেত্রকোণা ৬৪৭
  • বাগেরহাট ৬৩৭
  • বান্দরবান ৫৮২
  • ভোলা ৫৫৭
  • কুড়িগ্রাম ৫৫৩
  • নাটোর ৫৪৪
  • খাগড়াছড়ি ৫৩২
  • মাগুরা ৫২৫
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫১৭
  • ঝালকাঠি ৪৯৩
  • ঠাকুরগাঁও ৪৩৭
  • লালমনিরহাট ৪৩৬
  • পঞ্চগড় ৩৬১
  • শেরপুর ৩২৬
  • মেহেরপুর ২১৯
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট

শৈশব ও আমার বাবা – দিল আফরোজ রিমা

পোস্টকারীর নাম
  • বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ২০১৮
  • ২৯২৩ বার ভিউ করা হয়েছে

আমার শৈশব স্মৃতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে আমার সবুজ গ্রাম, দাদা-দাদি, চাচা, ফুপু, মা-বাবা, ভাইবোনের কলকাকলিতে মুখর আমাদের গ্রামের বাড়ি। আমাদের বাড়ি আমার স্মৃতির পাতায় আমার হৃদয় দরজায় ভালোবাসার এক স্বর্ণ মন্দির। আমাদের বাড়ি ছিল বেশ বড়ো, অনেক ফুল ফল গাছে ছায়াঘেরা ছিল সেই বাড়ি।

 

দক্ষিণমুখো বাড়িটার সামনেই ছিল অবারিত সবুজ শষ্যের মাঠ। বাড়িতে বেশ কিছু ঘর ছিল। আমার দাদা-দাদির ঘরটি ছিল সবচেয়ে বড়ো আর সুন্দর। সানবাঁধানো লাল রঙের বারান্দার নিচের ছিল বড়ো বড়ো সিঁড়ি। সিঁড়ির দুপাশে বসার জায়গা। সকালে বিকেলে ওখানটাতেই জটলা হত, গল্প হত। ওই বারান্দাটা আমার মনে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

আমার স্মৃতির পাতায় জেগে থাকা কোনো মানুষের কথা বলতে হলে প্রথমেই একজন মানুষের কথা বলতে হয়Ñ তিনি হলেন আমার দাদাভাই। আমার দাদাভাই ছিলেন সুশিক্ষিত পরিমার্জিত এক ব্যক্তিত্ব। দশ গ্রামের একজন ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ম্যারিজ রেজিস্টার ও মাধ্যমিক স্কুলের সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আমি নিজেই শুনেছি তার মুখে বিভিন্ন ভাষায় দুয়েকটি বাক্য। তিনি আমার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি গল্প করেছেন। বলেছেন তার ছাত্র জীবনের কথা, বিয়ের পর আমার দাদির সঙ্গে নতুন ঘর বাঁধার কথা। জীবনের নানা সুখ ও দুঃখের গল্প করতে গিয়ে কখনো দুয়েকটি গানের কলি গেয়েছেন। কখনো কোরানের আয়াত, কখনো দুটি হাদিস, কখনো সেক্সপিয়ারের লেখা দুটো লাইন। এসব হয়ত আমার চাচা ফুপুরাও জানবে না যা আমি জেনেছি।

আমার দাদাভাই ছিলেন শিক্ষানুরাগী এবং ধার্মিক মানুষ। সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতেন তিনি। সবসময় ধবধবে পরিপাটি পোশাকে থাকতে পছন্দ করতেন।

আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে প্রথম যেদিন নতুন স্কুলে গেলাম সেদিন একজন শিক্ষক আমার কাছে এগিয়ে এসে মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনÑ এই যে বাবু, তুমি কি সারাটা রাস্তা হেঁটে হেঁটে এসেছ?

আমি বলেছিলমÑ হ্যাঁ।

তখন তিনি বলেছিলেনÑ তাহলে তো অনেক কষ্ট করেছ। ছুটি হলে বাড়ি গিয়ে আমার স্যারকে বলবেÑ তিনি যেন তোমাকে অনেক মিষ্টি খাওয়ান। আমার স্যারকে চেন?

আমি বলেছিলামÑ না।

তিনি তখন সহাস্যে আমাকে বললেনÑ আরে আমার স্যারকে চেন না, তিনি তো তোমার বাড়িতেই থাকেন। তিনি হলেন তোমার দাদাভাই।

সেদিন আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমি বাড়িতে গিয়ে সবার কাছে বলেছিলাম। আমার দাদাভাই অনেক আগেই রিটায়ার্ড করেছিলেন। তবে মাঝে মাঝে তিনি আমার স্কুলে যেতেন। স্কুলের শিক্ষকগণ তাকে স্যার বলতেন। অনেক সম্মান করতেন। আমার সেই স্কুল প্রতিষ্ঠার পিছনে আমার দাদাভাইয়ের বিরাট অবদান আছে। একথা আমার আব্বার মুখেই শুনেছি। আজ আমার দাদাভাই বেঁচে নেই, স্মৃতি হয়ে গেছেন। মনে পড়ে আমার দাদাভাই আমাকে নিজে সাথে গিয়ে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। হোস্টেলে সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কলেজের অনেক স্যারও আমার দাদাভাইকে স্যার বলতেন। এই স্যার বলার ব্যাপারটা আমার কাছে খুব মজার ছিল।

আরো কত কথা মনে পড়েÑ আমার দাদাভাই আমার বিয়ের দিন আমার হাতটি আমার হাসব্যান্ডের হাতে তুলে দিয়ে চোখের জলে ভেসে বলেছিলেনÑ ‘ও যদি কোনো অন্যায় করে মাফ করে দিও। যদি আবার অন্যায় করে তাহলেও মাফ করে দিও। আবার যদি অন্যায় করে তখনো মাফ করে দিও। বলেছিলেনÑ ও আমার বড়ো আদরের এই বাড়ির সবার আদরের, ওকে কোনোদিন কষ্ট দিও না।” কথাগুলো মনে হলেÑ দুচোখ অশ্রæসিক্ত হয়।

আমার প্রথম সন্তান আমার মেয়ের যখন এক মাস বয়স তখন আমি বাড়িতে যাই। আমার দাদাভাই আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে বলেছিলেন, “তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা।” তার পনের দিন পরই তিনি মারা যান।

আমার মা-বাবার কথা বলার আগেই আমার দাদাভাইয়ের কথা মনে হলো। আমার স্মৃতির জানালা ধরে আজো অ¤øান তিনি।

আমার আজকের এই স্মৃতি চারণের মধ্যমণি আমার বাবা। আমার বাবাকে আব্বা বলে ডাকতাম। আমার আব্বা আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর আদরের একটি টুকরো। তার কথা লেখার শুরুতেই আমার দুচোখ ভিজে উঠেছে। আমি সব সময় বলতাম আমার আম্মার চেয়ে আব্বা আমাকে বেশি ভালোবাসে। আমার আম্মা বলতেনÑ আমি নাকি আমার আম্মার চেয়ে আব্বাকে বেশি ভালোবাসি।

আমাদের বাড়িতে অনেক ফল ও ফুলের গাছ ছিল। কিছু কছু গাছ ছিল অনেক পুরনো আর প্রকাÐ। আমরা ভাইবোনেরা গাছে উঠে আম জাম ফুল এসব পাড়তাম। বাড়িতে প্রচুর আম গাছ ছিল। ঝড়ের দিনে কাঁচা আম পড়ে সারাবাড়ি বিছিয়ে যেত। বাড়ির সবাই কুড়াতো। পাড়ার ছোট বড়ো সকলেই আসত আমাদের বাড়িতে আম কুড়াতে। ঝড়ের সময় আমার আব্বা বাড়িতে উপস্থিত থাকলে আমার আম কুড়ানো হতো না। বৃষ্টি ঝড় বাদলে কখনো আমার আব্বা আমাকে বাইরে বের হতে দিতেন না। ঝড়ে পড়া আমগুলো আমার আম্মা আমার দাদাবুজি কাটতে বসতেন। তখন কাঁচা আম কাটা, শুকনো আর আচার বানানোর ধুম লেগে যেত সারাবাড়িতে। আচারের মসলার সুগন্ধে চারিদিক ভরে যেত। তারপর আম পাকার পালা। আমাদের বাড়ির প্রত্যেকের ঘরে তখন প্রচুর পাকা আম থাকত। আমি ভালো ভালো মিষ্টি আম বেছে নিয়ে আমার আব্বাকে খাওয়াতে পছন্দ করতাম। সকাল বিকেলে দুবেলা তখন গাছে উঠে আম পাড়ার ধুম। আমিও সেই সময় গাছে উঠে আম পেড়েছি। পাকা পাকা আম পেড়ে খুব মজা পেয়েছি।

শীতের কুয়াশাভেজা সকালের কথা মনে পড়ে। আমরা ছিলাম গ্রামের ছেলেমেয়ে। খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠতাম। ফজরের সময় দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসত আজানের ধ্বনি। আমার আব্বা আম্মা উঠে নামাজ পড়তেন। আমাদেরও ডাকতেন। উঠতে চাইতাম না। চুপ মেরে শুয়ে থাকতাম আরো কিছুক্ষণ। আবার আম্মা ডাকতেন তখন নিরুপায় হয়ে উঠে বাইরে যেতাম। কুয়াশায় ঢাকা হাল্কা অন্ধকার। গেটের বাইরে ছিল টিউবওয়েল। ওখানে অজু করতে গিয়ে আমি অন্যমনস্ক হয়ে যেতাম। প্রকৃতির এক অপূর্ব নিরবতা আর সুভ্রতায় আমি মুগ্ধ হতাম। দূরের গ্রামগুলো দেখা যেত না। কিন্তু আবছায়ার মধ্যে মনে হত কি যেন নড়াচড়া করে। আর কেমন যেন শব্দও হয়। আমি বেশ কয়েকদিন খেয়াল করে একদিন আবিষ্কার করলামÑ নড়াচড়া করা বস্তুগুলো আসলে মানুষ আর হালের গরু। খুব ভোরে কৃষক চাচারা মাঠে গরু নিয়ে হাল চাষ করত। হাল বাইতে গিয়ে মুখে কিছু শব্দতো উচ্চারণ করতেই হয়। সেদিনের সেই শীতের ভোরের সুভ্রতার ছবি অমলিন হয়ে আছে আমার হৃদয় পটে। তারপর ধীরে ধীরে লার সূর্যের মিষ্টি রোদে সারা উঠান ভরে যাওয়া। সেকি মজা লিখে বোঝানে যাবে না। শীতের দিনে সম্ভবত মাঠে গমের বীজ ছড়ানো হত। আমাদের পাড়ার ছোট ছেলেমেয়ে ক্ষেতের এক পাশে মাদুর পেতে বসে ছোট্ট ঝুড়িতে করে মুড়ি খেতো আর বাঁশের লম্বা কঞ্চি হাতে কাক বাবুই শালিক তাড়াত। আর মুখে বলতÑ ‘হ্যারো… দূরো।’ শব্দগুলো শুনতে আমার বেশ লাগত। আমরাও আমাদের বাড়ির উঠোনে শীতের রোদে ভাইবোন নিয়ে পড়তে বসাতাম। সাথে পেয়ালায় নিতাম মুড়ি আর সন্দেশ। একটু খেতাম আর বইয়ের পাতা উল্টাতাম। আমার আব্বা বাইরে বসে খেতে মোটেও পছন্দ করতেন না। তাই মুড়ি সন্দেশ লূকিয়ে খেতে হত।

আমাদের বাড়িতে বেশ কিছু খেজুর গাছ ছিল। বিকেলে একটি লোক এসে খেজুর গাছে ছোট ছোট হাড়ি বেঁধে দিয়ে যেত। পরের দিন সকালে রসে ভরা হাড়ি গাছ থেকে নামিয়ে অর্ধেকটা রস আমাদের দিয়ে যেত আর অর্ধেকটা নিজে নিত। আমরা সবাই গøাসে করে ঠান্ডা রস খেতাম বাকিটুকু আম্মা নারকেল দিয়ে জ্বাল করে এক ধরনের মজাদার গুড় বানাত। আমাদের বাড়িতে গণি মিঞা নামে একজন থাকত। আমরা তাকে গণি কাকা বলতাম। সে আমাদের বাড়ির কাজ করত। শীতের মৌসুমে বাড়ির আঙিনায় সবজির চাষ করত। নতুন সবজির চারা আমার মনে নতুন আনন্দের দোলা দিয়ে যেত। গণি কাকা সকাল বিকাল নিয়ম করে চারাগাছে পানি দিত। আমরাও তার সাথে মাঝে মাঝে পানি দিতাম। সবজি গাছের পরিচর্যা করতাম। বিশেষ করে আমি এ কাজ করতে ভারি আনন্দ পেতাম। আজও নতুন সবজি চারার প্রতি আমি কেমন যেন একটা মায়া বা টান অনুভব করি।

শীতের দিনে আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের পিঠে বানান হত। অবশ্য দুধের পিঠা এবং ভাপা পিঠা শীতের মৌসুমে বেশি বানান হত। সেসময় সব বাড়িতেই কম বেশি পিঠা পুলির ব্যবস্থা হত।

গ্রীষ্মকালে প্রচÐ রোদ আর গরমে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠত। স্কুলে যেতে আমাদের তখন খুব কষ্ট হত। আমার আব্বা তখন বলতেনÑ ‘এত গরমের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। আগে বাঁচুক তারপর পড়াশোনা করবে। আমরা আব্বার চোখ এড়িয়ে স্কুলে যেতাম। শস্য ক্ষেতের পাশ দিয়ে আমরা স্কুলে যেতাম। এক সময় ধান ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ডিপ মেশিন বসানো হয়। স্কুল ছুটি হলে বাড়ি ফেরার সময় সেই মেশিনের কাছে গিয়ে পানি পড়া দেখতাম।

রোদে পুড়ে কৃষক চাচারা অনেক সময় আমাদের বাড়ির গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম করত। আমার দাদাভাই তাদের জন্য শরবত বানিয়ে দিতে বলতেন। আমি তো ভীষণ বিরক্ত হতাম। কিন্তু শরবত বানিয়ে দিতেই হত। আমার দাদাভাই নিজে হাতে তাদের শরবত খাওয়াতেন। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমার দাদাভাইয়ের একাজের কথা আমি একদিন ক্লাসে বসে এক স্যারের মুখেও শুনেছিলাম। স্যারের পাশের বাড়ির এক গরীব কৃষক স্যারকে আমার দাদাভাইয়ের এই আচরণের কথা বলেছিল।

মনে পড়ে গরমের সময় স্কুল থেকে অথবা বাইরে খেলাধুলা করে ঘরে ফিরলে আম্মা নিজের হাতে পাতা দধি দিয়ে মাঠা তৈরি করে খাওয়াতেন। অনিয়ম করলে বকা দিতেন শাসন করতেন। আমার আম্মাই আমাদের ছোটবেলায় লেখাপড়া শিখিয়েছেন। কোরান পড়া, নামাজ সবই আম্মা শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন নীতি-নৈতিকতা। ভুল করলে শাসন করতেন। গ্রামে থাকলেও আম্মা আমাদের শহরের মায়েদের চেয়েও যতœ করে মানুষ করেছেন, তবে আব্বা কখনো শাসন করেননি। আব্বা কখনো আমাকে বকা দেননি। কোনোদিন রাগ করেননি। সকল আবদার আমি তার কাছেই করতাম। আব্বা যখন অফিস থেকে ঘরে ফিরতেন যেখানেই থাকতাম সব ছেড়ে আব্বার সামনে এসে হাজির হতাম। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না। তাই গরমের সময় রাতে আমি আব্বাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস দিতাম। আব্বার জন্য কিছু করতে পারলে বড়ো শান্তি পেতাম আমি। ছোটবেলায় প্রকৃতির ছয়টি ঋতু উপভোগ করতাম। বড়ো হওয়ার সাথে সাথেই সেই ঋতু বৈচিত্র্য যেন এক এক করে হারিয়ে গেল। এখন প্রকৃতি অন্য রকম। ফিরে পেতে ইচ্ছে করে সেদিনে সেই বসন্তকাল। শীতের শেষে যখন গা একটু একটু ঘেমে উঠত আর দক্ষিণের ঠান্ডা হাওয়ার পরশে কি যে আরাম আর ভালোলাগা অনুভব করতাম তা শুধু অনুভব করা যায় প্রকাশ করা যায় না। সজীবতায় ভরে যেত চারদিক। সবুজ ধান ক্ষেতের উপরে বাতাস বয়ে যেত আর সেদিকে তাকালে মনে হত সবুজ কোমল ঢেউয়ের মাতম লেগেছে। কি অপূর্ব সাজে সেজে উঠত চারদিক। আমাদের বাড়িতে গাছের তো অভাব ছিল না। তাই নানা রকমের পাখিরও অভাব ছিল না। পাখির ডাকে মুখরিত ছিল আমাদের সেই স্মৃতিঘেরা বাড়ি। বাড়িতে নির্দিষ্ট ফুলের বাগান  ছাড়াও যেখানে সেখানে বড়ো বড়ো ফুলের গাছ ছিল। ছিল কাঠ মালতী, বকুল, গন্ধরাজ, হাজারি গোলাপ, হাসনাহেনা, বেলি, সন্ধ্যাবালতি, সন্ধ্যামনি, কুঞ্জলতা, কামিনি, রঙন, রক্তজবা, বাগানবিলাস। ছিল রঙবেরঙের পাতাবাহারের গাছ। আম্মা ফুল গাছের যতœ করতেন। গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে দিতেন, কখনো ছেটে দিতেন। কখনো কলম দিয়ে নতুন চারা লাগাতেন। আমার আম্মা প্রতিদিন ঘরের ফুলদানিতে পানি দিয়ে কাঁচা ফুল সাজিয়ে রাখতেন। ছোটবেলায় আম্মা আমাকে নানাভাবে চুল বেঁধে চুলে কাঁচা ফুল লাগিয়ে দিতেন।

আমার আব্বা একজন সুদর্শন ও কর্মঠ মানুষ ছিলেন। কোনো কোনো সময় দশজনের দায়িত্ব তিনি একাই পালন করতেন। আমার দাদা দাদি, চাচা ফুপু আমাদের এক কথায় বাড়ির সকলের দায়িত্ব আমার আব্বা এক হাতে পালন করে গেছেন। তাতো আমি নিজের চোখেই দেখেছি। তিনি তার ভাইবোনদের খুব ভালোবাসতেন। আমি খুব কাছ থেকে তার আবেগভরা মনের খবর রেখেছি।

প্রতি বছর কোরবানির সময় আব্বা প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। অনেকেই সে কাজে হাত লাগিয়েছে এবং কিছুক্ষণ কাজ করে উঠে গেছে। আব্বা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করতেন। আমাদের বাড়িতে কোরবানির জন্য বড়ো গরু কেনা হত। কখনো সাথে কয়েকটি ভেড়াও থাকত। খুব মজা হত। আব্বাই কোরবানির গরু ছাগলগুলো নিজ হাতে জবাই করতেন। আব্বা যখন মাংস নিয়ে কাজে ব্যস্ত হত আমি তার জন্য শরবত বানিয়ে খাইয়ে দিতাম। মাংস বিলানোর সময় অনেক লোকের ভিড় হত। আসলে আমাদের বাড়িটা ছিল অন্যরকম। সাটুরিয়া উপজেলার মধ্যে একটি বিশেষ বাড়ি। ঐতিহ্যবাহী সেই বাড়ির খ্যাতি ছিল। আর এখনো আছে। এখন কেউ বাড়িতে থাকে না। থাকে আমার আম্মা আর দুই কাকা। তবুও আলাদা যার যার আলাদা বাড়ি। ছোটবেলায় ছিল জনমানুষে গমগমে আনন্দঘেরা হাসি উচ্ছলতায় ভরা পরিবেশ। আর এখন নির্জন, শান্ত। সে বাড়িতে আমার আব্বা নেই। সবাই একসাথে বাড়িতে যায় কোনো কোনো সময়। গেটের কাছে দশ বারোটা প্রাইভেট কার ভিড় করে কিন্তু সেদিনের সেই প্রীতিঘন পরিবেশ আর উপস্থিত হয় না। যাকগে আমি তো শুধু শৈশবের কথাই লিখতে বসেছি আজকের কথা নয়।

আব্বাই আমার শৈশবের প্রধান স্মৃতিঘেরা মানুষ। আজ তিনি নেই। আমি কখনো বিশ্বাসই করতাম না যে আব্বা পৃথিবীতে একদিন থাকবে না। বড়ো মনে পড়ে তার কথা। আমাদের বাড়ির জন্য আব্বা অনেক খেটেছেন। নিজের অফিসের দায়িত্ব পালন করেও এত বড়ো একটা বাড়ির দায়িত্ব, এতগুলো মানুষের দায়িত্ব, বাড়িটা ঠিক রাখার দায়িত্ব একমনে পালন করে গেছেন নিরবে। তার ভাইবোনদের বিয়ে সাদির সময়ে দশজনের কাজের দায়িত্ব একাই সামলে নিয়েছেন। আমাকে তার সমস্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে নিজেই চলে গেছেন।

বর্ষাকালে যখন বাড়ির সামনে একটু একটু পানি দেখা যেত আমরা তখন খুশিতে মেতে উঠতাম। প্রতিদিন সকালে উঠে দেখতাম পানি কতটা বেড়েছে। পানি বেশি হলে আব্বা কাঠের  বড়ো টুকরো দিয়ে ঘাট বেঁধে দিতেন। কি মজাই না হত। আমার আব্বা দারুণ সাঁতার কাটতে পারতেন। অফিসে যাওয়ার আগে বর্ষার সেই পানিতে আব্বা সাঁতার কাটতেন। আমি দেখে খুব মজা পেতাম। বর্ষার পানিতে আমরা ভাইবোনেরা খুব মজা করে গোসল করতাম। পানির মধ্যে খেলতাম। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকার উপায় ছিল না। আম্মার বকুনির ভয়ে তাড়াতাড়িই উঠে পড়তাম।

বর্ষার সময় রাজাঘাটে পানি জমে থাকত। তখন আব্বা স্কুলে যেতে দিতে চাইতেন না। বৃষ্টি হলে স্কুলে যাওয়া যাবে না। আসলে আব্বা আমাদের কোনো কষ্ট করতে দিতে চাইতেন না। সেসব নিয়ে আমার আম্মা ভীষণ রেগে যেতেন। তিনি বলতেন জীবন খুব সুখের নয়। তাই মানুষ হতে হলে কষ্ট করাটাও শিখতে হবে।

রাতে পড়তে বসলে চোখে ঘুম এসে যেত। তখন আব্বা বলতেনÑ যাও শুয়ে পড়। আর পড়তে হবে না। আম্মা বলতেন, মুখ ধুয়ে এসে পড়তে বস। এখনো পড়া শেষ হয়নি। আমি মুখ ধুয়ে এসে পড়তে বসতাম। তবুও ঘুম আসত। তখন আম্মা বলতেন, সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে এসো। পড়া শেষ না করতে পারলে শোয়া যাবে না। শরৎকালের ঝকঝকে প্রকৃতি আকাশ আমার স্মৃতিপটে আঁকা হয়ে আছে। এই ধুলোবালির শহরে আজ আর শরৎ ওভাবে দেখা দেয় না। শরতের নীল আকাশের ধবধবে মেঘগুলো তুলার মতো ভাসত। আমরা ভাইবোনরা মিলে দেখতাম সেই সাদা মেঘের কারুকাজ। আকাশে সাদা মেঘের দেশে কখনো দেখা যেত একগুচ্ছ সাদা গোলাপ, কখনো বলাকার ঝাঁক কখনো সাদাপরি আবার দেখা যেত সাদা পঙ্খীরাজে ঘোড়ায় চেপে কোনো রাজকুমার যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার সেগুলো মিলিযে যেত। সেই ভালোবাসার বাড়িটাতে একটি শিউলি ফুল গাছও ছিল। আমরা যে সকালে সবার আগে উঠতে পারতাম যে সেদিন শিউলি ফুল কুরাতাম। আমার আম্মা আমাকে গোলাপি রঙের একটি সুন্দর ঝুড়ি কিনে দিয়েছিলেন। তখন সচরাচর প্লাস্টিকের ওই রকম ঝুরি দেখা যেত না। ওটার মধ্যে আমি শিউলি আর বকুল ফুল কুড়াতাম।

কত কথা মনে পড়ে

তারই সাথে ব্যথা ঝরে অন্তরে।

মনে পড়ে শুধু সেদিনের সুখ

দুঃখটাকে গেছি ভুলে।

ফিরে পেতে চাই সে হারানো দিন

জল ভরে আঁখি কূলে।

জানি না আমার মতো সব মানুষের মনে এমন ব্যাকুলতা আছে কিনা। ফেলে আসা শৈশব, মায়ের অনুরাগ ভরা যতœ, বকুনি, বাবার সাথে আহ্লাদিপনা এ যেন মধুতে মাখা। সেদিনের হেমন্তকাল আজ যেন হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন। মাঠভরা পাকা ধান, আমাদের পাড়ার কৃষক কাকা কৃষাণী কাকিরা সেই সময় খুব ব্যস্ত থাকত। তাদের এত ব্যস্ততার মধ্যেও তাদের চোখে মুখে হাসির ঝিলিক লেগে থাকত। হেমন্তের সেই সোনালি ফসল, আর ফসল ঘরে তোলার আনন্দঘন ব্যস্ততা সত্যিই সুন্দর মনমুগ্ধকর।

রোজা আসার আগে সবে-বরাতের দিন আমাদের পাড়ার সবাই রুটি হালুয়া বানাত। রাতে ইবাদত করবে বলে সন্ধেবেলায় গোসল করত সবাই। রাত জেগে ইবাদত করত। রোজার সময় আমার খুব ভালো লাগত। যদিও আমি ছোটবেলায় রোজা রাখতে পারতাম না। তবে সেহেরির সময় উঠে ভাত খাওয়ার বায়না করতাম। আম্মা বিরক্ত হতেন। কিন্তু আব্বা চুপি চুপি আমাকে ডেকে উঠাতেন। আমাদের বাড়িতে রোজার সারাটা মাস যেন উৎসব লেগে থাকত তারাবি নামাজ পড়ানোর জন্য রোজার মাসে হুজুর রাখা হত। তিনি আমাদের বসার ঘরে থাকতেন। রাতে তারাবি নামাজ পড়ানোর জন্য আমাদের পাড়া থেকেও কয়েকজন মুরব্বী আসতেন। সকালবেলা আমরা হুজুরের কাছে আরবি পড়তাম। রোজার সময় বেশি বেশি এবং ভালো ভালো রান্না হত, সকাল থেকেই সেসবের আয়োজন চলত। মহা আয়োজনে আমাদের বাড়ির ইফতারের ব্যবস্থা হত। বিকেল থেকেই আমার ফুপুরা ইফতার বানাতে ব্যস্ত হতেন। আম্মা রান্নায় ব্যস্ত থাকতেন।

এক সময় উপস্থিত হত ঈদের পূর্ব মুহূর্ত। ঈদের দুদিন আগে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম আমার ফুপু কাকারা কখন বাড়িতে ফিরবেন। সবচেয়ে বেশি পথ চেয়ে থাকতাম বিশেষ একজনের জন্য। তিনি হলেন আমার কাকা, আমার সব কাকা ফুপুদের মধ্যে এই একজনের জন্য আমার বেশি কষ্ট হত। এই মানুষটি আসার আশায় বসে থেকে চোখে জল এসে যেত। ওদিনই সবচেয়ে বেশি আদর করতেন। ঈদের দিন সকালবেলা আমাদের আগে গোসল করিয়ে দিয়ে নিজে গোসল করে নামাজে যেতেন। কাকা যে কয়টাদিন বাড়িতে থাকতেন আমরা ভাইবোন মিলে তাকে খুব জালাতন করতাম। আমরা কেউ তার কাঁধের উপর কেউ পিঠে কেউ কোলের উপর বসতাম। তার মাথায় বেশ বড়ো বড়ো চুল ছিল। আমি সে চুলে ফিতা দিয়ে ঝুটি বাঁধতাম। এক কথায় যা ইচ্ছে তাই করতাম। এসব করে খুব মজা পেতাম। তবে কাকা কখনো বিরক্ত হতেন না।

তিনি ডাক্তারি পাশ করে এক সময় বিদেশে চলে যান। তার কাছে নিয়মিত চিঠি লিখতাম। তার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে আমি অনেক কেঁদেছি। যাহোক ঈদের কথা বলছিলাম, ঈদের আগে আমার আব্বা ঢাকায় গিয়ে বাড়ির সবার জন্য ঈদের জামা, জুতো কিনে আনতেন। বিকেলে আমি আর আমার বোন আব্বার আসার অপেক্ষায় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আব্বা আসার পর আমরা অপেক্ষা করতাম কখন নতুন জামা-কাপড় বের করবেন।

অনেক কথাই মনে পড়ে যা আজ স্মৃতি হয়ে গেছে। আমার বোন আর আমি দুজনে একসাথে স্কুলে যেতাম। ও আমার দু’ক্লাস নিচে ছিল। স্বাস্থ্য ভালো, হলদে ফর্সা চেহারা, সেই থমথমে মিষ্টি মুখটি আবার দেখার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়। সেই ছোট্ট বোনটাকে একবার যদি কাছে পেতাম বুকের মধ্যে চেপে ধরে অনেক আদর করতাম। ও যখন ছোট ছিল কেমন যেন অবুঝ ছিল। যখন তখন আব্বার কোলে উঠতে চাইত। যে কাকাটা বেশি আদর করতেন ও তার জন্য বেশি পাগল ছিল। বছরে দুয়েকবার আমার বড়ো ফুপু ফুপাত ভাইবোন নিয়ে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। ওদের সাথে কদিন খুব মজা করে কাটাতাম। চলে গেলে খুব মন খারাপ হত।

আমার মেঝ ফুপুর যখন বিয়ে হয় তার সাথেই তার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলাম। এমনকি রাতেও তার গলা জড়িয়ে ঘুমিয়েছিলাম। যেদিন ঢাকায় চলে এলেন সেদিন দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে অনেক কেঁদেছিলাম। চুপি চুপি নয়, চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। আম্মা বলেছিলেন Ñ আর তো কেউ এমন করছে না, তুই এমন পাগলামি করছিস কেন?

আমাদের পাড়ার এক হাসেনা ফুপু ছিল। সেও আমাকে কখনো মা কখনো খালা বলত। আমাকে দেখলে আদর করে কথা বলত। যদিও সে আর এ পৃথিবীতে নেই। স্মৃতি হয়ে গেছে। আমাদের পাড়ার লোকগুলো তখন খুব অশিক্ষিত ছিল। কেউ অসুস্থ হলে ঠিকঠাক চিকিৎসা হত না। তাই অনেকেই অল্প বয়েস বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।

এজনের কথা বেশি মনে পড়ে। সে আমাদের বয়সী ছিল। রেজীয়াকে খুব ছোটবেলায় বিয়ে দেওয়া হয়। তখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে মাত্র পা দিয়েছি। বিয়ের পরেই রেজীয়ার পায়ে একটি ছোট্ট ঘা সবাই লক্ষ্য করল। সঠিক চিকিৎসার অভাবে সেই ঘা বছর খানেকের মধ্যেই ক্যান্সারে পরিণত হলো। মৃত্যুর অপেক্ষায় কিছুদিন কেটে গেল। এরই মধ্যে ওর চোখের সামনে ওর স্বামী আবার বিয়ে করল। তার কয়েকদিন পরই জীবনের সব লীলা শেষ করে সবাইকে মুক্তি দিয়ে চলে গেল। তার জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। এমন অনেক মানুষ আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে আছে। তাদের কথাও আমার লিখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু আমার এ বিরাট স্মৃতিক্ষেত্রে বিচরণ করতে গিয়ে হয়ত পাঠকগণ এতক্ষণে বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। ক্ষমা করবেন সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করলেও কিছু কথা আছে তা বাদ দেওয়া যায় না।

একটি সুন্দর সুখকর স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেল। একদিন সকালবেলা আমি আর বোন ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের ঘরেই আমার দাদাভাই বসে আছে তার কোলে একটি ফুটফুটে ছোট্ট সুন্দর ভাই। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার বোন বোঝেনি। ও বলেছিল দাদাভাই ঢাকা থেকে ভাই কিনে এনেছে। আমরা দুজন খুশিতে কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার বোন খুব লাফালাফি করল। একটি বিস্কুট নিয়ে ভাইয়ের মুখে দিতে গিয়েছিল। সেই ভাই আস্তে আস্তে বড় হলো। একদিন দেখলাম ভাই দাঁড়াতে পারে। আমি খুশিতে চিৎকার করে সারাবাড়ির লোকজন জড়ো করেছিলাম ভাই দাঁড়ানো শিখেছে বলে।  ভাই আধো আধো বোলে কথা বলতে শিখল। আব্বা ওর জন্য খুব সুন্দর সুন্দর জামা জুতো কিনে আনত। ভাইয়ের গায়ের রং ছিল হলদে ফর্সা। ওই সময় ওরকম সুন্দর বাচ্চা দেখা যেত না। পড়াশোনা বাদ দিয়ে ভাইকে নিয়ে খেলা করতেই আমার ভালো লাগত। ছোটবেলায় একটু ডানপিটে ছিল। বিকেলে ওকে হাত মুখ ধোয়াব বলে ডাকতাম। তখন দৌড়ে পালাত। ওর পেছনে পেছনে দৌড়ে ওকে ধরে আনতাম, জোর করে হাত মুখ ধুয়ে পরিষ্কার জামা-কাপড় পরিয়ে দিতাম। আমার ছোট দুই বোন আমার খুব বাধ্য ছিল। সবার ছোটটা বেশি বাধ্য ছিল। দুষ্টুও ছিল বেশি। তাই ওকে যতটা আদর করেছি তেমন অনেক মেরেছিও। আমিও তো ছোটই ছিলাম তাই না বুঝে শাসন করতে গিয়ে ওদের তিনজনকেই অনেক মেরেছি। সে কথা মনে করে আজ আমার কাঁদতে হয়।

বাড়িতে সবার মধ্যে একজন ছিলেন, তিনি আমার দাদাবুজি। খুব সহজ সরল এবং ধার্মিক মানুষ ছিলেন তিনি। সারাদিন সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। দাদাবুজি উপন্যাস পড়তে পছন্দ করতেন। শরৎচন্দ্র এবং বঙ্গিমচন্দ্রের বেশ কিছু উপন্যাসের কথা তিনি আমাকে বলেছিলেন। কবিতা পড়তে ভালোবাসতেন। কায়কোবাদের কিছু কবিতার দুয়েকটি চরণ তিনি মাঝে মাঝেই বলে উঠতেন, কবিতাগুলো তার মুখস্ত ছিল। আরেকজনের কথা না বললে আমার অন্যায় হবে। তিনি হলেন আমার নানাবুজি। একজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে আমাদের দেখাশোনা করেছেন। ছোটবেলা থেকে আমাদের লালন-পালন করেছেন অফুরন্ত ভালোবাসা আর আদর দিয়েছেন। আমার স্মৃতির মাঝারে তিনি একজন বিশেষ মানুষ। আমার ছোট ফুপু ছিলেন কখনো আমার ফুপু কখনো বন্ধু। তার সাথেই আমি স্কুলে যেতাম। পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন।

যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন আম্মা আমাকে পড়াতেন। আমি আম্মাকে ভয় পেতাম। আম্মা যখন পড়া ধরতেন ভয়ে আমি ভুল করে ফেলতাম। আর তখন আম্মার বকুনি অথবা মাইর জুটত কপালে। সেদিন কষ্ট হলেও আজ সে স্মৃতি আমার কাছে বড়ো মধুর। আম্মাকে আমি একজন আদর্শ মা বলেই মনে করি। তিনি কোনোদিন আমাদের কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। আমার আম্মা বলতেনÑ বাচ্চারা মনে কষ্ট পেল কিনা সেটা আমি ভাবি না, আমি ভাবি কিসে তাদের মঙ্গল হবে। তাই তারা মন খারাপ করলেও আমার শাসন করতে হবে, আমার না এক অসাধারণ মা। ছোটবেলা থেকে অন্য সবার সাথে তার পার্থক্যটা আমি বুঝতে পেরেছি।

আম্মা খুব সুন্দর ছিলেন। ফর্সা হাল্কা-পাতলা গড়ন। খাড়া নাক, ডাগর চোখ, কালো সুন্দর ভ্রæ-যুগল, তার মিষ্টি হাসি আমার মন কেড়ে নিত। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে খুব তাকিয়ে থেকেছি। কখনো গোলাপি, কখনো হলুদ কখনো বাসন্তি কিংবা আকাশি রঙের শাড়ি পরতেন আম্মা। শাড়িগুলো তার গায়ে জড়ালে যেন আরো বেশি সুন্দর হয়ে যেত। তিনি মাঝে মাঝে চোখে কাজল পরতেন। ঢিলে করে হাত খোঁপা করতেন। তার সেদিনের সেই মুখটি বড়ো দেখতে ইচ্ছে করে আমার।

ছোটবেলা আম্মাকে দেখেছি বই পড়তে আর নানা ধরনের নকশী সেলাই করতে। আমার ফুপুরা তাদের স্কুল কলেজের লাইব্রেরি থেকে বিভিন্ন বই এনে দিতেন। প্রচুর বই পড়েছেন তিনি। আমাকেও বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছেন একমাত্র তিনি। ছোটবেলায় আম্মাই আমার হাতে শিশু সাহিত্য তুলে দিয়েছেন।

দীর্ঘ পথ হেঁটে আমরা স্কুলে যেতাম। রাস্তার স্মৃতিগুলো আজো মনে গেথে আছে। স্কুলে যেতে একটি ছোট্ট নদী পার হতাম। নৌকায় উঠতে আমার খুব ভালো লাগত। বৃহস্পতিবার হাটবার ছিল। সেদিন খেয়াপাড়ের সময় দুয়েকটা নৌকাতো ডুবতোই। আমাদের স্কুলের মাঠেও লোকজন বসে বেচাকেনা করত। প্রচুর ভিড় হত সেদিন। আমার আব্বা সেদিন স্কুলে যেতে দিতেন না। বাজারের পাশেই আমার স্কুল ছিল। সেখানে কয়েকটা বড়ো বট গাছ ছিল। অনেকটা জায়গা জুড়ে তার শাখ-প্রশাখা ছিল বিস্তৃত। সে গাছগুলো আমার খুব প্রিয় ছিল। নদীর পাড়ে ছিল একটা ছোট বটগাছ। স্কুলে শেষ হতে বিকেল হয়ে যেত। পাড়ে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হত। তখন সেই বটগাছের নিচে দাঁড়াতাম। ঝিরিঝিরি বাতাস ঘর্মাক্ত শরীরে লেগে কিযে ভালো লাগত তা বলে বোঝানো যাবে না।

আমার আব্বার অফিস ছিল আমার স্কুলের কাছেই। টিফিনের সময় আব্বার অফিসে গিয়েই টিফিন করতাম। আব্বা ব্যবস্থা করে রাখতেন।

আমার স্মৃতিপটে আঁকা হয়ে আছে ফেলে আসা ধানক্ষেত, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা বক, আমাদের বাড়ির খেজুর গাছে বাবুই পাখির বাসা আর ওদের ডাকাডাকি, ফেলে এসেছি হলুদ সাদা বেগুনি রঙের কাসফুল। কামরাঙা গাছে টিয়া পাখির কুটুস কুটুস করে কামরাঙা খাওয়ার ছবি। মায়াবি ছোট সুন্দর গোলাপি রঙের কামরাঙা ফুল আরো কত কি আমার স্মৃতির পাতা সমৃদ্ধ করে রেখেছে।

মনে পড়ে আমার বিয়ের দিনের কথা। এ স্মৃতি শৈশব স্মৃতি নয়। তবে স্মৃতিতো বটেই। আমার প্রিয় মানুষ আমার আব্বার স্মৃতি। সেদিন আমাকে বিদায় দিতে হবে বলে আগের দিন থেকেই আব্বা চোখের পানি ফেলছিলেন। মন খারাপ করেই নানা কাজকর্মে ব্যস্ত ছিলেন। মায়েরা তো কাঁদেই, আমার মাও কেঁদেছেন কষ্ট পেয়েছেন। আম্মাতো আমি যেদিন প্রথম হোস্টেলে যাই সেদিনও কেঁদেছিলেন তবে কারো বাবাকে এমন কাঁদতে দেখিনি। আমার শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার সময় আমার আব্বা চিৎকার করে কেঁদেছিলেন। দুদিন পরে আমি বাড়িতে ফিরলে আব্বা নিজেহাতে কৈমাছ কেটে ভাজি করে ভাত বেড়ে আমার সামনে দিয়ে বলেছিলেন, আমার সামনে খা তো। দুদিনই তো তোকে দেখিনি তাই মনে হচ্ছে তুই না খেয়েই আছিস।

কয়েক বছর আগে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মানুষ কি এত কাজ পাগল ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায়ও কাজ করতেন। যখন বেশি অসুস্থ হলেন ঢাকায় আনা হলো। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেল ক্যান্সারে এমন ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন আর বাঁচার উপায় নেই। আমি জানতে পারলাম আমার আব্বা বেশিদিন আর এ পৃথিবীতে নেই। আমার আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। তবুও বুকে পাথর বেঁধে ভাইবোনকে সাথে নিয়ে হাসপাতালের দ্বারস্থ হলাম। খুব চেষ্টা করেছিলাম যেন আমার আব্বা আর কিছুদিন বাঁচে। কিছুই খেতে চাইত না। বাচ্চা মুরগির স্যুপ আর ফলের জ্যুস খেয়ে কাটল তিনটি মাস। খুব কষ্ট করে তোষামোদ করে একটু খাওয়াতাম। খেলে আমি খুশি হয়ে বলতাম এই তো ল²ী ছেলে। সে সময়ের তার মুখের কিছু কথা আমাকে দগ্ধ করে। তিনি বলেছিলেনÑ ‘আমার কষ্টের শেষ নেই রে মা।’

খুব অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। অধৈর্য হয়ে বলেছিলেন, ‘কবে আমার চিকিৎসা শেষ হবে? আমি কবে ভালো হব?’

আমি মনে কষ্ট নিয়ে চুপ করে ছিলাম। আমি তো জানতাম আমার আব্বা আর কোনোদিন ভালো হবেন না। শেষে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। ওখানে তার সাথে আমি যেতে পারলাম না। তার পাশে ছিলেন আমার আম্মা আর ছোট দুই বোন। রাতে ঘুমাতে পারতেন না। সারাশরীর কষ্টে জর্জরিত ছিল। যখন তখন আমার নাম ধরে ডাকতেন। আব্বা অসুস্থ অবস্থায় একমাস বাড়িতে ছিলেন। আমি কয়েকবার গিয়ে দেখে এসেছি। মৃত্যুর আগের দিনও আব্বা আমার খোঁজ করেছিলেন। পরের দিন দুপুরবেলা মৃত্যুর খবর এল। আর দেখা হলো ন। গিয়ে দেখলাম গোসল করিয়ে কাফন পরিয়ে রেখেছে।

অনেক ব্যথায় আমাদের সাথে

অভিমান করে বুঝি

কবর দেশের আঁধার ঘরে

নিয়েছে সে পথ খুঁজি। হ

 

হায়দার আলীর উইল

অরুণ কুমার বিশ^াস

 

এই কাহিনি নিছক অলৌকিক গল্প হিসেবে দিব্যি মানিয়ে যেত, যদি না ঘটনার আড়ালে খানিক ‘টুইস্ট’ থাকত। বলা যায়, ঘটনার আড়ালের সত্যটুকুই সব ছাপিয়ে গল্পের মূল মোটিফ্ বা উপজীব্য হয়ে ওঠে, এবং রিটায়ার্ড আমলা জনাব হায়দারের মেয়ে মাইশার জীবন ক্রমশ নিদারুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

 

ঘটনায় শেষতক কী ঘটে বলা কঠিন। কেননা, গল্পের কুশীলব কে কী ভাবছে, কোন্ দিকে মোড় নিচ্ছে সার্বিক কার্যপ্রণালি, এসব কিছু সব সময় লেখকের হাতে থাকে না। থাকার কথাও নয়। মুখবন্ধ মেলা ভারি না করে বরং কাহিনির দিকে এগোনো যাক।

শুরুতেই মাইশাÑ বাপের খুব আদরের সন্তান। মাইশার বয়স যখন মাত্র আট, তখন তার মা মারা যান। হায়দার সাহেব মেয়েঅন্ত প্রাণ। তাই দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করার কথা ভাবতেও পারেন নি। তাছাড়া রাশভারি টাইপ হায়দারের চরিত্রের কিছু কাঠিন্য সৌখিন মেয়েছেলেদের কাছে ঘেঁষতে খুব একটা উদ্যোগী করেনি। আত্মীয়-স্বজনের পীড়াপীড়িতে এক সময় খানিক নিমরাজি হলেন হায়দার, কিন্তু তখন তার যোগ্য পাত্রী মেলা ভার। কারণ, আমাদের সমাজে এখনও দোজবর ‘পাত্র’ হিসেবে মোটেও আদরণীয় নয়। যাও বা দুএকজন পাওয়া গেল, তারা হয় অশিক্ষিত, নয়তো খুব নি¤œরুচির। তা তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাচনভঙ্গিতে সুস্পষ্টভাবে প্রকটিত।

মাইশা একদিন কোনো রকম ভ‚মিকা না করে বলল, আমাকে নিয়ে তুমি কি খুব ঝামেলায় আছো বাপি ?

হঠাৎ এ কথা কেন মামণি ? কী এমন করেছি বলো তো- তোমাকে উপেক্ষা বা অনাদর ! তোমার কোন্ কথা শুনিনি বলো তো ! হায়দার আলী মেয়ের কথায় মনক্ষুণœ হন। বুকের ভেতর অচেনা কষ্টেরা পসরা সাজায়।

মাইশা আর কিছু বলে না। চুপ মেরে যায়। তবে তার চোখে কষ্টের আলতো ছোঁয়া চোখ এড়ায় না হায়দার সাহেবের। তিনি জেদি গলায় বলেন, কী হলো, বললে না ! আমি জানতে চাই কেন তোমার এমনটি মনে হল যে, তোমাকে নিয়ে আমি বিস্তর ঝামেলা পোহাচ্ছি !

তাই তো বাপি, নইলে তুমি হঠাৎ নতুন বন্ধু পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলে কেন ! হোয়াই ? শেষদিকে মাইশার কণ্ঠ ধরে এলো। ওর চোখে টলমল করে জল। মাইশা কাঁদে। প্রথমে নিঃশব্দে এবং পরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

মেয়ের কান্না হায়দারকে ছুঁয়ে যায়। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, আত্মীয়েরা যতই তাকে জপাক, তিনি আর কোনোদিন একা থেকে দোকা হওয়া বা মাইশার চোখে জল আনে এমন কিছু করবেন না। মাইশা চোখে আঙুল দিয়ে তার ভুল ধরিয়ে দিয়েছে। বলেছে, ধরো বাপি ব্যাপারটা ঠিক উল্টো হলো। আই মিন তুমি বেঁচে নেই, মা আর আমি। তুমি কি চাইতে তোমার মেয়ে তার মায়ের সাথে আরো একজন উটকো লোক নিয়ে বেড়ে উঠুক। সেই লোকটা তখন সম্পর্কের ধারাপাত ভুলে আমার দিকে কামার্ত হায়েনার চোখে তাকাতো। এটা নিশ্চয়ই চাইতে না তো বাপি, তাহলে তুমিই বা কেন ওপথে হাঁটতে চাইছ ! আত্মীয়-পরিজনের খেয়েবসে কোনো কাজ নেই, তাই তোমাকে খেলিয়ে খানিক মজা লুটছে। অথবা কে বলতে পারে, ওদের হয়ত কোনো ইন্টেরেস্ট আছে ! তোমাকে ঘেঁটে দিতে পারলে ওদের সেই উদ্দেশ্য হাসিল হয় !

ব্যস, মেয়ে তার চোখ খুলে দিল। মানুষ মাত্রই ভুল করে। জাঁদরেল আমলা বলে কি হায়দার আলীর কোনো ভুল হতে পারে না !

মেয়ে বড়ো হয়, চাকরির মই বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যান বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হায়দার সাহেব। তিনি উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ ও ইতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন অফিসার। পাবলিকের ট্যাক্সের টাকায় নয়, তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বৃত্তি নিয়ে পাশ্চাত্যে গিয়ে ডক্টরেট করে এসেছেন। দেশের প্রতি তার নিঃসীম মায়া, তিনি বিশ^াস করেন, প্রতিটি নাগরিকের উচিত দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করা। জাপানিরা যেমন দৈনিক দু’ঘণ্টা করে বেশি কাজ করে, কিন্তু সরকার থেকে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নেয় না।

পুরুষানুক্রমিকভাবে স্বচ্ছল হায়দার সাহেবের পরিবার। ছোটখাট জমিদার বললে ভুল হবে না। পরিবার আর কি, তার কোনো ভাইবোন নেই। তিনি একা। বাপের সব সম্পত্তি তিনিই পাবেন। এর কিছু অংশ এলাকার এক বৃদ্ধাশ্রমে দান করলেন। বা বলা যায়, নিজের ভবিষ্যৎ পথ তৈরি করে রাখলেন। যদিও মাইশা বলে, বাপিকে ছাড়া সে একদিনও থাকতে পারবে না।

কেন মা-মণি, চিরকাল তুমি আমার সাথে থাকবে ? তোমার নিজের ঘর হবে না ?

নিজের ঘর ! যদি না হয় ? তোমার কোনো প্রবলেম ! মিটিমিটি হাসে মাইশা। বাপিকে খেপিয়ে সে মজা পায়।

এভাবে বলো না মাইশা, তোমার মা কষ্ট পাবেন। তিনি বেঁচে থাকলে একদিনে কতগুলো ছেলের ইন্টারভিউ নিতেন জানো !

কতগুলো ? মাইশা চোখ নাচায়।

কম করে হলেও দু-তিন গÐা।

গÐা কী বাপি ? গÐারের বংশধর ! হি হি ! নাকি হাতি ঘোড়া মোষের আÐা ?

একদম দুষ্টুমি করো না মাইশা। যথেষ্ট বড়ো হয়েছ, এবার নিজের কথা ভাবো। বিশেষ কোনো পছন্দ থাকলে তাও বলতে পারো। তোমার মায়ের হয়ে আমিই না হয় সাক্ষাৎকার নেব।

কথা আর এগোয় না, মাইশা পালিয়ে যায়। তার নিজের ঘরে। আসলে তার পছন্দের কেউ নেই। সামনে মাস্টার্স এগ্জাম। এসব ফালতু ভাবনা ভাবার সময় কোথায় ! ইকনমিক্স যথেষ্ট টাফ সাবজেক্ট। তাও আবার নামি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মুদিখানা নয়। এবারও সে ফার্স্টক্লাস পাবার প্রত্যাশা করছে। অনার্সে দু নম্বরের জন্য ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়নি। এবার পারবে তো !

বলে রাখা ভালো, বিয়ের ব্যাপারে মোটেও উৎসাহ নেই মাইশার। এর পেছনে কারণটা ঠিক কী হায়দার আলী জানেন না। এতই পারসোনাল যে, মেয়েকে ডেকে সরাসরি শুধানোও যায় না। একান্তই ওর ব্যক্তিগত বিষয়। তবে বাবা হিসেবে তার একটা কর্তব্য আছে। এবং তিনি সেই কর্তব্য একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পরাম্মুখ নন। তক্কে তক্কে ছিলেন হায়দার সাহেব, যদি মেয়ে কখনও মুখ ফুটে কিছু বলে ! আজকালকার ছেলেময়ে ওরা, একটু প্রেমট্রেম করবে না, এটা কী করে হয়। অথচ আজ অব্দি ওর কোনো ছেলেবন্ধুকে তিনি বাসায় আনতে দেখেন নি। নাকি তলে তলে সব হচ্ছে ! কথায় বলে না, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ !

কিছুটা ভাবিত হন হায়দার। মাইশার ভেতর কিছু একটা নেই, বা কোনো কষ্ট মুখ লুকিয়ে আছে। মেয়ের এই শূন্যতাবোধ হায়দার আলীর মাঝেও সংক্রমিত হয়। অথচ মেয়েকে তিনি সুখী দেখতে চান, সর্বতোভাবে। তার ভালোমন্দে পাশে থাকতে চান। শুধু মাইশার কথা ভেবে জীবনে তিনি অনেকটা ছাড় দিয়েছেন। এজন্য অবশ্য তিনি কোনো স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড কিংবা বাহবা পেতে চান না। মায়ের অনুপস্থিতিতে মেয়েকে তিনি অনেক  বেশি কাছে পেয়েছেন, এও সত্যি।

মাস্টার্সের রেজাল্ট এল। নাহ, আশানুরূপ হয়নি। প্রথম শ্রেণি পেয়েছে, তবে মেধাক্রমে বেশ খানিকটা নিচের দিকে, মাইশা যা একদম মানতে পারে না। সে বোঝে, এর পেছনে কলকাঠি কে নেড়েছে ! ডিপার্টমেন্টের একজন তথাকথিত এনলাইটেন্ড মানুষ, সবাই তাকে একনামে চেনে। অথচ লোকটা মোটেও ভাল নয়, খ্বুই নিচু প্রকৃতির ইতর শ্রেণির মানুষ। এদের মুখোশটা খুলে দিতে পারলে বেশ হতো। সবার সাহসে কুলোয় না। মাইশার সাহস আছে। দেবে কি সে মুখোশটা খুলে !

হায়দার আলীকে ব্যাপারটা খুলে বলল মাইশা। অনার্সের সময়ও লোকটা তাকে জ¦ালিয়েছে। বারবার নানা অছিলায় রুমে ডেকে নিয়ে ইশারা ইঙ্গিতে কী কী সব বলেছে। মাইশা সব বুঝেও না বোঝার ভান করেছে। এছাড়া আর কিই বা করার ছিল ! খুব জোর তার পায়ের জুতো হাতে নিতে পারত ! চক্ষুলজ্জা ফেলে বিভাগের এক ম্যাডামকে ঘটনাটা শেয়ার করেছিল মাইশা। আশ্চর্যের বিষয়, ভদ্রমহিলা [সত্যিই কি ভদ্র] লোকটার কাছে মাইশাকে সারেন্ডার করতে বলল। এও জানিয়ে দিল, তুমি নিশ্চয়ই জানো, সে কতটা ক্ষমতাধর। পলিটিক্যাল কানেকশানও আছে। চাইলে সে তোমার পুরো লাইফ বরবাদ করে দিতে পারে। তারচে আপসে ধরা দাও, ভালো ফলাফল নিশ্চিত করো।

সত্যি বলতে, মাইশার স্রেফ বমি পেয়েছিল। একজন মহিলা এতটা নিচে নামতে পারে ! ওর মনে হয়েছিল, এটা একটা র‌্যাকেট। ছি ! কী কদর্য ওদের অভিরুচি !

মাস্টার্সের রেজাল্ট নিয়ে বড্ড অস্বস্তিতে ছিল মাইশা। অনুমান করেছিল, এমন কিছু একটা হবে। কারণ, মুখোশধারী লোকটা আবারও তার কামলোলুপ চেহারা দেখিয়েছিল মাইশাকে, মাস্টার্স পরীক্ষা শুরুর ঠিক একমাস আগে। এবার তার বক্তব্য অনেকটা পরিষ্কার। কোনোরকম রাখঢাক নেই। মাইশাকে নিয়ে সে দু’রাত কক্সবাজার কাটিয়ে আসতে চায়। তাহলেই ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট কনফার্মড। আর কখনো ডাকবে না। জাস্ট ওয়ান্স।

ডাকবে কেন, ভার্সিটিতে মুরগি কি কিছু কম আছে ! নিত্য নতুন চাইলেই অমনি পাওয়া যায়। আবারও বমি পায় মাইশার। অথচ এসব দেখার কেউ নেই ! এ কোন্ দেশে বাস করছি আমরা ! সত্যি লজ্জা হয় !

এবার কিন্তু খালিহাতে যায় নি মাইশা। জুতোও সে হাতে নেয় নি। কারণ, এমন ইতর শ্রেণির লোকেদের লাজলজ্জা নেই। কিল খেয়ে কিল চুরি করবে। দু’ঘা জুতোর বাড়ি খেয়ে দিব্যি ভুলে যাবে। লম্পট লোফার কোথাকার !

মাইশার পার্সে লুকোনো টেপরেকর্ডার ছিল। লোকটার সব কথা রেকর্ড করে নিয়েছে মাইশা। কিচ্ছু বাদ যায় নি। রেজাল্ট পেয়ে বড্ড মন খারাপ তার। লটঘট সব যে ওই ছুঁচোটা পাকিয়েছে, এটা বেশ বুঝতে পারে মাইশা। মনের কষ্ট চাপতে না পেরে বাপিকে সে সব বলে দেয়। শুনে প্রচÐ মনক্ষুণœ হন হায়দার আলী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব কী হচ্ছে ! সহসাই বিদ্রোহী হতে মন চায়। মাইশার দেয়া টেপ বারবার রি-ওয়াইন্ড করে শোনেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন, লোকটার বারোটা বাজাবেন। কোনো ছাড় দেবেন না। এসব নিনকমপুপ লোফারদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করা উচিত বিশ^বিদ্যালয় থেকে।

বাবা তাকে ‘ওন’ করছেন দেখে ভালো লাগে মাইশার। মা বেঁচে থাকলে ঠিক এটাই করতেন। শেষতক লড়তেন মেয়ের পক্ষে। লোকটার মুখোশ খুলে তুলে দিতেন পাবলিকের সামনে। পেঁদিয়ে ব্যাটার ছাল তুলে নিত হুজুগে জনগণ।

হায়দার আলীর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু মামুন সাহেব। তিনি জাঁদরেল ব্যারিস্টার। তার সঙ্গে কেসটা শেয়ার করলেন হায়দার আলী। বললেন, তিনি লোকটার চরম সর্বনাশ চান। অন্তত চাকরিচ্যুতি হোক এটুকু নিশ্চয়ই আশা করা যায়।

মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন ব্যারিস্টার মামুন। টেপ বাজালেন। মাইশার সাথে কথা বললেন। আরো কোনো ভিকটিম চেনা আছে কি না জানতে চাইলেন। কারণ, লোকটা সত্যি ঘোরেল। র‌্যাকেটটাও বড়ো।

কী হল, কিছু বলছ না যে ! উতলা হন হায়দার আলী। তিনি আরো বললেন, জানো মামুন, এই ঘটনার কারণে মাইশা বিয়ে অব্দি করতে চায় না। ওর ধারণা, সব পুরুষই অমন। নারীলোলুপ, কুরুচিপূর্ণ লম্পট। পুরো জাতের উপর তার ঘেন্না ধরে গেছে। মেয়েটার কী হবে বলো তো!

দিনকয়েক বাদে মামুন এলেন মাইশার বাসায়। খুব একটা আশা দিতে পারলেন না। প্রথম কথা হলো, টেপরেকর্ডারে ধারণ করা কথোপকথন আদালতে প্রমাণ বা আলামত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই কেসে তেমন সলিড কোনো সারকামস্টেন্সিয়াল এভিডেন্সও নেই। তাই কেস প্রমাণ করা কঠিন হবে। মালদার লোক সেÑ টাকা দিয়ে ডজনখানেক বাঘা উকিল কিনে ফেলবে। মাঝখান থেকে মাইশারÑ

মামুন কী বলতে চায় হায়দার জানেন। তিনি কষ্ট মেশানো দীর্ঘশ^াস ছাড়লেন। এই কেসের এখানেই আপাতত যবনিকা হলো। মাইশার ভীষণ মন খারাপ। সে ঠিক করলো, ছোটখাটো কোনো কাজ নিয়ে গাঁয়ে চলে যাবে। এই নষ্ট শহরে সে থাকবে না। একাই থাকবে সে।

 

খ.

চাইলেই যেমন হয় না, বাবা হিসেবে হায়দার সাহেব তেমনি তার মেয়েকে ইচ্ছামাফিক সবকিছু করতে দিতেও পারেন না। মাইশার একাকিত্ব তিনি অনুভব করেন। এও বোঝেন, মাইশার একজন সঙ্গী দরকার, যাকে সে বিশ^াস করতে পারে। এমন একজন, যার উপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায়। নইলে ওর মনের ক্ষত সারবে না।

মানেটা দাঁড়ায়, মাইশাকে বিয়ে দেয়াটা একান্ত জরুরি। কিন্তু বেঁকে বসেছে মেয়ে। কিছুতেই সে ওপথ মাড়াবে না। পুরুষ সম্পর্কে ওর আগ্রহটাই আর নেই। বিশ^াস-অবিশ^াস পরের কথা। বাপের বয়সী একজন শিক্ষক যদি এমন কাজ করতে পারে, তাহলে মামুলি একটা ছেলেছোকরাকে সে কাছে টানবে কোন্ ভরসায়!

অকাট্য যুক্তি। এই কথার পিঠে বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পান না হায়দার আলী। তাই বলে তিনি হাল ছাড়েন নি, মাইশার অগোচরে ছেলে খুঁজে চলেছেন। যদি তেমন যুতসই কাউকে পাওয়া যায়, তখন না হয় মায়ের কথা বলে হাতেপায়ে ধরে মেয়েকে রাজি করাবেন।

ছেলে অবশ্য পাওয়া গেল, খুব একটা খোঁজাখুজিও করতে হয় নি। ওবায়েদ আকাশ- হায়দার সাহেবের অফিসেরই এক জুনিয়র কর্মকর্তার ছেলে, কেবলই বিদেশ থেকে পড়াশোনো শেষ করে দেশে ফিরেছে। আপাতত এইচএসবিসিতে কাস্টমার কেয়ার ইউনিটে আছে। যথেষ্ট মেরিটরিয়াস, ডিলিজেন্ট, দেখতেশুনতেও অসুন্দর নয়। তাছাড়া হায়দার আলী মনে করেন, একটা ছেলেকে চেহারাছবিতে মিস্টার ইউনিভার্স হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং মানানসই হলেই হয়। সবচে বড় কথা, ব্যক্তিত্ববান হতে হবে। দেখে যেন সার্কাসের ক্লাউন বা সিড়িঙ্গে গোছের মনে না হয়।

আকাশ এলো একদিন হায়দার সাহেবের বাসায়, মানে খবর দিয়ে আনালেন। মাইশা বাসাতেই ছিল। হায়দার ওদের মিট করিয়ে দিয়ে সটকে পড়লেন। দুজনের মাঝে হাই- হ্যালো হল। টুকটাক কথাবার্তা। স্মার্ট ছেলে আকাশ। মাইশাকে তার পছন্দ না করার কোনো কারণ নেই। তার বাবার ‘পোস্ট অ্যান্ড পেডিগ্রি’ এক্ষেত্রে বিশেষ ভ‚মিকা রেখেছে।

আশ্চর্যের বিষয়- মাইশা খুব একটা মাথা নাড়ানাড়ি করেনি। দু’একবার রিকোয়েস্ট করতেই সে রাজি হয়। তবে কি আকাশকে ওর মন্দ লাগে নি! খুশি হন হায়দার আলী। নিজের দায়িত্বটুকু নিখুঁতভাবে পালন করতে পারাটা তার কাছে জরুরি বৈকি।

তবে মাইশা একটা শর্ত দিল। এক শর্তে আকাশকে সে বিয়ে করবে। কঠিন কথাÑ এটুকু না মানলে এ বিয়ে হবে না।

কিসের শর্ত মা, বল্ কী করতে হবে ? হায়দার আলীর চোখে সহসাই আষাঢ়ের ঘনঘটা। না জানি মেয়েটা আবার কী বলে বসবে!

বিয়ের পর আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে কিছু করতে পারবে না। কোনো ব্যাপারেই না। আমার সম্মতি ব্যতিরেকে ও আমাকে ছুঁতেও পারবে না। কঠিন শর্ত জুড়ে দেয় মাইশা।

হায়দার তার অফিসের জুনিয়র মানে ছেলের বাবাকে ডাকালেন। ছেলেসমেত। মাইশার শর্তের কথা বললেন। আকাশকে অনুরোধ করলেন, বাবা, তুমি ওকে বোঝাও। এভাবে কি জীবন চলে!

না আঙ্কেল, তার আর দরকার হবে না। আমি ওর শর্তেই রাজি। অন্তত আপনার মুখ চেয়ে –

বলা বাহুল্য, হায়দার সাহেব খুশিতে গদগদ। এই জামানায় এমন অনুগত ছেলে সত্যি বিরল। বিদেশে গিয়েও সে একদম বিগড়োয় নি। খাঁটি সোনা যাকে বলে।

যথারীতি বিয়েটা হল। মাইশার তরফে তেমন কোনো উচ্ছ¡াস চোখে পড়লো না। এটা অবশ্য আশাও করেন নি হায়দার আলী। তার মনে হয়েছে মাইশাকে একা রাখা বিপদজনক, চেনাজানার মধ্যে ভালো পাত্র পাওয়া গেছে, তাই অনেকটা তড়িঘড়ি বিয়েটা তিনি দিলেন।

বিয়ে হল, তবে কোনো বাসর হল না। আকাশ ওর কথা রেখেছে। মাইশা যেহেতু চায় নি, তাই বিয়ে করেও কৌমার্য অক্ষুণœ রাখতে এক রকম বাধ্য হয়েছে আকাশ। মেয়ের বাবা অবশ্য কিছু টের পেলেন না। পাবার কথাও নয়। শর্তটা সে আগেই মেনে নিয়েছে। এখন তো কোনো অভিযোগ চলবে না। পণ্য কিনে বাড়ি যাবার পর খুঁত আছে বলে ফিরে এলে দোকানি কী করে- আদর করে কাছে ডেকে বসায়, নাকি ব্যস্ততার অছিলায় দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়!

তবে এক ফাঁকে আকাশ জেনে নিল, হায়দার আলী তার শ^শুর, মেলা সম্পত্তির মালিক। ভবিষ্যতে এসবের হকদার তো সে-ই। কথায় বলে, পেটে খেলে পিঠে সইতে হয়। মাইশার পাগলামি তার কাছে বরং তুচ্ছ মনে হয়। শুধু শারীরিক প্রয়োজনে বিয়ে করার যেমন কোনো মানে নেই, ঠিক তেমনি ভাত ছড়ালে আজকাল কাকের অভাব হয় না। মানে বলতে চাইছি, টাকার বিনিময়ে পছন্দমতো নিত্যনতুন ময়ূরী ধরা যায়। অস্ট্রেলিয়া ঘুরে এসে এটুকু অন্তত সে বুঝেছে।

তাও ঘরের বউ বলে কথা। নানাজনে নানা কথা বলে। বিয়ের পর এদ্দিন হয়ে গেল, অথচ তারা হানিমুনে যাচ্ছে না কেন! বাচ্চাকাচ্চার খবর কী! পাবলিকের তো খেয়েবসে কাজ নেই, পরের ঘরে অহেতুক ঢুঁ মারা অনেকটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে কয়েকবার মাইশার মুখোমুখি হয়েছে আকাশ। জানতে চেয়েছে, তার এই নিরুত্তাপ বিষণœতার কী কারণ!

উত্তরে মাইশা কেবল চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। যার হাজারটা মানে হয়। সবার আগে মনে হয়, মাইশা তাকে শর্তের কথা মনে করিয়ে দিতে চাইছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে কোনো রকম প্রশ্ন করা চলবে না। না পোষালে তুমি বরং কেটে পড়ো। মাইশা তোমাকে আটকাবে না।

এর পরে কি আর কথা চলে! আকাশ তাও সেঁটে থাকে। নিয়মিত অফিস করে, যেন কিছুই হয়নি এমনিভাবে মাইশার সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখে। কিন্তু বেচারা আকাশের কথাটা একবার ভাবুন তো! পেটে রাজ্যের খিদে, সামনে প্লেট, লোভনীয় ডিশ। অথচ মুখে তুলতে গেলেই গলায় কাঁটা। যেন কেউ চোখ রাঙায়- এই চোপ! শর্তের কথা ভুলে গেছ! জেন্টেলমেন এগ্রিমেন্ট!

এভাবেই কাটে বছরদুয়েক। ইত্যবসরে অনেক কিছু ঘটে যায়। রিটায়ার করেন মাইশার বাবা হায়দার আলী। শরীরটা তার ভালো যাচ্ছে না। আকাশকে কিছু কথা বললেন তিনি। পরোক্ষে মাইশার সাথে তার সম্পর্কের কথা জানতে চান। চালিয়াত আকাশ হু হাঁ দিয়ে কাজ সারে। মুখ ফুটে বলতে পারে না, যে বস্তুত সে এখনও চিরকুমার! শ^শুরের সাথে কোনো রকম বাদানুবাদ বা কথোপকথন জমার অবকাশ দেয় না আকাশ। সে ধৈর্য ধরে। কারণ সবুরে মেওয়া ফলে। প্রত্যেকেরই কিছু চাওয়াপাওয়া থাকে। বিয়ে করেও যেহেতু সে ব্যাচেলর, কিছু বাড়তি প্রত্যাশা তার থাকতেই পারে। গাছেরটা না পেলে তলায় বসে কুড়াবে আকাশ। তাতে দোষের কী!

কিন্তু প্রশ্ন হলো ফল কবে পাকবে, গাছ থেকে টুপ করে পড়বে, আর কবেই বা সে কুড়ানোর জন্য বাঁশের ডুলি নিয়ে তৈরি থাকবে! তাও চেষ্টা করে যায় আকাশ। কিন্তু মাইশা মোটেও ভাঙে না। পুরুষ জাতির উপর তার অবজ্ঞা ক্রমশ উপেক্ষায় রূপ নেয়- তারপর বিবমিষা। আকাশকে সে এখন সহ্যই করতে পারে না। ক্রমশ এটা খেপামির পর্যায়ে পৌঁছায়। হায়দার আলী সব বোঝেন, কিন্তু কিছু করার নেই তার। সব যেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!

আকাশের এক বন্ধু অনেক ভেবেটেবে বলল, ভাবিকে বরং তুই কোথাও বেড়াতে নিয়ে চল। দেখবি, ঘরের বাইরে বেরোলে মনের বন্ধ দুয়ার খুলে যাবে। সম্পর্কের গুমোট কাটবে।

গেলে তো! ও তো আমার কোনো কথাই শোনে না! বিরস মুখে বলল আকাশ। মাইশার আচরণের সে কোনো সাযুজ্য খুঁজে পায় না। কচি খুকি তো নয়! আকাশের দিকটা সে একটুও বুঝবে না! নিন্দুকেরা কতো কী বলে! এও বলে, আকাশের আসলে মুরোদ নেই। বউ রাখবে কি করে! সত্যি বলতে, ওর মুরোদ আছে কি নেই সেই পরীক্ষাও এখনও অব্দি সে দিতে পারলো না। ডিসগাস্টিং!

 

গ.

এবার কিন্তু আকাশকে চমকে দিয়ে মাইশা বেড়াতে যেতে রাজি হল। এ যেন মেঘ না চাইতে জল! আকাশ খুশি হয়। মেঘের বদলে সোনারঙ জমা হয় আকাশের বুকে। কিন্তু ওরা যাবে কোথায়! বন্ধুই সব বাতলায়। বলে, তোরা হবিগঞ্জের বাহুবলে দ্য প্যালেস-এ যেতে পারিস। অনবদ্য জায়গা। গেলেই দেখবি ভাবির মন ভাল হয়ে যাবে। হানিমুনের জন্য একদম পারফেক্ট প্লেস।

কিন্তু শেষমেশ সেখানে যাওয়া হয় না। কোনো এক নেতার ছেলের বার্থডে সেলিব্রেট করছে। পুরো প্যালেস প্যাক্ড। ব্রিটেনে হলে ওই নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বরবাদ হয়ে যেত। পাবলিকের টাকায় পোলার জন্মদিন!

ওরা বাহুবলেই গেল, তবে দ্য প্যালেসে নয়, চা বাগনের ভিতরে ছোট্ট কটেজ। মনোরম, সবুজে শ্যামলে ভরপুর। সত্যি প্রাণ আছে এখানে। সারাদিন বেশ কাটলো। ফুরফুরে মেজাজ, ফুচকা চটপটি, তরতাজা চায়ের আমেজ। সুস্বাদু সব লোকাল ডিশ, খোচা-খুনসুটি। মাইশা সত্যি যেন প্রাণ ফিরে পায়। আশান্বিত হয় আকাশ। এবার হয়তো বরফ গলবে। রাতের জন্য অপেক্ষা- কিছু একটা হবে নিশ্চয়ই।

আদতে কিছু হয় না। যা ঘটে তা অঘটন। চরম বিপর্যয়। আকাশের কখনও নিরাপত্তার কথা মনে আসে নি। এমন অরক্ষিত জায়গায় কটেজ! চারপাশে শুধু গাছপালা, টিলাপাহাড়। কয়েক হাজার মিটার চৌহদ্দিতে কোনো জনমানব নেই। রাত তখন বারোটা একটা হবে। মনখুলে গান গাইছে মাইশা। জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে…! ওর এই গুণের কথা জানা ছিল না আকাশের। জানতে চায়ও নি অবশ্য।

সহসাই দরজা ভেঙে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পরে কয়েকজন। মুখে কালো কাপড় বাঁধা, পরনে ছাইরঙ জিন্স, দেশি মদের উগ্র গন্ধ। চোখের পলকে মাইশাকে তুলে নিয়ে যায় ওরা। কোথায় নিয়ে গেল বোঝার আগেই সব হাওয়া। আকাশ এখানে আগে কখনও আসেনি। কোথায় কাকে কমপ্লেন করবে, থানা এখান থেকে কতটা দূরে কিছুই জানে না। ঠিক বুঝতে পারলো না, মাইশাকে যারা তুলে নিয়েছে তারা স্থানীয় মাস্তান, নাকি ফুলের গন্ধ পেয়ে শহর থেকে ছুটে এসেছে! তবে একটা কথা ওর কেবলই মনে হয়, দুটো চোখ যেন বড় চেনা চেনা। ওর বন্ধু রিয়াজ নয় তো! যে কিনা ওদের এখানে আসার বুদ্ধি বাতলেছে!

বা মাইশাকে যখন ওরা তুলে নিল, একবারও বাধা দেবার চেষ্টা করে নি আকাশ। তার মানে অবচেতনে সে চাইছিল এরকম কিছু ঘটুক! নাকি সে নিজেই খবর দিয়ে ওদের এনেছে। ভাড়াটে গুÐা দিয়ে মাইশার ক্ষতি করতে চায়। মাইশার উপর সে প্রতিশোধ নিল! নাকি পুরোটাই স্রেফ দুর্ঘটনা! সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়। আকাশ নিজের ভেতর এক রকম শূন্যতাবোধ করে। ঘোরের মধ্যেই ফোন করে মাইশার বাবাকে সে খবরটা দেয়। এবং প্রায় সাথে সাথেই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে হায়দার আলী মারা যান।

পরদিন মাইশা এলো, তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে। সম্ভবত সে আত্মহত্যা করেছে। রেললাইনে মাথা দিয়েছে মাইশা। এভাবেই পুরুষ জাতির উপর দীর্ঘদিন পুষে রাখা কষ্টের বখরা নিল সে।

এর পরের ঘটনা বেশ চমকপ্রদ। বা বলা যায়, অরুচিকর। মাইশার মৃত্যুঘটনা নিয়ে কিছুটা পানি ঘোলা হয়। ওর স্বামী আকাশকে বারবার জেরার সম্মুখীন হতে হয়। চলে টানাহেঁচড়া, ক্রস ইনটেরোগেশন। যেহেতু এই কেসে কোনো আই-উইটনেস নেই, সন্দেহের তীর তবু আকাশের দিকে। তবে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়, তাই এ যাত্রা পার পেয়ে যায় মাইশার স্বামী আকাশ।

কিন্তু সমস্যা হয় অন্যখানে। জানেন নিশ্চয়, মাইশার বাবা হায়দার আলী জাঁদরেল আমলা। তার কাজে কোনো খুঁত থাকবে এটা ভাবা অন্যায়। মাইশার মৃত্যুতে আকাশ মোটেও কষ্ট পায়নি বা ভেঙে পড়েনি। কারণ ওদের ভেতর সে রকম কোনো সম্পর্কই ছিল না। বরং আকাশের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয় এই ভেবে যে, মাইশা বেঁচে থাকতে তাকে পরিতৃপ্ত না করলেও তার মৃত্যুতে কিছু ফায়দা হতে পারে। হিসেবটা এরকম- হায়দার আলীর সব সম্পত্তির মালিক মাইশা, আর তার অবর্তমানে ওটুকু আকাশের ভাগেই বর্তায়। এই ভেবে সে সমানে বগল বাজাতে শুরু করে। কথায় আছে, ভাগ্যবানের মরে জরু [বউ], আর অভাগার মরে গরু।

সব ঠিক ছিল, কিন্তু আকাশ বোধ হয় ভুলে গেছে, সবার উপরে খোদকারি করার মতো আরো একজন আছেন-তিনি স্বয়ং স্রষ্টা। নিয়তির মালিক। আকাশের হিসেবে কিছু গরমিল ছিল। মাইশার মৃত্যুজনিত শোক কিছুটা কমলে আকাশ একদিন তার শ^শুর হায়দার সাহেবের উকিলের সাথে দেখা করেন। এ কথা সে-কথার পর জানতে চান, মাইশার নামে লিখিত সম্পত্তি সে কিছু পাবে কি না।

স্মিত হেসে উকিলসাহেব কিছু কাগজ এগিয়ে দেন, সেখানে স্পষ্ট লেখা, হায়দার আলীর অবর্তমানে তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তির মালিক হবে মাইশা ও তার স্বামী ওবায়েদ আকাশ। তবে শর্ত থাকে যে, মাইশার অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে বা সে যদি কোনো কারণে আত্মঘাতী হয়, সেক্ষেত্রে পুরো সম্পত্তি নি¤েœাক্ত ট্রাস্টের হাতে ন্যস্ত হবে।

আকাশের মাথায় এবার সত্যি সত্যি চাঁদ-তারাসুদ্ধ আকাশ ভেঙে পড়লো। গাছের ও তলার দুটোই খেতে গিয়ে শেষতক সে কিছুই পেল না। বরং মাইশার মৃত্যুর পেছনে তার বেশ রকম হাত ছিল, এই অপরাধবোধ পেয়ে বসলো তাকে। শয়নে-স্বপনে নিশিজাগরণে সে কেবলই শুনতে পায় মাঝরাতে তাকে তুলে নেবার আগে মাইশার গাওয়া গান- জ্যোৎ¯œারাতে সবাই গেছে বনে! তার মানসিক স্থিরতা নেই, রাতে ঘুম হয় না, সারাক্ষণ কী যেন ভাবে আকাশ। প্রায় প্রতি রাতেই মাইশা হানা দেয় তার ঘরে। ও যেন বলতে চায়, কাউকে ঠকিয়ে কখনও জেতা যায় না আকাশ। তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছ, আমাকে ঠেলে দিয়েছো আত্মহননের পথে। আর যদি বলি সেই রাতের মুখোশে ঢাকা লোকগুলো তোমার অচেনা কেউ নয়, বরং তোমার নির্দেশেই ওরা এসেছিল, কী বলবে তুমি ?

ছি! এভাবে আমার উপর প্রতিশোধ নিলে! এতটা নিষ্ঠুর তুমি হতে পারলে আকাশ!

এখানেই গল্পটা শেষ হতে পারতো। কিন্তু আকাশের বরাতে যে তখনও কিছু বাকি!

হায়দার আলীর রেখে যাওয়া উইলের শর্ত মোতাবেক মাইশা স্বেচ্ছায় রেললাইনে মাথা দিয়েছে বিধায় পুরো সম্পত্তি চলে গেল ট্রাস্টের হাতে। এই শোক সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে আকাশের পক্ষে। মানুষ নাকি পুত্রশোক ভুলতে পারে, কিন্তু সম্পদ হাতছাড়া হলে সেই কষ্ট কখনও ভুলতে পারে না।

‘জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’- মাইশার অশরীরী গান আকাশকে ক্রমশ বেদিশা করে ফেলে। অনেক রাতে দুচোখের পাতা যখন একটু এক হয়, ঠিক তক্ষুণি এসে হানা দেয় মাইশা। স্বপ্ন নয়, বাস্তবে। লাশের গন্ধ পায় আকাশ। মাইশা তাকে মরেও শান্তি দেবে না! আকাশের মাথা ঘোরে, পানির তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ। প্রচÐ ঘামতে থাকে সে। কী যেন অবিরাম তাড়া করে তাকে। তবে কি ও পাগল হয়ে যাচ্ছে!

নাহ্ এভাবে চলতে পারে না। কিছু একটা করা দরকার। নইলে ও সত্যি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়বে। মনোবিদ মনসুর মুসা অবশ্য বললেন, এই নিয়েই তোমাকে থাকতে হবে আকাশ। সহজে তুমি মুক্তি পাবে না।

কী হয়েছে আমার, দয়া করে একটু বলবেন ডক্টর ?

বলছি, তবে তুমি ঠিক বুঝবে বলে মনে হয় না। এর নাম ‘রেকারিং সিনড্রোম’। অনভিপ্রেত দুর্ঘটনার পর কারো মধ্যে অপরাধবোধ তৈরি হয়। পেশেন্ট নিজেকে দোষী ভাবতে থাকে। এখানেও ঠিক তাই ঘটেছে। স্ত্রী মাইশা তোমাকে হন্ট করছে। চেষ্টা করো ভুলে যেতে, না পারলে মেনে নাও। বি স্টেডি আকাশ, নইলে সমূহ বিপদ! ইউ মে লুজ ইওর স্যানিটি। আই মিন মানসিক সুস্থতা নষ্ট হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে ওসব কিছুই হল না। আকাশ না পেরেছে ভুলে যেতে, না পারলো মানতে। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে এক বিকেলে সে রওনা হয়ে যায় হবিগঞ্জের বাহুবলে। জায়গাটা যেন তাকে ডাকছে। আকাশ পাগলের মতো তোলপাড় করে সবুজে ঘেরা সেই কটেজ, টিলাপাহাড়, চা বাগান। রাত নামলে আকাশ অস্থির হয়ে পড়ে, পথ খোঁজে সেই রেললাইনের কাছে যেতে। নিয়তি তাকে যেন টানছে।

পরদিন স্থানীয় পত্রিকায় দু’কলামের একটি নিউজ ছাপা হয়। সংবাদের শিরোনাম- প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতি খুঁজতে এসে ব্যাংক কর্মকর্তা দুর্ঘটনার শিকার। লাশ উদ্ধার! হ

পোস্টটি শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো আর্টিকেল
বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে, ইকবাল আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত
Theme Customized BY LatestNews